সময় অসময় ৮

প্রকাশিত:সোমবার, ১৬ নভে ২০২০ ০৯:১১

সময় অসময় ৮

মীর লিয়াকত

দৈনন্দিন জীবনে এটাই অধুনা আলোচনার যেন একমাত্র বিষয়। সংক্রমন মৃত্যু পিছু ছাড়ছে না। যদিও সরকারী তথ্য অনুযায়ী কমেছে মৃত্যু। কিন্তু সংক্রমন কি কমেছে? তার ওপর চিকিৎসা ব্যবস্থার নির্ভরতা নেই।  একজন সচিব করোনাক্রান্ত হবার পর তার ডাক্তার কন্যা হাসপাতালে ধর্না দিতে দিতেই ঢলে পড়লেন মৃত্যুর কোলে।  আন্তর্যাতিক খ্যাতিসম্পন্ন দেশবরেন্য ব্যক্তিত্ব জাতীয় অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামানের খবর তো সবাই জানেন। করোনা আক্রান্ত সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরকার দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও প্রথম সারির নেতা মো: নাসিমও চলে গেলেন। তাঁর মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয়ে স্ট্রোক করার পর পরই তাকে অপারেশন করা হয়। সিলেট এর সাবেক  মেয়র বদরুদ্দিন আহমদ কামরানকে আনা হয়েছিলো ঢাকায় কিন্তু বাঁচানো যায়নি। পরবর্তীতে এভাবে চলে যাবার মিছিল কেবল বেড়েছে। এরকম ঘটনা এখনো ঘটছে। আক্রান্ত হয়েছেন সংসদ সদস্য, আমলা, সাংবাদিক, আইনজীবি, শিক্ষক, ব্যবসায়ী সহ প্রায় সকল শ্রেনী পেশার মানুষ, ঘটছে জীবনহানিও। বর্তমানে জীবনযাত্রা স্বাভাবিক হয়ে এসেছে আগের চেয়ে কিন্তু নতুন করে বাড়ছে শংকাও। কারন হাটি হাটি পা পা করে এগিয়ে আসছে শীত! করোনা ভাইরাস শীতে আরো যে সক্রিয় হবে এতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু মানুষের তাতে কোন ভ্রƒক্ষেপ আছে বলে মনেই হয় না। যদি মারাত্মক কোন আকৃতি ধারন করে তাহলে এই দ্বিতীয় ধাক্কায় আবারো আসতে পারে লক ডাউন! যাক সে কথা!
সিলেটের একজন ডাক্তারকেও তার ডাক্তার কন্যা শত চেষ্টা করেও চিকিৎসা দিতে না পেরে মারা গেছেন।  তিনি ছিলেন একজন সাবেক সিভিল সার্জন। তিনি শমশেরনগরের সুপরিচিত ডাক্তার আব্দুল মতিন। তার কন্যা নর্থ ঈষ্টের সহযোগী অধ্যাপক  ডাক্তার রাবেয়া মুন্নী। ডাক্তার রাবেয়া মুন্নী তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে বাবার মৃত্যু কাহিনী যেভাবে লিখেছেন তাতেই আমাদের দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার অনেক কিছু  ভেসে ওঠে। এখানে ফেসবুকের সেই ভাইরাল হওয়া স্ট্যাটাস পাঠকদের সুবিধার জন্য এখানে তুলে ধরা হলো। ডাক্তার মুন্নী তার স্ট্যাটাসে লিখেছেনÑ
‘…..সকাল সাতটা থেকে আট টার মধ্যে তোমাকে নিয়ে ওসমানী মেডিক্য্যাল কলেজ হাসপাতালে গেলাম, কত আকুতি করলাম,  ওরা নিলো না। রেফার করলো শামসুদ্দিন হাসপাতালে। ইমারজেন্সীতে দাঁড়িয়ে রইলাম আধা ঘণ্টা,  তারপর ডাক্তার এলো, বনধ দরজার ওপাস থেকে বলল এক নমবর ওয়ার্ডে নিয়ে যান। শুধু এটুকু বলার জন্য আরো নীল হলো আমার বাবা। নিজে আমার সাথে আনা এ্যাম্বুলেন্স এর করমিদের সাথে করে ট্রলি নিয়ে ছুটছি, কেউ বলে দেবার,  দেখিয়ে দেবার নেই  এক নম্বর কোন দিকে। উদভ্রান্তের মতো ছুটছে এক ডাক্তার বানানোর কারিগর তার ডাক্তার বাবাকে নিয়ে। যে বাবা আজীবন শুধু বিনা পয়সায় চিকিৎসা দিয়ে গেলো হাজার হাজার মানুষের, যে বাবা আজীবন যবধঃয ংবপঃড়ৎ এর অনিয়ম দূর করতে লড়েছে, সরকারী কর্মকর্তার ৎবংঢ়ড়হংরনরষরঃু পালন করতে  আমাদেরকে ভূলে যেতো। না  শুধু গরীববের না, সমাজের সব সুযোগ সনধানীরা জানতো ডাক্তার মতিন পয়সা নেবেন না। ঃৎড়ষষবু ঠেলছি, ঙীুমবহ ংরষুহফবৎ ধসনঁষধহপব এ ভরীবফ, নীল গাঢ় হচ্ছিল…।  ওয়ার্ডে পৌছুলাম, নোংরা বেডে আমার ঢ়বৎভবপঃরড়হরংঃ বাবাকে নিজে টেনে হিঁচড়ে নামালাম। বলা হলো যান   ড়ীুমবহ সঁংশ কিনে আনেন। নীল গাঢ়তর হচছে। কতশত ডাক্তার কে ফোন দিলাম কেউ ধরল না। তিন চার ঘন্টা এভাবেই কাটলো।  কোন ডাক্তার এলো না।  শুধু ড়ীুমবহ দিয়ে বসে রইলাম।
তারপর  উরৎবপঃড়ৎ নৎরম মবহ উৎ ণঁহঁং সাহেবের কানে যখন ফোন গেলো তিনি খুব সহযোগিতা করলেন। তার ড়ৎফবৎ এরও এক ঘন্টা চলে যাবার পর এক ওয়াড বয় এসে বলল রুগী ওঈট তে নেবো,  কিন্তু ঃৎড়ষষবু কে ঠেলবে? আমি বল্লাম আমি। আবার ছুটে চলছি। বেলা দুটোয় ডাক্তার এলেন। আমাকে বললেন ওঈট নবফ ড়পপঁঢ়রবফ ,  তবে আমি চাইলে একটা ধষঃবৎহধঃরাব ব্যবসতা হবে,  কিন্তু রুগীর যে পড়হফরঃরড়হ,  তাতে লাভ হবে না। লাভ না হবার পড়হফরঃরড়হ তো তৈরী করলেন,  ধহড়ীরপ ড়ৎমধহ ফধসধমব তো করা শেষ।
আপনাদেরকে অনেক ধন্যবাদ, আমাকে এক শহীদ পিতার গর্বিত সন্তান বানানোর পথ সুগম করায় সার্বিক  সহযোগিতা করার জন্য। ধন্যবাদটা শুধু নৎরম মবহ সাহেবকে দিবো না। বিঃ দ্রঃ বাবার সরকারি চাকরির কঠিনতর দায়িত্ব পালন, আপোষহীন নীতির জন্য বারবার অনাকাঙ্ক্ষিত বদলী, অল্প কয়েকটা টাকায় সংসার চালানো দেখে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এ জয়েন করলাম। বিশটি  বছর দেশের মানুষের জন্য কাজ করে আজ জানলাম আমি এ দেশের এক অনাকাঙ্ক্ষিত সন্তান। হে দেশ তোমার এই অনাকাঙ্ক্ষিত সন্তানের অসীম ঘৃণা গ্রহণ কর। আমার বাবার সকল বংশধর তোমাকে আজীবন ঘৃণা জানাবে।’
শুধু যে করোনাকালে তা কিন্তু নয়। ডাক্তার মতিন বছর খানেক আগে রোড এ্যাকসিডেন্ট করেছিলেন মৌলভীবাজােরে। তাকে নেয়া হয়েছিলো মৌলভীবাজার হাসপাতালে। সেই হাসপাতালেরই তিনি ছিলেন সিভিল সার্জন। সেখানে ডিউটি অফিসার গল্পের বই পড়ছিলেন।  ডাক্তার মতিন যে এই হাসপাতালেরই সিভিল সার্জন ছিলেন তা জেনেও নেই ডিউটি অফিসার বিরক্ত হয়ে তার প্রতি নজর না দিয়েই বলে দিলেন এখানে কিছু হবে না ওসমানীতে নিয়ে যান। এই হলো আমাদের চিকিৎসা ব্যবস্থা। এই সব কারনেই বহু ভিআইপিরা দেশে চিকিৎসা না করে বিদেশে চলে যেতেন। এখন করোনাকালে তাও হয়ে গেছে বন্ধ। এখন এই পরিস্থিতিতে আমাদের চিকিৎসা ব্যবস্থার দৈন্যদশায় সবে খুলেছে অফিস আদালত, চালু হয়েছে ট্রেন বাস লঞ্চ বিমান। নতুনভাবে চালু হবে করোনার সংক্রমন বৃদ্ধি। অথচ চিকিৎসা ব্যবস্থার কোন উন্নতি হয়নি। করোনার প্রকাাপে এখন করোনা ছাড়া অন্য রোগেরও চিকিৎসা হচ্ছে মারাত্মকভাবে ব্যাহত। বড় বড় হাসপাতালে অন্য রোগের চিকিৎসা নিতে গেলে করোনা নিগেটিভের সার্টিফিকেট না নিলে ভর্তি করা হচ্ছে না। করোনা পরীক্ষা চাইলেই করে নেয়াও সহজ নয়। সেখানেও বিস্তর সময় প্রয়োজন। আবার সেখানে পরীক্ষা করতে গেলওে নতুনভাবে সংক্রমনেরও সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যাবে না। এ যেন এক হ য ব র ল অবস্থা। যুক্তরাস্ট্র যুক্তরাজ্য ইত্যাদি দেশের লকডাউন উঠিয়ে কাজে যাওয়া সব খুলে দেয়া আর বাংলাদেশের অবস্থা এক নয়। অবশ্য সেসব দেশে এই শীতে আবার নতুন করে লক ডাউনের শুরু।  সেখানে চিকিৎসা ব্যবস্থা ও আইন ভালো যা আমাদের দেশের সাথে আকাশপাতাল ব্যবধান। তাই আমাদের সংকটের সাথে তাদের তুলনা চলে না।  এছাড়া তাদের আর্থিক অবস্থান সব সময়ই ভালো।
আমাদের দরিদ্র জনগোষ্ঠী এই মোকাবেলা কখনো করার কথা নয়। আরো একটি বিষয় এখানে উল্লেখ করা দরকার। করোনাকালের মতো কঠিন সময়ে উন্নত দেশ মমুহে সবাই একজোট হয়ে পরিস্থিতির মোকাবেলা করে, যা আমাদের দেশে নেই।  এক জোট দুরের কথা বিরোধী পক্ষ সব সময়েই সরকারের গৃহিত কর্মসূচির বিরোধীতা করে আসছে। অথচ এই মূহুর্তে কারো বিরোধীতা করার সময় নয়। এটাও একটা বড় সমস্যা।
মীর লিয়াকত \ সব্যসাচী লেখক।

এই সংবাদটি 1,227 বার পড়া হয়েছে

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •