প্রবাসী নারী শ্রমিকদের সুরক্ষায় উদ্যোগ নেই

প্রকাশিত:সোমবার, ২৭ সেপ্টে ২০২১ ০৫:০৯

প্রবাসী নারী শ্রমিকদের সুরক্ষায় উদ্যোগ নেই
নিউজ ডেস্কঃ মধ্যপ্রাচ্যের বাংলাদেশি শ্রমিকরা বরাবরই দেশে রেমিট্যান্স পাঠানোর শীর্ষে থাকে। যাদের বড় একটি অংশ নারী। তবে বিভিন্ন সময়ে নারীদের অনেকেই বাধ্য হন শারীরিক, মানসিক ও যৌন নিপীড়নের শিকার হয়ে দেশে ফিরতে। উন্নত জীবনের বদলে তাদের ফিরতে হয় শূন্য হাতে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদেশে নারীকর্মীদের আপদকালীন সেবা পেতে নেই সুনির্দিষ্ট কোনো পদ্ধতি ও প্রশিক্ষণ। এছাড়াও তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে নেই পর্যাপ্ত উদ্যোগও। দেখা যায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিদেশে নির্যাতিত নারী শ্রমিকরা ওই দেশে আইনি আশ্রয় নেওয়ার বদলে, দেশে ফিরে অভিযোগ জানায়। এতে তাদের বিচার পাওয়ার সম্ভাবনাও ক্ষীণ হয়ে পড়ে। এদিকে, দেশে ফেরা এসব অভিবাসী নারী শ্রমিকের অনেককেই পড়তে হয় নতুন মানসিক চাপে। সমাজ এমনকি পরিবারের সদস্যদের কাছেও নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির শিকার হতে হয় তাদের। কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্বামীরা তাদের তালাক পর্যন্ত দেন আর অবিবাহিত নারীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সৃষ্টি হয় শঙ্কা ও জটিলতা। এমনই একজন রাহেলা (ছদ্মনাম)। ৭ বছর বয়সি ছেলের ভবিষ্যৎ চিন্তা করে এবং পরিবারর অভাব-অনটন দূর করতে ৫ বছর আগে গৃহকর্মী হিসেবে গিয়েছিলেন দুবাই। দুই বছরের নিয়োগে সে দেশে গেলেও তিনবার তার মালিক বদল হয়েছে। আর প্রত্যেকবারই শিকার হয়েছেন শারীরিক ও চরম মানসিক নির্যাতনের শিকার। ২০১৮ সালে জটিল শারীরিক ও মানসিক অসুস্থার কারণে শূন্য হাতেই দেশে ফিরতে বাধ্য হন তিনি। প্রতি মাসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে নানা কারণে দেশে ফেরা ৩০০ থেকে ৪০০ বাংলাদেশি নারী অভিবাসী শ্রমিকের মধ্যে রাহেলা মাত্র একজন। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের জরিপে দেখা যায়, ২০১৯ সালের আগস্ট মাসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে দেশে ফেরা এমন ১১১ জনের মধ্যে প্রায় ৩৫ শতাংশই এমন পরিস্থিতির শিকার হয়েছেন। আর ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের জরিপ বলছে, ২০১৭ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে মধ্যেপ্রাচ্য থেকে ফিরে আসা ২৫ থেকে ৩০ জন নারীকর্মী বড় ধরনের মানসিক সমস্যায় ভুগছেন এবং তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন ছিলেন গর্ভবতীও। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব রিক্রুট এজেন্সি (বায়রা) জানিয়েছে, বর্তমানে প্রায় ৫ লাখেরও বেশি নারী শ্রমিক বিভিন্ন দেশে কাজ করছেন। প্রতিমাসে তারা প্রায় ৭৫০ থেকে ৮০০ কোটি টাকার মতো আয় করছেন। আর নারী শ্রমিকদের বড় একটা অংশ গৃহকর্মী হওয়ায় তারা উপার্জনের সিংহভাগ টাকাই দেশে পাঠাচ্ছেন। এদিকে, জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ বু্যরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুসারে, করোনা মহামারির আগে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ১ লাখ নারীকর্মী বিদেশে যেতেন। করোনায় ২০২০ সালে এই সংখ্যা এক চতুর্থাংশেরও নিচে নামলেও এ বছর তা ফের স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। সংস্থাটির হিসেব অনুযায়ী, ২০২১ সালের মে পর্যন্ত প্রায় ২৮ হাজার ৮২৪ জন নারী কাজের জন্য বিভিন্ন দেশে গিয়েছেন। যদিও বেশিরভাগ শ্রমিক গিয়েছেন মধ্য প্রাচ্যের দেশগুলোতে। এছাড়াও মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, হংকং, সাইপ্রাস, ইতালি এবং যুক্তরাজ্যও রয়েছে এ তালিকায়। এদিকে, নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশ ফেরা নারী শ্রমিকরা জানায়, তাদের অভিবাসনের সুযোগ ও কাজের চাহিদা মধ্য প্রাচ্যে অনেক বেশি। বিভিন্ন অফিস, মার্কেট ও বাসা-বাড়িতে গৃহকর্মী অথবা পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়। তবে সেখানে যাওয়ার পর পরিস্থিতি বদলে যায়। কেউ কেউ ভালো মালিকের অধীনে কাজ করলেও অনেকেই সে সুযোগ পায় না। দেখা যায়, অর্থের প্রলোভন অথবা চুরি অভিযোগে জেলে পাঠানোর হুমকি দিয়ে বাধ্য করা হয় বিভিন্ন অনৈতিক কাজে। এছাড়াও গৃহকর্মী হিসেবে যাওয়া অনেকেরই কাজে সামান্য সমস্যা হলে তাদের জীবনে নেমে আসে নির্মম শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। এ বিষয়ে বায়রা মহাসচিব শামীম আহমেদ চৌধুরী নোমান বলেন, বর্তমানে বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত নারী কর্মীরা মোটা অংকের রেমিট্যান্স পাঠায়। কিন্তু তাদের নিরাপত্তায় সুনির্দিষ্ট উদ্যোগের অভাব রয়েছে। বিদেশে পাঠিয়েই সরকারের দায়িত্ব শেষ হওয়া উচিত নয়। অবশ্য তাদের পাঠানোর আগে যথাযথ প্রশিক্ষণ ও বয়স মূল্যায়ন এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আবশ্যক। এছাড়াও বিদেশে যাওয়া শ্রমিকদের কল্যাণে গঠিত তহবিলের অর্থ তাদের সাহায্যে যথাযথ ব্যবহার করা প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, সরকারের উচিত নারী শ্রমিক নির্যাতন বন্ধে সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন তৈরি করা এবং সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাসগুলোতে মাইগ্রেন্ট সার্ভিস সেন্টার (এমএসসি) গঠন করা। যাতে পুরোবিষয়টি একটা অনলাইন পস্ন্যাটফর্মে চলে আসে। এবং শ্রমিকরা ওই দেশ ত্যাগের আগে ও অবস্থান কালে যে কোনো অভিযোগ জানাতে পারেন। আর পুরোবিষয়টি মন্ত্রণালয় মনিটরিং করবে। এ বিষয়ে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব এবং বিএমইটির মহাপরিচালক শহিদুল আলম বলেন, ‘সরকার সবসময় নারী অভিবাসীদের নিয়ে উদ্বিগ্ন এবং তাদের পুনর্গঠনের জন্য আন্তরিক প্রচেষ্টা চালিয়ে আসছে। তারপরও যখন শুনি অন্য দেশে আমার দেশের কোনো মা অথবা বোন নির্যাতিত হয়েছে, তা আমাদের উদ্বিগ্ন করে। এবং তাদের যতটা সম্ভব সাহায্য করার চেষ্টা করি। তবে সম্প্রতি মহিলা অভিবাসীদের সহায়তায় ৪২৭ কোটি টাকার একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এ প্রকল্পের আওতায় এসব নারী কর্মীদের আর্থিক সহায়তাসহ পুনর্বাসন, আইনি পরামর্শ ও সহায়তাসহ সব কিছু নিশ্চিত করা হবে।

এই সংবাদটি 1,229 বার পড়া হয়েছে

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •