নোয়াখালীর সুবর্ণচরে সুপেয় পানির সংকট চরমে, ভোগান্তিতে বাসিন্দারা

প্রকাশিত:সোমবার, ২৬ এপ্রি ২০২১ ০৬:০৪

নোয়াখালীর সুবর্ণচরে সুপেয় পানির সংকট চরমে, ভোগান্তিতে বাসিন্দারা
মুজাহিদুল ইসলাম সোহেল, নোয়াখালী  প্রতিনিধি:

গভীর নলকূপ থেকে পরিবারের তেষ্টা মেটানোর জন্য এক কলসি পানি উঠানোর প্রাণপণ চেষ্টা করছেন। বার বার চেষ্টা করেও পানি তুলতে না পেরে হতাশ হয়ে হাঁপিয়ে উঠছেন। তারপরও অনেক কষ্টে এক কলমি পানি নিয়ে বাড়ি ফিরলে নোয়াখালীর সুবর্ণচরের মোহাম্মদ পুরের চল্লিশোর্ধ গৃহবধূ ফাতেমা বেগম । কয়েক মাস পূর্বেও কয়েক মিনিট কল চাপলে কলসি পূর্ণ হতো, কিন্তু সেই নলকূপে এখন এক ঘন্টা চেপেও কলসি পূর্ণ করতে পারছি না! নিজেদের গ্রামের নলকূপে পানি না থাকায় দু:খ করে ভুক্তভোগী এ নারী  বলেন, আমাদের গ্রামে এখন “কল আছে জল নেই”

জানা যায়, গত একমাস ধরে উপজেলার চরক্লার্ক ইউনিয়ন, পূর্ব চরবাটা ইউনিয়ন, চরবাটা ইউনিয়ন,চরজুবলি ইউনিয়ন, মোহাম্মদপুর ইউনিয়নসহ অন্য ইউনিয়ন গুলোর বেশকিছু গ্রামে গভীর নলকূপে পানি শূন্যতার কারণে সুপেয় পানির জন্য বড়ই দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে এই উপকূলীয় জনপদের বাসিন্দাদের।

উপকূলবর্তী সুবর্ণচর উপজেলার চরবাটা,পূর্ব চরবাটা, চরক্লার্ক ও মোহাম্মদপুর ইউনিয়ন সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, একটু সুপেয় পানির জন্য মানুষের মধ্যে হাহাকার বিদ্যমান। মানুষ এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়ি ছুটছে সুপেয় পানির জন্য। কোথাও গভীর নলকূপে পানি উঠছে সামান্য,আবার কোথাও উঠছে না পানি। যেখানে সামান্য পানি উঠছে সেখানে আবার লম্বা লাইন ধরে অপেক্ষা করছে পানির জন্য। এ যেন সুপেয় পানি জন্য লম্বা মিছিল। কোনো কোনো গ্রামে পুকুর ও ডোবায় পানি না থাকায় গোসল ও গবাদিপশুর পানির জন্য নলকূপই একমাত্র ভরসা, সেখানে আবার নলকূপে পানি উঠছে কম।এই যেন পুরো জনপদ জুড়ে বিশুদ্ধ পানির জন্য রুদ্ধশ্বাস চাতক পাখির মত অপেক্ষার প্রহরের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।

পূর্ব চরবাটা ইউনিয়নের পূর্ব চরমজিদ গ্রামের ছেরাজল হক এর খামার বাড়িতে কলসি নিয়ে হাজির কয়েকজন নারী। এদের মধ্যে ছালেহা বেগম জানান, ১ কিলোমিটার দূর থেকে এক কলস পানির জন্য এসেছি দেড় ঘন্টা হলো এখনো পানি নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারিনি। কখন পানি নিয়ে বাড়ি ফিরবো জানি না। খামারে পানি জন্য এসেও অনেক কথা শুনতে হয়,কলহ—বিবাদ হয় তবুও পানি নিতেই হবে। আর এখানেও নলকূপে তেমন পানি উঠছে না।

চরবাটা ইউনিয়নের পোল্টি্র খামারী খোকন জানান, নলকূপের পানি আমাদের একমাত্র ভরসা। নলকূপের বিশুদ্ধ পানি ছাড়া পোল্টি্র খামার অচল। গত এক মাস ধরে আমাদের নলকূপে পানি কম উঠছে, এতে আমরা বড়ই ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছি। খামারে সময় মত খাবার, পানি ও ঔষধ দিতে পারছি না। যে পরিমাণ পানি উঠছে তা অব্যাহত থাকলে বিরাট সমস্যার সম্মুখীন হতে হবে আমাদের।

৮নং মোহাম্মদ ইউনিয়ন পরিষদ সচিব গোলাম কিবরিয়া জানান, গত একমাস ধরে ইউনিয়ন পরিষদের গভীর নলকূপ থেকে মটরে পানি উঠছে না। আমরা অন্য স্থান থেকে পরিষদে পানির চাহিদা মিটাচ্ছি।

তিনি বলেন, শুধু পরিষদের নলকূপ নয় এই ইউনিয়নের প্রায় গ্রামে নলকূপে পানি উঠছে না। এতে এই ইউনিয়নের বাসিন্দারা সুপেয় পানির জন্য দুর্ভোগ পোহাচ্ছে দিনের পর দিন।

দক্ষিণ চরমজিদ গ্রামের বাসিন্দা হোসনে আরা বেগম জানান, এ গ্রামে শুষ্ক মৌসুমে এমনিতে পুকুর,খাল—বিল,ডোবা—নালায় পানি শুকিয়ে যায়, তবে বিগত বছর গুলোতে নলকূপে পানি ছিল। কিন্তু চলতি বছরে গত একমাস ধরে গভীর নলকূপে পানি নেই। আমরা ঠিক মতো গোসল করতে পারছি না। সুপেয় পানির জন্য ছুটছি এ বাড়ি থেকে ঐ বাড়ি। আমাদের গবাদিপশু জন্যও পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে।

নলকূপে পানির না থাকার বিষয়ে স্থানীয়দের অভিযোগ বোরো চাষের জন্য গ্রামে যত্রতত্র অনুমোদনহীন ও অপরিকল্পিত ভাবে গভীর নলকূপ স্থাপন করে গভীর থেকে পানি উত্তোলনের কারণে গভীর নলকূপে পানির সংকট সৃষ্টি হয়েছে।

ভুক্তভোগীরা জানায়, বিগত ৩ যুগেও এই অঞ্চলে এ ধরনের নলকূপে পানির সংকট দেখিনি।

অপরিকল্পিত ও অননুমোদিত গভীর নলকূপ স্থাপনের বিষয়ে উপজেলা বিএডিসি উপসহকারী প্রকৌশলী মো: শরিফুল ইসলাম জানান, উপজেলায় ৮টি ইউনিয়নে অনুমোদিত গভীর নলকূপ রয়েছে ১৫২টি ও বিএডিসি’র নিজস্ব নলকূপ রয়েছে ২০টি। অননুমোদিত ও অপরিকল্পিত গভীর নলকূপ রয়েছে সহস্রাধিক।

তিনি জানান, অনুমোদিত একটি গভীর নলকূপে প্রতি ঘন্টায় ১৮০০ কিউসেক পানি উত্তোলন হচ্ছে ভূগর্ভ থেকে। গড়ে প্রতিদিন অনুমোদিত ১৭২টি গভীর নলকূপ থেকে ১০ ঘন্টা করে ভূগর্ভ হতে পানি তুলছে কৃষক।এছাড়াও লাগামহীন ও অননুমোদিত সহস্রাধিক গভীর নলকূপ তো আছেই।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো.হারুন অর রশিদ জানান, চলতি রবি মৌসুমে উপজেলার ৩৮ হাজার ৫০০ শত হেক্টর আবাদী ভূমির মধ্যে ১১ হাজার হেক্টর ভূমিতে উচ্চ ফলনশীল বোরো ধানের চাষ করা হয়েছে। গত রবি মৌসুমে ছিল ৫ হাজার ৬২৫ হেক্টর, যা চলতি মৌসুমে দ্বিগুণ। রবি মৌসুমে অন্যন্য ফসলের চেয়ে ধান চাষে প্রচুর পানি ব্যবহার করতে হয়। প্রতি হেক্টর ধান চাষে ৪ লাখ ১৪০ কিউসেক পানি খরচ হচ্ছে। চলতি মৌসুমে অন্যান্য ফসল ছাড়া শুধু ১১ হাজার হেক্টর ভূমিতে বোরো চাষে খরচ হচ্ছে ৪৪ কোটি ১৫ লাখ ৪০ হাজার কিউসেক পানি। এর মধ্যে মাত্র ৩০ ভাগ পানি ব্যবহৃত হয় উপরি ভাগ থেকে।

তিনি আরও বলেন, ভূগর্ভের পানি রক্ষায় ও নিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের লক্ষ্যে আমরা রবি মৌসুমে অন্যন্য লাভজনক ফসল চাষের পরামর্শ দিচ্ছি কৃষকদের । হাইব্রিড ধানে পানির শোষণ ক্ষমতা বেশি হওয়ায় এবং এ অঞ্চলে পুকুর ও খাল বিলে পানি মজুদ না থাকায় ভূগর্ভের পানির উপর নির্ভর করছে কৃষক। এদিকে এবার বৃষ্টিপাত না হওয়ায় সম্পূর্ণ ভূগর্ভের পানি দিয়ে চাষাবাদ হয়েছে এ অঞ্চলে। ভূগর্ভের পানি রক্ষায় ও ভূগর্ভের পানির উপর চাপ কমাতে কম পানি লাগে এমন লাভজনক অন্যান্য ফসল চাষে উদ্ধুদ্ধ করতে কৃষকদের মাঝে প্রশিক্ষণ চলমান আছে।

গভীর নলকূপ স্থাপনের বিষয়ে এই কৃষি কর্মকর্তা অভিযোগ করে বলেন, বিএডিসির গভীর নলকূপ স্থাপনে অনুমোদন বিষয়ে উপজেলা কৃষি অফিসের সাথে সমন্বয়হীনতা রয়েছে। ফলে কত পরিমান ভূমিতে কি পরিমাণ পানি লাগবে সেই তথ্য নিরূপণ করা সম্ভব হয় না। চাষ অনুযায়ী গভীর নলকূপ স্থাপন করা হলে অবৈধ নলকূপ স্থাপন কমে আসতো।

এবিষয়ে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এনভায়রনমেন্টাল সাইন্স ডিজেস্টার ম্যানেজমেন্ট বিভাগের চেয়ারম্যান সহযোগী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মহিনুজ্জামান বলেন, ভূগর্ভ থেকে অতিরিক্ত পানি উত্তোলনের ফলে ভূগর্ভে পানি শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে। বৃষ্টি না হওয়ার ফলে এই শূন্যতা আরও বেগমান হতে পারে। এই শূন্যতা দীর্ঘায়িত হলে ভূগর্ভে সমূদ্রের লোনা পানি ডুকে যেতে পারে। ফলে সুপেয় পানির র্দীঘ মেয়াদী অভাব হতে পারে। তাই ভূগর্ভস্ত পানি রক্ষায় কৃষি কাজের জন্য আমাদের উপরি ভাগের পানির সঞ্চয় করার বিকল্প নেই।

ভূগর্ভে পানির সংকট ও গভীর নলকূপ পানি না উঠা বা কম পানি উঠার বিষয়ে, “গ্লোবাল টাস্কফোস অন ক্লাইমেট চেইঞ্জ ওয়াটার এন্ড এনার্জি” এর সভাপতি ও সেন্টার ফর পিপলস এন্ড এনভায়রনমেন্ট এর পরিচালক মো.আব্দুর রহমান রানা এবিষয়ে অশনি সংকেত দিলেন।

এই গবেষক বলেন, ভূগর্ভের পানির স্তর খালি হলে এই শূন্যস্থান পূরণে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে, ফলে মাটির অগভীরের আর্সেনিক যুক্ত ও লবনাক্ত পানি উপর নির্ভরতা বাড়লে ফসল ও স্বাস্থ্যগত সমস্যা দেখা দিতে পারে। ভূগর্ভে বড় ধরণের ধ্বসও নামতে পারে। এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে মাঠের পর মাঠ মরুভূমিতে পরিণত হতে পারে ও বড় ধরনের প্রাকৃতিক দূর‌্যোগের শিকার হতে পারে এ অঞ্চলের মানুষ।

তিনি গভীর নলকূপে পানি কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে দুষলেন অপরিকল্পিত ভাবে ভূগর্ভের পানি উত্তোলন ও ভূগর্ভের পানির উপর নির্ভরতা বৃদ্ধি করা, এছাড়াও নদী দূরে চলে যাওয়া, খাল—বিলে বৃষ্টির পানি বা উপরিভাগের পানি সংরক্ষণের প্রতি অমনোযোগী হওয়া। এই অঞ্চলের মানুষ ভূগর্ভে পানির স্তর সম্পর্কে অভিজ্ঞ না থাকা। এই অঞ্চলের ভূগর্ভের পানি রক্ষায় অপরিকল্পিত যত্রতত্র গভীর নলকূপ স্থাপন কৃষকদের নিরুৎসাহিত করা ও উপরিভাগের পানি সংরক্ষণের জোর দেওয়ার পরামর্শ দিলেন এই বিশেষজ্ঞ।

অবৈধ গভীর নলকূপ স্থাপন বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার এএসএম ইবনুল হাসান ইভেন বলেন, মাটির গভীর স্তরের পানি রক্ষায় অবৈধ ও অপরিকল্পিত গভীর নলকূপের বিরুদ্ধে দ্রুত অভিযান পরিচালনা করা হবে। এই অঞ্চলের কৃষকদের উপরি ভাগের পানি সঞ্চয় করতে উদ্বুদ্ধ করা হবে। এছাড়াও কম সেচ লাগে এমন ফসলের চাষ নিয়ে কৃষকদের মাঝে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে উপজেলা কৃষি বিভাগ।

এই সংবাদটি 1,228 বার পড়া হয়েছে

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •