

সংগ্রাম দত্ত
মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলার ২ নম্বর ভূনবীর ইউনিয়নের শাসন কদমতলা এলাকায় রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন পেট্রোবাংলা কোম্পানির তেলের পাইপলাইনে লিকেজ থেকে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।
মঙ্গলবার (২৩ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যার পর ঘটে যাওয়া এ ঘটনায় অন্তত এক কিলোমিটার এলাকায় আগুন ছড়িয়ে পড়ে। ফায়ার সার্ভিসের চারটি ইউনিটের টানা এক ঘণ্টার প্রচেষ্টায় অবশেষে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে।
ঘটনাপ্রবাহ-
প্রত্যক্ষদর্শী ও ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা যায়, সিলেটের হরিপুর থেকে রশিদপুর হয়ে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়া তেল ও গ্যাসের পাইপলাইন ওই এলাকা দিয়ে গেছে। বিকেল ৩টার দিকে স্থানীয়রা পাইপলাইন থেকে তেল লিক হতে দেখে বিষয়টি পাহারাদারকে জানান। দ্রুত দায়িত্বরতরা দুটি পয়েন্ট বন্ধ করার চেষ্টা করলেও এরই মধ্যে প্রচুর পরিমাণ তেল আশপাশে ছড়িয়ে পড়ে। সন্ধ্যার কিছু পর হঠাৎ লিক হওয়া তেলে আগুন ধরে যায় এবং দ্রুত আশপাশে বিস্তার লাভ করে।
আগুন নিয়ন্ত্রণের লড়াই-
রাত ৯টার দিকে শ্রীমঙ্গল ও মৌলভীবাজার থেকে ফায়ার সার্ভিসের চারটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে। প্রায় এক ঘণ্টার চেষ্টায় রাত ১০টা ২০ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। এ সময় স্থানীয় প্রশাসনের নেতৃত্বে উদ্ধার ও নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
শ্রীমঙ্গল ফায়ার সার্ভিসের ওয়ারহাউজ ইন্সপেক্টর সোলেমান আহমেদ বলেন,“রাত ৯টার দিকে খবর পেয়ে আমরা ঘটনাস্থলে পৌঁছি। চারটি ইউনিট প্রায় এক ঘণ্টার চেষ্টা চালিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়।”
মানবিক ক্ষয়ক্ষতি-
এ ঘটনায় মাছ ধরতে গিয়ে আগুনের কবলে পড়ে গুরুতর দগ্ধ হন ভূনবীর এলাকার বশির মিয়া (৫০) ও তাঁর ছেলে রেদোয়ান (২৪)। প্রাথমিকভাবে তাদের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরে গুরুতর অবস্থায় সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. মৌমিতা জানান, “অগ্নিদ্বগ্ধ অবস্থায় দুইজনকে আনা হয়। প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে দ্রুত সিলেট পাঠানো হয়েছে।”
পরিবেশ ও অর্থনৈতিক ক্ষতি-
তেল ছড়িয়ে পড়ায় এলাকার ছড়া ও জলাশয়ের মাছ মারা যেতে দেখা গেছে। এতে স্থানীয় পরিবেশের ক্ষতি ও জীববৈচিত্র্যের উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় এই গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ নষ্ট হওয়ায় অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণও অনেক বড় হতে পারে।
স্থানীয়রা জানান, অতীতে তেলচোর চক্রের কারণে এমন দুর্ঘটনার নজির রয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, এবারের ঘটনাতেও নাশকতার সম্ভাবনা থাকতে পারে।
প্রশাসনের অবস্থান-
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইসলাম উদ্দিন বলেন,
“ফায়ার সার্ভিসের চারটি ইউনিট প্রায় এক ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। এ ঘটনায় পেট্রোবাংলা ও সেভরন কোম্পানির যৌথ বিশেষজ্ঞ দল তদন্ত করবে। তারা নিরূপণ করবে—কীভাবে লিকেজ হলো, আগুনের সূত্রপাত কোথায় এবং কত টাকার ক্ষতি হয়েছে।”
বর্তমানে ঘটনাস্থলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন রয়েছে এবং পাইপলাইন ঘিরে পাহারাদার জোরদার করা হয়েছে।
উপসংহার-
শ্রীমঙ্গলের এই দুর্ঘটনা আবারও স্মরণ করিয়ে দিল—রাষ্ট্রীয় কৌশলগত সম্পদ ব্যবস্থাপনায় নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণ কতটা জরুরি। শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতিই নয়, মানবিক বিপর্যয় ও পরিবেশ ধ্বংসের ঝুঁকি এ ধরনের ঘটনায় বাড়ছে বহুগুণে। যথাযথ তদন্ত ও কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণই কেবল ভবিষ্যতে এ ধরনের ভয়াবহতা রোধ করতে পারে।