বাল্যকালীন স্মৃতি ও ফোবিয়া

প্রকাশিত:রবিবার, ২৬ সেপ্টে ২০২১ ০২:০৯

বাল্যকালীন স্মৃতি ও ফোবিয়া
সৈয়দ শওকত আলীঃ 
বৈকালে হাঁটছিলেম, সামনে দেখি এক মা তার ২ আণ্ডাবাচ্চা নিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে একটি গ্যাদা বড়ই সুশীল, মায়ের আঙুল ধরে চুপচাপ হাঁটছে। আরেক গ্যাদা বড়ই উচাটন, বার বার মায়ের লাগাম হতে ছুটে এদিক ওদিক লম্ফঝম্ফ করছে। একে সামাল দিতে মা হিমশিম খাচ্ছে।
শুনলুম মা দুষ্ট ছানাকে বলছে- আমার আঙুল ছাইড়া বারে বারে এদিক সেদিক গেলে তরে আসমান থাইকা পঙ্খীরাজ ঘোড়া নাইমা আইসা তুইলা নিয়া যাইব। বন্দী কইরা রাখব। আর কখনো ছাড়ব না। তুই আর আমাগো মুখ দেখবি না।
তাই না শুনে দুষ্ট ছানা আতংকে ভয়ে ভেউ ভেউ করে কান্না শুরু করল, সেই কান্না আর কিছুতেই থামে না। আমি যতক্ষণ ওদের আশেপাশে ছিলেম, দুষ্ট ছানা ভয়ার্ত চিৎকারে এলাকা মাথায় তুলে রেখেছিল।
আমার তখন কিছু কাহানী মনে পড়ে যায়, যা নিয়ে কিছুদিন পূর্বে কিছু স্টাডি করেছিলেম।
গায়িকা Adele ছোট থাকতে একদা সৈকতে আইসক্রিম চুষতে চুষতে রোদে চান করছিলেন। তখন এক seagull পংখী উড়ে এসে তাকে আঁচড়ে কামড়ে আইসক্রিম ডাকাতি করে নিয়ে চম্পট দেয়। শিশুর জন্য ব্যাপারটা ভীতিকর ছিল এবং তিনি সেই স্মৃতির দরুন বড় হয়েও seagull এর ভয়ে পারতপক্ষে আর সী-বীচ মাড়ান না।
টুইলাইট সহ অনেক মুভির নায়িকা ক্রিস্টেন স্টুয়ার্টকে বাল্যকালে ঘোড়ার পিঠে চড়িয়ে দেয়া হয়। ঘোড়া গা ঝাড়া দিয়ে তাকে ভূপাতিত করলে তার হাত ভেঙে যায়। সেই কষ্টকর স্মৃতির দরুন তিনি এখনো ঘোড়া দেখলে পলায়নের পায়তারা কষেন।
অপরাহ উইনফ্রের বাল্যকালে তার ঠাকুমা দিবানিশি চুইংগাম চিবাত এবং তারপর সেগুলো মুখ থেকে বের করে সারি বেঁধে টেবিল ও বিছানায় সেঁটে রাখত। এই ঘৃণ্য বিতৃষ্ণাকর দৃশ্য দেখতে দেখতে তার মধ্যে তীব্র চুইংগাম ভীতি সৃষ্টি হয় যা এখনো বিরাজমান এবং তার সহকর্মীদের সাথে নিয়মিত ঝগড়ার কারণ।
অভিনেত্রী স্কারলেট জোহানসেন একদা নিদ্রাভঙ্গ হয়ে তার মুখমণ্ডলে সানন্দে বিচরণরত একটি তেলাপোকা আবিষ্কার করলে পর তার মধ্যে আজীবনের জন্য তেলাপোকা ভীতি সৃষ্টি হয়। (ঘটনাক্রমে এহেন অভিজ্ঞতা আমারো আছে। তেলাপোকা সর্বভুক। আমার মশারিবিহীন নিদ্রার সুযোগ নিয়ে একবার ঠোঁট ও আরেকবার আঙ্গুল ভক্ষণরত অবস্থায় হাতেনাতে ধরা পড়ায় আমি তেলাপোকাকে হাত দিয়ে পিষে দিয়েছিনু)
আলেক্সান্ডার দ্য গ্রেইট, জুলিয়াস সিজার, চেংগিস খান, নেপোলিয়ন, হিটলার, মুসোলিনির মতো নিষ্ঠুর মানবহন্তারক বীর বাহাদুর বা স্বৈরাচারীরা বিলাই এর ভয়ে কাঁপত।
আমাদের প্রিয় বিখ্যাত সাহিত্যিক নাট্যকার চলচ্চিত্রকার হুমায়ূন আহমেদ মাকড়সার তীব্র ভয়ে আক্রান্ত ছিলেন। উনি তাঁর আত্মজীবনীমূলক একাধিক বইয়ে উল্লেখ করেছেন ব্যাপারটা। টয়লেটে মাকড়সা দেখে জরুরত না সেরেই ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়ে পলায়ন করেছেন অনেকবার। এই ভীতি তাঁর ভাই মু. জাফর ইকবাল এর ও আছে বলে উল্লেখ করেছেন।
অমন অস্বাভাবিক ভয়কে বলে ফোবিয়া। মনস্তত্ত্ববিদদের মতে, অধিকাংশ ফোবিয়া সৃষ্টি হয় অল্প বয়সে, নেতিবাচক কষ্টদায়ক ভীতিকর অভিজ্ঞতার দরুন। এবং পিচ্চিদের বড় হওয়ার সাথে সে ভয়ও বড় হয়, সে যতই জ্ঞানী গুণী বিজ্ঞানী বীর বাহাদুর হোক না কেন, সে ভয় থেকে আজীবন বেরিয়ে আসতে পারে না অধিকাংশই। এবং ফোবিয়ার কারণে দৈনন্দিন জীবন যাপন বড়ই বাধাগ্রস্ত হয়। সেই তুলনায় বয়স্করা নেতিবাচক অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হলে সাধারণত কাটিয়ে উঠতে পারে।
ব্যাপারটা অনেকটা মাটির জিনিস বানানোর মতো। মাটি নরম থাকা অবস্থায় তাকে ইচ্ছামতো আকৃতি দেয়া যায় কিন্তু মাটি পুড়ে শক্ত হয়ে যাওয়ার পর আকৃতি পরিবর্তন সুকঠিন।
কাজেই পিচ্চিদের অমূলক ভয় দেখানো বা অতিরিক্ত শাস্তি দেয়া খুবই অনুচিত। মানসিকভাবে অথর্ব হয়ে পড়তে পারে। আমি ঐ মাকে বললাম- আপনে কইতে পারতেন চুপচাপ হাত ধইরা হাঁটলে তরে চলকেট দিমু খেলনা দিমু।
মা কিঞ্চিৎ লজ্জা পেয়ে হাসলেন। বললেন- আর ভুল অইব না।
লেখকঃ চিকিৎসক ও কলামিস্ট, ঢাকা

এই সংবাদটি 1,250 বার পড়া হয়েছে

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •