সমাজে ভিলেজ পলিটিক্সের কুপ্রভাব

প্রকাশিত:শনিবার, ১২ ডিসে ২০২০ ০৩:১২

সমাজে ভিলেজ পলিটিক্সের কুপ্রভাব

সমাজের প্রতিটি কর্মকাণ্ড ভিলেজ পলিটিক্সকে ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে। ভিলেজ পলিটিক্স শব্দের অর্থ মূলত গ্রাম্য রাজনীতি হলেও আমরা শব্দটিকে নেতিবাচক অর্থে ব্যবহার করি। সামগ্রিক অর্থে শুধু ভিলেজ পলিটিক্স নয় বরং পলিটিক্স শব্দটি আমাদের সামাজে আজকাল একটু নেতিবাচক অর্থে ব্যবহার করে থাকি। পারিবারিক বা সামাজিক কোনো বিতর্কিত বিষয়ে আমরা হরহামেশা বলে থাকি— আমার সঙ্গে পলিটিক্স করবি না। তবে ভিলেজ পলিটিক্স শব্দটি একটু বেশি কুটিলতা অর্থে সমাজে এখন ব্যবহৃত হচ্ছে। এই ভিলেজ পলেটিক্সের কোনো কিতাবি সংজ্ঞা কোথায় পাওয়া যায় না। এর নির্দিষ্টভাবেভাবে গতিপ্রকৃতি নেই। গুণগত মানের দিক থেকে এটি নিম্নমানের। সাধারণত গ্রামের প্রভাবশালী, ক্ষমতাধর, বংশীয় পেশি শক্তি যাদের বেশি, ও আর্থিকভাবে সচ্ছল ব্যক্তিরা এই রাজনীতির চর্চা করে থাকে। এ ধরনের রাজনীতির কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম-নীতি, রাজনৈতিক দর্শন ও নথিপত্রের প্রয়োজন হয় না। এই রাজনীতি মূলত কান-কথার উপর নির্ভর করে প্রচলিত হয়। আমাদের মানসপটে যে নির্জন ছায়া নিবিড় শান্ত পরিবেশের গ্রামের কথা ভেসে ওঠে তার সঙ্গে এই রাজনীতি বড়ই বেমানান।

বর্তমান সমাজে এর জাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছে সাধারণ মানুষ। গ্রামে সালিশ আগের তুলনায় অনেকটা ভিন্নরূপ ধারণ করেছে। কান-কথার ওপর নির্ভর করে মাতব্বর যে সিদ্ধান্ত দেয় তার বিরোধিতা করার কোনো উপায় থাকে না। বিরোধিতা করলে সামাজিকভাবে অপমান, জুতা পেটা, এক ঘরে বা শারীরিকভাবে নির্যাতনের শিকার হতে হয়। ভিলেজ পলিটিক্সের ফাঁদে পড়ে অনেকে নিঃস্ব হয়েছেন। এমনকি অনেককে গ্রাম পর্যন্ত ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে। ক্ষমতার দাপটে আজ কোণঠাসা গ্রামের প্রবীণরাও। কেউ প্রতিবাদ করতে গেলেই উল্টো বিপদে পড়তে হয় পদে পদে। নিরীহ মানুষ এমন ভোগান্তির বেশি শিকার হচ্ছে। স্বার্থপরতা, পক্ষপাতিত্ব, রাজনৈতিক প্রভাব, পেশিশক্তির প্রভাব, অনৈতিক অর্থনৈতিক লেনদেন এখন যেন মহামারী আকার ধরন করেছে। একসময় যে সামাজিক কর্মকা-গুলো নিরপেক্ষভাবে প্রচলিত হতো এখন তা রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা জনসেবা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়েছে। রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার মাত্রা বাড়িয়ে দিয়ে দলীয় আনুগত্যের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়েছে। ফলে স্থানীয় পর্যায়ে নেতৃত্বের অন্তর্দ্বন্দ্ব বৃদ্ধি পেয়েছে।

সামাজিক নেতৃত্বে হচ্ছে পালাবদল। প্রবীণদের চেয়ে নবীনদের প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। তারা সামাজিক দায়বদ্ধতার চেয়ে নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় বিভিন্ন অনৈতিক লেনদেনে জড়িয়ে পড়ছে। ফলে সামাজিক সালিশের ওপরে গ্রামের মানুষের আস্থার সংকট সৃষ্টি হয়েছে। ভিলেজ পলিটিক্সের প্যাঁচে পড়ে অনেক নিরীহ মানুষকে জেল-জরিমানা দিতে হচ্ছে। সামাজিকভাবে একে অপরের নামে কুৎসা রটনা তো আছেই। এমনকি মামলায় জেতার জন্য কৌশল প্রতিপক্ষের পরিবারের বা নিজের শিশুসন্তানদের হত্যার মতো ঘটনা ঘটাচ্ছে। এসব নানা কারণে গ্রামীণ সমাজে যে সম্প্রতি ও ভালোবাসার বন্ধনে বসবাস ছিল তা প্রায় হারাতে বসেছে। গ্রামের মানুষগুলোর মধ্যেও শহরের রাজনীতির চেয়েও কুটিলতা কুবুদ্ধি মানুষের ক্ষতি সাধন করার মানসিকতা সৃষ্টি হয়েছে। তাই সামাজিক সম্প্রীতি, ভালোবাসা এবং সবার মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ সৃষ্টিতে পারিবারিকভাবে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। গ্রামীণ সমাজে প্রবীণদের যথাযথ সম্মান ও মর্যাদা দিতে হবে। একে অপরের সুখে দুঃখে পাশে দাঁড়ানোর জন্য সবাইকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। যেন ভিলেজ পলিটিক্সের জাঁতাকলে পড়ে আর একটি পরিবারও যেন নিঃস্ব না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

এই সংবাদটি 1,237 বার পড়া হয়েছে

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •