সুখের কান্নায় ডান চোখে, কষ্টে বাম চোখে আগে পানি ঝরে—কতোটা সত্য - BANGLANEWSUS.COM
  • নিউইয়র্ক, ভোর ৫:৪২, ২৬শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ


 

সুখের কান্নায় ডান চোখে, কষ্টে বাম চোখে আগে পানি ঝরে—কতোটা সত্য

newsup
প্রকাশিত ডিসেম্বর ৮, ২০২৩
সুখের কান্নায় ডান চোখে, কষ্টে বাম চোখে আগে পানি ঝরে—কতোটা সত্য

নিউজ ডেস্ক: ফেসবুকের বিভিন্ন গ্রুপে মানুষের কান্না সম্পর্কিত একটি ফটোকার্ড প্রচার করা হয়েছে। ‘আধুনিক মনোবিজ্ঞান এবং ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ’ নামের প্রায় ৫ লাখ সদস্যের একটি গ্রুপে মোল্লা ওমর নামের অ্যাকাউন্ট থেকে পোস্ট করা এমন একটি ফটোকার্ডে দাবি করা হয়েছে, ‘আমরা যখন সুখে কান্না করি, তখন সেটা প্রথম ডান চোখ দিয়ে পানি ঝরে, এবং কষ্টের কান্না করলে প্রথম বাম চোখ দিয়ে পানি ঝরে থাকে।’ পোস্টটিতে প্রায় সাড়ে ৬ শ প্রতিক্রিয়া পড়েছে। বাকি পোস্টগুলোতেও শতাধিক প্রতিক্রিয়া পড়েছে।

প্রশ্নোত্তর বিষয়ক ওয়েবসাইট কৌরাতেও মনোবিজ্ঞানের তথ্য হিসেবে উল্লেখিত তথ্যটির অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, সুখের কান্নার প্রথম অশ্রু ডান চোখ দিয়ে ও কষ্টের কান্নার প্রথম অশ্রু বাম চোখ দিয়ে পড়ার তথ্যটি সঠিক নয়। তথ্যটির কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।

কি–ওয়ার্ড অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক ফ্যাক্টচেকিং নেটওয়ার্ক (আইএফসিএন) স্বীকৃত যুক্তরাষ্ট্রের ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠান পলিটিফ্যাক্টের ওয়েবসাইটে কান্নার সঙ্গে চোখের অশ্রুর সম্পর্ক নিয়ে একটি ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদন খুঁজে পাওয়া যায়।

প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়, ২০২২ সালে ফেসবুকে কিছু পোস্ট শেয়ার করে দাবি করা হয়, ‘কারো কান্নার সময় ডান চোখ দিয়ে প্রথম পানি আসলে সেটি সুখের কান্না, বাম চোখ দিয়ে প্রথম পানি আসলে সেটি দুঃখের কান্না। আর যদি দুই চোখ দিয়েই প্রথমে পানি আসে তাহলে সেটি হতাশার।’

তথ্যগুলো সঠিক নয়। যুক্তরাজ্যের অলাভজনক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান ক্লিভল্যান্ডের এক প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠানটি জানায়, কান্না আনন্দ বা কষ্টের—যেটারই হোক, অশ্রুনালি ভেদে তাতে কোনো পার্থক্য হয় না। অর্থাৎ এক সঙ্গে দুই চোখ দিয়েই কান্না আসে। কষ্টের জন্য আলাদা কান্না বা সুখের জন্য আলাদা কান্না হয় না।

পরবর্তীতে ক্লিভল্যান্ডের ওই প্রতিবেদনটি থেকে জানা যায়, তিন পরিস্থিতিতে মানুষের চোখের পানি ঝরে।

১. বেসাল কান্না: এটি চোখের স্বাভাবিক পানি। সব সময় চোখের ভেতরেই থাকে। এটি চোখকে ভেজা রাখে। এর ফলে চোখ কখনো শুকিয়ে যায় না। চোখের পাতা নড়াচড়ার মাধ্যমে এই পানি চোখের পৃষ্ঠে সমানভাবে ছড়িয়ে পড়ে। এ ছাড়া এই পানি চোখের দৃষ্টি উন্নত এবং ফোকাস তীক্ষ্ণ করতে পারে।

২. ইরিটেন্ট টিয়ার্স বা জ্বালাপোড়ার কারণে চোখের পানি ঝরা: এই পানি চোখকে পরিষ্কার রাখে। যখন কেউ পেঁয়াজের খোসা ছাড়ান, বমি করেন বা চোখে ধুলোবালি পড়ে তখন চোখের ভ্রুর নিচের গ্রন্থিগুলো এই পানি নিঃসরণ করে। যা চোখের জ্বালাপোড়া সৃষ্টিকারী বস্তুকে ঠেলে বের করে দেয়।

৩. আবেগের কান্না: মানুষের দুঃখ, কষ্ট, আনন্দ ও রাগের প্রতিক্রিয়ায় এই কান্না আসে। এই কান্না অন্যের কাছে সহমর্মিতা বা সমবেদনা প্রার্থনার বার্তা দেয় বা কাউকে দূরে সরে যেতে বলে। এ কান্নায় অনেক বেশি মাত্রার স্ট্রেস হরমোন ও প্রাকৃতিক ব্যথানাশক থাকে।

আমেরিকান অ্যাকাডেমি অব অপথালমোলজির ওয়েবসাইটে এই আবেগের কান্না সম্পর্কে একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ১৬৬২ সালে ড্যানিশ বিজ্ঞানী নিলস স্টেনসেন আবিষ্কার করেন, মানুষের অশ্রুর উৎপত্তি হয় ল্যাক্রিমাল গ্রন্থি থেকে। মানুষের তিনটি স্বতন্ত্র ধরনের কান্না রয়েছে: স্বাভাবিক চোখের পানি, জ্বালাপোড়ার কারণে পানি আসা এবং আবেগের কান্না। অধিকাংশ গবেষক মনে করেন, আবেগের কান্না মানুষের অনন্য বৈশিষ্ট্য, যা আনন্দ বা কষ্টের তীব্র অনুভূতি থেকে আসে।

এই প্রতিবেদন থেকেও অনুভূতি ভেদে আলাদা চোখ থেকে প্রথমে পানির আসার কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। বরং জানা যায়, মানুষ যখন আবেগের কান্না করে তখন মস্তিষ্কের লিম্বিক তন্ত্রের সংকেতের মাধ্যমে (মস্তিষ্কের আবেগ, স্মৃতি এবং উত্তেজনা বা উদ্দীপনায় সাড়াদানকারী অংশ) ল্যাক্রিমাল গ্ল্যান্ড বা অশ্রুগ্রন্থি (যা দিয়ে সব ধরনের অশ্রু নিঃসরণ হয়) দিয়ে সে কান্না বের হয়ে আসে। উভয় চোখেই একটি করে এই ল্যাক্রিমাল গ্ল্যান্ড বা অশ্রুগ্রন্থি রয়েছে।

প্রতিবেদনগুলো থেকে দেখা যায়, মানুষের সুখের কান্না বা দুঃখের কান্না বলতে আলাদা কোনো কান্না নেই। এই দুই কান্নাই আবেগের কান্নার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। যার সূচনা হয় মস্তিষ্কের লিম্বিক তন্ত্রের সংকেতের মাধ্যমে।

আন্তর্জাতিক ফ্যাক্টচেকিং নেটওয়ার্ক (আইএফসিএন) স্বীকৃত যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠান চেক ইউর ফ্যাক্টকে আমেরিকান অ্যাকাডেমি অব অপথালমোলজি জানায়, অনুভূতি ভেদে আলাদা চোখ থেকে প্রথমে পানির আসার দাবিটির কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।

সিদ্ধান্ত
চোখের পানি ঝরা মানুষের একটি স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় ও আবেগীয় প্রক্রিয়া। আবেগ–অনুভূতির প্রতিক্রিয়ায় পানি ঝরাকেই মূলত কান্না বলা হয়। অনুভূতি আনন্দের বা কষ্টের যাই হোক না কেন— প্রতিক্রিয়া একই রকম হয়। অর্থাৎ উভয় চোখ সমানভাবে সক্রিয় থাকে। সুখের কান্না বা দুঃখের কান্না বলতে আলাদা কিছু নেই। অনুভূতিভেদে আলাদা চোখ থেকে প্রথমে পানির আসার দাবিটির কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।