স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠন হলে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফিরে আসবে

প্রকাশিত:মঙ্গলবার, ২৫ মে ২০২১ ১১:০৫

স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠন হলে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফিরে আসবে

সম্পাদকীয়:

করোনা অতিমারিতে  গত সপ্তাহের পুরো সময়টা আমাদের দৃষ্টি কেড়ে নিয়েছে ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরাইলের বর্বর বোমা হামলা।এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডে শত শত নিরীহ-নিরস্ত্র ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। নিহতদের একটি বড় অংশ নারী ও শিশু। বিশ্ববিবেক এ ধরনের বর্বরোচিত হামলার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে। ভাবতে অবাক লাগে, বিশ্বের প্রায় ৮০০ কোটি জনসংখ্যার ভেতর মাত্র ৪৫ লাখ ফিলিস্তিনির বসবাসের জন্য গত ৭৩ বছরেও এই পৃথিবীতে কোনো জায়গা হলো না। অথবা আরেকটু পরিষ্কার করে বলতে হয়, তাদের বসবাসের জায়গা দখল করে নেওয়া হয়েছে। আর বিশ্ব রাজনীতি এর মানবিক দিকটি দিনের পর দিন উপেক্ষা করে চলেছে।

গত সপ্তাহে হয়তো অনেক বড় আকারে হামলা হয়েছে। কিন্তু বছরের কোনো দিনই ফিলিস্তিনিরা বোধকরি স্বস্তির সঙ্গে পার করেন না। সব সময়ই তাদের ইসরাইলি হুমকি-ধমকির মুখে দিন অতিবাহিত করতে হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানি ও ইউরোপ থেকে বিতাড়িত ইহুদিদের জন্য একটি জায়গা করে দিয়েছিল ব্রিটিশরা। ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানেই তারা ফিলিস্তিনিদের ভূমিতে ভাগ বসায়। এ নিয়ে আরবরা খুব ক্ষুব্ধ ছিল, এমনকি ইসরাইলের সঙ্গে যুদ্ধেও নেমেছিল। সে যুদ্ধে আরবরা পরাজিত হওয়ার পর ইসরাইলিরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে এবং বেশি ভূমি দখল করে নেয়। জাতিসংঘের প্রস্তাব অনুযায়ী ফিলিস্তিনের জন্য ৫৬ শতাংশ জায়গা বরাদ্দ করা হলেও আরব যুদ্ধের পর ইসরাইলিরা ৭৬ শতাংশ জমি দখল করে নেয়। সামরিক শক্তিতে বলীয়ান ইসরাইল গত ৭০ বছর যাবৎ কোনো ফিলিস্তিনিকে একটি রাতের জন্যও নিশ্চিন্তে ঘুমানোর মতো অবস্থায় রাখেনি। জাতিসংঘ ইসরাইলিদের ফিলিস্তিনে জায়গা করে দিল; কিন্তু প্রতিশ্রুত ফিলিস্তিন রাষ্ট্র আজও প্রতিষ্ঠিত হলো না। ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস ২০১১ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ বরাবর সদস্যপদের জন্য আবেদন করেন। সেই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১২ সালের ২৯ নভেম্বর ফিলিস্তিনকে একটি পর্যবেক্ষক রাষ্ট্রের মর্যাদা দেওয়া হয়, পূর্ণ সদস্য নয়। ফিলিস্তিনিদের প্রতি বিশ্ব সভ্যতার এই হলো যুগ যুগ ধরে করে আসা আচরণ।

বরাবরের মতোই এটি একটি একতরফা আক্রমণ। ফিলিস্তিনিরা স্বাধীনভাবে বাঁচতে চায়। ইসরাইলকে নিশ্চিহ্ন করার কোনো ইচ্ছা তাদের থাকার কথা নয়। একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরলেই বোঝা যাবে এটি একটি অসম যুদ্ধ। ইসরাইলের প্রায় ৯০ লাখ নাগরিকের মধ্যে ১ লাখ ৭০ হাজার হলো নিয়মিত এবং সক্রিয় সামরিক বাহিনীর সদস্য। আরও ৩০ হাজার নাগরিক আছেন, যারা প্রয়োজনে যুদ্ধ করার মতো প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। এর বিপরীতে ফিলিস্তিনি হামাস সদস্যদের হিসাবে নিলেও তা ৩০ হাজারের বেশি হবে না। ইসরাইলের বিমান বাহিনীতে ৩৪ হাজার সৈন্য কাজ করে। তাদের আছে ৭০০ বোমারু বিমান। বিপরীতে ফিলিস্তিনিদের এর কিছুই নেই। নৌবাহিনীর তুলনা তো আরও বিস্ময়কর। ইসরাইল নেভিতে ১০ হাজার সৈন্য আছে। ৮টি মিসাইল বোট, ৫টি সাবমেরিন আর ৪৫টি পেট্রোল বোট নিয়ে ইসরাইলের নৌ-ব্রিগেড। অপরদিকে ফিলিস্তিনিদের গাজায় কিছু মাছ ধরার নৌকা ছাড়া আর কিছুই নেই। ভৌগোলিক আয়তনটিও তুলনীয় নয়। ফিলিস্তিনের অধীনে থাকা জমির পরিমাণ এখন মাত্র ৬ হাজার বর্গকিলোমিটার। ইসরাইলের দখলে রয়েছে ২২ হাজার বর্গকিলোমিটার ভূমি। অর্থনৈতিক দিক থেকেও ফিলিস্তিন অনেকখানি দুর্বল। ২০১৯ সালের হিসাব অনুযায়ী ফিলিস্তিনের বার্ষিক জিডিপি মাত্র ১৬ বিলিয়ন ডলার, যেখানে ইসরাইলের বার্ষিক জিডিপি ৪৪০ বিলিয়ন ডলার। ফিলিস্তিনি জনগণের মাথাপিছু আয় বার্ষিক ৩ হাজার ৫০০ ডলার, যেখানে ইসরাইলিদের মাথাপিছু আয় প্রায় ৪৫ হাজার ডলার। তুলনা করলে দেখা যাবে, ফিলিস্তিনিদের চেয়ে ইসরাইলের মাথাপিছু আয় প্রায় ১৫ গুণ বেশি। ২০২০ সালে ইসরাইলের সামরিক বাজেট ছিল ২০ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার, যা ফিলিস্তিনের বার্ষিক জিডিপির চেয়েও ২৫ শতাংশ বেশি। শক্তির তুলনা চলে কি? হ্যাঁ, একটি বিষয়ে ফিলিস্তিনিরা এগিয়ে, আর তা হলো স্বাক্ষরতার হার। পৃথিবীর গড় স্বাক্ষরতার হার প্রায় ৮৬ শতাংশ; আরব বিশ্বে তা ৭৫ শতাংশের বেশি নয়। ইসরাইলে এই হার ৯১ শতাংশ আর ফিলিস্তিনে তা ৯৬ শতাংশ। কিন্তু স্বাক্ষরতার হার দিয়ে তো যুদ্ধ করা যাবে না। এ কারণেই বললাম, শক্তিধর দেশ হিসাবে ইসরাইলই ফিলিন্তিনিদের উৎখাত করতে চাচ্ছে। ইসরাইলের দীর্ঘ ৭৩ বছরের আগ্রাসী মনোভাব আমাদের তাই ভাবতে শিখিয়েছে।

এই সংবাদটি 1,226 বার পড়া হয়েছে

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •