স্বাধীনতার ৫০ বছর এবং আজকের বাংলাদেশ

প্রকাশিত:সোমবার, ২২ মার্চ ২০২১ ১১:০৩

স্বাধীনতার ৫০ বছর এবং আজকের বাংলাদেশ

ম. আমিনুল হক চুন্নু::: 

‘পৃথিবীর একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে জ্বলন্ত ঘোষণার ধ্বনি-প্রতিধ্বনি তুলে
নতুন নিশান উড়িয়ে, দামামা বাজিয়ে দিগি¦দিক
এই বাংলায় তোমাকে আসতেই হবে হে স্বাধীনতা’

শামসুর রহমানের কবিতাংশ। কবির সাহসী ও দৃপ্ত উচ্চারণ এটি। আমাদের মুক্তি আকাঙ্খার প্রতিধ্বনি হয়েছে এখানে। অনেক কবির কবিতাই মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রেরণা দিয়েছে। অনেক কবিতায় ৯ মাসের যুদ্ধকালীন করুণ অবস্থা ফুটে উঠেছে। আবার অনেক কবিতায় মুক্তিকামী মানুষের চাওয়া-পাওয়ার কথা উঠে এসেছে কবির কণ্ঠে। আর একটি বিষয় সে সময়ের কবিতায় স্থান পেয়েছে সেটি হচ্ছেÑ অসাম্প্রদায়িক মনোভাব। এ অসাম্প্রদায়িক মনোভাবই শেষ পর্যন্ত আমাদের স্বাধীনতা অর্জনে ভূমিকা রেখেছে। রণাঙ্গনের যুদ্ধকালীনের আগে থেকেই র্বরবর পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চলছিল। ১৯৪৭ সাল। ১৫ আগস্ট আর ১৪ আগস্ট। ব্রিটিশ শাসিত ভারতবর্ষ থেকে ব্রিটিশ বিদায় নিয়ে চলে গেল। ভারতবর্ষ থেকে শেষ পর্যন্ত দুটি দেশ হল- ভারত ও পাকিস্তান। পাকিস্তান পূর্ব ও পশ্চিম নামে দুই ডানা নিয়ে উড়লেও তাতে নির্মল প্রাণজুড়ানো বায়ূর চেয়ে আগুনের হুলকা ছিল বেশি এবং শুরু থেকেই গণতন্ত্র নামটি অনেকটা নিষিদ্ধই ছিল পাকিস্তানের মানুষের কাছে। পাকিস্তানী সামরিক স্বৈরাচারের নির্মম শাসন আর শোষণের শিকার হয় প্রধানত পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি জনগণ। কার্যত পূর্ব পাকিস্তান পশ্চিম পাকিস্তানের একটি উপনিবেশে পরিণত হয়।

ব্রিটিশ বেনিয়ারা যেমন বাণিজ্যের নামে ভারতবর্ষে তাদের শাসন কায়েম করে ২০০ বছর ভারতের সম্পদ, সুখ ও স্বাধীনতা- সবই লুটে নেয়। বিশ্বের অন্য অনেক দেশের মত ভারতও তাদের বিশাল এক উপনিবেশে পরিণত হয়। ২০০ বছর লড়াই সংগ্রাম, বহু জীবন দান, নিপীড়ন-নির্যাতন সয়ে স্বাধীনতা অর্জন করে পূর্ব পাকিস্তানও ঠিক তেমনি পরিণতির মুখোমুখি দাঁড়ায় পাকিস্তানের অংশ হয়ে। সেই ১৯৪৭ সালের পর থেকেই পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ এক মুহূর্তের জন্যও স্বাধীনতার স্বাদ নিতে পারেনি। পাকিস্তানি শোষণ-বঞ্চনা, অবজ্ঞা-অবহেলা-অসম্মানের বিরুদ্ধে শুরু থেকেই বাঙালিদের আন্দোলন-সংগ্রামে নামতে হয়।

তবে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির পরের বছর ১৯৪৮ সালেই আমাদের বুঝতে অসুবিধা হয়নি যে মুসলিম ভ্রাতৃত্বের কথা বলে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম দেয়া হয়েছে তা নিতান্তই একটি ধোকা।

প্রথমেই পশ্চিম পাকিস্তানিরা আমাদের ভাষাকে অস্বীকার করল এবং ভাষার দাবিতে আন্দোলনরত বাঙালিদের বুকে গুলি চালিয়ে রাজপথকে করল রঞ্জিত। তারপরও আমরা ২৪টি বছর পশ্চিমাদের সঙ্গে থেকেছি। সহ্য করেছি হাজারো অত্যাচার-অবিচার। অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে আমাদের কোণঠাসা করে ফেলা হয়েছিল। পূর্ব পাকিস্তানের সোনালি আঁশ দিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানে গড়ে তোলা হয়েছিল দর্শনীয় নতুন রাজধানী-ইসলামাবাদ। বাদ-প্রতিবাদের কমতি ছিল না।
বাঙালিরা তৈরি করেছিল ’৬২, ’৬৬, ’৬৯ আর ’৭১। অখন্ড পাকিস্তান রক্ষার শেষ দাওয়াই ছিল ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন। যদিও ততদিনে বাঙালি মননে একটি স্বতন্ত্র জাতি হিসেবে জন্মলাভ করার আকুতি দানা বেঁধে উঠেছিল। তারপরও ১৯৭০ সালের নির্বাচন ছিল আমাদের মনোভাব সম্পর্কে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসক-গোষ্টিকে পরিষ্কার জানান দেয়ার সুযোগ। আমরা সে সুযোগ ষোলআনাই কাজে লাগিয়েছি।
আমাদের সামনে তখন ভরসার জায়গা ছিল বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ। বাঙালি সেদিন প্রাণ খুলে তাদের মনের কথা বিশ্ববাসীকে জানিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিল। ১৯৭০ এর ৭ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। ১৩ টি মহিলা আসনসহ জাতীয় পরিষদের আসন সংখ্যা ছিল ৩১৩ (৩০০+১৩) টি। এর মধ্যে অবিভক্ত পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চল পূর্ব পাকিস্তানের আসন ছিল ১৬৯ (১৬২+৭) টি। পূর্ব পাকিস্তানের ১৬৯টি আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ পায় ১৬৭টি আসন। ওই নির্বাচনে বহু রাজনৈতিক দল অংশ গ্রহণ করে। সামরিক আইনের অধিনে ওই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তবে সংরক্ষিত মহিলা আসনসহ ৩১০টি আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ বিজয়ী হয় ২৯৮ টি আসনে।

৭ ডিসেম্বরের নির্বাচনের পর তৎকালীন সামরিক প্রেসিডেন্ট জেনারেল এহিয়া খান ১৯৭১-এর ৩ মার্চ ঢাকায় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহবান করেন। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানের পিপিপি নেতা জেডএ ভুট্টো এবং পাকিস্তানের সামরিক চক্র সংখ্যাগরিষ্ট দলের কাছে অর্থাৎ আওয়ামী লীগের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের ব্যাপারে ষড়যন্ত শুরু করে। ষড়যন্ত্রকারীদের হাতের পুতুলে পরিণত হলেন সামরিক প্রেসিডেন্ট জে. এহিয়া খান। একাত্তরের পহেলা মার্চ ১টা ৫মিনিটে আকষ্মিক এক বেতার ঘোষণায় ৩ মার্চ অনুষ্ঠেয় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করা হয়। এ ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের (পূর্ব পাকিস্তানের) ছাত্র সমাজ, কৃষক-শ্রমিক, সরকারি বেসরকারি কর্মকর্তা কর্মচারিসহ সারা দেশের মানুষ বিক্ষোভে ফেঁটে পড়ে। বেরিয়ে পড়ে রাজপথে। সারা দেশ; বিশেষ করে ঢাকার রাজপথ হয়ে ওঠে উত্তাল। সেই সঙ্গে পাকিস্তানি সেনাদের আক্রমণও থেমে থাকেনি। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে প্রাণহানির কথা শোনা যায়। অনেকটা বাধ্য হয়েই তৈরি করা হয়- স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। ছাত্রলীগের তৎকালীন সভাপতি নূরে আলম সিদ্দিকী, সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান সিরাজ, ডাকসুর ভিপি আসম আব্দুর রব, সাধারণ সম্পাদক আব্দুল কুদ্দুস মাখন-এ চারজন থাকলেন সামনের সারিতে। পরবর্তি সময়ে এ চারজনকে ‘চার খলিফা’ নামে সম্বোধন করা হত। ছাত্রসমাজ সেদিনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলণ করেন। ১৯৭১, ৩ মার্চ ছাত্রলীগ ও শ্রমিক লীগ পল্টন ময়দানে এক বিক্ষোভ সমাবেশের আয়োজন করে। সেখানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রধান অতিথির বক্তৃতায় আবেগজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমি থাকি আর না থাকি। বাংলার স্বাধিকার আন্দোলন যেন থেমে না যায়। বাঙালির রক্ত যেন বৃথা না যায়। আমি না থাকলে আমার সহকর্মীরা নেতৃত্ব দেবেন। যেকোন মূল্যে আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে। অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

বঙ্গবন্ধু আগেই ঘোষণা করেছিলেন, ৭ই মার্চ রোববার রেসকোর্স ময়দানে তিনি পরবর্তি কর্মপন্থা ঘোষণা করবেন। ৪ মার্চ থেকে ৬ মার্চ সকাল ৬টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত সারা দেশে হরতাল পালনের আহবান জানান শেখ মুজিব। তার নেতৃত্বে দুর্বার গতিতে আন্দোলন এগিয়ে চলে। সেই আন্দোলনমুখর পরিস্থিতিতে ঘনিয়ে এল ৭ মার্চ। এখন সবার দৃষ্টি ৭ মার্চের দিকে।

বাঙালির ইতিহাসে অনেকগুলো দিন আছে, যা আমাদের মনে রাখতে হবে। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার জীবনের শ্রেষ্ঠ ভাষণটি দিয়েছিলেন। ১০ লক্ষাধিক লোকের সামনে পাকিস্তানি দস্যুদের কামান-বন্দুক-মেশিনগানের হুমকির মুখে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ওইদিন বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করেন, এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম, আমাদের মুক্তির সংগ্রাম। বঙ্গবন্ধু তার ভাষণে স্বাধীনতার ডাক দিলেন। তবে পাকিস্তানী জান্তা সরকারের সঙ্গে আলোচনার পথও খোলা রাখলেন। বহির্বিশ্বও বুঝে গেল পাকিস্তানের সঙ্গে কোন আপোস নয়। এবার বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশকে স্বাধীন করেই ছাড়বেন। তিনি বাঙালি জাতিকে এতদিন সে স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখিয়ে আসছিলেন, এবার দেশের স্বাধীনতার লক্ষ্যে সে পথেই পা বাড়িয়েছেন তিনি। বঙ্গবন্ধু তার ৭ই মার্চের ভাষণে স্বাধীনতার বীজ বপন করে দিলেন। উক্ত মর্মবাণী ঐতিহাসিক বিখ্যাত ভাষণ বক্ষে ধারণ করে রেসকোর্সের মাঠে সমবেত জনতা ঘরে ফিরলেন। তারা চুড়ান্ত ঘোষণা পেয়ে গেছেন। আর পেছনে ফিরে তাকানোর সময় নেই। যুদ্ধেই সব ফয়সালা হবে। ১৯ মিনিটের এক জাদুকরি ভাষণে বাঙালি জাতিকে স্বপ্নে বিভোর করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। এরপরই ফলে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ, ৯ মাসের লড়াই এবং স্বাধীনতা অজির্ত হয়।

ইতোমধ্যে বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ ২০১৭ সালে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিক সংস্থা-ইউনেসকো বিশ্ব ইতিহাসের প্রামাণ্য দলিল হিসেবে গ্রহণ করে ভাষণটিকে সংস্থাটি বিশ্বের ৭৮টি ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ দলিল, নতি ও বক্তৃতার মধ্যে বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণটি অন্তর্ভূক্ত করে। এরপর সরকারিভাবে দিবসটি আড়ম্বরের সাথে পালন করা হয়। তাছাড়া বর্তমান নতুন প্রজন্মের কাছে এই ভাষণ প্রেরণার উৎস।
বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের পর আবার অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিলেন। বাংলার সাড়ে ৭ কোটি মানুষ সেদিন হ্যামিলিয়নের বংশীবাদকের মত তার ডাকে সাদা দেয়। তার নির্দেশে গোটা পূর্ববাংলা পরিচালিত হয়। অন্যদিকে ৭ মার্চের ভাষণের কিছু অংশ ব্যাখ্যা করলে দেখা যায়Ñ তিনি সেদিন যুদ্ধের ঘোষণা যেমন পরোক্ষভাবে প্রদান করেন, আবার যুদ্ধে কীভাবে জয়ী হতে হবে; সে ব্যাপারেও বক্তব্য দেন।
অতঃপর ২৫ মার্চ ৭১ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু মুজিবকে ৩২ নম্বরের ঐতিহাসিক বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায় এবং পাকিস্তানী বর্বর হানাদার বাহিনীর সদস্যরা ঘুমন্ত বাঙালির উপর আক্রামণ চালায়, গণহত্যা শুরু করে। তবে এ কথা ঠিক যে, ২৬ শে মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছি। কিন্তু একথা বললে ভুল হবে না যে, প্রকৃতপক্ষে ৭ মার্চের ভাষণের মধ্যদিয়েই আমাদের স্বপ্নের কাঙ্খিত পথ তৈরি করেছি। যেখানে ঘোষিত হয়েছিল, এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম।

আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি এখন খুবই ঘোলাটে। করোনার মত ভাইরাসের কারণে গোটা পৃথিবী এখন বিভিষিকাময়। এ ভাইরাসের বিরুদ্ধে ভ্যাকসিন বেরিয়েছে। করোনা মহামারির মধ্য দিয়ে একটি বছর পার হয়ে আমরা স্বাধীনতার আরেক মার্চে পা রাখলাম। এবারের মার্চ নানা কারণে তাৎপর্যপূর্ণ। একাত্তরের চুড়ান্ত ত্যাগের মাধ্যমে মহান স্বাধীনতা। তবে পৃথিবীর ইতিহাসে এ ধরণের বিজয় দুর্লব। সেই স্বাধীন বাংলাদেশ অর্ধশত বর্ষে পা রাখবে আগামী ২৬ শে মার্চ ২০২১। এবারের মার্চে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ আমরা উদযাপন করছি এবং মহান ২১ শে ফেব্রæয়ারি ৬৮তম বর্ষে পা রেখেছে ভাষা আন্দোলন। বাংলাদেশ এই মুহুর্তে ধন-ধান্য ও সম্পদের প্রাচুর্যে সমৃদ্ধ একটি দেশ, তা আন্তর্জাতিক ভাবে স্বীকৃত। কিন্তু মনে রাখতে হবে, যত উন্নতি, অগ্রগতি হোক না কেন একমাত্র গণতন্ত্রই আমাদের রক্ষা করবে। প্রকৃত অবস্থায় গণতন্ত্রের জন্যই আমরা একাত্তরে সশস্ত্র যুদ্ধ করছি।

আমাদের স্বাধীনতার ৫০ বছর (সুবর্ণ জয়ন্তী) পূর্ণ হতে চলেছে। এ স্বাধীনতার জন্য মানুষ রক্ত ঝরিয়েছে অনেক। লাখো নারী সম্ভ্রম হারিয়েছে। আজ বাংলাদেশের ৫০ তম জন্মবার্ষিকীতে দাঁড়িয়ে স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, আমরা কী পেয়েছি আর কী পাইনি। পেয়েছি অনেক। একটি ভূখন্ড। একটি পতাকা। নিজেদের জাতীয় সংগীত। আমাদের পূর্ণ স্বাধীনতা। কিন্তু পাইনি অনেক কিছু।

বাংলাদেশ করোনাকে যেমন সাফল্যের সাথে মোকাবেলা করে যাচ্ছে, তেমনি অর্থনীতির ক্ষেত্রেও সাফল্য অর্জন করে চলেছে। সেই সাফল্যেই স্বীকৃতি- স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়শীল দেশের সার্টিফিকেট। জাতিসংঘ থেকে এই স্বীকৃতির ঘোষণা আসে গত ফেব্রæয়ারি মাসে। এই স্বীকৃতি স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী এবং বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ উদযাপনে ভিন্নমাত্রা দিয়েছে।

তাছাড়া বঙ্গবন্ধুর কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গত প্রায় ১২ বছর বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও অর্থনৈতিক মুক্তির পথে দুর্গমগিরি অতিক্রান্তের চেষ্টা করছে এবং উল্লেখযোগ্য অর্জনও হয়েছে। ২০০৯ সালে দেশে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে যাত্রার শুরুতেই পিলখানার ষড়যন্ত্র ছিল ভূমিকম্পময় ধাক্কা। তারপর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বাঁধাগ্রস্থ করার জন্য বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নৈরাজ্য সৃষ্টি, হেফাজতের উত্থান ও নৈরাজ্য, ২০১৫ সালের শুরুতে বিএনপি কর্তৃক কথিত অবরোধের নামে একনাগারে প্রায় তিনমাস যাবৎ জ্বালাও-পোড়াও এবং নিরীহ মানুষ হত্যার অপকর্ম ও জামায়াতের আন্ডারগ্রাউন্ড বাহিনীর লাগাতার জঙ্গী সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের বিপরীতে সামাজিক অর্থনৈতিক ও অবকাটামো খাতে যে উন্নয়ন হয়েছে তা আজ আওয়ামী লীগ শত্রæপক্ষকেও স্বীকার করতে হচ্ছে। তাছাড়া আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফসহ বড় বড় সব গবেষণা প্রতিষ্ঠানের নজর এখন বাংলাদেশের দিকে। বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হারে চীন-ভারতকেও ছাড়িয়ে গেছে বাংলাদেশ।
অন্যদিকে শেখ হাসিনার সরকার দুর্নীতি ও মানি লন্ডারিংয়ের বিরুদ্ধে কঠোর হতে চাইছে। কিন্তু দলের ভেতরে ও বাইরে রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ ও হুমকি প্রবলভাবে উপস্থিত থাকায় এ লক্ষে আকাঙ্খিত অর্জন চোখে পড়ছে না এবং একটি রাষ্ট্রের মৌলিক শক্তি তার সার্বিক শৃঙ্খলা ও আইনের কঠোর প্রয়োগ। কিন্তু ১৬ কোটি মানুষের দেশে শুধু আইন তৈরি এবং তার ভয় দেখিয়ে সার্বিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা বা ফিরিয়ে আনা যাবে না। এর জন্য প্রয়োজন একটা সুগভীর জাতীয় মানসকাঠামো। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে আমরা সে রকম একটা জাতীয় মানসকাঠামো এবং সব ক্ষেত্রে একটা টেকসই আস্তার পরিবেশ সৃষ্টি দেখতে চাই।

বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মিয়ানমারের প্রায় ১২ লক্ষ রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে আশ্রয় ও নিরাপত্তা দিয়ে গণহত্যার হাত থেকে বিশ্বকে রক্ষা করেছেন। অন্যতায় দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর এটি হত সবচেয়ে বড় গণহত্যা। যা বিশ্ব নেতাদের মুখে চুনকালি মাখিয়ে দিত। তবে সর্বদিক বিবেচনায় মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সময়ের প্রেক্ষিতে যে মহানূভবতা ও চিন্তার পরিচয় দিয়ে বিশ্ববাসীর সম্মান অর্জন করেছেন তার জন্য তাকে নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত করা যেতেই পারে।

মার্চ বাঙালিদের প্রাণের মার্চ। আন্দোলন আর জীবন দানের মার্চ। জীবনের চেয়ে দামি স্বাধীনতা অর্জনের মাস। মার্চ এবার আমাদের জীবনে অধিক তাৎপর্য ও বৈশিষ্ট্যমন্ডিত। এবার আমরা স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন করতে যাচ্ছি। ৩০ লাখ জীবন এবং ২ লক্ষাধিক মা-বোনের সম্ভ্রম হারিয়ে পাওয়া বাংলাদেশ। রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি কত ওলট-পালট, চড়াই উৎরাই প্রত্যক্ষ করে ৫০ বছর অতিক্রম করে আসা। অতঃপর সুবর্ণজয়ন্তী। কী আনন্দময়, তাই এবারের মার্চ আলাদা এক আবেগ, গৌরব এবং তাৎপর্য নিয়ে আসুক, ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে- এ প্রত্যাশা।

(লেখক ও গবেষক অধ্যাপক ম. আমিনুল হক চুন্নু, প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ, নূরজাহার মেমোরিয়াল মহিলা ডিগ্রি কলেজ, সিলেট। পিএইচ,ডি ফেলো।)

এই সংবাদটি 1,233 বার পড়া হয়েছে

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •