প্রতিবন্ধকতার কাছে হার না মানা স্বর্ণজয়ী মারজান

লেখক:
প্রকাশ: ৭ years ago

Manual8 Ad Code

পুরুষদের পাশাপাশি এগিয়ে যাচ্ছে নারীরা। আর সেই নারীদের ভিড়ে তরুণীদের সাফল্যটাই যেন বেশি। সদ্য সমাপ্ত সাউথ এশিয়ান গেমসে (এসএ) দেশের তরুণদের সঙ্গে সমানতালে সাফল্য পেয়েছে তরুণীরাও। তাদেরই একজন মারজান আক্তার প্রিয়া। দেশকে তিনি এনে দিয়েছেন ঝলমলে স্বর্ণপদক।

চার্লস ডারউন বলেছিলেন, মানুষের জীবন হলো সংগ্রামের, আর এই সংগ্রামের মধ্যে লিপ্ত জীবদের মধ্যে যার পরিস্থিতির উপযুক্ত মোকাবিলা করবে, তারাই টিকে থাকবে। আর বাকিরা বিলুপ্ত হয়ে যাবে। তেমনি টিকে থাকার লড়াইয়ে শেষ হাসি হেসেছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মারজান আক্তার প্রিয়া। যিনি সাউথ এশিয়ান গেমসের এবারের আসরে নারীদের কারাতে প্রতিযোগিতায় (অনূর্ধ্ব-৫৫ কেজি) স্বর্ণপদক জিতেছেন। বাংলাদেশের নারীদের মধ্যে এবারের আসরে তিনিই প্রথমে জিতেন এ সেরার পদক।

Manual1 Ad Code

 

কারাতে আসার পেছনের গল্পটা কেমন ছিল, জানতে চাইলে স্বর্ণজয়ী মারজান আক্তার প্রিয়া বলেন, ‘আমার শুরুটা ছিল স্কুল থেকেই। যখন ভিকারুন্নিসা নুন স্কুলে পড়ি, তখন খালেদ মনসুর নামে একজন লোক একটি স্টাইল শুরু করেন। সেখানে প্র্যাকটিস করতাম। তবে সেটা কারাতে ছিল না। আমার এসএসসির পর কারাতে শুরু করি। যখন খেলতাম, তখনই স্বপ্ন দেখতাম, একদিন বড়ো কোনো আসরে পৌঁছাব। দেশকে ভালো একটি জায়গায় রিপ্রেজেন্ট করব। ইউটিউবে যখন অন্য বন্ধুরা মুভি-নাটক দেখত, আমি তখন খেলাধুলা রিলেটেড ভিডিওগুলো বেশি দেখতাম।

Manual5 Ad Code

 

তবে শুরুতে পরিবারের বাধাটা আমার কাছে অনেক বড়ো ছিল। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো জায়গায় মেয়েদের সবকিছুতে বড়ো বাধা থাকে। খেলাধুলার ক্ষেত্রে ক্রিকেট ফুটবলের মতো অন্যান্য খেলাধুলার তেমন ভবিষ্যত্ নেই। তাই বাবা-মায়ের মনে সব সময় আশঙ্কা কাজ করত। পরিবার চাইত না আমি খেলাধুলায় যাই। তবু নিজেকে দমিয়ে রাখিনি কোনো প্রতিবন্ধকতার কাছে।’

জয়ের জন্যই ছুটেছি সারাক্ষণ।’ তিনি আরো বলেন, ‘স্বপ্ন লালন করেছি। লক্ষ্য ছিল একটাই—পরিবারকে দেখিয়ে দিতে চাই, আমিও পারি জয় নিয়ে আসতে। এসএ গেমসে স্বর্ণপদক পেয়ে সে স্বপ্ন পূরণ হলো। এখন আমার জন্য আমার পরিবারকে সারাদেশ চিনতে পারছে। এতে আমার পরিবার খুব খুশি।’

Manual4 Ad Code

বিজয়ের মাসে আরো একটি বিজয় দেখেছেন মারজান আক্তার। তাই তো বলেই উঠলেন, ‘আমার প্রতিপক্ষ পাকিস্তান হওয়ায় আমার চ্যালেঞ্জটা আরো বেড়ে গিয়েছিল—বিজয়ের মাসে আরেকটি বিজয় আমার ছিনিয়ে আনতে হবেই। আল্লাহর রহমতে এনেছিও। দেশকে আরেকটি বিজয় এনে দিতে পেরে তাই আমি অনেক বেশি উচ্ছ্বসিত।’ মারজান আক্তার প্রিয়া বর্তমানে পড়াশোনা করছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে চারুকলা বিভাগে। স্বপ্ন দেখেছেন কারাতে খেলবেন। যদিও শুরুটা ছিল নিজেকে নিরাপদ রাখার জন্যই। তার মতে, ‘প্রত্যেক মেয়েরই কারাতেতে আসা দরকার। সবাই মনে করেন কারাতে মারামারি করার জন্য। আমি বলি, না। এটি নিজের সেফটি রাখার জন্য। বাধ্যতামূলক মেয়েদের কারাতে শেখা প্রয়োজন। আমাদের সমাজে এখনো মেয়েদের সিকিউরিটি নেই, তাই নিজের সিকিউরিটি নেওয়ার বড়ো মাধ্যম কারাতে।’

জীবনের কোন স্টেজে কারাতেতে আসা উচিত, জানতে মারজান আক্তার বলেন, ‘আমি বলব, কারাতে আসার জন্য কোনো বয়সের ফ্রেম নেই। মানুষ যেকোনো সময় কারাতে আসতে পারেন। আমি কারাতে এসেছি তিন বছর হলো। আমার আগে অনেকেই এসেছে তারা কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারেনি। তাই যেকোনো বয়সে কারাতে আসা যাবে। যার জন্য সবচেয়ে বড়ো হাতিয়ার হলো মানুষের ইচ্ছাশক্তি। এই ইচ্ছাশক্তি যত প্রবল হবে, কাজ তত সহজ হবে। তাই সবারই কারাতে শেখা উচিত।’ সাউথ এশিয়ান গেমসের পর তার নজর এখন এশিয়ান গেমসের দিকে। তিনি বলেন, ‘এখন থেকে আরো ভালোভাবে প্র্যাকটিস করব নিজেকে আরো এগিয়ে নেওয়ার জন্য। পড়াশোনার পাশাপাশি কারাতেকে নিয়ে আমার স্বপ্ন। অন্য কিছু ভাবছি না।’

কারাতে ইভেন্টে আরো ভালো করার জন্য প্রয়োজন সঠিক পরিচর্যা। আর তার জন্যই যা যা প্রয়োজন, তার প্রতিও খেয়াল রাখার কথা বলেন মারজান আক্তার প্রিয়া। তিনি বলেন, ‘আমাদের কারাতের নিজস্ব কোনো প্র্যাকটিস গ্রাউন্ড নেই। সেটা একটা বড়ো সমস্যা। একদিন এই জায়গায়, অন্যদিন আরেক জায়গায়। এমন করে প্র্যাকটিসে মনোযোগ দেওয়া খুব কষ্টকর। তারপরও আমরা ভালো কিছু করছি। পৃষ্ঠপোষকদের একটু নজর দেওয়া দরকার কারাতের দিকে। তাহলে কারাতেতে ভালোমানের খেলোয়াড় উঠে আসবে। ক্যাম্প প্র্যাকটিস বাড়াতে পারবে ফেডারেশন।

Manual6 Ad Code

‘তাছাড়া বাংলাদেশে ফুটবল-ক্রিকেট খেলায় যেমন খেলোয়াড়দের ক্যাটাগরি অনুযায়ী বেতন-ভাতা, সম্মানী দেওয়া হয়। কিন্তু অন্যান্য খেলাধুলায় এমন ব্যবস্থা নেই। যেমন, যারা কারাতে ভালো করে, তাদের হয়তো বিভিন্ন সার্ভিস টিমে (পুলিশ, আর্মি, বিজিবি, আনসার) নেওয়া হয়। তবে আবার ভালো পদে নয়। তাই অন্যান্য খেলাধুলায়ও সরকারের নজর দেওয়া উচিত। তবেই সবাই খেলাধুলায় আসতে উত্সাহী হবে। আজকে আমি স্বর্ণ পদক জিতেছি, তাই হয়তো আমাকে নিয়ে এত হইচই। কিন্তু যিনি এক পয়েন্টের ব্যবধানে স্বর্ণ পদক পায়নি তার কী হবে। তাই সবার দিকেই নজর দিতে হবে। তবেই দেশ সকল খেলাধুলায় আরো এগিয়ে যাবে।’

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual4 Ad Code