সময় অসময় ১৫

প্রকাশিত:বুধবার, ২৩ জুন ২০২১ ১০:০৬

সময় অসময় ১৫

মীর লিয়াকত::     

বিভিন্ন চুটকী গল্প আমাদের মধ্যে চালু আছে। আসলে এগুলোর কোনো সত্যতা বা ভিত্তি নেই তবু এসব অসমর্থিত গল্পের অবতারনা আমরা আমাদের মতোই বিভিন্ন সময় করে থাকি। এরকম গল্পসল্প দিয়েই আজকের লেখা শুরু করতে চাই।
একবার এক আমেরিকান, এক ইউরোপীয়ান ও একজন বাঙালি বিশিষ্ট বিজ্ঞানী বসে কথা বলছিলেন। এরকম অনেক গল্প অবশ্য চালু আছে। ঠিক আছে শুরু যখোন এটা নিয়ে করে ফেলেছি বলেই ফেলি গল্পটা। তিনজনই গবেষনা করছেন আমেরিকার নিউজার্সিতে। ছুটির দিনে তারা অবসর থাকায় চুটিয়ে গল্প করছেন। গল্পে গল্পে আমেরিকান বিজ্ঞানী বললেন
আমাদের দেশে লাষ্ট ইয়ারে একজন আমেরিকান বিজ্ঞানী একটা সুপারসনিক জেট বিমান আবিস্কার করেছেন যেটা একবারে আকাশে লেগে চলতে পারে। এ এক দারুন আবিস্কার, কি বলেন?
ইউরোপিয়ান লাফিয়ে উঠে বললেন,
বলেন কি? আশ্চর্য ব্যাপার! আরে ভাই এরকম যদি আকাশে লেগে চলে তাহলে তো তা চুর্নবিচুর্ণ হয়ে দূর্ঘটনাকবলিত হয়ে মাটিতে পড়বে!
উত্তরে আমেরিকান বিজ্ঞানী হেসে বললেন,
আরে ভাই, এটা তো একটা কথার কথা! তার মানে হলো একটু নীচ দিয়ে যায় আর কি!
বাঙালি বিজ্ঞানী কোন কথা বলছেন না তিনি চুপচাপ বসে শুনছেন। তার মুখাবয়বে কোন চিন্তার রেখাই নেই। একেবারে নির্বিকার। ইউরোপীয়ানই কথা বললেন।
তবে আমাদের দেশে একজন ইউরোপিয়ান বিজ্ঞানী এমন এক সাবমেরিন কয়েকদিন আগে আবিস্কার করেছেন যেটা সরাসরি সাগরের নীচের মাটি ছুঁয়ে যেতে পারে। আর সেই সাথে স্পীড তো আছেই। আর এটা সবাই জানে বিশে^ আমাদের সাবমেরিন মানে আমাদের টোটাল নৌবাহিনীর উপরে আর কোন বাহিনীই হতে পারে না।
এবার আমেরিকান বিজ্ঞানী হো হো করে হেসে উঠলেন, বললেন,
আরে ভাই একি শোনালেন? এটা তো জানি যে ইউরোপিয়ান নৌবাহিনী বিশে^র সেরা। তাই বলে সাবমেরিন সাগরের নীচের মাটি ছুঁয়ে যাবে? সাগরের নীচের মাটি টাচ করার সাথে সাথে নির্ঘাৎ উল্টে যাবে সাবমেরিন।
এসব কথাবার্তা যখোন চলছিলো তখনো বাঙালি বিজ্ঞানী চুপ! মুখে যেন কুলুপ এঁটে বসে আছেন। আমেরিকান ও ইউরোপিয়ান বিজ্ঞানী তা লক্ষ্য করে বললেন,
কি ব্যাপার আপনি যে কিছুই বলছেন না ভাই। কিছু তো বলুন।
আমি শুনছি তো! আমাকে তো কিছু বলতে বলেননি। আমেরিকার বিমানবাহিনী বিশ^সেরা, ইউরোপের নৌবাহিনী বিশ^সেরা এটা কে না জানে? তবে আমাদের দেশে ডাক্তাররা বিশ^সেরা, তা জানেন?
আমেরিকান ও ইউরোপিয়ান দুজনে এক সাথে বললেন,
তাই নাকি! তাহলে বলুন তো আপনাদের এমেজিং কোনো আবিস্কারের কথা?
শুনুন, দেশটা আমাদের ছোট, কিন্তু ঘিলু সবার চেয়ে বেশি। আমাদের গুলিস্তানের ফুলবাড়িয়া বাসস্ট্যান্ডে এক লোক ফুটপাতে বড়ি বিক্রী করে। একটা বড়ি খেলে ১০৮ টা রোগ ২৪ ঘন্টায় ভালো হয়ে যায়।
আবার একসাথে দুজন বলে উঠলেন,
তাই নাকি! নিশ্চই এ বড়ির দাম কয়েক হাজার ডলার।
ডলারের হিসাব তো আর ওরা জানে না। দাম হলো মাত্র এক টাকা। ওখানে গিয়ে ভিড়ের মধ্যে দাঁড়ালেই হাতে হাতে বড়ি পৌঁছে দেয় স্বয়ং ডাক্তার।
আমেরিকান বললেন, কিন্তু ভাই আমাদের প্রসঙ্গ কি ছিলো তা কি আপনি ভুলে গেছেন। আমরা বলেছিলেম আবিস্কারের  কথা। কি আছে বলুন আপনাদের দেশের এমেজিং আবিস্কার।
আরে দাঁড়ান ভাই আপনারা তো দেখলাম হুইস্কি খেয়ে খেয়ে কথা বলছেন। আমার মুখের পানটা একটু  বাগে আসুক। প্রথম পিকটা ফেলেই বলছি।
ঠিক আছে বলুন।
আমাদের ডাক্তার কবিরাজ প্রসঙ্গ কেন আনলাম তা জানেন? আসলে আমরা জুওলজি নিয়ে বেশি চিন্তা করি। আমাদের আবস্কিারও প্রায় ঐ ধাচের।
পান খেয়ে আরেকটু চুন মুখে দিয়ে চিবিয়ে পিক পচাৎ করে ফেলে বাঙালি বিজ্ঞানী বললেন,
আমাদের দেশের সব মানুষ নাক দিয়ে ভাত খায়!
ওরা দুই বিজ্ঞানী হঠাৎ চুপ হয়ে গেলেন। কি বলছে লোকটা। নাক দিয়ে ভাত খায়! মানে কি? বিজ্ঞানের ধান্দায় জীবন কাটিয়ে দেন তারা। কোনদিকে চিন্তা করার সুযোগ তাদের নেই। কিন্তু এমন উদ্ভট কথা তো কখনো শোনেননি। মানুষ কখনো নাক দিয়ে খায়? আমেরিকান বললেন,
কি পাগলের মতো যা নয় তাই বলছেন।
ইউরোপিয়ান বললেন.
নিশ্চই আপনার মাথা খারাপ হয়ে গেছে!
আমি যা বলেছি ঠিক বলেছি। আমি পাগলের মতো কথা বলিনি, বলেছেন আপনারা দুজন।
কিন্তু নাক দিয়ে কিভাবে মানুষে খেতে পারে?
আরে ভাই এটা হলো একটা কথার কথা! ঐ একটুখানি নীচ দিয়ে খায় আর কি! তার মানে মুখ দিয়েই খায়।
কিন্তুÑ
আর কোন কিন্তু নয়। আপনাদের আকাশে লেগে না গিয়ে একটু নীচ দিয়ে সুপারসনিক বিমান যেতে পারে, সাবমেরিন সাগরের নীচে মাটিতে না লেগে একটুখানি উপর দিয়ে যেতে পারে আর আমি একটুখানি নীচ দিয়ে খাবার কথা বলতে আপনাদের আপত্তি?
এটা অনেকটা শোনা গল্প। হয়তো শুনেছেন অনেকেই।
তো এখন যেটা বলছি এটা আমি আর শুনিনি। এখানেও  একজন আমেরিকান একজন ইউরোপিয়ান ও একজন বাঙালির গল্প! এই তিনজনই বিশিষ্ট চিন্তাবিদ। আমেরিকান ভদ্রলোক মাথা চুলকে বললেন,
আমাদের দেশে রাইস থেকে বরফ তৈরী করার পরিকল্পনা হয়েছে। কিন্তু নানা কারনে শুরু করা যাচ্ছে না।
ইউরোপীয়ান চিন্তাবিদ বললেন,
এই গবেষণা তো আমাদের দেশে গত বছর থেকেই চলছে। শুনেছি আংশিক নাকি সফলও হয়েছে তারা।
বাঙালি চিন্তাবিদকে তারা তেমন পাত্তাই দিচ্ছে না দেখে বাঙালি কোন কথাই বললেন না। তাই তিনি কোন কথা না বলে তাদের কথা শুনেই যাচ্ছিলেন। আমেরিকার ভদ্রলোক বললেন,
রাইস নাকি গলানো হয়ে নানান প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এমন বরফ তৈরী হবে যা ৮০ ডিগ্রী তাপেও ৭২ ঘন্টা গলবে না। তবে ইউরোপে আপনি বললেন অনেক এগিয়ে গেছে কিন্তু রেজাল্ট তো জিরো। আমাদের আগেই হয়তো অস্ট্রেলিয়া আবিস্কার করে ফেলবে। ওরা এখন অনেক এগিয়ে। হয়তো অন্যান্য দেশও কাজ করছে রাইস নিয়ে।
ইউরোপীয় চিন্তাবিদ শুনছিলেন, তিনি বাঙালি চিন্তাবিদকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
কি ভাই আপনি যে কথা বলছেন না। আপনাদের দেশ তো ধানে গানে ভরপুর। আপনারাও তো কাজ করতে পারতেন।
এতোক্ষনে সুযোগ পেয়ে বাঙালি বললেন,
দেখেন আমরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ফরমালিন জাতীয় জিনিস নিয়ে কাজ করি। সিম্পল বিষয় নিয়ে আমরা কাজ করি না। এইবার ইউরোপীয় ও আমেরিকান দুজনের ইগোতে লাগলো। তারা বললেন এতো বড় একটা ব্যপারকে সিম্পল বলছেন? উত্তরে বাঙালি বললেন দেখুন সিম্পল নয়তো কি! রাইস থেকে প্রথম অক্ষর আর বাদ দিলেই তো আইস হয়ে যায়। এতো সিম্পল জিনিস নিয়ে আমাদের দেশে গবেষণা হয় না। সবচেয়ে বড় কথা রাইস থেকে বরফ বানানোর দরকারটাই বা কি? এসব উদ্ভট বাজে জিনিস নিয়ে মাথা নষ্ট করার দরকারটাই বা কি? এখানে কোন আউটপুট আছে, আপনারাই বলুন। আমরা দেখুন আঙ্গুরে ফরমালিন দিয়ে মাসখানেক অবিকল রেখে দিতে পারি। পচবেও না রংও বদলাবে না। আপনারা তো সকালে আঙ্গুর আনলে বিকেলেই পচে যায়। যান যান বাড়ি যান আপনাদের গবেষকদের বলুন রাইস থেকে ‘আর’ বাদ দিয়ে অতি সহজেই ‘আইস’ বানিয়ে নিতে। ফালতু এসব নিয়ে চিন্তা করার কোন মানেই হয় না। শুধু শুধু সময়ের অপব্যয়।
ইউরোপীয় ও আমেরিকান চিন্তাবিদদ্বয় কিছুই বলতে পারলেন না। এটা আবার কোন থিওরি! মুখ চাওয়া চাওয়ি করতে করতে তারা উঠে গেলেন। তারা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করতে করতে গেলেন। আসলেই তো ধান চাল থেকে বরফ তৈরীর দরকারটাই বা কি! আর ঐ বাঙালি যেভাবে বলে দিলো তাতে বোঝাই যায় ব্যাপারটা লেস ইম্পরটেন্ট। তারা নিজেরাই ধাঁধাঁয় পড়ে গেলেন।
গল্প গল্পই! বলা হয় এসব বুদ্ধি বাঙালিরা ঠিকই রাখে। এই যে করোনাকাল এ সময়ও এক শ্রেনীর মাথামোটা বুদ্ধিমান বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থা ও দেশের সরকারী বিধিনিষেধ না মেনে নিজেদের বুদ্ধি বলে সামাজিক দুরত্ব মেনে চলা লকডাউনের প্রতি সমর্থন দেখোনোকে ব্যঙ্গ করে কি অবস্থার সৃষ্টি করলো। এটা তারা না করলেই পারতো। পাগলা ঘোড়ার মতো এই যে সংক্রমন বেড়ে চলছে এটা থেকে আমরা অন্তত বড় ক্ষতি থেকে রেহাই পেতে পারতাম। মানুষ নিজে নিজেকে খুব বুদ্ধিমান মনে করে। এতোই বুদ্ধিমান যে বিশে^র আর কেউ যেন তাদের বুদ্ধির ধারে কাছেও নেই। রাইস শব্দের ‘আর’ উঠিয়ে যে ‘আইস’ হয়ে যেতে পারে এই বুদ্ধি তাদের মাথায় আগে এলে সত্যিই বরফের চিন্তা করা যায় কিনা সে চিন্তায় তারা নেই । করোনাকালে মাস্কটা পকেটে ভরে কিংবা গলায় রেখে দিব্যি পথ চলছে। না না অশিক্ষিত নয়, দস্তুর মতো শিক্ষিত মানুষ। পুলিশের গাড়ির সাইরেন শোনার সাথে সাথে মাস্ক চটজলদি পরতে দেখা যায়। আবার গাড়ি চলে গেলে আবার যেই সেই। ফেইসবুকে এরকম কিছু ভাইরাল হওয়া পোষ্ট অহরহ দেখা যায়। যেন অনেকটা ইয়ার্কী তামাশা। মাস্ক যে নিজেকে বিপদ থেকে বাঁচানোর জন্য সে চিন্তা মাথায় না রেখে দৃষ্টি থাকে কখন পুলিশ আসে।
ফেইসবুক পোষ্টে দেখা যায় পুলিশের গাড়ির সাইরেণ বাজা শুনে প্রতিবন্ধীর অভিনয় করতেও দেখা যায়। বলিহারী বুদ্ধি! কিন্তু এই বুদ্ধি খরচ করে লাভটা কার হচ্ছে। একজনকে জিজ্ঞেস করলাম,
ভাই মাস্ক তো আছে কিন্তু এটা ঠিক করে পরেন না কেন? এভাবে নাক মুখ বাইরে রাখলে ভাইরাসকে প্রতিহত করবেন কি করে। ভদ্রলোক বললেন, খুব অসহ্য লাগে। এরকম চলাফেরা করা যায় নাকি বলুন। কথা বলা যায় না, কেনাকাটা করা যায় না। সবচেয়ে বড় কথা পরলেই নাকে মুখে অহেতুক চুলকাতে হয়। তারপর একদিন দুদিন হলে না হয় এক কথা। এটা তো সব সময় পরতে হবে। এটা কি করে সম্ভব?
আমি বললাম,
অভ্যস্থ হয়ে গেলে সমস্যা হবে না।
ভদ্রলোক বললেন,
দেখুন ভাই হায়াতের মালিক যিনি তিনি হুকুম না করলে মরবো না। এতো ভয় পেলে কি আর চলে? এই রোগ এসেছে ইউরোপ আমেরিকার জন্য। ওরা তো পাপী, নেংটা চলে, অশ্লীল কাজ করে। মদ জুয়া নিয়ে থাকে। আমাদের কিছু হবে না।
বললাম,
তবু মাস্ক চশমা চলাফেরার সময় রাখুন এই বিপদের সময়।
ভদ্রলোক বললেন,
আরে ভাই গগলসও আছে। পিপিই মোটরসাইকেলে রেখেছি। খুব গরম লাগে। পুলিশ যন্ত্রনা করলে লাগাবো। যাচ্ছি বিয়ের দাওয়াতে। বললাম পুলিশ তো পিপিই না দেখলে আটকাবে। পুলিশ বুঝে বলবো। কোন পুলিশকে বলতে হয় ফার্মেসীতে যাচ্ছি, কাউকে বলতে হয় হাসপাতাল যাচ্ছি, যখন যেখানে যেভাবে বললে হয়।
ভদ্রলোক মোটরসাইকেল নিয়ে চলে গেলেন, আমি তার গমন পথের দিকে চেয়ে রইলাম। কতো বুদ্ধি বাঙালির। পুলিশকে ঠকাতে পেরে নিজে কি উৎফুল্ল, অথচ নিজের যে সর্বনাশটা করছে সে খেয়ালই করছে না। এতে পুলিশের লাভ না তার লাভ?
অস্বীকারের উপায় নেই, সবাই না হলেও বাঙালির মধ্যে একটা শ্রেনী কিন্তু এমন করেই চলেছে। এদের সংখ্যা কম নয়। জেনে করুক না জেনে করুক তারা কিন্তু করেই চলেছে। এই দুরবস্থা থেকে বেরিয়ে আসা দরকার। অসচেতন অবচেতন যে অবস্থাই হোক না কেন এখান থেকে বেরিয়ে আসতেই হবে। মনে রাখা দরকার বাঙালি ফেলনা জাতি নয়। বাঙালির ঐতিহ্য বিশ^ব্যাপী। গোটা বিশ^ এখন করোনায় জর্জরিত। সব কিছু ফেলে এখন এই বেষ্টনী থেকে যেভাবে হোক বেরিয়ে আসতে হবে। গোঁয়ার গাট্টামী দেখিয়ে অহেতুক বাইরে বেরুনো বন্ধ করতে হবে, স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে। প্রাণহানি রুখতেই হবে। আর এই রুখতে হলেই নিজেকে শুধরাতে হবে। এখন বুদ্ধি একটাই আর তা হলো, বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থা তথা সরকারী নিয়মকানুন মেনে চলতে হবে, নয়তো আমাদের কপালের দূর্ভোগ মোকাবেলা সম্ভব নয়।

এই সংবাদটি 1,246 বার পড়া হয়েছে

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •