পাহাড়ের দিনরাত্রী

প্রকাশিত:শুক্রবার, ০৮ অক্টো ২০২১ ০১:১০

পাহাড়ের দিনরাত্রী
সাহিত্য ডেস্কঃ  গণবদলি হচ্ছে শুনে সেদিন এমনিতেই বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের দিকে হেঁটে যাচ্ছিলাম। দোতলায় সিঁড়ির কাছাকাছি যেতেই সাক্ষাৎ হয়ে যায় হাওলাদার মহোদয়ের সঙ্গে। তিনি একটি পার্বত্য জেলার জেলা প্রশাসক পদের নিয়োগাদেশ পেয়েছেন। তবু যেন বিষণœবদনে নেমে যাচ্ছেন। কেননা তার পক্ষে তখনকার প্রেক্ষাপটে জেলা পরিবর্তন করা মোটেও সম্ভব নয়। আমি তার একজন পূর্ব পরিচিত এবং অনুজ সহকর্মী। এমন কষ্টবোধের মধ্যে আমিও একমত হলাম যে, আপনার মতো অফিসারকে খাগড়াছড়ি দেওয়াটা যথার্থ হয়নি। সকাল থেকে নানা স্তরের কর্মকর্তাকে ক্রমাগত বদলির আদেশ চলেছে। কে, কখন, কোথায়, কীভাবে যাচ্ছেন ঠিক নেই। সর্বত্র এক ধরনের চাপা আতঙ্ক বিরাজমান। মাত্র দিন দু’য়েক হলো তত্ত্বাবধায়ক সরকার এদের অন্তর্বর্তীকালীন দায়িত্ব নিয়েছেন। উপদেষ্টাগণ স্ব স্ব দফতরের কাজ বুঝে নিচ্ছেন সবে। সচিবালয়ের কোথাও কোনো সাড়াশব্দ নেই, তবে সংস্থাপন বিভাগের সংশ্লিষ্ট উপদেষ্টা মহোদয়ের কক্ষের সম্মুখে নানা স্তরের কর্মকর্তার ভিড় লেগেই আছে। এমনকি দু-একজন প্রভাবশালী সচিবও অবলীলায় উপদেষ্ঠা মহোদয়ের কক্ষে প্রবেশ করছেন এবং সহাস্যে বেরিয়ে আসছেন। তারা বেশ আত্মবিশ্বাসী ও ফুরফুরে মেজাজে আছেন। যেন সবকিছু তাদেরই শতভাগ নিয়ন্ত্রণে আছে। একটু ঘোরাঘুরি করে আওয়াজ পেলাম ইউএনওদের বদলির আদেশ আগামীকাল। তবে এতে কারও কোনো তদবিরের সুযোগ থাকবে না।

২০০১ সালের ৬ আগস্ট। বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিবের পদ থেকে আমার বদলির আদেশ হয় ইউএনও, মানিকছড়ি, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলায়। একই আদেশে এ বিভাগের আরও দুজনের পদায়ণ হয়। তবে তারা পাহাড়ে নয় সম্পূর্ণ প্লেইন ল্যান্ডে। কাজেই তারা উভয়ই মোটামুটি খুশি আছেন। উল্লেখ্য, এ অমানবিক আদেশে তাৎক্ষণিকভাবে অবমুক্ত হবেন এবং আগামীকালের মধ্যে যোগদান করার নির্দেশনাও ছিল। দিনটি ছিল হিরোশিমা দিবস। ১৯৪৫ সালের এই দিনে জাপানের হিরোশিমা শহরটি মার্কিনিদের এটম বোমার আঘাতে বিধ্বস্ত হয় এবং এতে প্রাণ যায় লক্ষাধিক মানুষের। আমার কাছে আদেশটিও যেন বোমা বিস্ফোরণের সমার্থক হয়ে দাঁড়ায়। একদিন পরেই আমার শ্রীলঙ্কা সফরের জিও হয়ে আছে, পাসপোর্টের অনুমোদনও সম্পন্ন। সপ্তাহ খানেকের সফর হবে এটি। এদিকে টিকিট, ফ্লাইট নম্বর সব নিশ্চিত করা হয়েছে। কিন্তু এখন কোথায় যাব কলম্বো না খাগড়াছড়ি? বুঝে উঠতে পারিনি, কোথা থেকে কী হয়ে গেল? বিনামেঘে বজ্রপাত বলতে যা বোঝায়। তাছাড়া গতকালই তো হাওলাদার মহোদয়ের জন্য আফসোস করে তাকে সান্ত¡না দিলাম আর আজ মাত্র চব্বিশ ঘণ্টার ব্যবধানে এই আমিই কিনা সরাসরি তার অধীনে পদায়ন পাই! কী অদ্ভুত! অদৃশ্য নিয়তির বিধানে যেমনটা হয়।

মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ সাফ জানিয়ে দিলেন, কারও কোনো দায় নেবেন না। জানানো হলো, সবাই আজই অপরাহ্নে এখান থেকে যথারীতি অবমুক্ত হবেন। কখন কীভাবে কোথায় যাবেন দায়িত্ব নিজের ওপর বর্তাবে। আমাদের তিনজনকে তাৎক্ষণিকভাবে ঘরোয়া ধরনের হলেও আনুষ্ঠানিক বিদায় দেওয়া হলো। আমি অনেকটা হতবিহ্বল, ভগ্নহৃদয়ে আজিমপুরে সরকারি বাসায় ফিরে আসি। সিঁড়ি বেয়ে তিনতলার দরজায় থেকে স্ত্রীকে বললাম, পরশু দিন বিদেশে যাওয়া হলো না জেবু! ব্যাগ গোছানো বাদ দাও। বরং খাগড়াছড়ির ব্যাগটা গুছিয়ে দাও। আজ রাতেই আমাকে যাত্রা করতে হবে। অন্যথায় অনাকাক্সিক্ষত বড় বিপদের আশঙ্কা করছি। ছোট ছোট তিনটি শিশুসন্তান আমাদের। সর্বকনিষ্ঠের বয়স তখন আট মাস। রাত ১০টা বাজে। প্রথমে ধানমন্ডি লাজফার্মার সামনে থেকে টিকিট নিয়ে মগবাজার হয়ে চট্টগ্রামগামী নাইট-কোচ ধরি। সারা রাতের অস্বস্তিকর বাস-জার্নি। অনিদ্রা আর অনিশ্চিত যাত্রা নিয়ে চট্টলার পাহাড়তলীতে পৌঁছে এক রাঙা প্রভাতের সন্ধান পেলাম।০৭ আগস্ট ২০০১ সাল। সকালে চট্টগ্রাম থেকে আমার পূর্বপরিচিত এবং বিশিষ্ট ব্যবসায়ী বন্ধু আবুল হোসেনের সহযোগিতায় তার বাড়িতে উঠি। খানিক বিশ্রাম নিয়ে প্রাতঃরাশ সম্পন্ন করি। তাঁর মানবিকতায় একটি সাদারংয়ের টয়োটা গাড়িতে খাগড়াছড়ির উদ্দেশে রওনা করি। এটি তার পারিবারিক গাড়ি। বলেছিলেন, ‘ভাই আমি চাঁটগাঁইয়া মানুষ কিন্তু জীবনে কখনো খাগড়াছড়ি যাইনি। শুনেছি রাস্তাও খুব ভালো না, পাহাড়িপথ, উঁচু-নিচু, আঁকাবাঁকা। খুব সাবধানে যাবেন’। বর্ণনা শুনে আমার হৃৎকম্পন যেন খানিকটা বৃদ্ধি পায়। তবুও মনের গহীনে অদৃশ্য শক্তি সঞ্চয় করে গাড়িতে পা বাড়িয়ে দিলাম।

অজানা-অচেনা দীর্ঘ পথের এক অবাক পথিক হয়ে পার্বত্য জেলা অভিমুখে যাত্রা করি। শহর ছেড়ে পূর্ব দিকে যেতে যেতে এদিক-ওদিক দুপাশে তাকাই প্রথমেই সপ্তদশ শতকের কবি আলাওলের মাজার, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের তোরণ, হাটহাজারী মাদ্রাসা, সরকারহাট, নাজিরহাট এবং ঐতিহ্যবাহী জনপদ ফটিকছড়িকে ডানদিকে ফেলে পাহাড়ি বনাঞ্চলে প্রবেশ করে আরও দূরে সামনে এগিয়ে গিয়ে মানিকছড়িতে পৌঁছি। বেলা তখন ১২:৩০ মি.। মানিকছড়ি একটি উপজেলা সদর হলেও অনুন্নত এবং জনমানবের হালকা বসতি বলে মনে হলো। হাইওয়ে সংলগ্ন থাকায় আমি সরাসরি অফিসে ঢুকে যাই। গাড়ি দেখে কিছু কর্মচারী ছুটে আসেন। স্বেছায় আমি পরিচয় দিয়ে বলি ইউএনও হিসেবে এ উপজেলায় আমার পোস্টিং হয়েছে। যোগদান করতে খাগড়াছড়ি যাচ্ছি। আপনাদের সঙ্গে পরিচিত হয়ে গেলাম, অন্য কিছু নয়। সবাইকে বেশ খুশি খুশি মনে হলো। পূর্ববর্তী ইউএনও সে সময় অফিসের বাইরে ছিলেন বিধায় সাক্ষাৎ হয়নি। এদের সামান্য আপ্যায়ন-আতিথেয়তা গ্রহণপূর্বক বিদায় নিয়ে পুনরায় যাত্রা করি।

চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি সড়কে উঠেই অস্পষ্ট হলুদ মাইলফলকে দৃষ্টি পড়লে চমকে উঠি আমি। দেখি সামনে প্রায় সত্তর কি.মি. তারপর জেলা সদর। রাস্তার অবস্থা নাজুক ও অকল্পনীয় এবড়ো-খেবড়ো আঁকাবাঁকা। প্রাইভেট কারের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ পথ। ঘন ঘন চান্দেরগাড়ি কাঠভর্তি মাঝারি সাইজের ট্রাক, হঠাৎ হঠাৎ পাবলিক বাসের ক্রসিং যেন জীবন হাতের তালুর মধ্যে এসে উপনীত। মনে হয় বিপরীত দিক থেকে ধাবমান প্রতিটি বাহনই আমার গাড়িকে মেরে দিয়ে যাবে। পথে জালিয়াপাড়া, মাটিরাঙা, গুইমারা, আলুটিলা ইত্যাদি পেছনে ফেলে এক ভয়াবহ আতঙ্কগ্রস্ততার তিক্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে অপরাহ্ণে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় খাগড়াছড়িতে পৌঁছে স্বস্তির এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাঁচি। সে দিনই সন্ধ্যায় নবাগত জেলা প্রশাসক এম আর হাওলাদারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করি। ডিসি হিসেবে তার কর্মকাল তখন মাত্র ৪৮ ঘণ্টা।

সম্ভবত দুই রাত সার্কিট হাউসে কাটিয়ে জেলা প্রশাসকের সঙ্গে উপজেলা সম্পর্কে মতবিনিময়, অফিস আদেশ গ্রহণ, সহকর্মীদের সঙ্গে পরিচিত হওয়া ইত্যাদি শেষে ১০ আগস্ট সকালে মানিকছড়ির উদ্দেশে রওনা করি। একইভাবে একই রাস্তায় ফিরে আসি। জেলা প্রশাসক একটা জিপগাড়ির ব্যবস্থা করে দিয়ে বললেন, ‘আপনার গাড়ি মেরামত না হওয়া অবধি ইউএনওর  দাফতরিক কাজের নিমিত্ত এটি ব্যবহার করুন।’ এমন বদান্যতা ও মানবিক ব্যবহারে আমি সত্যিই আপ্লুত হয়ে উঠি। পাহাড়ের অপ্রত্যাশিত এ কর্মজীবনে প্রকৃত অভিভাবকের ছায়া হয়ে পাশে দাঁড়ালেন স্বয়ং জেলা প্রশাসক। অনুজ সহকর্মীর প্রতি তার হৃদ্যিক অনুভূতি প্রকাশের সেই ভাষা এখনো আমাকে সহসা প্রাণচঞ্চল করে তোলে। তাকে ভাবলেই আমি শ্রদ্ধাবনত হই। নতুন জায়গা, নতুন পরিবেশ-প্রতিবেশ, আদিবাসী আর সেটেলারদের পাশাপাশি সামাজিক অবস্থান, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মতবিরোধ, পাহাড়ি-বাঙালি অভ্যন্তরীণ মনস্তাত্ত্বিক চিন্তাধারা ইত্যাদি অনুধাবন করতে শুরু করি। জেলা প্রশাসকের স্নেহাশিস ও অনুকূল আচরণে আমি কাজে নিবেদিত হওয়ার নিমিত্ত দৃঢ় মনোবল প্রদর্শনের সবে প্রস্তুতি নিচ্ছি। মনে মনে বলছি, চাকরিতে ভালো কর্মস্থল নয়, ভালো বস প্রয়োজন। আমি তো তা-ই পেয়েছি। কাজেই কিসের দুঃখবোধ?

ঠিক তখনই বলা যায় আমার জীবনের চরম দুর্বিষহ ও দুঃসময়ের ললাটলিপি লেখা হয়ে যায়। ছোট ছোট তিন তিনটে সন্তান ও স্ত্রীকে অনেকটা অনিশ্চয়তার মাঝে ঢাকায় রেখে আসতে না আসতেই মাত্র চৌদ্দ দিনের মাথায় আমার সুস্থ-সবল এবং প্রায় নিরোগ মা ২৫ আগস্ট ২০০১ খ্রি. তারিখে আকস্মিক মৃত্যুবরণ করেন। মায়ের এমন চলে যাওয়া আর আমার এমন অভিশপ্ত পোস্টিং একাকার হয়ে যায়। যেখান থেকে তাৎক্ষণিকভাবে পরিবারের কারও সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করার কোনো উপায় নেই। যা আমাকে ক্রমেই শারীরিক ও মানসিকভাবে দুর্বল করে তোলে। দুশ্চিন্তা, নিত্য-অনিদ্রা ও দুঃস্বপ্নের দীর্ঘ রজনীগুলো আমাকে যেন ক্রমাগত গ্রাস করতে থাকে। মায়ের জন্য কিছু করতে পারিনি, কেন পারিনি! মানুষের জীবনে কত বিচিত্র স্বাদ-আহ্লাদ থাকে! যাপিত জীবনকালে সবকিছু পূরণীয় নয় জানি। তবু অন্তহীন ও চিরন্তন এই মনোবাসনা। আমার মায়ের এ ধরনের অভিমানভরা প্রস্থান আমি কোনোক্রমেই মেনে নিতে পারছিলাম না। আমার কিছু ভালো লাগে না, মন বসে না দাফতরিক কাজে। যেন দায়িত্বের খাতিরে রুটিন মাফিক কাজ করছি শুধু। উদ্যোগ-উদ্যম, উৎসাহে অজানা অদৃশ্য ভাটা পড়ে যায়।

ছুটির দিনের নির্জন দুপুরে যখনই চারদিক থেকে নিঃসঙ্গতা এসে আমাকে সহসা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত করে দিত, তখনই পাহাড়ের ছোট ছোট টিলা, ছড়া বা বীর মুক্তিযোদ্ধা মং সার্কেল রাজা মংপ্রু সাইন বাহাদুরের বাগানবাড়ি দেখতে যেতাম। আমি সত্যিই একা। কখনোবা মানিকছড়ি রাজবাড়িতে গিয়েছি। এদের যথাযথ উত্তরাধিকার নেই বললেই চলে। পালিতকন্যার স্বামী ড. রাজিব রায় শিক্ষিত, বিনয়ী, কর্মঠ মানুষ। রাজার অবশিষ্টাংশ তিনিই দেখভাল করতেন। তাঁর বাহ্যিক আভিজাত্য, অতিথি পরায়ণ ব্যবহার, মং রাজার মুক্তিযুদ্ধের গল্প, এদের পারিবারিক ঐতিহ্য ইত্যাদি শুনে শুনে মুগ্ধতায় মন ভরে যেত। আমি ক্ষণিকের জন্য হলেও প্রাণে সতেজতা অনুভব করতাম। কিছু দিন হলো মি. রাজিব রায় পরলোকগত হয়েছেন। পরবর্তীতে চট্টগ্রামের চাকরির সময়েও তিনি সবসময় আমার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে গেছেন। খোঁজ রাখতেন এবং কায়মনোবাক্যে আশীর্বাদ করতেন একজন প্রকৃত নিত্য শুভার্থী হয়ে।

মানিকছড়ির চাকরিকালে আকস্মিকভাবে দু’য়েকবার মুখোমুখি হয়েছি পাহাড়ি জনপদের সর্বাধিক পরিচিত নেতা, কৌশলী রাজনীতিবিদ ও লিজেন্ড সন্তু লারমার। একদিন মধ্যাহ্নে তিনি সদলবলে আমার অফিসে প্রবেশ করলেন। কিছু সময় বসে হঠাৎ আমাকে নিয়ে গেলেন উপজেলার কাছাকাছি এক বাড়িতে। কোনোক্রমেই তাকে প্রত্যাখ্যান করা গেল না। তিনি সেখানে আমন্ত্রিত অতিথি ছিলেন আমি যেন তার সফরসঙ্গী। এবং তা-ই হলো। আপ্যায়ন পরবর্তী জনসমক্ষেই তিনি বললেন, ‘এখানে আপনার কোনো চিন্তা নেই। আপনি নিঃসংকোচে ঘুরবেন। আমার লোকজন আপনার সেবায় নিয়োজিত। আমরা ভালো অফিসারদের নিরাপত্তা বিধান করি।’

মনে পড়ে, উপজেলায় সারা দিন কমবেশি জনবান্ধব হয়ে বেশ কোলাহলে কেটে যেত। ভুলে গিয়ে ডুবে যেতাম মানুষের অভিযোগ অনুযোগের গতানুগতিক গল্পের ভিতর। কিন্তু দিনের শেষে নির্জন সন্ধ্যা নেমে আসত আমার জনম-জনমের অভিশাপ নিয়ে। বিদ্যুৎ নেই, ফোনালাপের সুযোগ খুবই সীমিত। কল বুকিং দিয়ে অপেক্ষার অজানা প্রহর। ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলে সম্ভব, অন্যথায় মন খারাপ। স্থানীয় মানুষ এতেই অভ্যস্ত। এদের চাহিদা কম, কাজেই কারও কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই, নেই কোনো প্রতিবাদও। বাইরের লাইট পোস্ট নিভে গেলে হারিকেনের মৃদু আলো জ্বলে উঠল। আর মুহূর্তেই উদ্ভাসিত হয়ে উঠত হাজারো জোনাকির তারা। গাঢ় অন্ধকারকে বিদীর্ণ করে তৎক্ষণাৎ তাদের দখলে চলে যেত আমার দোতলা বাসভবনের চারপাশের বৃক্ষরাজি। জোনাকিরা দলে দলে দীপজ্যোতি দিয়ে আমাকে

সান্ত্বনা দিত, তারা আমার নিঃশব্দ কান্না কান পেতে শুনত। তাদের আজো আমার ভীষণ মনে পড়ে। আমি রাতের পাহাড়ে প্রকৃতি প্রদত্ত সেসব ছোট ছোট উড়ন্ত নক্ষত্রগুলোকে খুব মিস করি। এদের ফিরে পেতে চাই। এ মহানগরীর এমন শঙ্কিত তথা অস্থির নাগরিক জীবনে জোনাকির অস্তিত্ব কোথায়? এদের দেখার চোখ কোথায় আমাদের? বলতে পারি, সব মিলিয়ে মানিকছড়ির ১১ মাস ছিল আমার চাকরির সুদীর্ঘ ৩২ বছরের যাত্রায় একেবারেই আলাদা। কেবলই স্মৃতিময়, দুঃখ জাগানিয়া এবং বেদনাবিধুর।

লেখকঃ হোসেন আবদুল মান্নান

এই সংবাদটি 1,228 বার পড়া হয়েছে

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •