সময় অসময়- ২১

banglanewsus.com
প্রকাশিত February 7, 2022
সময় অসময়- ২১
মীর লিয়াকত:
জীবনের স্বাভাবিক চলার পথে আজকাল সবচেয়ে মারাত্মক  অন্তরায় গুলোর একটি  শব্দদূষণ। শব্দদূষনের প্রতিক্রিয়া মারাত্মক। বর্তমান ব্যস্ততায় রাত অবধি গোটা প্রকুতি পরিবেশ শব্দ দুষন থেকে রেহাই পাচ্ছে না। নগর সভ্যতায় তো চব্বিশ ঘন্টাই শব্দের ভয়াবহ দূষণ লেগেই আছে। সাধারণ ভাবে আমাদের জীবনযাত্রায় যানবাহন ছাড়াও প্রচন্ড শব্দে নিয়ন্ত্রনহীন মাইকের শব্দে জীবন হয়ে ওঠে দুঃসহ। কিন্তু এ সমস্যায় সবাই নির্বাক কারো যেন কিছুই করার নেই। আমার একজন পরম শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব বছর খানেক আগে শেষ নিশ্যাস ত্যাগ করেছেন। নাম আলাউদ্দিন খান। পাক আসলে ডানকান ব্রাদার্সের একটি চা বাগানের হেডক্লার্ক হিসেবে রিটায়ার্ড করার পর প্রায় নিঃসঙ্গ জীবনযাপন কালে একদিন আমাকে ডেকে নিয়ে গিয়ে বলেছিলেন বাবা তোমরা তো সাংবাদিকতা কর, এই যে অস্বাভাবিক ভাবে চারিদিকে মাইকের শব্দে এমনি সয়লাব হচ্ছে এর কি কোন প্রতিকার নেই? অন্তত একটু লেখার চেষ্টা করো। এভাবেÑ যদি শব্দ দুষন চলতে থাকে তাহলে তো নিরীহ বয়োবৃদ্ধদের কেউ বেঁচে থাকবে না। আমি তাৎক্ষনিভাবে লেখার ব্যাপারে আশ^াস দিলেও ভালোভাবেই জানতাম লিখে কারো কিছু এসে যাবে না। তবু আমি লিখেছিলাম হয়নি কিছুই এবং তাই স্বাভাবিক! শ্রদ্ধেয় সেই ব্যক্তিটি এরপর মাত্র বছরখানেক বেঁচেছিলেন। শেষ দিকে পরিবারবর্গের সাথে তিনি কানাডায় ছিলেন। মৃত্যুর পর  ঐ এলাকায় গিয়ে দেখলাম সেখানে সেই মাইকের তান্ডবলীলা বরং আগের চেয়ে বেড়েছে আরো। এ সমস্যা এখোন আমাদের ঘরে ঘরে ।
আর মত্র বছরখানেক পরই আমরা বিশ সালের দরজায় কড়া নাড়বো। ঘড়ির কাঁটায় এগিয়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত সময়, আর সময়ের সাথে সাথে আমাদের পরিবেশে শব্দদুষন রচনা করেছে এক মারাত্মক ক্ষত। এ ক্ষত যে পরিবেশের ওপর কতটা ভয়াবহ তা ভেবে দেখার মতো অবকাশও আমাদের নেই। তবু শব্দ আমাদের দৈনন্দিন জীবনের একটা অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। শব্দহীনভাবে জীবন থাক।  কথা বলা থেকে শুরু করে বিভিন্ন শব্দ সাধারণভাবে কোন প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি না করলেও যখন শব্দ হয় অস্বাভাবিক তীব্র তখন স্বভাবতই আমাদের শংকিত হতে হয়।
পিথাগোরাসই সম্ভবতঃ প্রথম গবেষণা করেন শব্দের ওপর। কথিত আছে যে পিথাগোরাস একদা এক কামারের দোকানের পাশ দিয়ে যাবার সময় লৌহখন্ডের ওপর হাতুড়ির প্রচন্ড আঘাতজনিত শব্দ অনেকক্ষন দাঁড়িয়ে মনোযোগ সহকারে প্রত্যক্ষ করেন। পরবর্তীতে এ রিদম শব্দ থেকেই তিনি সঙ্গীত যন্ত্র উদ্ভাবন করেন। তবে শব্দ যেমন মধুর সঙ্গীতের সৃষ্টি করে তেমনি মানুষকে আতঙ্কিতও করে। শব্দের গতি প্রতি সেকেন্ডে ১১৬০ ফুট। শব্দের ফলে যে কম্পনের সৃষ্টি হয সেই কম্পনের হারকে ফ্রিকোয়েন্সী বা তীব্রতা বলে। একজন সুস্থ মানুষ ২০ থেকে ২০.০০০ পর্যন্ত ফ্রিকোয়েন্সীতে শুনতে পায় । শব্দ যতো কাছে থেকে হবে তীব্রতা হবে তত বেশী। তবে তরঙ্গের চাপ প্রতিবর্গ সেন্টিমিটারে  এক হাজার  ভাগের দুই ডাইনের সমান (শক্তির একককে  ডাইন বলা হয়) আবার একেই শব্দ পরিমাপের বেলায় ডেসিবেল বা সংক্ষেপে উই  বলা হয়। নীচে শব্দের তীব্রতা অনুযায় উই এর পরিমাণ কিছুটা উল্লেখ করা হলো।
১। সাধারণ শ্যাস প্রশ্যাসের শব্দ -১০ ডি.বি  (ডেসিবেল)
২। পাতা ওড়ানোর শব্দ ২০ ডি.বি
৩। সাধারণ স্বাভাবিক কথাবার্তার শব্দ ৬০ ডি.বি
৪। রেডিও টিভির শব্দ ৭০ ডি.বি
৫। ৪০/৬০ ফুট দুরত্ব থেকে চলন্ত ট্রাকের  শব্দ -৮৫  ডি.বি
৬। জেট বিমানের শব্দ- ১০০ ডি.বি
৭। সাইরেনের শব্দ- ১১৫ ডি.বি
বিজ্ঞানের  দৃষ্টিকোণ থেকে শব্দের এ পরিমাপ অনুযায়ী পরিবেশের ওপর প্রভাব সাধারণভাবে বোঝা সম্ভব নয়। তবে চিকিৎসা বিজ্ঞানে এর প্রভাব সহজবোধ্য। তার কারণ চিকিৎসা বিজ্ঞানে শতকরা পঞ্চাশ ভাগ  রোগের উৎস মুলত শব্দ দূষণ থেকে হয়। শুধু মানুষের কথা বললে ভুল বলা হবে। অন্যান্য প্রাণীরাও শব্দের দ্বারা প্রভাবিত হয়। এ কারণে সরকারের পক্ষ থেকে শব্দ নিয়ন্ত্রণের বিভিন্ন ব্যবস্থা গৃহিত হয়। এক্ষেত্রে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দায়িত্বের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। উদাহরণ স্বরূপ যেমন পথের পাশে রেষ্টুরেন্ট থেকে ডেকসেট প্রকম্পিত করে গান বাজানো কিংবা রাত ১০ টার পর এমপ্লিফায়ারের সাহায্যে হাইটোনে মিউজিক কিংবা ঘোষনা বা অন্যান্য কাজে ব্যবহার করা আইনতঃ নিষিদ্ধ। এমনকি পাশের বাড়ীতে বসে উচ্চ ভল্যূমে রেকর্ড প্লেয়ার বা রেডিও বাজালে তা যদি অন্যের অসুবিধা সৃষ্টি করে তাও আইনতঃ দন্ডনীয় অপরাধ। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে এসব ক্ষেত্রে আইন এতো শিথিল কেন। কেন ওপেন রেষ্টুরেন্ট সমূহে ভল্যূম দিয়ে প্রতিযোগীতা হয় গানের। কোথায় নিয়ন্ত্রন? জীব জগতের দিকে দৃষ্টি দিলে দেখা যায় জীবজগতে শব্দের প্রতিক্রিয়া সম্বন্ধে কোন ধারণা না থাকলেও মানুষের ওপর ক্ষতির প্রভাব স্পষ্ট। শব্দ তীব্র হলে রক্তবাহী নালিগুলো আপনাআপনি সংকুচিত হয়, ফলে রক্তচাপ বৃদ্ধি পায়। বিভিন্ন রোগের উপসর্গ দেখা দেয়। কখনো রক্তে কোলেস্টরেল বৃদ্ধি পায় এবং হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়। যারা কারখানায় কাজ করে তারা অনবরত শব্দের মধ্যে অবস্থান করে বাইরের সাধারন কথাবার্তা শুনতে অসুবিধা হয় এমনকি তারা নিজেরা উচ্চস্বরে কথা না বলে সহজ হতে পারে না। শব্দ তীব্র হলে কানের পর্দায় চাপ পরে। অনেক সময় কানের পর্দা নষ্ট হয়ে শ্রবনশক্তির বিলোপ ঘটে। শব্দের সবচেয়ে মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে মানসিক প্রতিক্রিয়া যার ফলে স্বাভাবিক কর্ম থেকে বিচ্যুত হওয়া এমনকি প্রতিক্রিয়া মারাত্মক হলে ব্রেন ইনজুরির আশংকাও দেখা দিতে পারে।
অবশ্য সরকার আন্তরিক হলে শব্দ দূষণের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারেন। শব্দ দুষনের আশংকায় প্রায়ই বিমানবন্দরগুলো শহর থেকে দুরে রাখা হয়। হাসপাতালের সামনে গাড়ীর হর্ন বাজানো নিষিদ্ধ করা হয় বাংলাদেশে অন্যান্য দেশের মতো শব্দ নিয়ন্ত্রন আইন থাকলেও কার্য্যতঃ তা  পুরোপুরি মেনে চলা হয় না। শব্দ নিয়ন্ত্রনের জন্য যেখানে সরকারী নিষেধাজ্ঞা থাকে যে সব এলাকায়ও শব্দ হয়। শহরে বিয়ের অনুষ্ঠানে কখনো সারারাত ধরে মাইক বাজানো হয়। ফলে পারশবরতী  এলাকার রোগী থাকলে তার রোগ বৃদ্ধি পাবেই। এত সন্দেহের অবকাশ নেই ।
অবশ্য একথাও ঠিক শুধু সরকারের উপর দায়িত্ব দিয়েই সমস্যার কথাবলে সম্ভব নয়। এখানে নাগরিক দায়িত্ব পালনের একটি ব্যাপার আছে। এ দায়িত্ব পালিত হয় না বললেই চলে। উন্নত বিশে^ এই নাগরিক দায়িত্ববোধ শিক্ষাÑসস্কৃতি সভ্যতা সচেতনতা সর্বোপরি সরকারী বিধি ব্যবস্থার কারণে শব্দ অনেকাংশে  নিয়ন্ত্রিত এবং বাইরে জনসাধারনের ওপর তেমন প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে না। বিশে^র দরিদ্রতম দেশের শেষ কাতারে আছে ইথিওপিয়া এবং এর ঠিক ওপরের নামটিই বাংলাদেশ। পৃথিবীতে আমাদের দীনতম অবস্থান কারোরই অজানা নয়। ধারণা নেই শুধু  আমাদের নিজেদের সচেতনতার অভাব আমাদের অনেক পিছিয়ে দিয়েছে। আর আজ তাই আদ্দিসআবাবার ঠিক ওপরে স্থানে কোনক্রমে জায়গা করে আছে ঢাকা। এখনও সচেতনতা বৃদ্ধি না পেলে একেবারে নীচে নেমে থাকাও বিচিত্র নয়। অশিক্ষা কুশিক্ষার দরুন আইনের প্রতি অবজ্ঞা আমাদের সঠিক জীবন পরিক্রমাকে ভ্রান্তপথের দিক  নির্দেশ করে। আশে পাশের শব্দ নিয়ন্তনে রাখা এমন কষ্টসাধ্য হত না যদি আমরা নিজেরা নিজেদের দায়িত্ব পালনে যতœবান হতাম। সচেতনতার প্রসঙ্গে অপ্রাসঙ্গিক একটা কথা  না বলে পারছি না। পাতাকুঁড়ির দেশ পত্রিকাটি বাসষ্ট্যান্ড সংলগ্নে । পত্রিকা অফিসে যাবার সময় ষ্ট্যান্ডে এক মহিলা নিয়ে রাস্তা পেরুচ্ছেন এক ভদ্রলোক। একটি বাসের তীব্র হর্ন বাজাবার জন্য ধমক দেন। ব্যস্, আর যায় কোথায়! বাস চালক হর্নে হাত দিয়েই রাখলেন। কয়েক মিনিট হর্নই বাজালো চালক অট্টহাসি দিয়ে আর বাসের সহযোগীরা তাদের তরমুজের বিচির মতো দাঁত বের করে ভদ্রলোককে বোল্ড করে তৃপ্ত হলো। আরো একটি সচেতনতার অভাব লক্ষ্য করলাম  পাতাকুঁড়ির দেশ থেকে গজ পঞ্চাশেক দুরে স্তুপীকৃত আবজর্নার পাশে লক্ষ্য করলাম এক ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে প্রশ্রাব করছেন। গায়ে গ্যাবার্ডিনের ¯্যুট  চোখে মারকারী সানগøাস। অথচ তার পাঁচ আঙ্গুল পাশেই একটি সাইনবোর্ডে ঝুলানো। লেখা ‘এখানে প্রশ্রাব করলে জুতার বাড়ি দেয়া হবে’! অবশ্য সাইনবোর্ডের সাথে দশাসই একটি জুতোও ঝুলানো ছিল। এ ধরনের সাধারণ সচেতনতা যাদের নেই তারা কিভাবে অন্যান্য সামাজিক-রাষ্ট্রীয় কাজে সহায়তা  করবেন?
যতকাল শিক্ষার হার সন্তোষজনক ভাবে বৃদ্ধি পাবে না ততোকাল সচেতনতাও আসবে না, নাগরিক দায়িত্ববোধও জাগবে না। অতএব নিয়ন্ত্রনহীনভাবে শব্দ দুষন চলবেই আর লাগামহীন শব্দ দুষন নিয়ন্ত্রন যদি আমাদের দেশে করার প্রয়াস নেয়া হয় তাহলে নিজেদের মূল্যাবোধ সৃষ্টির কোন বিকল্প নেই।
লেখক : মীর লিয়াকত, সব্যসাচী লেখক । 

এই সংবাদটি 1,233 বার পড়া হয়েছে

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।