• ২১ জানুয়ারি, ২০২২ , ৭ মাঘ, ১৪২৮ , ১৭ জমাদিউস সানি, ১৪৪৩

বাজার দখলে দেশি-বিদেশি কোম্পানির নানা তৎপরতা

newsup
প্রকাশিত নভেম্বর ৩০, ২০২১
বাজার দখলে দেশি-বিদেশি কোম্পানির নানা তৎপরতা

অর্থনীতি ডেস্কঃ 

দেশে ২০৩০ সাল পর্যন্ত প্রায় ১২ হাজার মেগাওয়াটের ১৫টি এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণ ও পরিকল্পনাধীন। এ ছাড়া বিভিন্ন শিল্পাঞ্চল হচ্ছে। দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমছে। ফলে দিন দিন এলএনজির (তরল প্রাকৃতিক গ্যাস) ব্যবহার বাড়ছে। এখন দৈনিক গড়ে ৭০ কোটি ঘনফুট আমদানি করা গ্যাস ব্যবহূত হচ্ছে। ২০২৫ সালে দেশে এলএনজির দৈনিক চাহিদা ৪০০ কোটি ঘনফুটে পৌঁছাবে। বর্তমানে দেশে বার্ষিক ১৫-১৬ হাজার কোটি টাকার এলএনজির বাজার রয়েছে। সামনের দিনগুলোয় তা কয়েক গুণ হবে। এলএনজির এই বিশাল বাজারে নিজেদের অংশগ্রহণ বাড়াতে নানামুখী তৎপরতা চালাচ্ছে দেশি-বিদেশি কোম্পানি। তবে এ খাত-সংশ্নিষ্টরা মনে করেন, এলএনজির আমদানি কার্যক্রমের নিয়ন্ত্রণ পেট্রোবাংলার কাছেই থাকা যৌক্তিক। আর বাজার স্থিতিশীল রাখতে সরকারের শক্তিশালী তদারকি থাকা উচিত।

সূত্র জানায়, এখন মহেশখালীর গভীর সমুদ্রে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল রয়েছে (এফএসআরইউ)। এ দুটি পরিচালনা করছে দেশীয় কোম্পানি সামিট ও যুক্তরাষ্ট্রের এক্সিলারেট এনার্জি। এলএনজি সরবরাহের জন্য কাতার এবং ওমানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি রয়েছে। আর আন্তর্জাতিক বাজার থেকে সরাসরি এলএনজি সংগ্রহে ১৬টি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি রয়েছে পেট্রোবাংলার। এ ছাড়া সামিট গ্রুপ ও এমিরাটস ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানির সঙ্গে বিদ্যুৎ-জ্বালানি দ্রুত সরবরাহ বিশেষ বিধানে দীর্ঘ মেয়াদে এলএনজি সরবরাহে চুক্তি করতে যাচ্ছে পেট্রোবাংলা।
এদিকে পটুয়াখালীর পায়রায় একটি এফএসআরইউ, মহেশখালীর মাতারবাড়ীতে একটি স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল ও একটি এফএসআরইউ স্থাপনের উদ্যোগ রয়েছে সরকারের। এ প্রকল্পের কাজ পেতে দেশি-বিদেশি কোম্পানি সরকারের উচ্চ পর্যায়ে দেনদরবার করছে। কারণ ২০২৪ সালের পর থেকে দেশের ক্ষেত্রগুলো থেকে গ্যাস উৎপাদন কমতে থাকবে। সমুদ্রে নতুন ক্ষেত্র আবিস্কৃত না হলে বাংলাদেশকে গ্যাসের জন্য পুরোপুরি আমদানির ওপর নির্ভর করতে হবে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে বলেছেন, পায়রায় এফএসআরইউর কাজ পেতে পারে সামিট গ্রুপ।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, আগামীতে দেশে এলএনজির ব্যবহার বাড়বে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম ওঠানামার বিষয়টি মাথায় রাখতে হচ্ছে। তিনি বলেন, পায়রা ও মাতারবাড়ীতে টার্মিনাল স্থাপনে অনেকেই আগ্রহ প্রকাশ করেছে। সবার প্রস্তাব যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। যোগ্য কোম্পানিকে কাজ দেওয়া হবে।
বুয়েটের অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম. তামিম বলেন, এলএনজির আন্তর্জাতিক বাজার অস্থিতিশীল। তাই আন্তর্জাতিক বাজার সম্পর্কে দক্ষ একটি টিম পেট্রোবাংলার থাকতে হবে, যারা বাজার বুঝে কখনও দীর্ঘ মেয়াদে কখনও স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি আনবে। তিনি বলেন, এলএনজির কার্যক্রম পেট্রোবাংলার কাছে রাখতে হবে। তারাই প্রয়োজন অনুসারে বেসরকারি কোম্পানির মাধ্যমে সরবরাহ চ্যানেল চালু রাখবে। আমদানি ও সরবরাহ করা গ্যাসের মান ও পরিমাণ যাচাইয়ে দক্ষ হতে হবে বলেও মত দেন ম. তামিম। তিনি আরও বলেন, এলএনজি সরবরাহ, আমদানি সংক্রান্ত একটি কার্যকর নীতিমালা থাকতে হবে। তাহলে কোনো একক কোম্পানি মার্কেট দখলে রাখতে পারবে না। এ খাত স্থিতিশীল থাকবে।
পায়রায় এফএসআরইউ স্থাপনে একাধিক প্রস্তাব :পটুয়াখালীর পায়রার রাবনাবাদ চ্যানেলে এফএসআরইউ স্থাপনে চলতি বছর সামিট গ্রুপ একটি প্রস্তাবনা জ্বালানি বিভাগে জমা দেয়। কোম্পানিটি ২০২৩ সাল থেকে বছরে ৩ দশমিক ৭৫ মিলিয়ন টন হারে ২২ বছরের জন্য এলএনজি সরবরাহের প্রস্তাব করে। সামিটের প্রস্তাবে তিনটি অপশন রয়েছে। একটি হলো- পায়রা বন্দরের রাবনাবাদ চ্যানেলে এক লাখ ৩৮ হাজার থেকে ১ লাখ ৭০ হাজার ঘনমিটার স্টোরেজ ক্ষমতার এফএসআরইউ নির্মাণ করা হবে। ৩০ হাজার থেকে ৪০ হাজার ঘনমিটার স্টোরেজের ছোট জাহাজে এলএনজি আনা হবে। এতে সমুদ্রের তলদেশে পাইপ বসানোর প্রয়োজন হবে না। দ্বিতীয় প্রস্তাবে সামিট বলেছে, রাবনাবাদ চ্যানেলে এফএসআরইউ বসবে, আর কুতুবদিয়ায় একটি ভাসমান স্টোরেজ ফ্যাসিলিটি (এফএসইউ) থাকবে। বিদেশ থেকে বড় জাহাজে এলএনজি এনে কুতুবদিয়ায় স্টোরেজ করা হবে। এর পর ছোট জাহাজে পায়রার এফএসআরইউতে আনা হবে। এ ক্ষেত্রেও সাগরের তলদেশে পাইপলাইন বসাতে হবে না। তৃতীয় প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, এফএসআরইউ পায়রা বন্দর থেকে ৬০ কিলোমিটার গভীরে সমুদ্রে থাকবে। এর জন্য ছোট এলএনজি ক্যারিয়ার আর পৃথক স্টোরেজ ট্যাঙ্ক (এফএসইউ) লাগবে না। তবে সমুদ্রের তলদেশে ৬০ কিলোমিটার পাইপলাইন বসাতে হবে। সামিটের এফএসআরইউর রিগ্যাসিফিকেশন ক্ষমতা হবে দিন ৫০ কোটি ঘনফুট। সামিট বলেছে, বৈরী আবহাওয়ায় এলএনজি সরবরাহ বিঘ্নিত হলে এর জন্য বাড়তি অর্থ পরিশোধ করতে হবে না। প্রয়োজনীয় পাইপলাইন সামিট নিজেই বসাতে চায়। এর ব্যয় এলএনজির দামের সঙ্গে যুক্ত হবে। সংশ্নিষ্টরা মনে করেন, রাবনাবাদ চ্যানেলে এফএসআরইউ বসলে পায়রা বন্দরের জাহাজ চলাচল ও ড্রেজিং কার্যক্রম বিঘ্নিত হবে।
এদিকে এক্সিলারেট কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকত থেকে ৭৫ কিলোমিটার গভীর সমুদ্রে দৈনিক ৮০ কোটি ঘনফুট রিগ্যাসিফিকেশন ক্ষমতার এফএসআরইউ স্থাপন করবে। কোম্পানিটি খুলনা পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছে। এফএসআরইউর স্টোরেজ ক্ষমতা হবে দুই লাখ ঘনমিটার। প্রাথমিকভাবে নর্থওয়েস্ট পাওয়ার কোম্পানির ১২শ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ প্রকল্পে ১৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করবে। সমুদ্রে ৭৫ কিলোমিটার পাইপলাইন, কুয়াকাটা থেকে পায়রা পর্যন্ত ২৫ কিমি পাইপলাইন এবং পায়রা থেকে খুলনা পর্যন্ত ১৮০ কিমি পাইপলাইন বসানোর প্রস্তাব দিয়েছে এক্সিলারেট। এক্সিলারেট বলছে, তাদের এফএসআরইউ রাবনাবাদ চ্যানেলের ড্রিজেং কার্যক্রম ও জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটাবে না।
এলএনজি কার্যক্রম তদারকির দায়িত্বে থাকা পেট্রোবাংলার প্রতিষ্ঠান রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানির (আরপিজিসিএল) এক কর্মকর্তা জানান, সামিট ও এক্সিলারেটের কারিগরি প্রস্তাব যাচাই করা হচ্ছে। এর পর আর্থিক প্রস্তাব বিশ্নেষণ করা হবে।
নর্থওয়েস্ট পাওয়ার কোম্পানির (এনডব্লিউপিজিসিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী এএম খোরশেদুল আলম সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, পায়রায় দুই হাজার মেগাওয়াটের এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে প্রথম ধাপে ১২শ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎকেন্দ্র ২০২৩-২৪ সালের মধ্যে উৎপাদনে যাওয়ার কথা। ফলে এলএনজি টার্মিনাল এ সময়ের মধ্যে স্থাপন হলে প্রকল্পের কাজ যথাসময়ে বাস্তবায়ন সম্ভব হবে।
মহেশখালীতে নতুন টার্মিনাল :বর্তমানে মহেশখালীর গভীর সমুদ্রে দুটি এফএসআরইউ রয়েছে। এর একটি সামিটের, অন্যটি এক্সিলারেটের। সরকার মহেশখালীতে আরেকটি এফএসআরইউ বসাতে চায়। মাতারবাড়ীতে নির্মাণাধীন কোল পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানির (সিপিজিসিবিএল) কয়লা জেটি ও চ্যানেল ব্যবহার করে একটি এফএসআরইউ বসানোর প্রস্তাব দিয়েছে সামিট। এ জন্য চ্যানেলের কোনো উন্নয়ন প্রয়োজন হলে তাতে সামিট বিনিয়োগ করবে। তবে সংশ্নিষ্টরা বলছেন, কয়লার জেটি ও চ্যানেল ঘিরে এফএসআরইউ গড়ে উঠলে তাতে কয়লা আমদানি কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানিবিষয়ক উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী সামিটের প্রস্তাব নিয়ে সিপিজিসিবিএল এবং চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনার পরামর্শ দিয়েছেন জ্বালানি বিভাগকে। মাতারবাড়ীর উন্নয়নকাজের সহযোগী জাইকা সামিটের প্রস্তাবে একমত নয় বলে সূত্র জানিয়েছে।
এদিকে এক্সিলারেট এনার্জি তাদের বিদ্যমান টার্মিনাল বদলিয়ে নতুন এফএসআরইউ বসানোর প্রস্তাব দিয়েছে, যার স্টোরেজ ক্ষমতা এক লাখ ৫১ হাজার ঘনমিটার হবে। বর্তমান এফএসআরইউর স্টোরেজের ক্ষমতা ১ লাখ ৩৮ হাজার ঘনমিটার। আর দৈনিক রিগ্যাসিফিকেশন ক্ষমতা ৫০ কোটি ঘনমিটার থেকে বেড়ে ৭০ ঘনমিটার হবে।
স্থলভাগের এলএনজি টার্মিনাল :আবহাওয়া খারাপ হলে সাগরে ভাসমান টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ বিঘ্নিত হয়। তাই স্থলভাগে এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ রয়েছে সরকারের। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দ্রুত এ প্রকল্প বাস্তবায়নের নির্দেশনা দিয়েছেন। তিন বছর আগে দরপত্র ডেকেও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া থেমে আছে। কারণ দেশের জ্বালানি-বিদ্যুৎ খাতের প্রভাবশালী একটি কোম্পানি ওই দর প্রক্রিয়ার প্রাথমিক তালিকায় পেছনের দিকে পড়ে যায়। এর পর থেকে দর প্রক্রিয়া থমকে যায়। আরপিজিসিএল সূত্র জানায়, আটটি কোম্পানির সংক্ষিপ্ত তালিকা করা হয়েছে। সামনে তাদের কাছ থেকে প্রস্তাব নেওয়া হবে।
এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প :এলএনজিভিত্তিক দুই হাজার ৭৬৫ মেগাওয়াটের ৪টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণকাজ চলছে। এর মধ্যে একটি দ্বৈত জ্বালানির। এ ছাড়া ২০৩০ সালের মধ্যে আট হাজার ২৭৫ মেগাওয়াটের মোট ৯টি এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।

এই সংবাদটি 1,226 বার পড়া হয়েছে

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •