সময় অসময় ১৪

প্রকাশিত:রবিবার, ৩০ মে ২০২১ ০৫:০৫

সময় অসময় ১৪

মীর লিয়াকত::

মাত্র রমজান শেষ হলো আর সেই সাথে উদযাপিত হলো পবিত্র ঈদুল ফিতর। আমরা পেছনে ফেলে এসেছি পবিত্র রমজানের একটি মাস। যারা নিয়ম মাফিক প্রতিবছর এই কঠিন সাধনাটি পালন করেন নিশ্চই তারা গভীর প্রশান্তির সাথে মানসিক শারীরিক বহু বিষয় উপলব্দি করতে পারছেন। মূলতঃ আল্লাহ্ তার বান্দাদের এই মাসের সাধনার কারনে স্বীয় অনুগ্রহ বিতরন করেন। এখন আমরা যদি তা নির্দেশ মতো নিতে জানি না, আর নানা ভুল যুক্তি দেখিয়ে মহান আল্লাকে অস্বীকার করে চলি তাহরে তো আমাদের জীবন নানা দূর্বিপাকে সয়লাব হবেই। বর্তমান বৈশি^ক অতিমারীর দিকে লক্ষ্য করলেই আমরা তা স্পষ্টভাবে উপলব্দি করে নিতে পারি।
প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের জন্য আমরাই দায়ী। আল্লাহ নির্ধারিত পথে না চলে আমরা বিপরীত পথ অবলম্বন করে চলি।  পাহাড়-পর্বত কেটে ফেলি, বন জঙ্গল সাবাড় করি, বৃক্ষ ইচ্ছামতো কর্তন করি, অশ্লীলভাবে চলাফেরা করি, কুরআনিক নির্দেশনাকে অবজ্ঞা করি, হিংসামিথ্যাকে প্রতিষ্ঠিত করতে প্রাণহানি ঘটাই, স্বাস্থ্যের সচেতনাকে এড়িয়ে চলি, সামাজিক নিয়মকানুনকে ভিন্ন পথে নিতে কাজ করি! বৈশি^ক বিপর্যয় এসব কারনেই আমাদের ওপর খর্গ হয়ে নেমে আসে। আশরাফুল মখলুকাত মানুষকে আল্লাহ বিভিন্নভাবে তাঁর অষেষ রহমত বরকত রহম দিয়ে সাজিয়েছেন। আমরা যদি তার বিপরীতে কাজ করি তাহলে আমাদের শুদ্ধপথে অবস্থান নেয়া কি করে হবে?
যাক আমার আজকের এই লেখা পবিত্র রমজানকে নিয়ে। তাই আর সেই প্রসঙ্গে যাবো না।
মুসলিমরা রোজা রাখলে তাকে বলা হয় ‘সিয়াম’।
হিন্দু বা বৌদ্ধরা না খেয়ে থাকলে তাকে বলা হয় ‘ উপবাস ’ ।
খ্রিস্টানরা না খেয়ে থাকলে তাকে বলা হয় ‘’ফাস্টিং’ । বিপ্লবীরা না খেয়ে থাকলে তাকে বলা হয় ‘’অনশন’ । আর, মেডিক্যাল সাইন্সে উপবাস করলে তাকে বলা হয় অটোফেজি’ । খুব বেশি দিন হয়নি, মেডিক্যাল সাইন্স ‘ অটোফেজি’র সাথে পরিচিত হয়েছে । সবাই জানেন ২০১৬ সালে নোবেল কমিটি জাপানের ডাক্তার ‘ওশিনরি ওসুমি ’-কে অটোফেজি আবিষ্কারের জন্যে পুরষ্কার দেন । এরপর থেকে আধুনিক মানুষেরা ব্যাপকভাবে উপবাস করতে শুরু করেন।
যাই হোক, এখন দেখা যাক ‘ অঁঃড়ঢ়যধমু ‘ কি.? অঁঃড়ঢ়যধমু শব্দটি একটি গ্রিক শব্দ । অঁঃড় অর্থ নিজে নিজে, এবং চযধমু অর্থ খাওয়া । সুতরাং , অটোফেজি মানে নিজে নিজেকে খাওয়া । না, মেডিক্যাল সাইন্স নিজের মাংস নিজে খেতে বলে না । শরীরের কোষগুলো বাইরে থেকে কোনো খাবার না পেয়ে নিজেই যখন নিজের অসুস্থ কোষগুলো খেতে শুরু করে , তখন মেডিক্যাল সাইন্সের ভাষায় তাকেই অটোফেজি বলা হয় । আরেকটু সহজভাবে বলা যায়।
আমাদের ঘরে যেমন ডাস্টবিন থাকে , অথবা আমাদের কম্পিউটারে যেমন রিসাইকেল বিন থাকে, তেমনি আমাদের শরীরের প্রতিটি কোষের মাঝেও একটি করে ডাস্টবিন আছে । সারা বছর শরীরের কোষগুলো খুব ব্যস্ত থাকার কারণে, ডাস্টবিন পরিষ্কার করার সময় পায় না। ফলে, কোষগুলোতে অনেক আবর্জনা ও ময়লা জমে যায় ।
শরীরের কোষগুলো যদি নিয়মিত তাদের ডাস্টবিন পরিষ্কার করতে না পারে , তাহলে কোষগুলো একসময় নিষ্ক্রিয় হয়ে শরীরে বিভিন্ন প্রকারের রোগের উৎপন্ন করে । ক্যান্সার বা ডায়াবেটিসের মতন অনেক বড় বড় রোগের শুরু হয় এখান থেকেই। মানুষ যখন খালি পেটে থাকে, তখন শরীরের কোষগুলো অনেকটা বেকার হয়ে পড়ে। কিন্তু তারা তো আর আমাদের মত অলস হয়ে বসে থাকে না , তাই প্রতিটি কোষ তার ভিতরের আবর্জনা ও ময়লাগুলো পরিষ্কার করতে শুরু করে দেয় ।
কোষগুলোর আমাদের মতন আবর্জনা ফেলার জায়গা নেই বলে তারা নিজের আবর্জনা নিজেই খেয়ে ফেলে। মেডিক্যাল সাইন্সে এই পদ্ধতিকে বলা হয় অটোফেজি । শুধুমাত্র এই জিনিসটা আবিষ্কার করেই জাপানের ওশিনরি ওসুমি (ণড়ংযরহড়ৎর ঙযংঁসর) ২০১৬ সালে নোবেল পুরস্কারটা নিয়ে গেলেন । তিনি আবিষ্কার করেন যে ১২-২৪ ঘন্টা রোজা রাখলে মানুষের দেহে অটোফেযি চালু হয়। তিনি প্রমান করেন যে, রোজা রাখার মাধ্যমে মানুষের নিম্ন লিখিত উপকার গুলো হয়-
১। দেহের সেল পরিস্কার হয়।
২। ক্যান্সার সেল ধ্বংস হয়।
৩। পাকস্থলীর প্রদাহ সেরে যায়।
৪। ব্রেইনের কার্যকরীতা বাড়ায়।
৫। শরীর নিজে নিজেই সেরে যায় (অঁঃড়ঢ়যধুু)
৬। ডায়াবেটিস ভালো হয়।
৭। বার্ধক্য রোধ করা যায়।
৮। স্থূলতা দূর হয়।
৯। দীর্ঘ জীবন লাভ করা যায়।
কিন্তু মুল বিষয়ের প্রতি আলোকপাত করলে কি পাওয়া যায়?  যখনি বিজ্ঞান অসহায় হয় তখনি বিজ্ঞানকে কুরআনের কাছে ছুটে আসতে হয়। এসব আবিস্কৃত হয়েছে হবে, কিন্তু ষোল শ’বছর আগে কুরআন তা বলে দিয়েছে। পৃথিবীর এমন কোন কিছু নেই যা কুরআন বলে দেয়নি। নানান কুট কৌশলে, খোঁড়া যুক্তিতে আমরাই কুরআনকে অবহেলা করি, নিজেরাই আবিস্কার করি, নোবেলসহ বড় বড় পুরস্কার পাই। কিন্তু যা নেবার সামনাসামনি হোক কিংবা লুকিয়ে নেয়া হোক নিতে হয় কিন্তু এই কুরআন থেকেই। নিজেদের স্বার্থ সিদ্ধি হবার পর তারা আর কুরআনকে স্বীকার করতে চান না। অথচ এই কুরআনই পরিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা। যারা মানেন তাদের জন্য রয়েছে আল্লাহ’র পুরস্কার আর যারা মানেন না আল্লাহ প্রসঙ্গ এড়িয়ে যেতে চান তাদের জন্য রয়েছে লোক দেখানো পুরস্কার।
বিজ্ঞানীদের যদি এতোই ক্ষমতা থাকে তবে তারা মরে যান কেন? আজীবন জীবিত থাকার বড়ি আবিস্কার করে দেখান না কেন! যতোই আবিস্কার করে নিজেরা ক্রেডিট নেন আল্লাহ নির্ধারিত সময়ে তারা তল্পি তল্পা গুটানোরও সময় পান না। অসহায় হয়ে চোখ বন্ধ করেন চিরতরে।  তাই আমাদের বুঝতে হবে এই জগতের সব কিছুই আল্লাহতায়ালার দয়া করুনা মেহেরবানীর উপর নির্ভরশীল। তাই আল্লাহকে স্মরণে রেখে সব কাজ করে যাওয়াই কি উত্তম নয়? এই সহজ বাক্য যতো তাড়াতড়ি আমরা বুঝতে সক্ষম হবো ততোই হবে আমাদের জন্য মঙ্গল, নয়তো আমাদের কপালে হয়তো আরো বেশি খারাবী এসে দেখা দেবে, এ কথা বলাই বাহুল্য।

এই সংবাদটি 1,234 বার পড়া হয়েছে

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •