চীন ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়েরই বিকশিত হওয়ার সুযোগ রয়েছে - BANGLANEWSUS.COM
  • নিউইয়র্ক, দুপুর ১:৩২, ১৯শে মে, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ


 

চীন ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়েরই বিকশিত হওয়ার সুযোগ রয়েছে

banglanewsus.com
প্রকাশিত আগস্ট ১০, ২০২২
চীন ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়েরই বিকশিত হওয়ার সুযোগ রয়েছে
ড. ওয়েন ওয়্যাং :: চীনকে হুমকি বিবেচনা করার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যে দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে, তার অবস্থান বস্তুত বাস্তব ইতিহাসের অভিজ্ঞতা ও প্রমাণের বিপরীতমুখী। মতাদর্শিক চিন্তার জায়গায় এমন বদ্ধমূল অবস্থান চীনের একাডেমিকদের বিবেচনায়ও গ্রহণযোগ্য নয়। সত্য-অসত্য বিচারের সুবিধার্থে কিছু প্রামাণ্য তথ্য এ লেখায় উপস্থাপিত হলো।
বিগত চার দশকেরও অধিক সময়ে চীন কোনো যুদ্ধে জড়ায়নি।
ওয়াশিংটনের সহ্যশক্তি পরীক্ষার নামে দেশটি কখনোই ফ্লোরিডা প্রণালি ধরে ডেস্ট্রয়ার বা বোম্বার পাঠানোর পাঁয়তারা করেনি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি দেশ, যার সামরিক ব্যয়ের পরিমাণ বিশ্বের সামরিক পরাশক্তিগুলোর তালিকায় এর পরবর্তী ১০টি দেশের মোট সামরিক ব্যয়ের চেয়েও বেশি। অন্যদিকে চীনের সামরিক ব্যয় যুক্তরাষ্ট্রের মোট অঙ্কের এক-তৃতীয়াংশেরও কম।
লোভের বশবর্তী হয়ে এবং দূরদৃষ্টির অভাবে সৃষ্ট কোনো অর্থনৈতিক সংকট এযাবৎ চীনের সুনিয়ন্ত্রিত অর্থনীতির ওপরে আঘাত করতে পারেনি। চীন এমন একটি দেশ, যেখানে নাগরিকরা, এমনকি স্থানীয় পর্যায়ের পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা পর্যন্ত আত্মরক্ষার স্বার্থে অস্ত্র নিয়ে চলাফেরা করার কোনো প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন না।
সমাজতন্ত্র প্রসঙ্গে মার্কিন রাজনীতিবিদদের আগ্রাসী মনোভাব এবং মার্কিন সরকারের নিয়মিত হুমকি-ধমকি চীনের নাগরিকদের মধ্যে বিভ্রান্তি ও ক্ষোভের জন্ম দেয়।
রাষ্ট্র হিসেবে চীনের কাছ থেকে নানা সুবিধা গ্রহণ করে থাকে যুক্তরাষ্ট্র, যেগুলোর পেছনে রয়েছে মূলত রাষ্ট্র হিসেবে চীনের পরিশ্রমী ও উদার মানসিকতা। প্রতিবছর যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তারা হাজার হাজার ডলারের পণ্য ও সেবা ক্রয় করে থাকেন, যার প্রস্তুতকারক দেশ চীন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরো বেশি চীনা কম্পানি যুক্তরাষ্ট্রে নিজেদের উৎপাদন কারখানা প্রতিষ্ঠা করে যাওয়া এবং চীনের বাজারে মার্কিন কম্পানিগুলোর শেয়ারের পরিমাণ বাড়তে থাকা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রে চীনে উৎপাদিত ভোগ্যপণ্যের সরবরাহ কমে আসার কোনো আশঙ্কা নেই।
চীনের হাতে থাকা এক ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি সমমানের ইউএস ট্রেজারি বন্ড যুক্তরাষ্ট্রকে ২০০৮ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট থেকে রক্ষা করেছে। তা সত্ত্বেও দেশটি চীনের বিরুদ্ধে বাণিজিক সংঘাতে যাওয়ার দুঃসাহস দেখিয়েছে, যার মূল্য শেষ পর্যন্ত দিতে হচ্ছে এর শুল্ক প্রদানকারী সাধারণ ভোক্তাদের। নির্বুদ্ধিতার চরম উদাহরণ সৃষ্টিকারী ওয়াশিংটনের মোড়লরা এবার উন্নত প্রযুক্তির সহায়তা নেওয়া পর্যন্ত বন্ধ করে দিয়েছে, কারণ এই প্রযুক্তির উৎস চীন!
চীন নিজ থেকে এমন কোনো সংঘাতকে প্রশ্রয় দেয়নি, বরং একে প্রতিহত করার লক্ষ্যে পদক্ষেপ গ্রহণ করে এসেছে।
চীনের জনসংখ্যা যুক্তরাষ্ট্রের জনসংখ্যার চার গুণ বেশি। চীনে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার সব দেশের মোট জনসংখ্যার চেয়েও বেশি। তাই চীনের জিডিপি যে যুক্তরাষ্ট্রের জিডিপি ছাড়িয়ে যেতে সক্ষম হবে, তা বলাই বাহুল্য। প্রতিনিয়ত চীনের প্রবৃদ্ধি দমন করার প্রচেষ্টার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র চীনের নাগরিকদের মধ্যে এই ধারণার জন্ম দিয়েছে যে শুধু ক্ষোভের বশবর্তী হয়েই দেশটি তাদের উন্নত জীবনযাপনের পথে বাধা সৃষ্টি করছে। বস্তুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কোনো খেলার প্রতিযোগিতা নয়, যেখানে বিজয়ীদের জন্য পুরস্কারের হাতছানি থাকবে।
চীন বিশ্বের বেশির ভাগ দেশের তুলনায় অধিকসংখ্যক আন্তর্জাতিক চুক্তি স্বাক্ষর করেছে এবং আন্তর্জাতিক সংস্থায় যোগ দিয়েছে। ১৯৪৫ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত জাতিসংঘের মূলনীতিকে বিবেচনায় রেখে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা রক্ষা নিশ্চিত করার ব্যাপারে দেশটি অত্যন্ত সচেতন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা থেকে উপকৃতদের তালিকায় চীন ছাড়াও আরো বহু রাষ্ট্র রয়েছে, তা সত্ত্বেও দেশটি এই ব্যবস্থায় কোনোরূপ পরিবর্তন আনার কোনো প্রয়োজন অনুভব করে না।
তিব্বত, শিনজিয়াং ও হংকং প্রসঙ্গে চীনের বিরুদ্ধে আনীত মার্কিন অভিযোগের সঙ্গে দেশটি একমত নয়। উইঘুর ও তিব্বতের অধিবাসীদের জন্য জনসংখ্যা ও জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের সুযোগ ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। পাশাপাশি হংকংয়ের অর্থনীতি রীতিমতো বিশ্বের অনেক উন্নত দেশের তুলনায় অধিক গতিশীলতা লাভ করেছে।
আদর্শ আর নীতিনৈতিকতার বুলি আওড়ানো মার্কিন মোড়লদের বরং নিজেদের দুর্দশাগ্রস্ত ও নেশায় আসক্ত সমাজের দিকেই বেশি মনোযোগ দেওয়া উচিত, এমনটা মনে করে চীনের সাধারণ মানুষ। বাফেলো কিংবা ইউভালডের মতো জায়গাগুলোতে সংঘটিত দুর্ঘটনাগুলোর কথা কারো পক্ষে ভুলে যাওয়া সম্ভব নয়। যুক্তরাষ্ট্র থেকে পোস্ট করা চীনা পর্যটকদের ভিডিওতে দেখা গেছে, মাইলের পর মাইল লম্বা রাস্তার ধারে তাঁবু বানিয়ে দিনাতিপাত করছেন অসংখ্য ‘হোমলেস’ মার্কিন, এই ছোট্ট তাঁবুই যাদের একমাত্র ‘হোম’! মার্কিন রাষ্ট্রব্যবস্থার এমন দুর্দশা হতবাক করে দিয়েছে চীনের জনসাধারণকে। যুক্তরাষ্ট্রের সীমানা ছাপিয়ে যাওয়া অপরাধের মাত্রা এবং শহরগুলোতে বাড়তে থাকা নৃশংসতার উদাহরণ চীনের মানুষের মনে গভীর উদ্বেগ জন্ম দিয়েছে।
যাদের একসময় চীনের জনগণ অনুকরণীয় বলে মনে করত, আজ তাদের এই স্খলনের ব্যাখ্যা কেমন হতে পারে? রাষ্ট্র হিসেবে এগিয়ে যাওয়া ও সাফল্যের পন্থা অনুসন্ধানের প্রশ্নে চীন বরাবরই যুক্তরাষ্ট্রকে আদর্শিক অবস্থানে রেখে এসেছে। এই আদর্শের শিক্ষাকে পুঁজি করে চীন বহু বছরের পথ পাড়ি দিয়ে আজকের অবস্থানে এসেছে এবং রীতিমতো অধিকার নিয়েই বর্তমান বিশ্বে নিজেকেও এক আদর্শ রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। এই সাফল্যকে অন্য কোনোভাবে পর্যালোচনার কোনো অবকাশ নেই।
‘যুক্তরাষ্ট্র’ নামের সঙ্গে একসময় যে বড় বড় স্বপ্নের সংযোগ ছিল, সেসব স্বপ্ন ভেঙে গিয়ে চীনা নাগরিকদের মধ্যে এখন এসেছে রাজনৈতিক নবজাগরণ, জন্ম নিয়েছে এক নতুন আত্মবিশ্বাস। নিজেদের তিন হাজার বছরের সংস্কৃতি ও অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করে চীন নিজে এখন বিশ্বকে আরো উন্নত করে তোলার পথে অগ্রসর হচ্ছে।
সহজাতভাবে উদ্যোক্তাসুলভ মানসিকতা নিয়ে চলা সত্ত্বেও চীনের মানুষ পুঁজিবাদের অবাধ বিস্তারকে ভালো চোখে দেখে না। আমরা বাজারে পুঁজির সরবরাহকে একটি নিয়ন্ত্রণের আওতায় রাখার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করতে পারি। সেই সঙ্গে এটিও আমাদের কাছে স্পষ্ট যে এই নিয়ন্ত্রণের মূল লক্ষ্য সামাজিক সমতা বিধান ও রাষ্ট্রীয় মঙ্গল সাধনে সুপরিমিত মানোন্নয়ন নিশ্চিত করা। এই সূত্র অনুসরণ করেই চীন দারিদ্র্য বিমোচন করেছে এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের প্রশ্নে দেশে অভূতপূর্ব রূপান্তর সাধন করেছে।
চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কৌশলগত পার্থক্য এখানেই। যখন একটি দেশ তার সব নাগরিককে নিয়ে একসঙ্গে ওপরে ওঠার সিঁড়িতে পা রাখছে, তখন অন্যটি হয় অভিজাতদের কিংবা রীতিমতো বর্বর স্বভাবের মানুষের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে হতাশার অন্ধকারে ক্রমেই তলিয়ে যাচ্ছে।
এটি সত্য যে চীন ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়ের সামনেই আরো বিকশিত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। রাজনীতি ও মতাদর্শিকতার প্রশ্নে দুটি রাষ্ট্রেরই আরো কাজ করা প্রয়োজন। জড়তা কাটিয়ে একে অন্যের ব্যাপারে ইতিবাচক মন্তব্য করার সক্ষমতা অর্জন করা এবং একে অন্যের শক্তি থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে একটি সমন্বিত অগ্রগতির দিকে মনোযোগী হওয়ার মাধ্যমেই রাষ্ট্র দুটি তাদের মধ্যকার দূরত্ব ও স্নায়বিক চাপের ব্যবধান কমাতে পারে।
লেখক : চনগিয়াং ইনস্টিটিউট ফর ফিন্যানশিয়াল স্টাডিজের এক্সিকিউটিভ ডিন এবং রেনমিন ইউনিভার্সিটি অব চায়নার (আরইউসি) ভাইস প্রেসিডেন্ট
সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।