বঙ্গবন্ধুর পররাষ্ট্রনীতি বাংলাদেশের উন্নয়নের চালিকাশক্তি

প্রকাশিত:সোমবার, ২৭ জুলা ২০২০ ১২:০৭

বঙ্গবন্ধুর পররাষ্ট্রনীতি বাংলাদেশের উন্নয়নের চালিকাশক্তি


ড. এ কে আব্দুল মোমেন

স্বাধীন হবার পরও বাংলাদেশের প্রতি চীনের বিদ্বেষী নীতি কার্যকর থাকে। ১৯৭২ সালের ৮ আগস্ট জাতিসংঘের সদস্য পদ লাভের জন্য আবেদন করে বাংলাদেশ। কিন্তু চীনের বিরোধিতায় ১০ আগস্ট তা নাকচ হয়ে যায়। এ নিয়ে ক্ষোভও ঝরে পড়ে বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠে। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দ্বিবার্ষিক অধিবেশনে ১৯৭৪ সালের ১৮ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর ভাষণে বলেন, ‘…যখন চীনের বিরুদ্ধে জাতিসংঘে ভেটো দেয়া হতো তখন এই বাংলার মানুষই বিক্ষোভ করতো। আমি নিজে ওই ভেটোর বিরুদ্ধে বহুবার কথা বলেছি। যে ভেটোর জন্য চীন ২৫ বছর জাতিসংঘে যেতে পারে নাই, দুঃখের বিষয়, সেই চীন ভেটো ‘পাওয়ার’ পেয়ে প্রথম ভেটো দিলো আমার বাংলাদেশের বিরুদ্ধে। তবুও আমি কামনা করি তাদের বন্ধুত্ব। অনেক বড় দেশ। দুশমনি করতে চাই না। বন্ধুত্ব কামনা করি। কারণ আমি সকলের বন্ধুত্ব চাই। কিন্তু জানি না, আমার এই কামনায়, আমার এই প্রার্থনায় তাঁরা সাড়া দেবেন কি না। যদি না দেন কিছু আসে যায় না। ভুলে গেলে চলবে না যে, আমরা এত ছোট দেশ নই। বাংলাদেশ এতটুকু নয়। পপুলেশনের ভিত্তিতে বাংলাদেশ দুনিয়ার অষ্টম বৃহত্তম রাষ্ট্র।’ এর মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনচেতা পররাষ্ট্রনীতি ফুটে ওঠে। পরে অবশ্য চীন তাদের অবস্থান পাল্টায়। ১৯৭৪ সালের সেপ্টেম্বরে চীনা রেডক্রসের একটি দল সফর করে বাংলাদেশের বন্যার্ত অঞ্চল। তাদের কাছ থেকে পাওয়া যায় এক মিলিয়ন ডলারের সহযোগিতা। আর পঁচাত্তরের মে মাসে দেশটির সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করতে সক্ষম হয় বাংলাদেশ। এখানে সে সময়ের একটি ঘটনা উল্লেখ করতে চাই। ১৯৭৪ সালে আমি সে সময়কার বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী দেওয়ান ফরিদ গাজীর একান্ত সচিব হিসেবে কাজ করি। কয়লা, লবণসহ দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় উপাদানের বেশিরভাগই আমরা সে সময় ভারত থেকে আমদানি করতাম। সেবার কয়লা ও লবণ কেলেঙ্কারি হলো। এর ফলে ভারত থেকে কয়লা আমদানি অনিশ্চিত হয়ে পড়ল। যথাসময়ে জ¦ালানি সরবরাহের লক্ষ্যে আমরা কয়লা সরবরাহে আন্তর্জাতিক একটা টেন্ডার আহ্বান করি। এতে চীনও অংশ নেয়। যদিও চীন তখনও বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়নি। চীন বলল, গুণগত মানের কয়লা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই তারা সরবরাহ করতে পারবে। কিন্তু বেঁকে বসল বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। তাদের যুক্তি, পরিবহন খরচ বেশি হবে। বিষয়টির সুরাহার জন্য আমরা বঙ্গবন্ধুর কাছে গেলাম। বঙ্গবন্ধু দাম বেশি হওয়া সত্ত্বেও চীন থেকে কয়লা আমদানির বিষয়টি অনুমোদন করে দিয়ে বললেন, ‘ব্যবসা হলে সম্পর্কও হবে’। এর কিছুদিন পরে ভারতের নয়াদিল্লীতে ESCAP সম্মেলন হয় এবং ওই সম্মেলনের সময় চীনের মন্ত্রী ও আমাদের মন্ত্রীর বৈঠক হয়। যা মন্ত্রী পর্যায়ে চীনের সঙ্গে প্রথম আলোচনা। এর ফলে বরফ গলতে থাকে। ১৯৭৪ সালের জুনে জাতিসংঘের সদস্য পদ লাভের সময় সরাসরি বিরোধিতা থেকে বিরত থাকে চীন। ভেটো প্রদান থেকে বিরত থাকে।
আমেরিকার লুকোচুরি
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় আমেরিকার ভূূমিকা আমাদের পক্ষে ছিল না। যদিও সে দেশের বহু হৃদয়প্রাণ ব্যক্তিত্ব, অনেক আইন-প্রণেতা ও বুদ্ধিজীবী বাংলাদেশের যুদ্ধের পক্ষে জনমত সংগ্রহ করেছেন। যুদ্ধাগ্রস্ত দেশের মানুষের জন্য ফান্ড সংগ্রহ করেছেন। আমেরিকান কবি এলেন গিন্সবার্গ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষেই তো লিখে ফিললেন বিখ্যাত ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ কবিতাটি। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু সেই মার্কিন মুল্লুকের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে জোর দিলেন। স্বাধীনতার দুতিন বছর পর্যন্ত আমেরিকার মন গলাতে বেগ পেতে হয় বাংলাদেশকে। ১৯৭৪ সালের সেপ্টেম্বরে আমেরিকা সফরে যান বঙ্গবন্ধু প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড আর ফোর্ডের সঙ্গে ১ অক্টোবর হোয়াইট হাউসে মিটিং করেন। এই বৈঠকে বেশ উদার ছিলেন বঙ্গবন্ধু। ফোর্ড বাংলাদেশকে অভিনন্দন জানালেও খানিকটা রক্ষণশীল ভঙ্গিতে বলেন, ‘আপনাদের স্বাধীনতা লাভ ও জাতিসংঘের সদস্য পদ অর্জনের জন্য আমি আপনাকে অভিনন্দন জানাই।’ বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘আমরা একটি দরিদ্র দেশ, কিন্তু আমরা আপনাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক চাই।’ এই সফর থেকে ১ লাখ টন খাদ্য সহায়তা মেলে। এতে দীর্ঘ মেয়াদে সুসম্পর্কের বীজ যে রোপিত হয়, তা বলাই বাহুল্য।
মুসলিম দেশসমূহের সঙ্গে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন
স্বাধীনতা লাভের মাত্র তিন বছরের মাথায় বাংলাদেশ ১২৬টি দেশের স্বীকৃতি অর্জন করে। এত অল্প সময়ে এতগুলো দেশের স্বীকৃতি পাওয়া মোটেও চাট্টিখানি কথা নয়। স্বীকৃতির মানে হলো ওইসব দেশ বাংলাদেশকে পূর্ণ সার্বভৌম দেশ হিসেবে পরিগণিত করে। শুরুর দিকে বাংলাদেশকে নিয়ে আরব ও মুসলিম দেশগুলো খানিকাটা দ্বিধাগ্রস্ত ছিল। কারণ, পাকিস্তানের মতো বড় মুসলিম দেশ থেকে বের হয়ে গিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করা ভৌগোলিক আয়তনের ছোট্ট এই দেশটির ভবিষ্যত কীই বা হতে পারে- এমন দোলাচল ছিল তাদের। তবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ও অল্প সময়ের মধ্যে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপক যোগাযোগ তাদের আশ্বস্ত করতে সক্ষম হয়। এদিক থেকে ১৯৭৩ সালে আলজিয়ার্সের জোটনিরপেক্ষ শীর্ষ সম্মেলন উল্লেখ করার মতো। ১৯৭৩ সালের সেপ্টেম্বরে প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই সম্মেলনে ইসরাইলী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ মতামত তুলে ধরেন, যা তাঁকে সম্ভাব্য বিশ্ব মুসলিম নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। একই সঙ্গে আরবদের সমর্থন করায় বাংলাদেশের প্রতি আরব দেশগুলোর অগাধ আস্থা তৈরি হয়। ১৯৭৩ সালে আরব-ইসরাইল যুদ্ধের সময় আরবদের প্রতি শুভেচ্ছার নিদর্শন হিসাবে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে একটি মেডিকেল টিম পাঠানো হয়। প্রায় কাছাকাছি সময়ে যুদ্ধরত মিসরীয় সেনাবাহিনীর জন্য এক লাখ পাউন্ড চাও পাঠানো হয়। উদ্দেশ্য ছিল, বাংলাদেশের প্রতি আরব দেশগুলোর দৃষ্টি ফেরানো। বাংলাদেশ তাতে সফলও হয়। ১৯৭৩ সালের ১৫ ডিসেম্বর দেশবাসীর উদ্দেশে দেয়া এক বেতার ও টেলিভিশন ভাষণে বঙ্গবন্ধু উল্লেখ করেন, ‘আমরা আজ গর্বিত যে, মধ্যপ্রাচ্যে আমরা আরব ভাইদের এবং প্যালেস্টাইনবাসীদের পাশে রয়েছি। ইসরাইলীরা তাদের ন্যায্য অধিকারে হস্তক্ষেপ করেছে। ইসরাইলীরা জাতিসংঘের প্রস্তাব মানেনি। তারা দখল করে বসে আছে আরবদের জমি। আমি আরব ভাইদের একথা বলে দেবার চাই এবং তারা প্রমাণ পেয়েছে যে, বাংলার মানুষ তাদের পেছনে রয়েছে। আরব ভাইদের ন্যায্য দাবির পক্ষে রয়েছে। আমাদের সর্বশক্তি দিয়ে তাদের সাহায্য করব।’
১৯৭৪ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি ৩২তম দেশ হিসাবে ইসলামী সম্মেলন সংস্থা-ওআইসির সদস্যপদ লাভ করার মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধুর পররাষ্ট্রনীতি পরিণত মর্যাদা লাভ করে। এই সম্মেলনে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে অংশগ্রহণ করে। এটি ছিল ওআইসির দ্বিতীয় সম্মেলন। এই সম্মেলনটি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির জন্য উল্লেখযোগ্য একটি ঘটনা। কেননা, বঙ্গবন্ধু দৃঢ়ভাবে ঘোষণা দেন যে, পাকিস্তান আগে বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশ হিসেবে স্বীকৃতি না দিলে বাংলাদেশ এই সম্মেলনে অংশগ্রহণ করবে না। এর ফলে প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোর ওপর ওআইসিভুক্ত দেশগুলো থেকে প্রচণ্ড চাপ পড়ে। পাকিস্তান রাজি হলেও বাধা হয়ে দাঁড়ায় ১৯৫ জন পাকিস্তানী যুদ্ধবন্দীর বিচার প্রক্রিয়া এবং কয়েক হাজার পাকিস্তানে আটকে পড়া বাংলাদেশী নাগরিকদের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন। পরে সোমালিয়ার মধ্যস্থতায় বিষয়টির সমাধান হয়। এছাড়া প্রতিবেশী বন্ধুরাষ্ট্র ভারতও কোনভাবেই চাচ্ছিল না যে, লাহোরের ওই সম্মেলনে বাংলাদেশ অংশগ্রহণ করুক। এই ইস্যুতে কয়েকবার ভারতীয় হাইকমিশনার আমার মন্ত্রীর সঙ্গে এসে দেখা করেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু কাউকে কিছু না বলে নিজের মতো করে সিদ্ধান্ত নেন। এটি ছিল তার দৃঢ় ও স্বাধীনচেতা নেতৃত্বের বহির্প্রকাশ। ভুট্টো বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিতে রাজি হওয়ায় পর কয়েকজন ওআইসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ঢাকায় এসে বঙ্গবন্ধুকে সসম্মানে তাদের উড়োজাহাজে করেই লাহোর নিয়ে যান। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে লাহোর বিমানবন্দরে যথাযথ অভ্যর্থনা জানানো হয়, মর্যাদা ও গুরুত্ব দেয়া হয়।
উদীয়মান বিশ্ব নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত
শান্তি ও ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করায় অল্প সময়েই সদ্য স্বাধীন দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক মহলে সুপরিচিত হয়ে উঠেন। বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক দরবারে শান্তির মডেল হিসেবে পরিচিতি পেতে থাকে। ১৯৭২ সালের অক্টোবরে চিলির রাজধানী সান্তিয়াগোতে বিশ্ব পরিষদের প্রেসিডেনসিয়াল কমিটির সভায় বাঙালি জাতির মুক্তি আন্দোলনে অনবদ্য ভূমিকা রাখায় বঙ্গবন্ধুকে ‘জুলিও কুরি’ পদক দেয়ার সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়। পৃথিবীর ১৪০টি দেশের শান্তি পরিষদের প্রতিনিধির উপস্থিতিতে বঙ্গবন্ধুকে এই পদকের জন্য প্রস্তাব গৃহিত হয়, যা পুরো বাঙালি জাতির জন্য গর্বের বিষয়। ১৯৭৩ সালের মে মাসে বিশ্ব শান্তি পরিষদ ঢাকায় দুদিন ব্যাপী সম্মেলনের দ্বিতীয় দিন ২৩ মে জাতীয় সংসদের উত্তর প্লাজায় বঙ্গবন্ধুকে ‘জুলিও কুরি’ পদক পড়িয়ে দেয়া হয়। এ সময় বিশ্বশান্তি পরিষদে যোগ দিতে আসা সারা বিশ্বের প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। পদক পরিয়ে দেয়ার সময় বিশ্বশান্তি পরিষদের সে সময়ের মহাসচিব রমেশ চন্দ বলেন, ‘শেখ মুজিব শুধু বঙ্গবন্ধু নন, আজ থেকে তিনি বিশ্ববন্ধুও বটে।’ বঙ্গবন্ধুও তাঁর ভাষণে বলেন, ‘বিশ্বশান্তি আমার জীবনদর্শনের মূলনীতি। নিপীড়িত, নির্যাতিত, শোষিত, শান্তি ও স্বাধীনতাকামী সংগ্রামী মানুষ, যে কোন স্থানেই হোক না কেন, তাদের সঙ্গে আমি রয়েছি। আমরা চাই, বিশ্বের সর্বত্র শান্তি বজায় থাকুক, তাকে সুসংহত করা হোক।’ বঙ্গবন্ধুর পররাষ্ট্রনীতিতে ভর করে জাতিসংঘের ‘UN Peac keeping’ এ বাংলাদেশ আজ একটি ব্র্যান্ড নেম।
আলজেরিয়ায় ন্যাম সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু
১৯৭৩ সালের ৫ থেকে ৯ সেপ্টেম্বর আলজেরিয়ার রাজধানী আলজিয়ার্সে অনুষ্ঠিত হয় জোটরিপেক্ষ আন্দোলনের (ন্যাম) শীর্ষ সম্মেলন। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এই সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অংশগ্রহণ করেন। এই সম্মেলনেই ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত পৃথিবী গড়তে বিশ্বনেতাদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। এই সম্মেলন শেষে ঘোষণাপত্রে জাতিসংঘে বাংলাদেশের সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে জোটনিরপেক্ষ দেশগুলো তাদের সমর্থন দেয়।
সম্মেলনে ৮ সেপ্টেম্বর স্বাগত ভাষণে সারা বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘উপনিবেশবাদ, সাম্রাজ্যবাদ, বর্ণবাদবিরোধী মজলুম জনগণের ন্যায্য সংগ্রামের প্রতি বাংলাদেশের সমর্থনে ‘জোটনিরপেক্ষ নীতি’ সংবিধানে অন্তর্ভুুক্ত করা হয়েছে।’
সম্মেলনের ফাঁকে বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী বিশ্বনেতার সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন বঙ্গবন্ধু। এই সম্মেলনের সময় সৌদি আরবের বাদশাহ ফয়সাল, প্রেসিডেন্ট টিটো, মিসরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত, উগান্ডার প্রেসিডেন্ট ইদি আমিন, লিবিয়ার প্রেসিডেন্ট গাদ্দাফিসহ অনেক দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন।
পরদিন ৯ সেপ্টেম্বর বিদায়ী ভাষণেও বঙ্গবন্ধু বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা ও পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, ‘একটি সমৃদ্ধ বিশ্বের জন্য আমাদের পরমাণু নিরস্ত্রীকরণের ওপর জোর দিতে হবে।’
সম্মেলনের ঘোষণাপত্রে বাংলাদেশকে জাতিসংঘের সদস্যপদ দিতে জোটনিরপেক্ষ দেশগুলোর জোর সমর্থনের কথা অন্তর্ভুক্ত করা হয়। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে পরিচালিত কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এই সমর্থন আদায়ের পথে মূল চালিকাশক্তি ছিল।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার উল্লেখ করতে চাই। ২০১৪ সালে ন্যামের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের এক সম্মেলনে আমি অংশগ্রহণ করি। আমি দেখে অভিভূত হই, সেখানকার সেই অডিটোরিয়ামের পাশের দেয়ালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ন্যাম সম্মেলনে উপস্থিতির ওপর বড়সড় সাইজের ছবিসহ বক্তব্য স্থাপন করা হয়েছে। কিউবার প্রতিনিধি (যিনি ১৯৭৩ সালের সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন) বললেন, আমি যে চেয়ারে বসে কথা বলছি, সেখানে বসেই বঙ্গবন্ধু ১৯৭৩ সালে ন্যাম সম্মেলনে ভাষণ দিয়েছিলেন। আলজেরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী বললেন, বহু রাষ্ট্রনায়ক এই সম্মেলনে যোগদান করেছেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু এতই বড় মাপের নেতা ছিলেন যে, তাঁর স্মৃতি ধারণ করে আমরা এই দেয়ালে তার প্রতিকৃতি তুলে ধরেছি। দুদিন পর আমাদের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাহমুদ আলী এই সম্মেলন কক্ষে এলে তাকে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি সংবলিত এই দেয়াল আমি দেখাই এবং গর্ববোধ করি।
এই সম্মেলনে ৭৮টি দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধান এবং ২১টি পর্যবেক্ষক দেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। বিশেষ আমন্ত্রণে যোগ দেন জাতিসংঘসহ ১১টি আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা। তবে সবাইকে ছাপিয়ে এই সম্মেলনের মধ্যমণি হয়ে ওঠেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার মহানায়ক ও জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। নেতৃত্বের প্রগাঢ় গুণাবলীর পাশাপাশি মানবিক গুণবলীতেও অনন্য ছিলেন তিনি। দৃঢ়তা, সততা, বক্তব্যের জোরালো বাগ্মিতা, অসহায় ও নির্যাতিত জনপদের প্রতি অকেুণ্ঠ সমর্থন ও ভালবাসার জন্য বঙ্গবন্ধু সকলের পছন্দের ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। এই সম্মেলনে বক্তব্য দেয়ার পর সম্মেলনের নেতারা বঙ্গবন্ধুর বক্তব্যের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন। অনেকেই বঙ্গবন্ধুকে জড়িয়ে ধরে আলিঙ্গন করেন। তাঁর বক্তব্য এতটাই যৌক্তিক আর বাস্তবধর্মী ছিল যে, এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর নির্যাতিত ও বঞ্চিত জনপদের শীর্ষ নেতায় পরিণত হন বঙ্গবন্ধু।
চলবে…
লেখক : পররাষ্ট্রমন্ত্রী গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার

 

 
ড. এ কে আব্দুল মোমেন
 
স্বাধীন হবার পরও বাংলাদেশের প্রতি চীনের বিদ্বেষী নীতি কার্যকর থাকে। ১৯৭২ সালের ৮ আগস্ট জাতিসংঘের সদস্য পদ লাভের জন্য আবেদন করে বাংলাদেশ। কিন্তু চীনের বিরোধিতায় ১০ আগস্ট তা নাকচ হয়ে যায়। এ নিয়ে ক্ষোভও ঝরে পড়ে বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠে। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দ্বিবার্ষিক অধিবেশনে ১৯৭৪ সালের ১৮ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর ভাষণে বলেন, ‘…যখন চীনের বিরুদ্ধে জাতিসংঘে ভেটো দেয়া হতো তখন এই বাংলার মানুষই বিক্ষোভ করতো। আমি নিজে ওই ভেটোর বিরুদ্ধে বহুবার কথা বলেছি। যে ভেটোর জন্য চীন ২৫ বছর জাতিসংঘে যেতে পারে নাই, দুঃখের বিষয়, সেই চীন ভেটো ‘পাওয়ার’ পেয়ে প্রথম ভেটো দিলো আমার বাংলাদেশের বিরুদ্ধে। তবুও আমি কামনা করি তাদের বন্ধুত্ব। অনেক বড় দেশ। দুশমনি করতে চাই না। বন্ধুত্ব কামনা করি। কারণ আমি সকলের বন্ধুত্ব চাই। কিন্তু জানি না, আমার এই কামনায়, আমার এই প্রার্থনায় তাঁরা সাড়া দেবেন কি না। যদি না দেন কিছু আসে যায় না। ভুলে গেলে চলবে না যে, আমরা এত ছোট দেশ নই। বাংলাদেশ এতটুকু নয়। পপুলেশনের ভিত্তিতে বাংলাদেশ দুনিয়ার অষ্টম বৃহত্তম রাষ্ট্র।’ এর মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনচেতা পররাষ্ট্রনীতি ফুটে ওঠে। পরে অবশ্য চীন তাদের অবস্থান পাল্টায়। ১৯৭৪ সালের সেপ্টেম্বরে চীনা রেডক্রসের একটি দল সফর করে বাংলাদেশের বন্যার্ত অঞ্চল। তাদের কাছ থেকে পাওয়া যায় এক মিলিয়ন ডলারের সহযোগিতা। আর পঁচাত্তরের মে মাসে দেশটির সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করতে সক্ষম হয় বাংলাদেশ। এখানে সে সময়ের একটি ঘটনা উল্লেখ করতে চাই। ১৯৭৪ সালে আমি সে সময়কার বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী দেওয়ান ফরিদ গাজীর একান্ত সচিব হিসেবে কাজ করি। কয়লা, লবণসহ দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় উপাদানের বেশিরভাগই আমরা সে সময় ভারত থেকে আমদানি করতাম। সেবার কয়লা ও লবণ কেলেঙ্কারি হলো। এর ফলে ভারত থেকে কয়লা আমদানি অনিশ্চিত হয়ে পড়ল। যথাসময়ে জ¦ালানি সরবরাহের লক্ষ্যে আমরা কয়লা সরবরাহে আন্তর্জাতিক একটা টেন্ডার আহ্বান করি। এতে চীনও অংশ নেয়। যদিও চীন তখনও বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়নি। চীন বলল, গুণগত মানের কয়লা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই তারা সরবরাহ করতে পারবে। কিন্তু বেঁকে বসল বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। তাদের যুক্তি, পরিবহন খরচ বেশি হবে। বিষয়টির সুরাহার জন্য আমরা বঙ্গবন্ধুর কাছে গেলাম। বঙ্গবন্ধু দাম বেশি হওয়া সত্ত্বেও চীন থেকে কয়লা আমদানির বিষয়টি অনুমোদন করে দিয়ে বললেন, ‘ব্যবসা হলে সম্পর্কও হবে’। এর কিছুদিন পরে ভারতের নয়াদিল্লীতে ESCAP সম্মেলন হয় এবং ওই সম্মেলনের সময় চীনের মন্ত্রী ও আমাদের মন্ত্রীর বৈঠক হয়। যা মন্ত্রী পর্যায়ে চীনের সঙ্গে প্রথম আলোচনা। এর ফলে বরফ গলতে থাকে। ১৯৭৪ সালের জুনে জাতিসংঘের সদস্য পদ লাভের সময় সরাসরি বিরোধিতা থেকে বিরত থাকে চীন। ভেটো প্রদান থেকে বিরত থাকে।
আমেরিকার লুকোচুরি
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় আমেরিকার ভূূমিকা আমাদের পক্ষে ছিল না। যদিও সে দেশের বহু হৃদয়প্রাণ ব্যক্তিত্ব, অনেক আইন-প্রণেতা ও বুদ্ধিজীবী বাংলাদেশের যুদ্ধের পক্ষে জনমত সংগ্রহ করেছেন। যুদ্ধাগ্রস্ত দেশের মানুষের জন্য ফান্ড সংগ্রহ করেছেন। আমেরিকান কবি এলেন গিন্সবার্গ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষেই তো লিখে ফিললেন বিখ্যাত ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ কবিতাটি। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু সেই মার্কিন মুল্লুকের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে জোর দিলেন। স্বাধীনতার দুতিন বছর পর্যন্ত আমেরিকার মন গলাতে বেগ পেতে হয় বাংলাদেশকে। ১৯৭৪ সালের সেপ্টেম্বরে আমেরিকা সফরে যান বঙ্গবন্ধু প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড আর ফোর্ডের সঙ্গে ১ অক্টোবর হোয়াইট হাউসে মিটিং করেন। এই বৈঠকে বেশ উদার ছিলেন বঙ্গবন্ধু। ফোর্ড বাংলাদেশকে অভিনন্দন জানালেও খানিকটা রক্ষণশীল ভঙ্গিতে বলেন, ‘আপনাদের স্বাধীনতা লাভ ও জাতিসংঘের সদস্য পদ অর্জনের জন্য আমি আপনাকে অভিনন্দন জানাই।’ বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘আমরা একটি দরিদ্র দেশ, কিন্তু আমরা আপনাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক চাই।’ এই সফর থেকে ১ লাখ টন খাদ্য সহায়তা মেলে। এতে দীর্ঘ মেয়াদে সুসম্পর্কের বীজ যে রোপিত হয়, তা বলাই বাহুল্য।
মুসলিম দেশসমূহের সঙ্গে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন
স্বাধীনতা লাভের মাত্র তিন বছরের মাথায় বাংলাদেশ ১২৬টি দেশের স্বীকৃতি অর্জন করে। এত অল্প সময়ে এতগুলো দেশের স্বীকৃতি পাওয়া মোটেও চাট্টিখানি কথা নয়। স্বীকৃতির মানে হলো ওইসব দেশ বাংলাদেশকে পূর্ণ সার্বভৌম দেশ হিসেবে পরিগণিত করে। শুরুর দিকে বাংলাদেশকে নিয়ে আরব ও মুসলিম দেশগুলো খানিকাটা দ্বিধাগ্রস্ত ছিল। কারণ, পাকিস্তানের মতো বড় মুসলিম দেশ থেকে বের হয়ে গিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করা ভৌগোলিক আয়তনের ছোট্ট এই দেশটির ভবিষ্যত কীই বা হতে পারে- এমন দোলাচল ছিল তাদের। তবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ও অল্প সময়ের মধ্যে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপক যোগাযোগ তাদের আশ্বস্ত করতে সক্ষম হয়। এদিক থেকে ১৯৭৩ সালে আলজিয়ার্সের জোটনিরপেক্ষ শীর্ষ সম্মেলন উল্লেখ করার মতো। ১৯৭৩ সালের সেপ্টেম্বরে প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই সম্মেলনে ইসরাইলী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ মতামত তুলে ধরেন, যা তাঁকে সম্ভাব্য বিশ্ব মুসলিম নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। একই সঙ্গে আরবদের সমর্থন করায় বাংলাদেশের প্রতি আরব দেশগুলোর অগাধ আস্থা তৈরি হয়। ১৯৭৩ সালে আরব-ইসরাইল যুদ্ধের সময় আরবদের প্রতি শুভেচ্ছার নিদর্শন হিসাবে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে একটি মেডিকেল টিম পাঠানো হয়। প্রায় কাছাকাছি সময়ে যুদ্ধরত মিসরীয় সেনাবাহিনীর জন্য এক লাখ পাউন্ড চাও পাঠানো হয়। উদ্দেশ্য ছিল, বাংলাদেশের প্রতি আরব দেশগুলোর দৃষ্টি ফেরানো। বাংলাদেশ তাতে সফলও হয়। ১৯৭৩ সালের ১৫ ডিসেম্বর দেশবাসীর উদ্দেশে দেয়া এক বেতার ও টেলিভিশন ভাষণে বঙ্গবন্ধু উল্লেখ করেন, ‘আমরা আজ গর্বিত যে, মধ্যপ্রাচ্যে আমরা আরব ভাইদের এবং প্যালেস্টাইনবাসীদের পাশে রয়েছি। ইসরাইলীরা তাদের ন্যায্য অধিকারে হস্তক্ষেপ করেছে। ইসরাইলীরা জাতিসংঘের প্রস্তাব মানেনি। তারা দখল করে বসে আছে আরবদের জমি। আমি আরব ভাইদের একথা বলে দেবার চাই এবং তারা প্রমাণ পেয়েছে যে, বাংলার মানুষ তাদের পেছনে রয়েছে। আরব ভাইদের ন্যায্য দাবির পক্ষে রয়েছে। আমাদের সর্বশক্তি দিয়ে তাদের সাহায্য করব।’
১৯৭৪ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি ৩২তম দেশ হিসাবে ইসলামী সম্মেলন সংস্থা-ওআইসির সদস্যপদ লাভ করার মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধুর পররাষ্ট্রনীতি পরিণত মর্যাদা লাভ করে। এই সম্মেলনে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে অংশগ্রহণ করে। এটি ছিল ওআইসির দ্বিতীয় সম্মেলন। এই সম্মেলনটি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির জন্য উল্লেখযোগ্য একটি ঘটনা। কেননা, বঙ্গবন্ধু দৃঢ়ভাবে ঘোষণা দেন যে, পাকিস্তান আগে বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশ হিসেবে স্বীকৃতি না দিলে বাংলাদেশ এই সম্মেলনে অংশগ্রহণ করবে না। এর ফলে প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোর ওপর ওআইসিভুক্ত দেশগুলো থেকে প্রচণ্ড চাপ পড়ে। পাকিস্তান রাজি হলেও বাধা হয়ে দাঁড়ায় ১৯৫ জন পাকিস্তানী যুদ্ধবন্দীর বিচার প্রক্রিয়া এবং কয়েক হাজার পাকিস্তানে আটকে পড়া বাংলাদেশী নাগরিকদের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন। পরে সোমালিয়ার মধ্যস্থতায় বিষয়টির সমাধান হয়। এছাড়া প্রতিবেশী বন্ধুরাষ্ট্র ভারতও কোনভাবেই চাচ্ছিল না যে, লাহোরের ওই সম্মেলনে বাংলাদেশ অংশগ্রহণ করুক। এই ইস্যুতে কয়েকবার ভারতীয় হাইকমিশনার আমার মন্ত্রীর সঙ্গে এসে দেখা করেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু কাউকে কিছু না বলে নিজের মতো করে সিদ্ধান্ত নেন। এটি ছিল তার দৃঢ় ও স্বাধীনচেতা নেতৃত্বের বহির্প্রকাশ। ভুট্টো বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিতে রাজি হওয়ায় পর কয়েকজন ওআইসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ঢাকায় এসে বঙ্গবন্ধুকে সসম্মানে তাদের উড়োজাহাজে করেই লাহোর নিয়ে যান। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে লাহোর বিমানবন্দরে যথাযথ অভ্যর্থনা জানানো হয়, মর্যাদা ও গুরুত্ব দেয়া হয়।
উদীয়মান বিশ্ব নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত
শান্তি ও ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করায় অল্প সময়েই সদ্য স্বাধীন দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক মহলে সুপরিচিত হয়ে উঠেন। বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক দরবারে শান্তির মডেল হিসেবে পরিচিতি পেতে থাকে। ১৯৭২ সালের অক্টোবরে চিলির রাজধানী সান্তিয়াগোতে বিশ্ব পরিষদের প্রেসিডেনসিয়াল কমিটির সভায় বাঙালি জাতির মুক্তি আন্দোলনে অনবদ্য ভূমিকা রাখায় বঙ্গবন্ধুকে ‘জুলিও কুরি’ পদক দেয়ার সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়। পৃথিবীর ১৪০টি দেশের শান্তি পরিষদের প্রতিনিধির উপস্থিতিতে বঙ্গবন্ধুকে এই পদকের জন্য প্রস্তাব গৃহিত হয়, যা পুরো বাঙালি জাতির জন্য গর্বের বিষয়। ১৯৭৩ সালের মে মাসে বিশ্ব শান্তি পরিষদ ঢাকায় দুদিন ব্যাপী সম্মেলনের দ্বিতীয় দিন ২৩ মে জাতীয় সংসদের উত্তর প্লাজায় বঙ্গবন্ধুকে ‘জুলিও কুরি’ পদক পড়িয়ে দেয়া হয়। এ সময় বিশ্বশান্তি পরিষদে যোগ দিতে আসা সারা বিশ্বের প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। পদক পরিয়ে দেয়ার সময় বিশ্বশান্তি পরিষদের সে সময়ের মহাসচিব রমেশ চন্দ বলেন, ‘শেখ মুজিব শুধু বঙ্গবন্ধু নন, আজ থেকে তিনি বিশ্ববন্ধুও বটে।’ বঙ্গবন্ধুও তাঁর ভাষণে বলেন, ‘বিশ্বশান্তি আমার জীবনদর্শনের মূলনীতি। নিপীড়িত, নির্যাতিত, শোষিত, শান্তি ও স্বাধীনতাকামী সংগ্রামী মানুষ, যে কোন স্থানেই হোক না কেন, তাদের সঙ্গে আমি রয়েছি। আমরা চাই, বিশ্বের সর্বত্র শান্তি বজায় থাকুক, তাকে সুসংহত করা হোক।’ বঙ্গবন্ধুর পররাষ্ট্রনীতিতে ভর করে জাতিসংঘের ‘UN Peac keeping’ এ বাংলাদেশ আজ একটি ব্র্যান্ড নেম।
আলজেরিয়ায় ন্যাম সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু
১৯৭৩ সালের ৫ থেকে ৯ সেপ্টেম্বর আলজেরিয়ার রাজধানী আলজিয়ার্সে অনুষ্ঠিত হয় জোটরিপেক্ষ আন্দোলনের (ন্যাম) শীর্ষ সম্মেলন। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এই সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অংশগ্রহণ করেন। এই সম্মেলনেই ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত পৃথিবী গড়তে বিশ্বনেতাদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। এই সম্মেলন শেষে ঘোষণাপত্রে জাতিসংঘে বাংলাদেশের সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে জোটনিরপেক্ষ দেশগুলো তাদের সমর্থন দেয়।
সম্মেলনে ৮ সেপ্টেম্বর স্বাগত ভাষণে সারা বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘উপনিবেশবাদ, সাম্রাজ্যবাদ, বর্ণবাদবিরোধী মজলুম জনগণের ন্যায্য সংগ্রামের প্রতি বাংলাদেশের সমর্থনে ‘জোটনিরপেক্ষ নীতি’ সংবিধানে অন্তর্ভুুক্ত করা হয়েছে।’
সম্মেলনের ফাঁকে বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী বিশ্বনেতার সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন বঙ্গবন্ধু। এই সম্মেলনের সময় সৌদি আরবের বাদশাহ ফয়সাল, প্রেসিডেন্ট টিটো, মিসরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত, উগান্ডার প্রেসিডেন্ট ইদি আমিন, লিবিয়ার প্রেসিডেন্ট গাদ্দাফিসহ অনেক দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন।
পরদিন ৯ সেপ্টেম্বর বিদায়ী ভাষণেও বঙ্গবন্ধু বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা ও পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, ‘একটি সমৃদ্ধ বিশ্বের জন্য আমাদের পরমাণু নিরস্ত্রীকরণের ওপর জোর দিতে হবে।’
সম্মেলনের ঘোষণাপত্রে বাংলাদেশকে জাতিসংঘের সদস্যপদ দিতে জোটনিরপেক্ষ দেশগুলোর জোর সমর্থনের কথা অন্তর্ভুক্ত করা হয়। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে পরিচালিত কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এই সমর্থন আদায়ের পথে মূল চালিকাশক্তি ছিল।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার উল্লেখ করতে চাই। ২০১৪ সালে ন্যামের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের এক সম্মেলনে আমি অংশগ্রহণ করি। আমি দেখে অভিভূত হই, সেখানকার সেই অডিটোরিয়ামের পাশের দেয়ালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ন্যাম সম্মেলনে উপস্থিতির ওপর বড়সড় সাইজের ছবিসহ বক্তব্য স্থাপন করা হয়েছে। কিউবার প্রতিনিধি (যিনি ১৯৭৩ সালের সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন) বললেন, আমি যে চেয়ারে বসে কথা বলছি, সেখানে বসেই বঙ্গবন্ধু ১৯৭৩ সালে ন্যাম সম্মেলনে ভাষণ দিয়েছিলেন। আলজেরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী বললেন, বহু রাষ্ট্রনায়ক এই সম্মেলনে যোগদান করেছেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু এতই বড় মাপের নেতা ছিলেন যে, তাঁর স্মৃতি ধারণ করে আমরা এই দেয়ালে তার প্রতিকৃতি তুলে ধরেছি। দুদিন পর আমাদের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাহমুদ আলী এই সম্মেলন কক্ষে এলে তাকে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি সংবলিত এই দেয়াল আমি দেখাই এবং গর্ববোধ করি।
এই সম্মেলনে ৭৮টি দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধান এবং ২১টি পর্যবেক্ষক দেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। বিশেষ আমন্ত্রণে যোগ দেন জাতিসংঘসহ ১১টি আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা। তবে সবাইকে ছাপিয়ে এই সম্মেলনের মধ্যমণি হয়ে ওঠেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার মহানায়ক ও জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। নেতৃত্বের প্রগাঢ় গুণাবলীর পাশাপাশি মানবিক গুণবলীতেও অনন্য ছিলেন তিনি। দৃঢ়তা, সততা, বক্তব্যের জোরালো বাগ্মিতা, অসহায় ও নির্যাতিত জনপদের প্রতি অকেুণ্ঠ সমর্থন ও ভালবাসার জন্য বঙ্গবন্ধু সকলের পছন্দের ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। এই সম্মেলনে বক্তব্য দেয়ার পর সম্মেলনের নেতারা বঙ্গবন্ধুর বক্তব্যের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন। অনেকেই বঙ্গবন্ধুকে জড়িয়ে ধরে আলিঙ্গন করেন। তাঁর বক্তব্য এতটাই যৌক্তিক আর বাস্তবধর্মী ছিল যে, এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর নির্যাতিত ও বঞ্চিত জনপদের শীর্ষ নেতায় পরিণত হন বঙ্গবন্ধু।
চলবে…
লেখক : পররাষ্ট্রমন্ত্রী গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার

এই সংবাদটি 1,231 বার পড়া হয়েছে

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •