শায়খুল হাদিস সুরইঘাটি; এক দরবেশ জ্ঞানী 

প্রকাশিত:বুধবার, ১০ ফেব্রু ২০২১ ০৩:০২

শায়খুল হাদিস সুরইঘাটি; এক দরবেশ জ্ঞানী 
 সৈয়দ মবনু ::: 
শায়খুল হাদিস মাওলানা শফিকুল হক সুরইঘাটি; প্রথম সাক্ষাতেই যাঁর প্রতি আমার শ্রদ্ধা এবং প্রেম হয়ে যায়। সেই দু হাজার দুই কিংবা তিন খ্রিস্টাব্দের কথা। সিরাতুনন্নবী (স.) সেমিনার ছিলো কানাইঘাটের একটি কমিউনিটি সেন্টারে। কারা করেছিলো স্মরণ নেই। তবে যারা করেছিলো তারা খুবই তরুন। আমাকে তারা প্রধান আলোচক হিসাবে দাওয়াত করলো। আমিও সম্মতি দিলাম। সেই সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন শায়খুল হাদিস মাওলানা শফিকুল হক সুরইঘাটি। এই তাঁর সাথে প্রথম দেখা। আলোচকদের মধ্যে শুধু মুফতি রশিদ মকবুল ছাড়া অন্য কারো নাম এই মুহুর্তে স্মরণ হচ্ছে না। মুফতি রশিদ মকবুল আমার তালতো বোনের স্বামী, তাই ভুলার সুযোগ নেই। প্রধান আলোচক, তাই সবার শেষ বক্তা। আমি প্রস্তুত হয়ে গিয়েছিলাম হযরত রাসুল (স.)-এর সিরাত নিয়ে কিছু কথা বলবো। কিন্তু সেমিনারের আয়োজকরা বললেন, ‘কানাইঘাটে একটি অপপ্রচার রয়েছে, আমি দেওবন্দ বিরোধী। আমাকে প্রধান আলোচক করায় দেওবন্দ ঘরানার অনেকে প্রতিবাদ করেছেন।’ তাদের কথা শোনে আমি আমার আলোচনার বিষবস্তুতে একটু পরিবর্তন করে মনে মনে ভাবলাম; শুরু করবো জবলে নূরের গারে হেরা থেকে এবং শেষ করবো সাহরাপুরের দেওবন্দ হয়ে বর্তমান উলামায়ে কেরামে এসে। যাতে ভুলও ভাঙে এবং আলোচনাও হয়। আমার আলোচনার মধ্যেই আছরের আজান হয়ে যায়। আমি নামাজের আগেই সংক্ষেপ করে শেষ করি। নামাজ শেষে সভাপতির বক্তব্য এবং দোয়া। শায়খুল হাদিস মাওলানা শফিকুল হক সুরইঘাটি নামাজ শেষে মঞ্চে এসে তাঁর বক্তব্যের সময়টুকু আমাকে দিয়ে দিলেন। আমি লজ্জিত হয়ে বললাম, হুজুর আমরা তো আপনার বক্তব্য এবং দোয়া নিতে অতি আগ্রহী। তিনি বললেন, তোমার কথা তো গুরুত্বপূর্ণ আজকের তরুণ সমাজের জন্য। তুমি কথাকে শেষ করো ইতমিনানের সাথে। আমি হযরতের নির্দেশে আবার মাইকে গিয়ে কথা শুরু করলাম। কিন্তু আগের মতো আর গতি তৈরি করতে পারলাম না। তবু কিছু কথা বললাম। বিশেষ করে কানাইঘাটের আলেমদের উদ্দেশ্যে বললাম, আল্লামা মুশাহিদ বাইমপুরী (র.)-এর মতো জ্ঞানী মানুষ যে এলাকায় জন্ম সেই এলাকা কেন অনেক ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকবে? হয়তো অনেকেই স্বীকার করবেন না যে তারা পিছিয়ে আছেন। কিন্তু আজও আল্লামা মুশাহিদ বাইমপুরী (র.)-এর একটি জীবনীগ্রন্থ প্রকাশ করা সম্ভব হলো না, তা কি প্রমাণ করে না যে এই এলাকা চিন্তার দিকে অনেক পিছিয়ে? যারা আল্লামা মুশাহিদ বাইমপুরী (র.) কে দেখেছেন তারা চলে গেলে আর প্রকৃত ইতিহাস পাওয়া যাবে না, তাই যত দ্রুত সম্ভব সেই উদ্যোগ নিতে হবে। বক্তব্য শেষে এসে শায়খুল হাদিস মাওলানা শফিকুল হক সুরইঘাটির পাশে বসলে তিনি আমার জন্য দোয়া করলেন। অতঃপর কিছু নসিহত করে দোয়া শুরু করলেন। সেদিনের পর প্রায় আটারো বছর চলে যায় শায়খুল হাদিস মাওলানা শফিকুল হক সুরইঘাটির সাথে আমার দেখা নেই। তবে সেই এলাকার কাউকে পেলে জিজ্ঞাস করি; তিনি কেমন আছেন?
৮ ফেব্রæয়ারি ২০২১ ছিলো সুরইঘাট মাদরাসার বার্ষিক ওয়াজ। এই মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা শায়খুল হাদিস মাওলানা শফিকুল হক সুরইঘাটি। ওয়াজে প্রধান অতিথি তাঁরই ছাত্র, বাংলাদেশ ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উপ-পরিচালক শায়খুল হাদিস ড. মুশতাক আহমদ। ড. মুশতাক সাহেবের সাথে আমার বেশ ঘণিষ্ট সম্পর্ক রয়েছে। তিনি সিলেট পৌঁছার আগেই আমাদের প্রিয় হাফিজ মাওলানা আব্দুল হাই মাসুমকে জানিয়ে দিলেন তাঁর আগমনের কথা আমাকে জানাতে। মাসুম ফোন দিলে আমি বললাম, দিনে হয়তো দেখা হবে না। তবে কোম্পানিগঞ্জ থেকে সুরইঘাট যাওয়ার পথ যেহেতু আমাদের বাসার সামন দিয়ে তাই দেখা হতে পারে। মাসুম বললো, আপনিও আমাদের সাথে সুরইঘাট যাবেন। আমি বললাম, এটা কি তোমার নির্দেশ, না ড. মুশতাক সাহেবের? সে বললো, শায়খের কথা হলো আপনার যদি সময় থাকে তবে সাথে যাবেন, নতুবা রাতে ফিরে দেখা হবে। ড. মুশতাক সাহেব সিলেট যদি রাতে থাকেন তবে আমার বাসায়ই থাকবেন, তা স্বাভাবিক। আমি তাঁকে বলেছি, এটা আমার বাড়ি নয়, আপনার নিজের মনে করে না বলেও এসে যাবেন। তিনি বয়সে আমার দশ বছরের বড় হলোও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তিনি নিজেই তৈরি করে নিয়েছেন।
কোম্পানিগঞ্জ থেকে যাওয়ার পথে তারা আমাদের বাসার সামন থেকে আমাকে উঠিয়ে নিলেন। আমার খুব খুশি লাগছে, আমার একজন প্রিয় জ্ঞানী মানুষকে অনেকদিন পর দেখতে পাবো। ড. মুশতাক আমাকে বললেন, ‘মবনু ভাই; হুজুর যখন মালিবাগে ছিলেন তখনতো তিনি অনেক ইয়াং। কিন্তু তাঁর দিকে চাইলেই মনে হতো একজন মুখলিস মানুষ। আজকে আমার খুব আনন্দ লাগছে, দীর্ঘদিন পর আমার প্রিয় উস্তাদকে দেখতে পাবো।’ প্রকৃত অর্থে আজ আমরা দুজনই আনন্দিত একজন ভালো মানুষ, একজন দরবেশ জ্ঞানীকে দেখতে পাবো বলে। রাত সাড়ে দশটায় আমরা সুরইঘাট মাদরাসায় পৌঁছি। ওয়াইটিং রোমে হযরতের সাথে আমাদের দেখা হয়। আমি তাঁর সাথে মোসাফা করার সময় সুরইঘাট মাদরাসার শিক্ষক মুফতি রেজাউল করিম কাসেমি আমার পরিচয় দিলেন। শায়েখ ব্যস্থ হয়েগেলেন আমাকে খাওয়ানোর জন্য। বললাম, আমি ড. মুশতাক সাহেবের সাথে এসেছি। প্রয়োজনে তাঁর সাথে খাওয়া-দাওয়া হবে। তিনি মুফতি রেজাউল করিম কাসেমীকে বললেন, আমাকে চা দিতে। চা আসলো সবার জন্য। আমরা চা পানের ফাঁকে আব্দুল হাই মাসুম একটা ছবি উঠায়। তাঁকে অশেষ ধন্যবাদ। ড. মুশতাক তাসাউফ সম্পর্কে খুব গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখলেন। তাঁর বক্তব্য শেষে এশার জামায়াত হয়। জামায়াত শেষে আমাদেরকে খাওয়ানোর জন্য শায়খুল হাদিস মাওলানা শফিকুল হক সুরইঘাটি আবার ওয়াইটিং রোমে আসেন। আমাদেরকে সাথে নিয়ে নিজেই রওয়ানা দেন খাওয়ার রোমের দিকে। আমি জুতা টিক করতে একটু পিছনে আটকে গেলে তিনি দাঁড়িয়ে যান। তাঁর মতো বুজুর্গ আমার মতো একজন সাধারণ মানুষের জন্য দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন, নিজেই লজ্জিত হলাম। জুতা টিক না করেই দৌঁড়ে এগিয়ে আসি। আসতে আসতে বারবার মনে হলো তিনি শায়খুল হাদিস মাওলানা শফিকুল হক সুরইঘাটি নয়, তিনি মির্জা গালিব কিংবা শায়েখ ইবনে আরাবী। একেবারে বয়সে, পোশাকে, সাদা দাড়িতে একেবারে আরব কিংবা ইরানে দার্শনিকদের মতো মনে হচ্ছে। তাঁর ছেলে জানালেন, বয়স সত্তর বছর। তবে পেসার-ডাইবেটিক্স কিছু নেই। চেহরা থেকে যেন নুর ঝড়ছে। বারবার চেয়ে থাকতে ইচ্ছে করে। তিনি এক ঘরের সামনে এসে দাঁড়িয়েগেলেন। আমিও তাঁর সাথে দাঁড়িয়ে গেলে বললেন, সামনের ঘরে চলে যান, আমার ছেলে আছে। সেখানে গিয়ে আমরা খাওয়া-দাওয়া করলাম। খাওয়া-দাওয়া চলাকালিন সময় তিনি এই রোমে আসেন এবং খবর নেন। শেষ বিদায়ের বেলা তিনি নিজে গাড়ি পর্যন্ত আমাদেরকে এগিয়ে দিলেন। আমাদের গাড়ি ছাড়ার পূর্ব পর্যন্ত তিনি দাঁড়িয়ে থাকলেন।

এই সংবাদটি 1,229 বার পড়া হয়েছে

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •