দ্য রোটারি ফাউন্ডশনের কার্যক্রম এম আতাউর রহমান পীর - BANGLANEWSUS.COM
  • নিউইয়র্ক, সন্ধ্যা ৬:২৬, ২৪শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ


 

দ্য রোটারি ফাউন্ডশনের কার্যক্রম এম আতাউর রহমান পীর

newsup
প্রকাশিত নভেম্বর ১, ২০২৩
দ্য রোটারি ফাউন্ডশনের কার্যক্রম এম আতাউর রহমান পীর

রোটারি একটি আন্তর্জাতিক সেবাধর্মী সংগঠন। এই সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা করেন আমেরিকার শিকাগো নগরীতে বসবাসকারী সাঁইত্রিশ বয়সী একজন আইনজীবী ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দের ২৩শে ফেব্রুয়ারি। ইতিমধ্যে সংগঠনটি ১১৮ বছর অতিক্রম করেছে। সারা বিশ্বের প্রায় ২০০টি রাষ্ট্র ও ভৌগলিক এলাকায় রোটারি ক্লাবসমূহ ছড়িয়ে আছে।

রোটারির কার্যক্রম পরিচালিত হয় শান্তিময় বিশ্ব গঠনের লক্ষ্যে। রোটারিয়ানরা মনে করেন যেখানে ক্ষুধা, দারিদ্র্য, অশিক্ষা, কুশিক্ষা, অভাব- অনটন, স্বাস্থ্যহীনতা বিদ্যমান সেখানে শান্তির কথা চিন্তা করা বৃথা। তাই বিশ্বজুড়ে রোটারি কাজ করছে দারিদ্র্য বিমোচনে, স্বাস্থ্য উন্নয়নে, পোলিও মুক্ত বিশ্ব গঠনসহ শান্তির অন্বেষণে।

যাদের বিত্তের সঙ্গে চিত্তের সংমিশ্রণ রয়েছে তারা-ই রোটারি কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হয়ে সমাজ উন্নয়নে কাজ করছেন। রোটারিয়ানরা কাজ করছেন বিশ্বভ্রাতৃত্বের বন্ধনে সকল মানুষকে একত্রিত করে সমাজ থেকে সকল অনাচার দূর করতে। কিন্তু ভাল কাজ করতে হলে অর্থের প্রয়োজন। সেই অর্থের যোগান দিতে রোটারি ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠা করেছে “দ্য রোটারি ফাউন্ডেশন”। রোটারিয়ান ও তাদের বন্ধুদের অনুদানে এটি বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম বেসরকারী তহবিল। রোটারি আন্তর্জাতিকের সমাজ উন্নয়নমূলক নানাবিধ কর্মকাণ্ড এই ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে পরিচালিত হচ্ছে।

পোলিও একটি প্রতিরোধযোগ্য মারাত্মক ব্যাধি। এ ব্যাধি নির্মূলে রোটারি বিগত ৩৮ বছর যাবৎ কাজ করছে এবং অচিরেই এই ব্যাধি বিশ্ব থেকে নির্মূল হবে বলে আমাদের বিশ্বাস। রোটারির পোলিও নির্মূল কর্মসূচীর সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনাইটেড স্টেট সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল এন্ড প্রিভেনশন, ইউনিসেফ, মিলিন্ডা এন্ড গেটস ফাউন্ডেশন এবং বিশ্বের সকল রাষ্ট্রের সরকার। ইতিমধ্য শুধুমাত্র রোটারি ফাউন্ডেশনই একাজে ১.৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় করেছে। বিশ্বের আপামর জনগণের সঙ্গে বিশ্বের ১২ লক্ষ রোটারিয়ানও অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন পোলিওমুক্ত সেই সুন্দর পৃথিবীর জন্যে।

রোটারিকে আমরা অনেকভাবেই সংজ্ঞায়িত করে থাকি। “পরিসেবার মাধ্যমে স্থানীয়ভাবে এবং বিশ্বব্যাপী মানুষের জীবনমানকে উন্নত করে যে সংগঠন সেটি হচ্ছে রোটারি” – এটি রোটারির অনেকগুলো সংজ্ঞার মধ্যে একটি। কেননা রোটারি ক্লাবের সদস্যরা- যাদেরকে রোটারিয়ান বলা হয় তারা তাদের সময়, মেধা এবং সম্পদ (টাকা) দিয়ে সমাজের উন্নতির জন্য নিরলস কাজ করেন।

রোটারির অন্যতম একটি কাজ হলো বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা। রোটারি শুধুমাত্র শিক্ষা এবং মানবিক সেবার মাধ্যমে নয় বরং তরুণ নেতাদের জীবনমান ও দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমেও শান্তি ও আন্তর্জাতিক সমঝোতা গড়ে তোলে। এজন্যে রোটারি যে কাজগুলো করছে তা হলো:

ক. রোটারি পিস সেন্টারের মাধ্যমে বিশ্বের ৭টি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবছর ১০০ এরও অধিক শিক্ষার্থীকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনে অর্থায়ন করেছে। এসব স্নাতক ডিগ্রিধারীগণ বিশ্বজুড়ে সরকার, কর্পোরেশন এবং সংস্থাগুলিতে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার পদে কাজ করছেন।

খ. রোটারির মানবিক প্রকল্পগুলোর মাধ্যমে দারিদ্র্য, নিরক্ষরতা এবং বিশুদ্ধ জলের অভাবের মতো সংঘাতের অন্তর্নিহিত কারণগুলি প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে।

গ. রোটারি ইয়ুথ এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম ১১৫টি দেশে প্রতি বছর ৮০০০ টিরও বেশি উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষার্থীকে বিদেশে বসবাস ও অধ্যয়ন করতে সহযোগিতা করে এবং এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সম্প্রতি বৃদ্ধি করে।

** এবার রোটারি আন্তর্জাতিক জেলা ৩২৮২ এর সেবামূলক কিছু কার্যক্রমের বর্ণনা দিতে চাই।

রোটারি আন্তর্জাতিক জেলা ৩২৮২ এর যাত্রা শুরু হয় ২০১৩-১৪ রোটাবর্ষ থেকে। বিগত বছরগুলোতে রোটারি আন্তর্জাতিক জেলা ৩২৮২ দ্য রোটারি ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে সমাজ হিতকর যে কাজগুলো করেছে তার সংক্ষিপ্ত বিবরণ:

২০১২- ২০১৩ রোটাবর্ষে চাঁদপুর সেন্ট্রাল ক্লাব আর্সেনিক দূরীকরণে একটি প্রজেক্টটি গ্রহণ করে জাপানের একটি জেলা ২৮৪০ এর সাথে যাতে দ্য রোটারি ফাউন্ডেশন থেকে ক্লাবের মাধ্যমে মোট খরচ হয়েছিল ৪৮৫৪৬ আমেরিকান ডলার।

খ. একই বছরে ময়মনসিংহ ক্লাব অসহায় মানুষের জন্য পটুয়াখালিতে স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম গ্রহণ করা হয় যাতে দ্য রোটারি ফাউন্ডেশন থেকে ক্লাবের মোট খরচ হয়েছিল ৫১৭৬২ আমেরিকান ডলার।

২০১৪-১৫ রোটাবর্ষে ব্রাহ্মণবাড়িয়া তিতাস ক্লাব সিতানগর গ্রামের মানুষের জীবনমান উন্নয়নের জন্য দ্য রোটারি ফাউন্ডেশন থেকে দুইবারে পায় ১১২৯৪২ আমেরিকান ডলার। এই প্রকল্পের মাধ্যমে সিতানগর গ্রামের হতদরিদ্র মানুষের জন্য পানীয় জল, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বিদ্যুতের ব্যবস্থা করা হয়।

২০১৮-২০১৯ রোটাবর্ষে রোটারি ক্লাব অভ্ খুলসি শিশুদের অন্ধত্ব নিবারণের একটি প্রজেক্টের মাধ্যমে দ্য রোটারি ফাউন্ডশনের ১,৪১,০৭১ আমেরিকান ব্যয় করে কয়েক হাজার শিশুর চোখের চিকিৎসা ও পরামর্শ প্রদান করে।

খ. এছাড়াও একই বছরে রোটারি ক্লাব অভ্ সিলেট প্রাইড, সিলেটের শহরতলীতে একটি চক্ষু হাসপাতাল নির্মাণের জন্য দুইটি প্রকল্পে দ্য রোটারি ফাউন্ডেশন থেকে মোট ১৪৩৪৫০ আমেরিকান ডলার অনুদান পায় এবং হাসপাতালটি ইতিমধ্যে কার্যক্রম শুরু করেছে।

গ. একই বছর দ্য রোটারি ফাউন্ডেশনের একটি গ্রান্টের মাধ্যমে জালালাবাদ রোটারি হাসপাতালে থেরাপি যন্ত্রপাতি সরবরাহের জন্য ৩৭৫০০ আমেরিকান ডলার অনুদান পাওয়া যায়।

ঘ. এছাড়াও একই বছর সাগরিকা রোটারি ক্লাব খাগড়াছড়িতে Rotary Physiotheraphy and Geriatric Centre স্থাপনের জন্য ৩১৫০০ আমেরিকান ডলারের অনুদান লাভ করে।

২০১৯-২০২০ রোটাবর্ষে দ্য রোটারি ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে জেলা ৩২৮২-এ সবচেয়ে বেশি কাজ হয়েছে করোনাকালীন সময়ে। কাজগুলো হচ্ছে:

ক. ২৫০০০ আমেরিকান ডলার অনুদান পেয়ে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থ সুনামগঞ্জ, বান্দরবন, কিশোরগঞ্জ, শেরপুর ও জামালপুরের ১১০ জন মানুষকে ঘর মেরামতের জন্য ৩ বান্ডিল করে ঢেউটিন এবং ৪০০ পরিবারকে সার ও বীজ কেনার জন্য নগদ অর্থ সাহায্য প্রদান করা হয়। অতিমারী করোনা শুরু হলে আরও ২৫০০০ আমেরিকান ডলার অনুদান পাওয়া গেলে সিলেট, সুনামগঞ্জ, ফেনী, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, শেরপুর ও কক্সবাজারের প্রায় ৫০০০ মানুষের মাঝে খাদ্য সামগ্রী বিতরণ করা হয়। তাছাড়া করোনা রোগীকে বহনের জন্য দ্য রোটারি ফাউন্ডেশন ও নিজস্ব অর্থায়নে চট্টগ্রাম আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলাম, সুনামগঞ্জে রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি এবং ফেনী ডায়াবেটিক হাসপাতালে প্রায় ৪০ লক্ষ টাকা ব্যয়ে ৩টি এম্বুলেন্স প্রদান করা হয়। এছাড়া সিলেট হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতালে ১৫১৫০০ আমেরিকান ডলার ব্যয়ে ৬টি ভানটিলেটর ও চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালে ২ টি ভ্যান্টিলেটর; প্রায় ৬০০০০ আমেরিকান ডলার ব্যয়ে সিলেট কিডনী ফাউন্ডেশন হাসপাতালে ২ টি ডায়ালাইসিস মেশিন, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালে ১টি করে বাইপাপ মেশিন ও ১টি করে হাই ফ্লো অক্সিজেন ক্যনোলা; ও দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ৬০টি অক্সিজেন কনসেনট্রেটর প্রদান করা হয়। এছাড়া দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ৫০০০০ আমেরিকান ডলার ব্যয় করে মাস্ক, পিপিই সহ বিভিন্ন সুরক্ষা সামগ্রী বিতরণ করা হয়। চট্টগ্রাম হোপ ফাউন্ডেশন হাসপাতালকেও একই সময়ে ৩৪১৪০ আমেরিকান ডলার ব্যয় করে ডিজিটাল এক্স রে মেশিন সরবরাহ করা হয়। করোনা চলা কালিন সময়ে জালালাবাদ রোটারি হাসপাতালে ১০টি এবং চট্টগ্রাম….হাসপাতালে ২৫টি বেড প্রদান করা হয়। এতে দ্য রোটারি ফাউন্ডেশন থেকে প্রায় ৪০০০০ আমেরিকান ডলার ব্যয় হয়।

খ. এইবছর শুধু যে বাংলাদেশে আমরা প্রজেক্ট করেছি তা নয়। একই সময়ে ভারতের কর্নাটক, হাবলি, কলকাতা, গৌহাটি, শিলচর, চেন্নাই, তামিলনাডু ও সাংলি এলাকায় ৮ টি গ্রান্টে আমাদের পক্ষ থেকে সহযোগিতা করা হয়, যার ফলে প্রায় ৫,০০,০০০ আমেরিকান ডলার দ্য রোটারি ফাউন্ডেশন থেকে খরচ করে উল্লেখিত স্থান গুলোতে বিভিন্ন প্রজেক্ট সম্পন্ন করা হয়।

২০২০-২১ রোটাবর্ষে ৩৩০০০ আমেরিকান ডলার ব্যয় করে ফেনি পৌরসভা প্রদত্ত একটি কক্ষে ফিজিওথেরাপি ইউনিট স্থাপনের কাজ চলছে।

২০২১-২২ রোটাবর্ষে প্রায় ৭০০০০ আমেরিকান ডলার ব্যয় করে সিলেট কিডনী ফাউন্ডেশন, চট্টগ্রাম কিডনী ফাউন্ডশন হাসপাতাল এবং কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রত্যেককে ২টি করে ডায়ালাইসিস মেশিন প্রদান করা হয়।

পরিশেষ বলতে চাই রোটারির কার্যক্রম সম্পর্কে জনসাধারণের মধ্যে ইতিবাচক ইমেজ তথা ভাবমূর্তি বৃদ্ধির মাধ্যমে, আমরা সারা বিশ্বের প্রগতিশীল ও নেতৃত্বের অধিকারী মানুষের উপর প্রভাব ফেলতে পারি- যার মাধ্যমে আমাদের সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে, রোটারি শক্তিশালী ও দীর্ঘস্থায়ী হবে এবং বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় আমাদের প্রত্যাশা পুরণ হবে।

লেখক : পিডিজি, রোটারি ডিসট্রিকট ৩২৮২ বাংলাদেশ ।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।