বাংলাদেশের মানুষ হিসেবে পরিচিতি পেতে চাই বিশ্বে

প্রকাশিত:মঙ্গলবার, ১৬ ফেব্রু ২০২১ ০৬:০২

বাংলাদেশের মানুষ হিসেবে পরিচিতি পেতে চাই বিশ্বে

ওমর শাহেদঃ  

অবিশ্বাস্য তার দেশপ্রেম, অসাধারণ কর্মবীর তিনি। বিশ্বের সেরা ও এক নম্বর ব্যাংক ‘ব্যাংক অব আমেরিকা’র সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট একজন বাংলাদেশি; নারী–‘বুশরা আহমেদ’। নিজের জন্মভূমির তরুণ, তরুণীদের লেখাপড়ার পাশাপাশি কাজের অবিশ্বাস্য সুন্দর এক পরিকল্পনা বাস্তবায়নে নেমেছেন। অনেক তার স্মরণীয় সাফল্য, অনেক যোগ্যতা। কথা বলে তার ভাষায় লিখেছেন  ওমর শাহেদ। ছবি তুলেছেন আকরাম হোসেন

১.

আমি ‘ব্যাংক অব আমেরিকা’য় সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট–‘এন্টারপ্রাইজ ডিজিটাল ব্যাংকিং’ বিভাগে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৩৩ কোটি মানুষের সাড়ে সাত কোটি আমাদের কাস্টমার বা ভোক্তা। তাদের মোট সাড়ে চার কোটি আমাদের অনলাইন ও মোবাইল ব্যাংকিংয়ের কাস্টমার। এত মানুষের একজনকেও কখনো ব্যাংকে পা রাখতে হয় না। তারা সব লেনদেনই মোবাইলে সারেন। টাকা জমা, তোলা, বিল শোধ–সবই করেন নিজের স্মার্ট ফোনে। আমাদের সিইও ব্রায়ান ময়নাহান এই পুরো কাজটিকে বলেন ‘ব্যাংক ইন ইউর পকেট।’ স্মার্টকার্ড নয়, আমাদের ‌‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স’ বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যন্ত্রমানবী ‘এরিকা’ কাজগুলো করে। যদি বলি, ‘এরিকা, ট্রান্সফার ১০ ডলারস’, কয়েক সেকেন্ডে সেই ক্রেতার অ্যাকাউন্টে টাকা চলে যায়। আমাদের সব ধরনের কাজই হয় মুখে বা মোবাইলে। বিশ্বের মোট আড়াই লাখ মোবাইল অ্যাপ্লিকেশনসের মধ্যে ব্যাংক অব আমেরিকার মোবাইল অ্যাপ্লিকেশনই জে.ডি. পাওয়ারের সার্টিফিকেট পেয়েছে। এটি মার্কিন ডাটা অ্যানালিটিকস অ্যান্ড কনজিউমার ইন্টেলিজেন্স কোম্পানি।

২.

এখানেও নেই, আমেরিকাতেও নেই–দুনিয়ার কোথাও, কোনো ক্ষেত্রেই পুরুষ, নারীতে সমতা নেই। দুঃখজনক হলেও সত্য, যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশে বহু চেষ্টা করেও মহিলারা নেতা বা প্রেসিডেন্ট হতে পারছেন না। অবিশ্বাস্য এই কাজ বাংলাদেশে আমরা করেছি। একজন নারী আমাদের নেতা! সেজন্য ভিন দেশে খুব গর্বিত হই।  নারীর ক্ষমতায়নে আমি বিশ্বাস করি। যুক্তরাষ্ট্রে আমার কাজ মানুষের বৈচিত্র্য ও নারীর অন্তর্ভুক্তিতে। ব্যাংক অব আমেরিকার গড়া শুধু মহিলাদের জন্য নেতৃত্ব, শিক্ষা ও উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানের সিনিয়র কাউন্সিল মেম্বার। আমাদের আরেকটি প্রতিষ্ঠান আছে ‘পাওয়ার অব টেন’। ১০ জন ক্ষমতাবান নারী মিলে প্রতিষ্ঠানটি গড়েছি। মেয়েদের শেখাই–কীভাবে নেতা হতে হবে। এমন কাজ দেশেও করতে চাই।

৩.

নেতৃত্ব দেওয়ার দীর্ঘ অভিজ্ঞতার পরেও কীভাবে ভালো নেতা হতে হয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিখব বলে গিয়েছিলাম বিশ্বখ্যাত হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলে (এইচবিএস), ‘এক্সিকিউটিভ এমবিএ’ করব। এখানে এই এমবিএ করতে ১৫-২০ বছরের নেতৃত্ব দেবার অভিজ্ঞতা থাকতে হয়। ডিগ্রিটিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ‌‘করপোরেট স্পন্সরশিপ’। যার মানে, যে প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন তাদের হার্ভার্ডকে লিখিত দিতে হয়, আপনি তাদের অন্যতম নেতা। আপনার যোগ্যতায় প্রতিষ্ঠানের শতভাগ বিশ্বাস আছে। ব্যাংক অব আমেরিকার এই লিখিত স্পনসরশিপ ও আমার শিক্ষাগত যোগ্যতায় এইচবিএসে পড়ার সুযোগ পেলাম। লিডারশিপ শিখতে গিয়ে তাদের কাছে শিখে এলাম, কোনো প্রতিষ্ঠানের সিইও বা প্রধান নির্বাহী অফিসার হওয়াতেই  জীবন সার্থক হয় না। জীবনে সার্থক হতে হলে ভালো মানুষ, ভালো মা, ভালো বন্ধু–‘ভালো’ হতে হয়। একেক জনের কাছে সাফল্য একেক রকমের। তবে তাতে বড় বা ছোট হওয়ার ব্যাপারই নেই। এই আমার জীবনের একটি স্বপ্ন ছিল –করপোরেট আমেরিকায় কোনো এক বিশাল প্রতিষ্ঠানের ‘নাম্বার ওয়ান’ হব;  হার্ভার্ড সে ধ্যান ধারণাই পাল্টে দিল। এরপর থেকে সারা জীবন ধরে একজন ভালো মানুষ, ভালো মা, ভালো প্রেমিকা, ভালো বন্ধু হতে চাই। জীবনের এই চিরসত্য বোধগুলো গড়ে দেওয়ায় হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।

৪.

‘শিক্ষকতা’ বোধহয় রক্তেই আছে। মা–আমাতুর রশিদ, ২৭ বছর বাংলাদেশে শিক্ষকতা করেছেন। এখন অবসরে। চট্টগ্রামের জামালখানের সেন্ট মেরিস স্কুলে পড়িয়েছেন। এটি মিশনারি স্কুল। মায়ের রক্তের এই ধারা আমার মধ্যে আছে। না হলে এত ভালো ব্যাংকে চাকরি করে কেন এদিকে আসব? মানুষ বলেনও, তুমি পড়াতে যাও কেন? তারা তো তোমাকে ওভাবে পয়সা দিতে পারবেন না, কিন্তু মানুষকে বোঝানো কঠিন–সবকিছু পয়সা দিয়ে মাপা, যাচাই হয় না। কোনো বিষয়ে ‘প্যাশন’ বা তীব্র অনুরাগ আসে ভেতরের বোধ থেকে; শিক্ষকতা আমার প্যাশন, আমার ডাক। মা ছোটবেলায় আমাকে বলতেন, যদি একটি বাচ্চারও ভবিষ্যৎ ঠিক করে দিতে পার, তাহলে তোমার জীবন ও পৃথিবীতে আসা সার্থক। আমার মনে হয়, শিক্ষকতা সেই সুযোগটিই আমাকে দেয়। ছাত্র, ছাত্রীদের সবসময় প্রথম দিন ক্লাসে বলি, আমার একটি লক্ষ্য, যেদিন তোমরা এই ক্লাস থেকে বের হবে, যেকোনো পাঁচটি নতুন বিষয় শিখে যাবে। সারা জীবন কাজে লাগবে। ক্লাসের শেষদিন তাদের প্রশ্ন করি, তোমরা কি পাঁচটি বিষয় শিখেছো? অনেকে বলে, ২০টি, ৯টি বিষয় শিখেছি। আমার ছাত্রছাত্রীদের যে যা শেখে, সেটি আমার পুরস্কার হয়। আমার কাছ থেকে তারা শিখে কাজে লাগাতে পারলে আমি ধন্য হই। আমার অস্ট্রেলিয়ার ছাত্র, ছাত্রীরা মেইল পাঠিয়ে বলে, প্রফেসর বুশরা আহমেদ, আপনার ক্লাস নেওয়ার পর প্রমোশন পেয়েছি। কেউ লেখে, নিজের ব্যবসা শুরু করতে পেরেছি। কারও বক্তব্য, ম্যানেজারের সঙ্গে কথা বলেছি, বসকে চ্যালেঞ্জ করেছি। এমনসব প্রাপ্তি তো পয়সা দিয়ে মাপা যায় না।

৫.

মায়ের ও নিজের বোধে সব সময় আমার শখ ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াব। স্বপ্নগুলো আমার বড়। শুরুতেই পোস্ট গ্রাজুয়েটে পড়াতে চেয়েছি। অ্যাকাডেমিক লাইনে না থাকলে তা পূরণ হয় না। সেজন্য পেশাদার অধ্যাপক হতে হয়। প্রথমে খোঁজ নিলাম, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতে গেলে আমাকে কী করতে হবে। বলা হলো ‘এ অসম্ভব। অধ্যাপনার অভিজ্ঞতা ছাড়া তো হবে না।’ অসম্ভবে আমি বিশ্বাস করি না। সবই সম্ভব যদি আন্তরিক চেষ্টা ও পরিশ্রম থাকে। ইউনিভার্সিটি অব হিউসটন ও হার্ভার্ডের ডিগ্রি এবং তার চেয়েও দামি ২০ বছরের বেশি আমার ব্যাংকিং ও শিল্প জগতের কাজের অভিজ্ঞতা আছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলিনা অঙ্গরাজ্যের শার্লট শহরের ইউনিভার্সিটি অব নর্থ ক্যারোলিনা শার্লট (ইউএনসি শার্লট)’র বিজনেস স্কুল–‌‘বেল্ক স্কুল অব বিজনেস’-এ আমাকে অ্যাসোসিয়েট ফ্যাকাল্টি  হিসেবে নিয়োগ দিল। তাদের মতে, আমার মতো এক ইন্ডাস্ট্রি লিডার যখন ক্লাসে যান; তিনি বাস্তব ও ২৩ বছরের টানা অভিজ্ঞতা নিয়ে পড়ান। মূল্যই আলাদা। এভাবে চেষ্টায় ও পরিশ্রমে আমি বুশরা আহমেদ এখন ৩টি পোস্ট গ্রাজুয়েট কোর্স পড়াই।

৬.

ইউএনসি শার্লটে পড়ানোর আগে আমার অধ্যাপনার অভিজ্ঞতা ছিল ‘হার্ভাড বিজনেস স্কুল ক্লাব অব শার্লট’-এ। যুক্তরাষ্ট্রের অনেক শহরে হার্ভার্ড বিজনেস স্কুল ক্লাব আছে। সাবেক ছাত্র, ছাত্রীদের সংগঠন।  আমরা সমাজের জন্য অলাভজনক কাজ করি। আমাদের সামাজিক বা কমিউনিটি ওয়ার্ক হয়। হার্ভার্ড বিজনেস স্কুল ক্লাব অব শার্লটে আমরা একটি সার্টিফিকেশন কোর্স করাই। নাম ‘মিনি এমবিএ’। কোর্সটি তাদের জন্যে যাদের কোম্পানির ১০-১৫ বছরের ম্যানেজমেন্ট বা ব্যবস্থাপনার কর্মঅভিজ্ঞতা আছে। অধ্যাপনা করে টাকাগুলো পাই, আমরা পুরোটাই চ্যারিটি বা দাতব্য হিসেবে অলাভজনক কাজে নিয়োজিত প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে দিই। আমি বা অন্য ফ্যাকাল্টিরা টাকাগুলো নিই না। এভাবেও সমাজের উন্নয়নে আমরা কাজ করি। কাজগুলো সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি। ব্যাংক, শিক্ষকতা, অন্যান্য কাজের বাইরে বিভিন্ন ধরনের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আমি নানা ধরনের অলাভজনক কাজ করি। এই মুহূর্তে একটি অলাভজনক বোর্ডে কাজ করছি -‘শার্লট বাইল্যাংগুয়েল’। প্রতিষ্ঠানটির বোর্ডে আমি মার্কেটিং মেম্বার। যারা দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকেন; সেই বাবা-মাদের আমরা শেখাই, কীভাবে সন্তান মানুষ করতে হয়, তাদের জীবন গড়ে দিতে হয়। এর বাইরেও হার্ভার্ড বিজনেস স্কুল ক্লাব অব শার্লটের আমি বোর্ড মেম্বার। পদবি ‘ডিরেক্টর অব মার্কেটিং’। যখন ইউএনসি শার্লটে শিক্ষকতা করতে আগ্রহী হলাম, কাকতালীয়ভাবে তখন ব্যাংক অব আমেরিকার একজন ‘এক্সিকিউটিভ কোচ’ হিসেবে তাদের সঙ্গে কাজ করছি। তাদের কিছু ছাত্র, ছাত্রীকে কোচিং বা প্রশিক্ষণ দিতাম। আমাদের ব্যাংকে তাদের শেখাতাম, কীভাবে কাজ করতে হয়, কীভাবে মিটিং চালাতে হয়। সাধারণ দক্ষতাগুলোই শেখাতাম। ফলে ইউএনসি শার্লট কর্তৃপক্ষ আমার কাজ সম্পর্কে খুব ভালোভাবে জানতেন। সবকিছু বিচার করে ২০১৫ সালের শুরুতে ‘অ্যাডজাঙ্কট প্রফেসর’ পদে তারা আমার সঙ্গে চুক্তি করলেন। তারা বললেন, ‘আপনি দয়া করে চূড়ান্ত নিয়োগের আগে অপেক্ষাধীন সময় প্রবেশনাল পিরিয়ড হিসেবে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ান।’ অধ্যাপনার শুরু হলো।

৭.

সেই ২০১৫ সালেই আমি তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ‌‘সেরা অধ্যাপক’ হয়েছি। যুক্তরাষ্ট্রের সব বিশ্ববিদ্যালয়েই আলাদাভাবে অধ্যাপকদের তালিকা করা হয়। আমার এমবিএর ছাত্র, ছাত্রীরা আমাকে মূল্যায়ন করেছেন। শিক্ষকতার প্রথম বছরেই সেরা প্রফেসর তালিকার প্রথমে আমি থেকেছি। হার্ভার্ড বিজনেস স্কুল ক্লাব অব শার্লটে প্রায় পাঁচ বছর ধরে আছি। অনলাইনে গুগল করলে আমাকে পাবেন। ফ্যাকাল্টিদের প্রথম নামটিই আমার। কারণ শেষ নামটি– আহমেদ। বেল্ক স্কুল অব বিজনেসে পড়াই। এখানে একটি ক্লাস নিয়ে শুরু করেছিলাম। পরে তারা আমাকে ভালো করছি বলে আরও দুটি ক্লাস দিতে চাইলেন। এখানে প্রথম যে কাজটি করলাম–ছাত্র, ছাত্রীদের করপোরেট সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং কোর্স হিসেবে পড়াতে শুরু করলাম। আমরা ফেইসবুক, লিংকডইনসহ বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ায় থাকি, বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে এখানে থাকতে হয়, কাজ করতে হয়। আমার এই কোর্সে ছাত্রছাত্রীদের আমি শেখাতাম কীভাবে সোশ্যাল মিডিয়াতে মার্কেটিং করতে হবে। এখানে প্রতিষ্ঠানের কাজ কী? সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠান কীভাবে সবার চেয়ে ভালো করতে পারে? ইত্যাদি পড়াতাম। ব্যাংক অব আমেরিকার বাস্তব অভিজ্ঞতা কাজে  লাগাতাম।  ব্যাংকের ‌‘সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং টেকনোলজি প্লাটফর্ম’র তখন আমি লিডার। কোর্সটিতে আমাদের সাফল্যের পরে ইউএনসি শার্লট অনুরোধ করলেন মিসেস বুশরা আহমেদ আপনি বিগ ডেটা এনালিটিক্স পড়ান। তারা জানতেন, ব্যাংক অব আমেরিকায় ডেটা এনালিটিক্স, হাডুপ, বিগ ডেটা নিয়ে আমি কাজ করতাম। ব্যাংকে আমার দলটি অবিশ্বাস্য ডেটা ভলিউম নিয়ে কাজ করত। বিশ্ববিদ্যালয় তখন অনুরোধ করল, আমি সেই টেকনোলজি যেন তাদের ছাত্রছাত্রীদের শেখাই। চাকরি করে এত ক্লাস নেওয়া সম্ভব নয়। ফলে বললাম, তাহলে আমি সোশ্যাল মিডিয়া পড়াতে পারব না। আমার দুটি সন্তান আছে। তাদের পড়ালেখা শেখাই, সঙ্গে থাকি। ছেলেদের সময় থেকে কোনোভাবেই ছাড় দিতে রাজি নই। তাদের সময় দিতে আমি কম ঘুমাই। এত কষ্টের কারণ আমার সন্তানরা যেন কোনোদিন বলতে না পারে, আমাদের মা পেশাজীবন করতে গিয়ে আমাদের সময় দেননি। মাতৃত্বের দায়িত্ব আমার প্রথম অগ্রাধিকার। এই প্রসঙ্গে বলি, আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ অ্যাওয়ার্ড পেয়েছি ২০১৯ সালে। সমাজসেবার জন্য ‘আগামী ফাউন্ডেশন’ নর্থ ক্যারোলিনার ‌‘সেরা মা’ হিসেবে আমাকে স্বীকৃতি দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টি অঙ্গরাজ্যের ৫০ জন সেরা বাঙালি নারীকে নির্বাচন করেছে, যারা রোল মডেল। শিক্ষা, শিল্প, সমাজসেবা ইত্যাদি প্রতিটি ক্ষেত্রের একজন নির্বাচন করেছে। অনেক অ্যাওয়ার্ড পাই, কিন্তু ‌‘সেরা মা’ সম্মান ছিল খুব সম্মানের। যা বলছিলাম, বিশ্ববিদ্যালয়কে বললাম, বাচ্চাদের পর আমার ব্যাংক অব আমেরিকা, তারপর ইউনিভার্সিটি, নানা ধরনের সামাজিক কাজ। যেখানে সুযোগ পাই, কাজ করি। আমি তথ্যবিজ্ঞান (ডেটা সায়েন্স) পড়াতে আবেদন করিনি। তারা আমাকে বলেছেন। বললাম, এমবিএ-ই পড়াব। তারা বললেন, ডেটা সায়েন্স পড়ান। এ বিভাগে আমাদের ভালো শিক্ষকের দরকার। হাতে-কলমে, ইন্ডাস্ট্রিতে যার কাজের অভিজ্ঞতা আছে। বিষয়টি এখন বিশ্বজুড়ে এক নম্বর বিষয়। নাসা থেকে পৃথিবীর যত জায়গা আছে বিশেষত মার্কিন রাজনীতি, নির্বাচনসহ তাদের ও অন্যদেরও দুনিয়ায় একটি বিষয়ই প্রাধান্য পাচ্ছে–তথ্য বা ডেটা। তথ্য ছাড়া কিছুই চলে না। ইউনিভার্সিটি অব নর্থ ক্যারোলিনা শার্লটের ডেটা শিক্ষা বিভাগ যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিখ্যাত বিষয়গুলোর একটি। এমন সমৃদ্ধ বিভাগ খুব কমই আছে। বোধহয় যুক্তরাষ্ট্রের মোটে ১০টি বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রিটি অফার করে।

৮.

আমার করপোরেশন ব্যাংক অব আমেরিকায় বিগ ডেটা, অ্যানালেটিকস নিয়ে কাজ করেছি। ফলে যখন ডেটা সায়েন্স পড়াতে গেলাম, বললাম, ‘ঠিক আছে, আমি এক শর্তে পড়াব। শ্রেণিতে পাঠ্যপুস্তক অনুসরণ করব না। সিলেবাস তৈরি করে নিজেই সেভাবে পড়াব। আপনারা আমাকে কিছু বলতে পারবেন না। কারণ এ আমার ক্লাস। আমি আমার মতো করে আমার ক্লাস সাজাব। কীভাবে ছাত্র, ছাত্রীদের পড়াব তাতে আমার ওপর ছড়ি ঘোরাতে পারবেন না।’ তারা বললেন, আপনার যেভাবে প্রয়োজন, আপনি পড়ান। পুরো স্বাধীনতা রইল। কী পড়াবেন, প্রশ্ন করবেন– সব আপনার স্বাধীনতা। এ বিশ্বাসের কারণ, তারা জানতেন, ব্যাংক অব আমেরিকা ইজ ভেরি নোন অ্যান্ড ভেরি ফেমাস ফর ডেটা সায়েন্স।

ইউএনসি শার্লটে ‘কম্পিটিটিভ অ্যাডভানটেজ উইথ বিগ ডেটা অ্যানালেটিকস (তথ্যবিজ্ঞান ব্যবহার করে কীভাবে বিভিন্ন করপোরেশন বা কোম্পানিগুলো তুলনামূলক অগ্রগতি করতে পারে)’ কোর্সটি পড়াতে শুরু করলাম। একটি কোম্পানি কীভাবে তাদের ও অন্যদের তথ্য ব্যবহার করে প্রতিযোগিতার বাজারে প্রথম হতে পারবে–এই হলো আমার বিষয়। মাস্টার্সের ছাত্র, ছাত্রীরা কোর্সটি পড়ে। আমার ৯০ শতাংশ ছাত্র, ছাত্রী চাকরি করে। স্নাতক পাস করে পড়তে এসেছে। গড় বয়স ৩০ থেকে ৬০ বছর। ডেটা সায়েন্সে আমার ছাত্র, ছাত্রীরা ডেটা সায়েন্টিস্ট। সবাই কাজ করে। পিএইচডি করা, নামকরা ডেটা সায়েন্টিস্ট আমার ছাত্রছাত্রী। বিভিন্ন কোম্পানির ম্যানেজমেন্ট লিডার, হেড অব দি ডিপার্টমেন্ট আছে। আমার ক্লাসরুম খুব সমৃদ্ধ। আমি শিক্ষার্থীদের বলি ‌‘আমার কাছ থেকে যত শিখবে, তার চেয়ে বেশি শিখতে পারবে তোমার পিআরদের (বন্ধু) কাছে। কারণ তোমরা প্রত্যেকে ডেটা সায়েন্স বিশেষজ্ঞ। আলাপ তোমাদের গড়ে দেবে। তারপরও আমাকে দরকার কারণ আমি তোমাদের সবার চেয়ে বেশি জানি। ডেটা সায়েন্সে আমার হাতেকলমে অভিজ্ঞতা ব্যাংক অব আমেরিকায় হয়েছে। বিরাট এই ব্যাংকে বিশাল বড় মাল্টিমিলিয়ন ডলারের প্রজেক্ট আমি ম্যানেজ করতাম। ইনচার্জ ছিলাম। আমার পরিকল্পনা ডেটা এক্সপার্টরা ব্যবহার করেছেন। ইউএনসি শার্লটে পরিকল্পনার পর্যায়ে আমি ডেটা সায়েন্স পড়াই। তথ্য কীভাবে ব্যবহার করতে হবে, সেভাবে সফল হতে হবে, তথ্য সংগঠিত করতে হবে; দিতে হবে, মানুষকে তথ্যে বোঝাতে হবে; ডেটা  দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া, তথ্য দেখে কীভাবে বলব আগামী পাঁচ বছরে আমার কোম্পানিতে এগুলো চাই। সেগুলো নিয়ে কাজ তাদের শেখাই। তথ্যের ভিত্তিতে, দিকে তাকিয়ে, নির্ভর করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সফলতা পড়াই। সবই তাদের পড়াই। পড়াতে আমার খুব ভালো লাগে। তার একটি কারণ ওরা এর মধ্যে পর্যায়ে। এই নিয়ে তিন বছর ধরে ডেটা সায়েন্স পড়াচ্ছি। সপ্তাহে একদিন তিন ঘণ্টার ক্লাস। নিয়মিত সেমিস্টারে বুধবার সাড়ে ৫টা থেকে সাড়ে ৮টা। সামারে সপ্তাহে তিনদিন পড়াই। সামার কোর্স মোট পাঁচ সপ্তাহের। নিয়মিত সেমিস্টার চার মাসের। ইউএনসি শার্লটের ডেটা সায়েন্স বিভাগ যুক্তরাষ্ট্রেই খুব মানসম্পন্ন। নাম ‌‘স্কুল অব ডেটা সায়েন্স।’ বিভিন্ন ক্ষেত্র থেকে মাস্টার্স করতে ছাত্র, ছাত্রীরা আসে।

৯.

ইউএনসি শার্লটে আরেকটি ডিপার্টমেন্টে অস্ট্রেলিয়ার ছাত্র, ছাত্রীদের পড়াই। সামারে আমার একটি শর্ট কোর্স আছে- ‌‘ডিজিটাল ডেটা অ্যানালেটিকস’। ডেটার ওপরে, শিক্ষার্থীরা সব অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন ইউনিভার্সিটির। নর্থ সাউথ ওয়েলস ইউনিভার্সিটি, উলেঙ্গং ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব সিডনির ছাত্র, ছাত্রীরা আসে আমার এই সার্টিফিকেশন কোর্সে। তিনজন অধ্যাপক কোর্সগুলো পড়ান। একজন বেল্ক কলেজের ডেটা সায়েন্স অনুষদের ডিন। আরেকজন শিক্ষক, তৃতীয়জন আমি। আমরা তিনটি মডিউল পড়াই। শেষটি আমি পড়াই–ডিজিটাল ডেটা অ্যানালেটিকস’। কারণ এখন ডিজিটালে ব্যাংকিং নিয়ে কাজ করছি। এখানেও আমার পেশাগত জীবন, ইন্ডাস্ট্রি অভিজ্ঞতার কারণে তারা ক্লাসটি নেওয়ার জন্য অনুরোধ করেছেন। প্রথম আবেদনের পর থেকে তারা আমাকে অ্যাপ্রোচ করছেন, আপনি এই, এই ক্লাসগুলো নিন। আরও কারণ, আমার ক্লাসের ফিডব্যাক ভালো। বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতায় পড়াই। আমি পাঠ্যবই অনুসরণ করি না, খুব অ্যাপলিকেশন নির্ভর হয়। ছাত্র, ছাত্রীদের বাচ্চা বলি। মানবিক আচরণ করি। গতকাল সিলেবাস জমা দিলাম। এই  সেমিস্টারে সব মিলিয়ে ১ হাজার পয়েন্ট আছে। ছাত্রছাত্রীদের ১ হাজার পয়েন্টে পরীক্ষা দিতে হবে। ১শ পয়েন্ট উপস্থিতি– কে কত কথা বলে, ইন্টারঅ্যাকটিভ কী–এর ওপর এই নম্বরগুলো দেওয়া হবে। আমার নিয়ম হলো, ক্লাসে শুধু নিজেই কথা বলব না। তুমিও বলবে, আমিও বলব। স্টুডেন্টরা এ অনুসরণ করে ও ভালোবাসে। অন্য ক্লাসের শিক্ষকরা এ কাজ অত করেন না। ২শ পয়েন্ট দিই কনটেমপরারি আর্টিকেল বা সমসাময়িক লেখায়। তাদের বলি, ফোর্বসে গিয়ে অত তারিখের এই আর্টিকেলটি পড়ে মনোভাব লেখো। মোট চারটি আর্টিকেল তাদের পড়তে দিই। আমি নম্বর দিই অ্যাসাইনমেন্টের পর। এভাবেও পড়ানোর মাধ্যমে তাদের জটিলভাবে চিন্তা করা শেখাই। পরে তারা বলে, আপনার ক্লাস করার পর আমাদের চিন্তার প্রক্রিয়া অনেক গতিশীল, সংঘবদ্ধ হয়েছে। গ্রেড করি কে কত চিন্তা করতে পারে, কে অত পারে না তার ভিত্তিতেও। কত প্রকার, কী, কী প্রশ্ন করি না। এজন্য অনেক কাজ করতে হয়। কম ঘুমিয়ে, লেখাপড়া ও কারিকুলাম করি। তারপরও ভালো লাগে, তাদের কারণে আরও শিখতে পারছি। আমেরিকার ইউনিভার্সিটিতে প্রতিটি শিক্ষক কারিকুলাম তৈরি করেন। তাদের কাঠামো তৈরি করে দিয়ে বলা হয়, এই ফ্রেমে থাকবেন। ছাত্র, ছাত্রীদের পড়াতে আমাকে অনেক পরিশ্রম করতে হয়। কারণ আমি বহুনির্বাচনী প্রশ্নও দিই না। প্রশ্নগুলো প্রশ্নোত্তর, রচনামূলক, প্রায়োগিক কম্পিউটারভিত্তিক করি। আমার টিচিং অ্যাসিসটেন্ট আছে। সপ্তাহে ২০ ঘণ্টা সাহায্য করে। আমার প্রশাসনিক কাজ করে। গ্রেডিং, পড়ালেখা সবশুদ্ধ সপ্তাহে ১৫ থেকে ২০ ঘণ্টা বিশ্ববিদ্যালয়ে দিই। দিনে ৩ ঘণ্টা করে সপ্তাহে ১৫-২০ ঘণ্টা নিজেকে তৈরিতে সময় দিতেই হয়।

১০.

হার্ভার্ড বিজনেস স্কুল ক্লাব অব শার্লটের হয়ে মিনি এমবিএতেও বেশিরভাগই আমার চেয়ে বয়সে বড়। ওখানে বয়স ব্যাপার নয়। যুক্তরাষ্ট্রে শিক্ষা বয়সের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। সেখানে ৪০ বছর বয়সেও মনে করলে স্কুলে যেতে পারবেন। এখানে এক বয়সের পর চাইলেও পড়ালেখা করতে পারেন না। ওখানে অনার্সের পর বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কেউ পড়ালেখা করেন না। ভালো চাকরি পাওয়ার জন্য আন্ডার গ্রাজুয়েটই যুক্তরাষ্ট্রে যথেষ্ট বেশি ভালো ডিগ্রি। মাস্টার্স অতিরিক্ত পড়ালেখা হিসেবে, প্রেরণায় করেন। তারা আবার হয়তো দ্রুত পদোন্নতি চান, গবেষণায় যেতে যেত চান, শিক্ষকতা করতে চান। আমাদের মতো আবশ্যিক নয়। ফলে যেসব ছাত্রছাত্রী এমবিএ পড়তে আসে তারা স্বপ্রণোদিত। নিজেদের জন্য পড়ালেখা করে। কারও কথায়, চাকরি পেতে পড়ালেখা করে না। এ ধরনের ক্লাসগুলোর ৯০ ভাগ ছাত্রছাত্রী চাকরি করে। তারা আসেন কারণ তারা জানতে, শিখতে ও বিশ্বকে বুঝতে চায়।

১১.

যুক্তরাষ্ট্রে শিক্ষকদের সম্মান ভালো। তবে ছাত্র, ছাত্রীরা ক্লাসে উঠে দাঁড়ায় না। নিজেদের মতো থাকে। শিক্ষক বলে আমি একটুও রাগ করতে পারব না। তবে আমার ক্লাস শুরু ৫টা ৩০ মিনিটে, তারা এক মিনিট পরেও ক্লাসে ঢুকতে পারবে না। ছাত্র, ছাত্রীরা ৫টা থেকে ৫টা ২৫ মিনিটে সবাই চলে আসে। সেখানে এটি একটি সম্মান শিক্ষকের আছে যে তার ছাত্র, ছাত্রীরা কেউ ক্লাসে দেরি করে ঢোকে না। আমার কাছে সম্মান–যখন অ্যাসাইনমেন্ট দেব, দেরি করে জমা দেবে না। আমাকে প্রশ্ন করতে পারবে। এ ধরনের সম্মান পাই। তারা কিন্তু ক্লাসে চ্যালেঞ্জ করে। পরে বলে এ শিক্ষক ক্লাসে ভালো ছিলেন না, কিচ্ছু শিখতে পারিনি। আমি পয়সা ফেরত চাই। যুক্তরাষ্ট্রের সব বিশ্ববিদ্যালয় কিন্তু বেসরকারি নয়, হার্ভার্ড বেসরকারি। সে দেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনীতি নেই। শুরু থেকে এমন। তাদের সংবিধানেও ছাত্ররাজনীতি নেই। তারা সেভাবেই দেশ গড়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয় পড়ালেখার। ছাত্ররাজনীতি বাচ্চাদের জীবনের উদ্দেশ্য লক্ষ্য থেকে সরিয়ে নিয়ে যাবে। রাজনীতি ও বিশ্ববিদ্যালয় একে অন্যের পরিপন্থী।

১২.

ব্যাংক অব আমেরিকার ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রামের আমি এক্সিকিউটিভ কোচ। প্রকল্পটির পুরো মানে অ্যাপ্লাইড টেকনোলজি প্রোগ্রাম (এটিপি)। যুক্তরাষ্ট্রে তারা প্রায় ১২ বছর ধরে মডেলটি বাস্তবায়ন করছেন। ব্যাংক অব আমেরিকা এখন প্রযুক্তিনির্ভর বিরাট ব্যাংক। ২০১২-১৩ সাল থেকে এটিপিতে কাজ করছি। আমার ইউএসসি শার্লটের আন্ডার গ্রাজুয়েট ছাত্রছাত্রীদের ব্যাংক অব আমেরিকায় ১৭ মাসের ব্যাংকিং খাতের এই কর্মপ্রশিক্ষণ দিই। পড়ালেখার পাশাপাশি তারা আমাদের সঙ্গে খণ্ডকালীন চাকরি করে। ব্যাংকের চাকরিতে প্রতি ছাত্র, ছাত্রীর একজন করে এক্সিকিউটিভ কোচ থাকেন। ব্যাংকে সিনিয়র লেভেলের, সিনিয়র লিডার। ছাত্র বা ছাত্রীটিকে সুপারভাইজ বা দেখাশোনা করেন, মেন্টর বা বিজ্ঞ পরামর্শদাতার কাজ করেন। কীভাবে কাজ করতে হয় শেখান। আমার অধীনে গত বছর সেরা মেধাবী চারজন ছাত্র, ছাত্রী ছিল। এক্সিকিউটিভ কোচ হিসেবে আমার সঙ্গে এক ঘণ্টা, এক ঘণ্টা করে মাসে দুইবার দেখা হয়েছে। তখন তারা আমাকে তাদের সব সমস্যার কথা বলেছে। তারা যে বিভাগে কাজ করে, সেখানে কেমন করছে জানিয়েছে। বরাবরের মতো কীভাবে করলে ভালো কাজ করতে পারবে পরামর্শ ও নির্দেশনা দিয়েছি। আমার অধীনে যারা চাকরি করে, তাদের বলি দেখো, কীভাবে মিটিং চালাচ্ছি। বাস্তব অভিজ্ঞতায় দেখে শেখে কীভাবে মিটিং চালাতে হয়। বলি দেখো, আধ ঘণ্টার মধ্যে কীভাবে কত বড় সিদ্ধান্ত নিই। কীভাবে কথা বলি, কথা কীভাবে কোন লাইনে কেন যাচ্ছে। প্রশ্ন কীভাবে হ্যান্ডেল করি। কাজটি এভাবে করব, প্রজেক্টটি এভাবে। দেখো পার? সিনিয়র এক্সিকিউটিভ লেভেলে কোচিং করাই। তাদের শেখাই কীভাবে কথাও বলতে হয়। যে যে বিভাগে কাজ করে সে সেই কাজ শেখে। ছাত্র, ছাত্রী হিসেবে যতটুকু বিকাশ ঘটানোর আমরা চেষ্টা করি। ব্যাংক অব আমেরিকা প্রচণ্ড নিয়মতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান। প্রচুর সম্পত্তি নিয়ে কাজ করতে হয়। অসংখ্য গোপন তথ্য, নথি আছে। সব তো আর শেখাতে পারব না। তারপরও ১শ ভাগের ৩০ ভাগ কাজ তারা এভাবে জানতে ও শিখতে পারে। ১৭ মাসে তারা এত কিছু শেখে, ব্যাংকে কাজের অভিজ্ঞতা হয়ে যায় বলে চাকরি পেয়ে যায়। এক্সিকিউটিভ কোচ বলে আমার সুপারিশে তাদের চাকরি হয়। যদি বলি এ ভালো নয়, আমাদের  আর দরকার নেই; সেই ছাত্র বা ছাত্রী কাজটি করতে পারে না। এক্সিকিউটিভ কোচের প্রচুর ক্ষমতা। কোন ছাত্রকর্মী থাকবে, কে চাকরি পাবে তার সুপারিশের ওপর নির্ভর করে। গত সাত বছর যত শিক্ষার্থীর কোচ ছিলাম, মেন্টর হয়েছি; একজনেরই সুপারিশ করিনি। তার আচরণের অসুবিধা, সমস্যা ছিল। ব্যাংকের সংস্কৃতির সঙ্গে যাবে না বলে তাকে চাকরির জন্য রাখতে পারিনি।

১৩.

ব্যাংক অব আমেরিকার ‘অ্যাপ্লাইড টেকনোলজি প্রোগ্রাম’ বা এটিপি মডেলটিই বাংলাদেশে শুরু করছি। অবশ্য প্রেক্ষাপটসহ সব ভিন্ন হবে। দেশে এই মডেলের নাম, ‘অ্যাপ্লাইড ক্যারিয়ার প্লেসমেন্ট প্রোগ্রাম (এসিপিপি)’। প্রকল্পটির ধারণা ও নকশা আমার। মডেলটির মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রোগ্রামটি আমিই প্রথম শুরু করব। দেশে এটিই আমার প্রথম কাজ। কেউ এমন কাজ কখনো করেননি। ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে চালু হবে। ডিআইইউ (ড্যফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি)’র স্বাধীন সংস্থা এইচআরডিআই (হিউম্যান রিসোর্স ডিপার্টমেন্ট ডেফোডিল ইউনিভার্সিটি)’র সঙ্গে কাজ করব। হব তৃতীয় পক্ষ। আমি ড্যাফোডিলের নই। ইউনাইটেড স্টেটস অব আমেরিকার স্বতন্ত্র বিশেষজ্ঞ। তাদের সঙ্গে পরামর্শ, আলোচনায় কাজ করব। ছাত্র, ছাত্রী, অধ্যাপক, এইচআরডিআইয়ের সঙ্গে মিলে এই প্রোগ্রামটি সফল করব। ড্যাফোডিলের ছাত্র, ছাত্রীদের নিয়ে আমরা শুরুটি করব। ৮ থেকে ১১ সেমিস্টারের ছাত্র, ছাত্রীরা পড়ালেখার পাশাপাশি চাকরি করবে। এইচআরডিআইয়ের মাধ্যমে  কোম্পানিগুলো আমরা ঠিক করব। আমি থাকব  কোম্পানিগুলোকে তাদের বলব, ভাই আপনারা আমাদের সঙ্গে কাজ করবেন? ১০ জন ছাত্র, ছাত্রী দেব। টানা দেড় বছর কাজ করবে। নেবেন? বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখার পাশাপাশি খণ্ডকালীন হিসেবে সপ্তাহে ২০ ঘণ্টা চাকরি করবে। উদ্যোগটি সফল করতে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ভিসি, বিভিন্ন বিভাগের চেয়ারম্যানরা আমাকে সাহায্য করছেন। যাতে পড়ালেখার রুটিনে ওরা পার্টটাইম চাকরি করতে পারে। এইচআরডিআই আমাকে সাহায্য করবে কীভাবে সবকিছু করতে হবে। কোম্পানিগুলো বাইরে থেকে এত মানুষ ভাড়া করে। ৪০ হাজার কোটি টাকা দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। দেশে কোনো মেধা, দক্ষতা নেই বলে। আমাদের ১০টি ছাত্রছাত্রীকে ১৫ মাসে যা চান তাদের শেখাবেন। যখন গ্রাজুয়েশন করবে, তাদের নেন। কারণ তারা আপনাদের অভিজ্ঞতা অর্জন করে ফেলেছে। ব্যাংক অব আমেরিকায় যে মডেলে কাজ করি, সেটিই বাংলাদেশে চালু করব। প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে এইচআরডিআইয়ের মাধ্যমে যোগাযোগ করে আমরা চুক্তি করব। তারা দেশের বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কাজ করছেন। বাংলাদেশের ইন্টার্নশিপের ধারণা ও কার্যকারিতা বদলে দেবে প্রোগ্রামটি। আমি খুব আশাবাদী।

১৪.

‘করপোরেট ফেমিনোলজি’ নামে একটি বই আছে। পৃথিবীর ১৭ জন নারীনেত্রীর জীবন ও সাফল্য লেখা। হার্ভার্ড অ্যালামনাই বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা তাদের ১৭ মহিলা নেতাকে নির্বাচন করে লিখেছে। স্ব স্ব ক্ষেত্রে ওপরের সারিতে, বিভিন্ন দেশে বড় প্রতিষ্ঠান চালাচ্ছেন। শুধুমাত্র তাদের নির্বাচন করা হয়েছে, যারা অবস্থানে খুব সফল ফিমেল লিডার। আমি একজন। একমাত্র বাংলাদেশি। তারা আমার নামের নিচে ইউএসএ পরিচয় লিখেছিলেন। বদলে ‘বাংলাদেশ’ লিখতে বলেছি। কারণ বাংলাদেশের মানুষ হিসেবে এই বইতে ও জীবনে পরিচিতি পেতে চাই।

১৫.

এই যে এসএপিপি শুরু করব, বাংলাদেশে চলে আসব–হয়তো হবে না। দুটি বাচ্চা ওখানে জন্মেছে, বড় হবে; তারা যেখানে থাকবে, আমি মা কাছাকাছি থাকব। তারা হয়তো কোনোদিন বাংলাদেশে থাকতে আসতে চাইবে না। এ কাজের মাধ্যমে নিজের দেশের কাছাকাছি থাকতে চাই। ওখানে শিক্ষাব্যবস্থার উন্নতির জন্য এত কিছু করি; এখানেও করতে চাই। আমার মা বলেন, তুমি যখন ওখানে করো, সাগরে এক ফোঁটা হয়, যখন দেশে এসে করবে, বালতিতে এক ফোঁটা হবে। এখানে কাজ করো, ওখানে এমন অনেক মানুষ আছেন। এখানে নেই। যদি এখানে কিছু শুরু করতে পারি, সন্তানেরা হয়তো তার অংশ হতে চাইবে। যাদের কোনোদিনও আনতে পারতাম না, দেশে আনার একটি সুযোগ হয়তো তৈরি হবে।

এই সংবাদটি 1,246 বার পড়া হয়েছে

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •