‘ফেব্রুয়ারী ১৯৬৯’ চেতনার নতুন উন্মোচন ফারুক মাহমুদ

প্রকাশিত:শুক্রবার, ২২ ফেব্রু ২০১৯ ০১:০২

‘ফেব্রুয়ারী ১৯৬৯’ চেতনার নতুন উন্মোচন ফারুক মাহমুদ

ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এদেশের সংগ্রামের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তথাকথিত লৌহমানব আইউবের পতন। এই আন্দোলনে প্রাণ গেল কত মানুষের। ছাত্রসমাজের ১১ দফা আন্দোলনের কর্মসূচির মিছিলে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে জীবন দেন ছাত্রনেতা আসাদুজ্জামান। তিনি হয়ে ওঠেন গণভ্যুত্থানের সব শহিদের প্রতীকী-পুরুষ। শামসুর রাহমান লিখলেন—‘আসাদের শার্ট আজ আমাদের প্রাণের পতাকা’।

 

বাঘের খাঁচা থেকে বেঁচে গিয়ে সিংহের খপ্পরে পড়ার অবস্থা। গত শতাব্দীর সাতচল্লিশে ভারতবর্ষ ভাগ হলে পূর্ববাংলার মানুষের মনে আশা জন্মেছিল—এবার স্বাধীন রাষ্ট্রে শান্তিতে বসবাস করা যাবে। কিন্তু সেই আশার গুড়ে বালি পড়তে বেশি সময় লাগেনি। সাম্রজ্যবাদ বিদায় নিল, চেপে বসল শোষণের জগদ্দল পাথর। শুধু অর্থনৈতিক শোষণ বঞ্চনাই নয়, এবারের আঘাতটা বাঙালির অস্তিত্বের কেন্দ্রবিন্দুতে। সাংস্কৃতিক আগ্রাসন। ভাষার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র। কিন্তু এ তো মানা যায় না! মাতৃভাষায় দাগ পড়বে, আরোপিত ভাষায় কথা বলতে হবে! কী করে সম্ভব। পূর্ববাংলার মানুষ প্রতিবাদ করল। সেই থেকে শুরু। বায়ান্নের একুশে ফেব্রুয়ারি জন্ম নিল প্রতিরোধের নতুন পথরেখা। বিশ্ববাসী দেখল—মাতৃভাষা রক্ষার জন্য জীবনপাত! বাঙালির সংগ্রাম দিনে দিনে অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠল। রক্ত আর আগুনের স্রোত একাত্তরে তৈরি করল স্বাধীনতার আলোক ফোয়ারা। মাঝে বাঙালির সংগ্রামের অনেক সিঁড়ি। বাঙালির এসব বীরত্বগাথা ইতিহাসের উপাদান। কিন্তু সাহিত্য কি এসব উপাদানে নির্মিত হতে পারে না! সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় বীর বাঙালির দীর্ঘ সংগ্রামের বিদ্যুেরখা সংযুক্ত হয়েছে। কবি শামসুর রাহমানের নাম এ প্রসঙ্গে গুরুত্বসহকারেই উচ্চারিত হয়।

 

শামসুর রাহমানের কাব্যবৈশিষ্ট্যের নানা উজ্জ্বল দিক রয়েছে। বহু বিশেষণে তিনি অভিষিক্ত। একটি বিশেষ বিশেষণ হচ্ছে—শামসুর রাহমান ইতিহাসের কবি। বাঙালির দীর্ঘদিনের যে সংগ্রাম—এর প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, বিষয়, প্রত্যাশা সবই এসেছে তাঁর কলমে। তিনি যখন লেখেন—‘এখন তোমাকে নিয়ে খেঙরার নোংরামি,/ এখন তোমাকে ঘিরে খিস্তি-খেউড়ের পৌষমাস!/ তোমার মুখের দিকে আজ আর যায় না তাকানো,/ বর্ণমালা, আমার দুঃখিনী বর্ণমালা।’

 

আমরা বেদনায় আর্দ্র হয়ে পাঠ করতে পারি বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন আর বাঙালির মাতৃভাষার বিষাদিত মুখ। মুক্তিযুদ্ধ-স্বাধীনতা বিষয়ক তাঁর কবিতাগুলো হয়ে উঠেছে আমাদের প্রাত্যহিক উচ্চারণের আনন্দ।

 

ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এদেশের সংগ্রামের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তথাকথিত লৌহমানব আইউবের পতন। এই আন্দোলনে প্রাণ গেল কত মানুষের। ছাত্রসমাজের ১১ দফা আন্দোলনের কর্মসূচির মিছিলে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে জীবন দেন ছাত্রনেতা আসাদুজ্জামান। তিনি হয়ে ওঠেন গণভ্যুত্থানের সব শহিদের প্রতীকী-পুরুষ। শামসুর রাহমান লিখলেন—‘আসাদের শার্ট আজ আমাদের প্রাণের পতাকা’।

 

ঊনসত্তরের ২০ জানুয়ারি আসাদের আত্মদানের মধ্য দিয়ে বাঙালির আন্দোলন উত্তালতার এক নতুন মাত্রা লাভ করে। সেই বছরে জানুয়ারি থেকে শুরু হয়ে সংগ্রামের উর্মিমালা অগ্নিস্রোতে পরিণত হয়। ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র’ নামে যে মিথ্যে মামলা হয়েছিল, পাকিস্তানি শাসকচক্র তা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়। ঊনসত্তরের একুশে ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবসহ সব অভিযুক্ত মুক্তি লাভ করেন। নতুন আবহে, আরও শাণিত চেতনার উম্মোচনে পালিত হয় ওই বছরে একুশে ফ্রেব্রুয়ারি। শামসুর রাহমান লিখলেন, ‘ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯’ নামে একটি কবিতা। ওই কবিতায় কবি আবারও তুলে এনেছেন বাঙালির হাজার বছরের চেতনা-ঐতিহ্য, বারবার জ্বলে ওঠার সাহস ও সৌন্দর্য এবং বলছেন ইতিহাসের এক স্বর্ণগাথার প্রেক্ষাপট অর্জনের নতুন বয়ান—‘আবার ফুটেছে দ্যাখো কৃষ্ণচূড়া থরে থরে শহরের পথে/কেমন নিবিড় হয়ে। কখনো মিছিলে কখনো বা/একা হেঁটে যেতে মনে হয়—ফুল নয়, ওরা/শহীদের ঝলকিত রক্তের বুদ্বুদ, স্মৃতিগন্ধে ভরপুর।/একুশের কৃষ্ণচূড়া আমাদের চেতনারই রঙ।’

 

দেশের মানুষের সম্মিলিত ‘দেখা’টাকেই শামসুর রাহমান দেখছেন কবির অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে, লিখছেন চেতনার অনিঃশেষ প্রবাহমানতার কথা। সময় এগিয়ে যায়, কিন্তু ইতিহাসের স্থানে স্থানে চেতনার রোপিত বীজ বিলুপ্ত হয় না, সেই বীজ থেকে গাছ হয়, ফুল ফোটে, ছড়ায় সৌরভরাশি। উল্লিখিত কবিতায় শামসুর রাহমান লিখেছেন—‘…উনিশশো ঊনসত্তরেও/আবার সালাম নামে রাজপথে শূন্যে তোলে ফ্ল্যাগ,/বরকত বুক পাতে ঘাতকের থাবার সম্মুখে।/ সালামের চোখ আজ আলোকিত ঢাকা,/ সালামের মুখ আজ তরুণ শ্যামল পূর্ব বাংলা।’

 

অনেক উজ্জ্বল, অম্লান কবিতার মতোই শামসুর রাহমানের ‘ফেব্রুয়ারী ১৯৬৯’ কবিতাটি আমাদের চেতনায় প্রজ্জ্বলিত থাকা—দেশ-মাটি এবং মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার কথা প্রসারিত করবে, প্রবাহিত করবে। আমাদের মনে সংগ্রামের যে মশাল প্রজ্জ্বলিত আছে, তা থেকে ছড়াবে আলো, আরো আলো।

 

 

এই সংবাদটি 1,301 বার পড়া হয়েছে

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •