সময় অসময় (৭)

প্রকাশিত:শনিবার, ১৭ অক্টো ২০২০ ০১:১০

সময় অসময় (৭)
মীর লিয়াকত :: এমসি কলেজের ধর্ষন কাহিনী এখন আর কারো অজানা নয়। ক্ষমতাসীন দলের  ছাত্র সংগঠনের  এই লজ্জাজনক ঘটনা কালের স্বাক্ষী হয়ে রইলো। কলেজ ছাত্রাবাসে এই সোনার ছাত্ররা গৃহবধু ধর্ষন করে কলেজের সোনালী ইতিহাস করেছে চরমভাবে কলুষিত। দেশেরে জনগন সরকারসহ সবাই এই ঘটনায় মুক ও বধির হয়ে আছেন। মনে হয় যেন এটা মগের মুল্লুক। বন্ধ ছাত্রাবসে এই নারকীয় কান্ড কিভাবে ঘটলো আজ তা ওপেন সিক্রেট।
ষাটের দশকে আমিও ছিলাম এই কলেজেরই ছাত্র। কলেজ ছাত্রাবাসেই কেটেছে দুইটি স্বর্নালী বছর। এখন এই ঘটনার পর লজ্জায় মাথা হেঁট হয়ে আসে। এই কলেজের ছাত্র ছিলেন প্রখ্যাত শিক্ষার্থীবৃন্দ।
আবু তাহের, বীর উত্তম, মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার ও বামপন্থী রাজনীতিবিদ
এম. সাইফুর রহমান, বাংলাদেশের সাবেক অর্থমন্ত্রী
আবুল মাল আবদুল মুহিত, বাংলাদেশের সাবেক অর্থমন্ত্রী
দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ, প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ, দার্শনিক, সাহিত্যিক ও সমালোচক
আলতাফ হোসেইন, সাংবাদিক, পাকিস্তানের শিল্পমন্ত্রী-১৭ আগস্ট ১৯৬৫ – ১৫ মে ১৯৬৮।
নুরুল ইসলাম নাহিদ , বাংলাদেশের সাবেক শিক্ষামন্ত্রী
জয় ভদ্র হগজর, ভারতের সাবেক এমপি ; প্রাক্তন ভেটেরিনারি মন্ত্রী, আসাম সরকার।
নীহার রঞ্জন রায় , বিখ্যাত ঐতিহাসিক
এম এ রশীদ , বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় এর প্রথম উপাচার্য
মোহাম্মদ আতাউল করিম, (জন্ম: ৪ মে, ১৯৫৩) বাংলাদেশী-মার্কিন পদার্থবিজ্ঞানী। যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়ার নরফোকে অবস্থিত ওল্ড ডোমিনিয়ন ইউনিভার্সিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট (গবেষণা) হিসেবে কর্মরত এই বিজ্ঞানী ইলেক্টো-অপটিক্সের গবেষণায় অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে গণ্য। এই আতাউল করিম আমার এক বছরের জুনিয়র ছিলো। আজ সে জগদ্বিখ্যাত। সে বয়ে বয়ে আনতে পারে দেশের জন্য বিশে^র সর্বোচ্চ সম্মান নোবেল পুরস্কার। আগেও একিিধকবার সে নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছিলো।
ব্রিগেডিয়ার আব্দুল মালিক, হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ, জাতীয় অধ্যাপক
খলিল উল্লাহ খান, প্রখ্যাত অভিনেতা।
মুফতি নুরুন্নেছা খাতুন, উদ্ভিদবিজ্ঞানী, শিক্ষক এবং উদ্যানবিদ্যাবিদ।
নীহাররঞ্জন রায়, ইতিহাসবেত্তা, সাহিত্য সমালোচক
ময়নুল হক চৌধুরী , (১৯২৩-১৯৭৬) আসাম মন্ত্রী সভায় প্রভাবশালী মন্ত্রী ছিলেন।
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, গল্পকার সাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক। ১৯৯৬ খ্রিষ্টাব্দে তাকে বাংলা একাডেমি পুরস্কার প্রদান করা হয়।
শানারেই দেবী শানু, অভিনেত্রী ও মডেল, লাক্স-চ্যানেল আই সুপারস্টার মুকুট বিজয়ী।
এতোসব সম্মানী মানুষ জনদের স্মৃতিধন্য এই কলেজকে কোথায় নিয়ে হেলো ছাত্র নামের ওই হায়েনারা। ছি:!
২০১২ সালের ৮ জুলাই যখন এমসি কলেজ হোস্টেল আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হলো তখন অনেকেই মায়াকান্না দেখিয়েছিলেন। কিন্তু আজ পর্যন্ত পুলিশ প্রশাসন এ ব্যাপারে কোন শক্ত ভূমিকা নিতে পারে নাই। এখানে তাদেরও ব্যর্থতা আছে। দুষ্কৃতকারীদের কোন বিচার আজও হয়নি।
এমসি কলেজ হোস্টেল যারা পুড়িয়ে দিয়েছিল তাদের বিরুদ্ধে তখন যদি অ্যাকশন নেয়া হতো তাহলে ৮ বছর পর তাদের উত্তরসুরীরা এমসি কলেজকে ধর্ষিতার রক্তে রঞ্জিত করার সাহস পেতো না।এমসি কলেজের অধ্যক্ষ করোনাকালীন সময়ে হোস্টেলটা কেন যে খোলা রাখলেন এটা তিনিই জানেন। এটা একটা ভুল সিদ্ধান্ত ছিল। যেই ভুলের খেসারত দিতে হলো এক নববধূকে। আসামী সাইফুর দীর্ঘ দিন থেকে ৫ম ছাত্রাবাসের হোস্টেল সুপারের বাসভবন জোর পূর্বক দখল করে অবস্হান করছিল। ঐ ভবন থেকেই পুলিশ অস্ত্র  উদ্ধার করে। হোস্টেল সুপার এ ব্যাপারে প্রশাসনের মাধ্যমে আগে থেকেই শক্ত অবস্হান গ্রহন করা প্রয়োজন ছিল। এখানেই তাঁর ব্যর্থতা। কলেজ প্রশাসন কি ঐ কুলাঙ্গার ছাত্রদের ক্রীড়নক হিসেবে কাজ করছিলো? এই প্রশ্ন এখন স্পষ্টভাবে উঠে আসছে।
কলেজের ইতিহাসটা প্রসঙ্গক্রমে এখানে আলোচনা করার প্রয়াস পাচ্ছি সহৃদয় পাঠকদের জন্য। মুরারিচাঁদ কলেজ ১৮৯২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় তৎকালীন সিলেটের প্রখ্যাত শিক্ষানুরাগী রাজা গিরিশচন্দ্র রায় (১৮৪৫ – ১৯০৮) -এর অনুদানে। কলেজটির নামকরণ করা হয় তার প্রমাতামহ মুরারিচাঁদ এর নামে। পূর্বে কলেজটি সিলেটের বন্দর বাজারের নিকট রাজা জি. সি. উচ্চ বিদ্যালয় এর পাশে অবস্থিত ছিল। ১৮৯১ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কলেজটিতে এফ. এ. ক্লাস খোলার অনুমতি দিলে ১৮৯২ সালের ২৭ জুন আনুষ্ঠানিকভাবে মুরারিচাঁদ কলেজের যাত্রা শুরু হয়। সে সময় ছাত্রদের বেতন ছিল ৪ টাকা এবং ১ম বিভাগে এন্ট্রান্স পাশকৃতদের জন্য বিনা খরচে পড়ার ব্যবস্থা ছিল।
১৮৯২ সাল থেকে ১৯০৮ সাল পর্যন্ত রাজা গিরিশচন্দ্র রায় নিজেই কলেজটির সকল খরচ বহন করেন। ১৯০৮ সালে রাজা মারা গেলে কলেজটি সরকারি সহায়তা চায়। তখন থেকে কলেজটি সরকারি সহায়তায় পরিচালিত হতে থাকে। এরপর ১৯১২ সালে কলেজটি পূর্ণাঙ্গ সরকারি কলেজ রূপে আত্মপ্রকাশ করে। একই বছর তৎকালীন আসামের চিফ কমিশনার স্যার আর্চডেল আর্ল কলেজটিকে ২য় শ্রেণির কলেজ থেকে ১ম শ্রেণির কলেজে উন্নীত করেন । ১৯১৩ সালে কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক বিজ্ঞান ক্লাস চালু হয়। পরবর্তীতে জননেতা আব্দুল মজিদ (কাপ্তান মিয়া) সহ আরো অনেকে মিলে ১৮০০০ টাকা অনুদান দিলে কলেজটিতে স্নাতক শ্রেণি চালু হয়।
১ম বিশ্বযুদ্ধ ও অন্যান্য নানা সমস্যার কারণে কলেজের ক্যাম্পাস পরিবর্তনের প্রয়োজন দেখা দেয়। তখন কলেজ থেকে ৩ কি. মি. দুরে থ্যাকারে টিলায় (বর্তমান টিলাগড়) ১২৪ একর ভূমি নিয়ে বিশাল ক্যাম্পাসে কলেজ স্থানান্তর করা হয়। সে সময় কলেজের ছাত্রসংখ্যা ছিল ৫৬৮ জন। ১৯২১ সালে তৎকালীন আসামের গভর্নর স্যার উইলিয়াম মরিস কলেজের নতুন ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ১৯২৫ সালে ভবন নির্মাণ সম্পন্ন হলে তা উদ্বোধন করেন তৎকালীন আসামের গভর্নর স্যার উইলিয়াম রীড।
১৯৪৭ এর দেশ বিভাগের পূর্ব পর্যন্ত কলেজটি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত ছিল। দেশ বিভাগের পর এটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে আসে। পরবর্তীতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে ১৯৬৮ সালে কলেজটি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হয়, এবং সর্বশেষ ১৯৯২ সালে বাংলাদেশ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর দেশের সকল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ এর মত মুরারিচাঁদ কলেজটিকেও বাংলাদেশ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় এর অধিভুক্ত করা হয় এবং অদ্যাবধি রয়েছে।
সিলেট মুরারি চাঁদ কলেজের ইতিহাসের এক মহান নায়ক সৈয়দ আব্দুল মাজিদ (কাপ্তান মিয়া) । ১৮৯৭ সালের বিরাট ভূমিকম্পের ফলে রাজার বাড়ি ঘর ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সমূহ ধংস হয়ে যায়। তিনি ঋণ গ্রহণ করে তা পুনর্র্নিমাণ করতে যেয়ে ধীরে ধীরে আর্থিক অনটনে পতিত হন। ১৯০৮ সালে রাজা গিরিশ চন্দ্রের মৃত্যুর পর এইডেড প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। বাবু দুলাল চন্দ্র দেব এবং কাপ্তান মিয়ার উদ্যোগে কলেজটি নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পায়। সেই সময় মুরারিচাঁদ কলেজ সিলেট শহরের ভিতর ছিল এবং প্রথম শ্রেণীর ডিগ্রি কলেজের উপযুক্ত পরিবেশ এবং দালান কোঠা সেখানে ছিলনা। তিনি শহর থেকে তিন মাইল দূরে ১২০ একর জমি অধিগ্রহণ করে বর্তমান মুরারিচাঁদ কলেজ প্রাঙ্গণের ভিত্তির সূচনা। কাপ্তান মিয়া কলেজের নতুন কোনো নাম বা নিজের নাম না দিয়ে এই নতুন প্রাঙ্গণে কলেজটিকে মুরারিচাঁদ কলেজের নামই রাখেন। রাজা গিরিশ চন্দ্রে যে বীজ বপন করেছিলেন কাপ্তান মিয়া সেটাকে মহীরুহুতে পরিণত করেন। বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ১৯১৯ সালে সিলেট আগমন করলে তাকে যে বিরাট সংবর্ধনা দেয়া হয়, আব্দুল মাজিদ কাপ্তান মিয়া ছিলেন সেই অভ্যর্থনা কমিটির সভাপতি।
১২৪ একর ভূমির উপর অবস্থিত মুরারিচাঁদ কলেজের সুবিশাল ক্যাম্পাসে রয়েছে একটি ক্যান্টিন, একটি মসজিদ, ছাত্র-ছাত্রীদের আবাসিক হোস্টেল, বিভিন্ন বিভাগীয় ভবন এবং একটি খেলার মাঠ রয়েছে। ক্যাম্পাসের পুর্বে রলেছে সিলেট সরকারি কলেজ এবং উত্তরে রয়েছে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও সিলেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ। এছাড়াও কলেজের পাশেই রয়েছে টিলাগড় ইকো পার্ক। কলেজের ভিতরে একটি পুকুরও রয়েছে।
এই বিশাল ইতিহাসের কলেজে বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ১৯১৯ সালে সিলেট আগমন করলে তাকে বিরাট সংবর্ধনা দেয়া হয়। অথচ হায় এই কলেজটিকে কিছু বিপথগামী কুলাঙ্গার কোথায় নিয়ে গেছে ভাবা যায়? তবে আশার কথা সরকার খুব অল্প সময়ের মধ্যে সংষিøষ্ট কুলাঙ্গারদের গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে। এদের সুষ্ঠু বিচার হলে কিছুটা হলেও আমাদের লজ্জা ঘুচবে। এই বিচার যাতে বিলম্বিত না হয়, এই প্রত্যাশা করি।

এই সংবাদটি 1,231 বার পড়া হয়েছে

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •