বাংলাদেশ ও বাংলাসাহিত্যের শিরা উপ-শিরায় সিলেট হাসনাইন সাজ্জাদী

প্রকাশিত:রবিবার, ১৯ জুলা ২০২০ ১১:০৭

বাংলাদেশ ও বাংলাসাহিত্যের শিরা উপ-শিরায় সিলেট হাসনাইন সাজ্জাদী

সিলেট থেকে অনেক কিছুই বাংলাদেশ পেয়েছে।সংকীর্ণতার পরিচয় দিতে নয়,মহান বাঙালি জাতিকে একটু স্মরণ করিয়ে দিতে এই কয়েক ছত্রের উপস্থাপন।তবুও লেখা পাঠে বিরক্তির উদ্রেক হলে সরি।সিলেট প্রীতি কিংবা সাম্প্রদায়িক উপস্থাপনা নয়,ইতিহাস বলার জন্য এই লেখা।
আমরা জানি বল্লাল সেন মহান ভারতীয় জাতিকে ৪ শ্রেণিতে বিভক্ত করে হিন্দুত্বের তগমা দিয়ে বৌদ্ধ সম্প্রদায়কে হিন্দু জাতির বাইরে নিয়ে যান এবং সিডিউল কাস্ট বা অন্তজ শ্রেণিকে হিন্দু সম্প্রদায় থেকে বের করে দেন।ব্রাহ্মণ সম্পদায় তখন নিম্নবর্গের হিন্দুদের উপর চালায় ধর্মীয় নিপীড়ন।একদিকে তিনি বৌদ্ধদের উপর চালান অমানুষিক নির্যাতন এবং অপরদিকে নিম্ন বর্ণের হিন্দুদেরকে দাসত্বের শিকলে বেঁধে ফেলেন।এসময় বৌদ্ধদের উপর রাষ্ট্রীয় নির্যাতন বেড়ে গেলে তারা স্থান ত্যাগ করতে শুরু করে।বর্তমান ভারতাংশ ছেড়ে তারা বাংলাদেশের উত্তরাংশ,ঢাকার মুন্সিগঞ্জ,নরসিংদী ও কুমিল্লার ময়নামতিতে বিহার [রক্ষা ব্যূহ]নির্মাণ করে বসবাস শুরু করে। এসব স্থানেও তারা একসময় আক্রান্ত হয় এবং অখণ্ড সিলেটের পাথারিয়া পর্বত,করিম গঞ্জ,কাছাড়,শিলচর ও আসাম পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে।তাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
এমতাবস্থায় তারা তাদের সাধন ভজন পদ্ধতিকে লিপিবদ্ধ করে রাখার প্রয়াস থেকে লেখে চর্যাচর্যগীতিকা যা নেপালের রাজ দরবার থেকে আবিষ্কৃত হয় এবং চর্যাপদ নামে পরিচিতি পায়।সিলেট ও আসামে বসে চর্যাপদ রচিত হয় বলে চর্যাপদে সিলেটের ভাষা ও মাটি-মানুষের বর্ণনা পাওয়া যায়।
নোট -১; বাংলাসাহিত্যের সূতিকাগার সিলেট ও আসাম।
প্রাণ বিপন্ন ভেবে একসময় বৌদ্ধরা সিলেট ও আসাম অঞ্চল ছেড়ে নেপাল ও তিব্বতে গিয়েছিলো।তিব্বতি ভাষায়ও চর্যাপদ পাওয়া গেছে।
বাংলাসাহিত্যের প্রথম গ্রন্থ চর্যাপদ ছাড়াও বৈষ্ণব সাহিত্যের রক্তধারাও সিলেটের।বৈষ্ণবসাহিত্যকে বাংলাসাহিত্যের ছাদ গণ্য করা হয়ে থাকে।
নবদ্বীপে জন্ম হলেও শ্রী চৈতন্যদেবের পৈত্রিক বাড়ি সিলেটে।বাঙালির হাতে এবং বাংলায় উদ্ভাবিত একমাত্র ধর্ম হলো বৈষ্ণব ধর্ম।এ ধর্মের অপভ্রংশ নাথ ধর্ম।বৈষ্ণবসাহিত্য ও নাথসাহিত্য এ দু ধর্মমত থেকেই রচিত হয়েছে।
ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজি নবদ্বীপ আক্রমন করে রাজদণ্ড হাতে তুলে নিলে নিম্ন বর্ণের হিন্দুরা মুসলমান হতে থাকে।কৃষ্ণ ভক্ত হিসাবে চৈতন্যদেব মুসলিম সাম্যধারার অনুকরণে সাম্যবাদী বৈষ্ণব ধর্মের প্রবর্তন করে নিম্ন বর্ণের হিন্দুদেরকে মুসলমান হওয়া থেকে বিরত করেন।আবার মুসলমারা পরবর্তীকালে বৈষ্ণব ধারার আদলে স্থানীয়ভাবে বাউল মতবাদের জন্ম দেন।
নোট-২; শ্রী চৈতন্যদেবকে কেন্দ্র করে বৈষ্ণবসাহিত্য প্রচারিত হওয়াতে এখানেও সিলেটের রক্তপ্রবাহিত।
ভারতীয় ভাববাদ বাঙালি মানসই শুধু নয়,বিশ্ব মানসেও জল সিঞ্চন করেছে রবীন্দ্র সাহিত্যের আলোকধারায়।আর রবীন্দ্রনাথ বড় চমক পশ্চিমা বিশ্বকে দিয়েছিলেন হাছন রাজার একটি বাক্যে।’মম আঁখি হইতে পয়দা আছমান জমিন’এর ব্যাখ্যায় শান্তি খুঁজে পায় তারা।এ মরমি দর্শনে্র চর্চায় আজো তারা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে থাকে।
নোট-৩; মরমী সাধক হাছন রাজা সিলেট সন্তান।
ষোলআনা খাটি বাঙালি হওয়ার একটি আন্দোলন বাংলায় (ব্যাডেন পাওয়েলের স্কাউটিং আন্দোলনের মত) এক সময় জনপ্রিয় ছিল এবং স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সে আন্দোলনে সিদ্ধহস্ত ছিলেন বলেও দাবী করেছেন- তার নাম ‘ব্রতচারী আন্দোলন’।যার তিন দফাই ছিলো বাংলাদেশের সূতিকাগার।
ক,আমি বাংলাকে ভালবাসি।
খ,আমি বাংলার সেবা করবো।এবং
গ,আমি বাংলার ব্রতচারী।
১৯৩২ সালে সিলেটের মনিষী গুরুসদয় দত্ত এই আন্দোলন শুরু করেন এবং অবিভক্ত বাংলায় এই আন্দোলন ছিলো দেশপ্রেমের পীঠস্থান।নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুও এই আন্দোলনের প্রেরণা গ্রহণকা রী বলে বর্ষীয়ান্দের কাছ থেকে জানা যায়।আমার দাদা লোক-সাহিত্যিক ও ভাষা সংগ্রামী আমির সাধুর নিকট থেকে আমি এ বিষয়ে জেনেছি!
এদিকে হাছন রাজা নিজেও তার গানে বাঙালির মাহাত্ম্য বর্ণনা করেছেন এভাবে-‘হাছন রাজা বাঙালি গো / তোমার প্রেমের কাঙালি গো…।
নোট-৪;বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সূতিকাগারও এই সিলেট।
বিজ্ঞান যুগে বিজ্ঞান কবিতা এখন বিশ্বব্যাপী সমাদৃত।কবিতার উপমা,উৎপ্রেক্ষা ও চিত্রকল্পে বিজ্ঞান চর্চার দাবীতে আমি বিজ্ঞান কবিতা আন্দোলনের সূচনা করি ১৯৮৮ সালে।সমিতিভিত্তিক অধিক সাম্যের রাষ্ট্র দর্শন বিজ্ঞানবাদও আমার উপস্থাপনা।’বিজ্ঞানবাদের কাব্যতত্ত্ব’ ও ‘বিজ্ঞান কবিতার রূপরেখা’ আলোচ্য পুস্তিকা আকারে আমি উপস্থাপন করেছি।বিশ্বসাহিত্য ও রাষ্ট্র দর্শনে আমার গবেষণাপত্র এখন আলোচিত বিষয়।আমি সিলেটের মৌলভীবাজার জেলার জুড়ীর সন্তান।আমার রক্ত সিলেটের রক্ত।
নোট-৫; বিশ্ব কবিতার বাঁকবদলে বিজ্ঞানকাব্যতত্ত্ব সিলেট সন্তানের হাতেই উপস্থাপিত।
এ ছাড়াও সিলেটের নিজস্ব উপভাষা ও নিজস্ব বর্ণমালা ছিলো যার নাম সিলেট নাগরি।ঐতিহ্য হিসাবে সিলেট নাগরির চর্চাই শুধু নয়,বন্ধু গবেষক মোস্তফা সেলিম সিলেট নাগরি লিপির পুনর্জাগরণ সম্পন্ন করেছেন।
উপরোক্ত কারণসমূহে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদের উন্মেষ,বিকাশে ও বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় সিলেট মুখ্য ভূমিকার দাবীদার।
সমাপ্ত।
ঢাকা- তারিখ-১৯/০৭/২০২০।

এই সংবাদটি 1,227 বার পড়া হয়েছে

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •