ভূমি ক্ষয়ে বিলিন হচ্ছে কুয়াকাটা সৈকত

প্রকাশিত:মঙ্গলবার, ২১ জুলা ২০২০ ০৩:০৭

ভূমি ক্ষয়ে বিলিন হচ্ছে কুয়াকাটা সৈকত

কুয়াকাটা (পটুয়াখালী) :
দেশের অন্যতম সমুদ্র সৈকত কুয়াকাটা সমুদ্রের কড়াল গ্রাসে ক্রমশই ছোট হয়ে আসছে ভূ-ভাগ। প্রতিবছর বালু ক্ষয়ে ছোট হয়ে আসছে কুয়াকাটার ভূ-ভাগের মানচিত্র। সূর্যোদয় সূর্যাস্তের বেলাভূমি কুয়াকাটা হারাতে বসেছে তার রুপ সৌন্দর্য ও জৌলুস। প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে অমাবস্যা ও পূর্ণিমার জোঁ’তে সাগরে সৃষ্টি হয় প্রকান্ড ঢেউ। ঢেউয়ের ঝাঁপটায় সৈকতের বালু সরে গিয়ে ভূতুরে সৈকতের সৃষ্টি হচ্ছে। বালু ক্ষয়ের কারনে ঝুঁিকতে রয়েছে সৈকতের ট্যুরিজম পার্ক,কুয়াকাটা দাখিল মাদ্রাসা পয়েন্ট,মসজিদ মন্দিরসহ জিরো পয়েন্টে থাকা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। বিলীন হয়ে গেছে সংরক্ষিত বনাঞ্চলসহ অনেক স্থাপণা। সৈকতের পশ্চিমাংশে চায়না সিকো কোম্পানী বেরীঁবাধ এর সংস্কার কাজ শুরু করলেও তা চলছে কচ্ছপ গতিতে। কবে নাগাত এ কাজ শেষ হবে তা বলতে পারছে না কেউ। কুয়াকাটায় পর্যটন খাতে বিনিয়োগকারীরা দূঃসচিন্তায় পরেছেন। প্রতিনিয়ত সৈকতের ভূমি ক্ষয়ে ছোট হয়ে আসছে ভূ-ভাগ। ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে সৈকত লাগোয়া আবাসিক হোটেল ও পর্যটনমুখী ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষ জিও টিউব ও বস্তা ফেলে সৈকত রক্ষার চেষ্টা করলেও তা যুগোপোযোগী নয় বলে স্থানীয়দের অভিমত। জিও টিউব ও বস্তা দিয়ে সাময়িকভাবে কিছুটা কাজে আসলেও দীর্ঘ মেয়াদী কোন কাজে আসছে না এসব প্রকল্প।
স্থানীয় মানুষ সৈকত রক্ষায় গ্রোঁেয়ন বাধঁসহ মেরিন ড্রাইভ রাস্তা নির্মানের দাবিতে এর আগে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে আসলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে উদাসীন। পাউবো কর্তৃপক্ষ বলছে সার্ভে চলছে উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের এবিষয়ে জানানো হয়েছে। কবে নাগাত এ সার্ভে শেষ হবে তা সঠিক ভাবে বলতে পারছেন না পাউবো।
জোয়ারের সময় সৈকতে পর্যটকরা পদচারনা করতে পারছে না। সমুদ্রের ঢেউ এসে আচঁড়ে পড়ছে। দাড়ানোর জায়গাটুকু নেই। ভূমি ক্ষয়ের কবলে সৈকতের বালু সরে গিয়ে সমুদ্রের মাঝে চর পড়ছে। পুরানো কোন চিহ্ন নেই নন্দিত স্থান এ সৈকতের। এ ভাঙ্গনের কবলে পরে পর্যটকদের গুরুত্বপূর্ণ দর্শনীয় স্থান বিলীন হয়ে গেছে। যার মধ্যে সৈকত লাগোয়া ফয়েজ মিয়ার ঐতিহ্যবাহী নারিকেল বাগান, জাতীয় উদ্যান ও সংরক্ষিত বনাঞ্চল অন্যতম ।
গত ত্রিশ বছর ব্যবধানে প্রায় দেড় কিলোমিটার ভূ-ভাগ সমুদ্র গর্ভে চলে গেছে। বালুক্ষয়ের কবলে পরে,ঔতিহাসিক রেভিনিউ ডাকবাংলো, সীমানা প্রাচীরসহ বায়ো গ্যাস প্লান্টসহ সরকারী বেসরকারী অনেক স্থাপণাই এখন শুধুই স্মৃতি।
অপর দিকে সৈকত লাগোয়া ফয়েজ মিয়ার নারিকেল বাগান,তালবাগান,শাল বাগান,৩ টি লেক,ঝাউবন ,গঙ্গামতির বন, লেম্বুরবন,ফাতরার বনসহ ম্যানগ্রোভ এবং সংরক্ষিত বন বিলীন হয়ে গেছে অনেক আগেই। সৈকতের ভূ-ভাগের বালুমাটি ঢেউয়ের ঝাপটায় ¯্রােতের তোরে সরে গিয়ে সমুদ্রের মাঝে অসংখ্য ডুবোচরের সৃষ্টি হয়েছে বলে জেলেরা জানান। বিজয়ের চর নামক একটি চর জেগে উঠেছে। সেখানে গাছপালাও বড় হয়ে গেছে। গ্রোঁেয়ন বাধঁ দেয়ার মাধ্যমে ¯্রােতের গতি পরির্বতন করলেই সৈকত রক্ষা পাবে এমনটাই দাবি করছেন স্থানীয় অনেক বাসিন্দারা। সৈকত রক্ষায় স্থায়ী প্রকল্প গ্রহনের উদ্যোগ না নিলে সূর্যোদয় সূর্যাস্তের এই বেলাভূমি কুয়াকাটা অচিরেই নিঃসচিহ্ন হয়ে যাবে বলে স্থানীয়দের আশংকা। দেশী-বিদেশী পর্যটকদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ এ সৈকতটি রক্ষায় দ্রুত পদক্ষেপ নেয়ার দাবী জানান পর্যটকসহ বিনিয়োগকারীরা।
সরেজমিনে সৈকত এলাকা ঘুরে দেখা গেছে যে, প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে অমাবস্যা ও পূর্ণিমার জোঁ’তে সাগর উত্তাল থাকে। সমুদ্রের বিশাল ঢেউ এসে সজোরে আঘাত হানে ভূ-ভাগে। কুয়াকাটা উপকূলীয় এলাকা বালু এলাকা হওয়ায় ঢেউয়ে ঝাপঁটায় বালু সরিয়ে পশ্চিম দিকে মোহনায় নিয়ে যায়। এতে ভূ-ভাগের বিশাল অংশ সমুদ্রে বিলীন হয়ে যায় প্রতিবছর। স্থানীয় ও বিশেষজ্ঞ মতে সাগরের ¯্রােতের গতি পরির্বতনে গোঁেয়ন বাধঁ রক্ষা করতে পারে পর্যটন নগরী কুয়াকাটাকে। গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে তাল গাছ, রেইনট্রি গাছ ও নারিকেল গাছসহ নানা প্রজাতির উদ্ভিদ ঢলে পড়ে সৈকতে। চলতি বর্ষা মৌসুমে ভূ-ভাগের প্রায় ৩০-৪০ফুট ভেঙ্গে সমুদ্র গর্ভে চলে গেছে। এভাবে বালু ক্ষয় অব্যাহত থাকলে অচিরেই বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে আবাসিক এলাকা ও ফসলি জমি বিলীন হবার সম্ভানা রয়েছে।
ঢেউয়ের আঘাতে বিধ্বস্ত সৈকত এলাকা পরিদর্শনকালে স্থানীয় বাসিন্দা ফেরেস্তালী খলিফা (৬০) সহ একাধিক ব্যাক্তি জানান,সাথে ৩৫-৪০ বছর আগে ২-৩ কিলোমিটার দুরে শুটকির ব্যবসা করতেন তিনি। যা এখন সমুদ্রের কড়াল গ্রাসে চলে গেছে। সেখানে এখন ২৫-৩০ফুট পানি। এসব শুধু এখন স্মৃতির পাতায় ভেসে বেড়াচ্ছে।
কুয়াকাটায় বেড়াতে আসা রাশিয়ান সিভিল প্রকৌশলী ইউরা টিউরিয়াজিন (বিদেশী পর্যটক) তার ভষায় বলেন, বালুক্ষয় রোধ করতে সুদীর্ঘ রক্ষা প্রাচীর যথেষ্ট সহায়ক হতে পারে। যেমনটা আমার দেশেও দেখে থাকি।
কুয়াকাটা প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও উন্নয়ন কর্মী শফিকুল আলম বলেন, কুয়াকাটা সৈকত ভাঙ্গন র্দীঘ দিনের সমস্যা। সাগরে সামান্য ভিতরে মাত্র ১.৫ সেন্টি মিটার পানি। গ্রোঁেয়ন বাধেঁর মাধ্যমে রক্ষা পেতে পারে সৈকত। গ্রোয়েন বাধেঁ দিয়ে সাগরের পানির ¯্রােতের গতি পরির্বতন করলে খুব সহজে আমাদের কুয়াকাটার সৈকত রক্ষা হতে পারে। তিনি আরো বলেন,আমি অনেক দেশ ভ্রমন করেছি। যার অনেক প্রমান আমার কছে আছে।
এ বিষয়ে কলাপাড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আবুল খায়ের বলেন, ‘ভারতীয় একটি বিশেষজ্ঞ দল সৈকতের বালুক্ষয় রোধে কাজ করবে বলে আশা করছি। তিনি আরও বলেন, জিও টিউব প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে বালুক্ষয় রোধ করা যেতে পারে। তবে কবে নাগাদ কাজ শুরু হবে তা নিশ্চিত করে বলতে পারছি না।
পটুয়াখালী পাউবো‘র নির্বাহী প্রকৌশলী খান মোহাম্মদ ওয়ালিউজ্জামান বলেন, কুয়াকাটা সৈকত রক্ষার জন্য স্থায়ী ভাবে (টিপিপি) প্লালিং তৈরী করে মন্ত্রনালয়ে পাঠানো হয়েছে। আশা করি দ্রুত ব্যবস্থা হবে।

এই সংবাদটি 1,248 বার পড়া হয়েছে

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •