BengaliEnglishFrenchSpanish
করপোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি এবং ব্যাংকিং খাত - BANGLANEWSUS.COM
  • ৬ই ডিসেম্বর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ


 

করপোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি এবং ব্যাংকিং খাত

banglanewsus.com
প্রকাশিত নভেম্বর ১৪, ২০২২
করপোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি এবং ব্যাংকিং খাত

নিরঞ্জন রায় ::: বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি করপোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি অর্থাৎ সিএসআর বা করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা পালনে দেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকার ওপর কিছু তথ্য স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক সাধারণত দেশের ব্যাংকিং খাতের মূল কার্যক্রম; যেমন—ব্যাংকের সঞ্চয়ের হ্রাস-বৃদ্ধি, ঋণদান পরিমাণ, খেলাপি ঋণের পরিমাণ, অর্জিত মুনাফা প্রভৃতি তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করে থাকে। সেই হিসেবে দেশের ব্যাংকগুলোর সিএসআরে ভূমিকা রাখার তথ্য বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে প্রকাশ করা কিছুটা ব্যতিক্রম হলেও এর গুরুত্ব অনেক। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী বিগত ছয় মাসে অর্থাৎ জানুয়ারি থেকে জুন ২০২২ সময়কালে দেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান মোট ৬.৭৩ বিলিয়ন টাকা সিএসআর বাবদ ব্যয় করেছে, যা তার পূর্ববর্তী ছয় মাসে অর্থাৎ জুলাই থেকে ডিসেম্বর ২০২১ সময়কালে ছিল মাত্র ৩.১০ বিলিয়ন টাকা।

এই ৬.৭৩ বিলিয়ন টাকার মধ্যে বিভিন্ন ব্যাংকের ব্যয় ৬.২৯ বিলিয়ন টাকা এবং বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ব্যয় ০.৪৩ বিলিয়ন টাকা। সিএসআর বাবদ মোট ৬.৭৩ বিলিয়ন টাকা ব্যয়ের মধ্যে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা খাতে ব্যয় হয়েছে ৪.৬১ বিলিয়ন টাকা, শিক্ষা খাতে ব্যয় হয়েছে ০.৮০ বিলিয়ন টাকা এবং স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় হয়েছে ০.৫০ বিলিয়ন টাকা।
উল্লিখিত তথ্যগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে দেশের ব্যাংক ও আর্থিক খাত তাদের সিএসআর পালনে ভালো ভূমিকা রাখতে শুরু করেছে এবং বিগত ছয় মাসে এই খাতে তাদের অর্থ বরাদ্দের পরিমাণ দ্বিগুণের বেশি করেছে, যা খুবই ভালো লক্ষণ। তবে এই উল্লেখযোগ্য ব্যয় বৃদ্ধি যদি এই সময় দেশে ঘটে যাওয়া বন্যার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে সাহায্য করা বা প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে অনুদান প্রদানের কারণে হয়ে থাকে, তাহলে এই ব্যয় বৃদ্ধির ধারা ভবিষ্যতে অব্যাহত থাকবে কি না তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ থাকতেই পারে। কেননা এর বেশির ভাগ অর্থ ব্যয় হয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায়। বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের প্রকাশিত তথ্যে এ বিষয়ে কোনো কিছু উল্লেখ করেনি। এখানে আরো একটি বিষয় লক্ষ করার মতো, তা হচ্ছে এই খাতে ব্যাংকগুলোর অর্থ ব্যয়ের তুলনায় অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অর্থ ব্যয়ের পরিমাণ খুবই নগণ্য; অর্থাৎ মাত্র ০.৪৩ বিলিয়ন টাকা অর্থাৎ ৬.৪০ শতাংশ। সুতরাং দেশের ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা পালনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত সেই তথ্য থেকে আরো একটি বিষয় উল্লেখ করার মতো, তা হচ্ছে দেশে অর্ধশতাধিক ব্যাংক এবং শতাধিক ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান থাকলেও মাত্র সাত-আটটি ব্যাংক ও হাতে গোনা কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান এই সামাজিক দায়বদ্ধতা পালনে ভূমিকা রাখতে পেরেছে। অন্যরা সেভাবে এখনো শুরুই করেনি, যা মোটেই আশার কথা নয়।

এখন করপোরেট বিশ্বের যুগ। সব কিছুর পেছনেই রয়েছে করপোরেট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের প্রভাব, ভূমিকা ও অবদান। বিশ্বের রাজনীতি, অর্থনীতি ও সমাজনীতি—এর সব কিছুই আবর্তিত হচ্ছে করপোরেট ব্যবসা-বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে। দেশের রাজনীতিবিদরাও নীতি প্রণয়ন করে থাকেন করপোরেট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সুবিধার কথা মাথায় রেখে। এই প্রবণতা আবার উন্নয়নশীল বিশ্বের চেয়ে উন্নত বিশ্বে অনেক বেশি, তবে সেটি হয় কিছুটা ছদ্মাবরণে এবং বেশ উন্নত পদ্ধতিতে, যা খালি চোখে খুব একটা দেখা যায় না। জনগণ কর দিয়ে সরকার পরিচালনার সুযোগ করে দিলেও রাজনৈতিক দল চালানোর জন্য যে অর্থের প্রয়োজন তার জোগান এই করপোরেট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানই দিয়ে থাকে। আবার এ কথাও অস্বীকার করা যাবে না যে দেশের অর্থনৈতিক উন্নতিতে, বিশেষ করে বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এই করপোরেট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সুতরাং মুনাফা অর্জন করপোরেট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মূল লক্ষ্য হলেও তারা দেশের বিভিন্ন খাতে ভালো ভূমিকা রাখে এবং এ কারণেই সিএসআর এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও আলোচিত বিষয়। উন্নত বিশ্বের করপোরেট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের স্লোগানই হচ্ছে সমাজ, কমিউনিটি, গ্রাহক বা কাস্টমার ও শেয়ারহোল্ডারের জন্য কাজ করা। ফলে সেসব প্রতিষ্ঠান সিএসআরকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়। এই খাতে ভালো অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ ছাড়াও আরো অনেক পদক্ষেপ গ্রহণ করে থাকে। এই দিক থেকে আমাদের দেশের করপোরেট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও পিছিয়ে নেই। ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান যেহেতু একটি নিয়ন্ত্রক সংস্থা, অর্থাৎ বাংলাদেশ ব্যাংকের অধীনে কাজ করে, তাই তাদের তথ্য কেন্দ্রীয়ভাবে সংরক্ষিত থাকে বলে নিয়মিত প্রকাশিত হয় এবং আমরা জানতে পারি। কিন্তু অন্যান্য বৃহৎ করপোরেট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও এই খাতে ভালো ভূমিকা রাখে, যা কোনো নিয়ন্ত্রক সংস্থার অধীনে সংরক্ষিত থাকে না। ফলে নিয়মিত প্রকাশিত না হলেও সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবর থেকে আমরা জানতে পারি।

বর্তমান করপোরেট বিশ্বে সিএসআরের মানদণ্ড শুধু এই খাতে কিছু অর্থ ব্যয়ের মাধ্যমে মূল্যায়ন করা উচিত হবে না। এর পরিধি এখন বেশ বিস্তৃত। আধুনিক করপোরেট ওয়ার্ল্ডে সিএসআর একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানকে কিছুটা স্বশাসিত প্রতিষ্ঠানে পরিণত করে। পরিবেশ, সমাজ, কমিউনিটি এবং সর্বোপরি দেশের ভালো হয় এ রকম সিদ্ধান্ত ও নীতি এই করপোরেট প্রতিষ্ঠান নিজেরাই গ্রহণ করে থাকে। এ কারণেই বর্তমান বিশ্বে, বিশেষ করে উন্নত বিশ্বের সমাজে সিএসআরের প্রভাব বিশেষ করে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পরিবেশসংক্রান্ত বিষয়ে এর প্রভাব অনেক বেশি। এ কারণেই অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরো অনেক দায়িত্ব পালন করতে হয়। এ ক্ষেত্রে আমাদের দেশের করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো অনেকটাই পিছিয়ে আছে। যদিও অনেক প্রতিষ্ঠান এ রকম দায়িত্ব পালন করে থাকে, কিন্তু তা মোটেই উল্লেখ করার মতো নয়, অন্তত আমাদের মতো সাধারণ মানুষের জানার মধ্যে নেই। এখন সময় এসেছে আমাদের দেশের করপোরেট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে এদিকে নজর দেওয়ার এবং ভালো ভূমিকা রাখার।

সিএসআর বিষয়কে মোটামুটি চারটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হয়ে থাকে এবং সেগুলো হচ্ছে, ১. পরিবেশগত, ২. নৈতিকতা, ৩. মানবিক বা অনুদান এবং ৪. আর্থিক বিষয়। করপোরেট প্রতিষ্ঠান যেকোনো পদক্ষেপ গ্রহণের আগে ভেবে দেখবে যে তার প্রভাব পরিবেশের ওপর কিভাবে পড়তে পারে। যেমন—ডিজিটাল বাংলাদেশে কাগজবিহীন বা পেপারলেস অফিস হবে; যেখানে কোনো কাগজ, কালি বা প্রিন্টারের ব্যবহার থাকবে না এবং এর ফলে পরিবেশের ক্ষতি হবে না। কিন্তু আমাদের দেশের ব্যাংকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অফিসে গেলে দেখা যায়, প্রত্যেক কর্মকর্তার টেবিলের ওপর কাগজের স্তূপ। সিএসআরের অংশ হিসেবে প্রত্যেক ব্যাংক তাদের অফিস কাগজবিহীন বা পেপারলেস ঘোষণা করতে পারে। সমগ্র ব্যাংকে সেটি করা সম্ভব না হলেও কোনো বিশেষ বিভাগ বা নির্দিষ্ট কোনো অফিসে সেটি শুরু করে পর্যায়ক্রমে তার পরিধি বিস্তৃত করা সম্ভব। একইভাবে নৈতিকতার বিষয়টি এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অনেক কারণেই আমাদের সমাজে নৈতিকতার চরম অধঃপতন ঘটেছে, তাই একে ফিরিয়ে এনে সমাজে ন্যয় ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ব্যাংকসহ অন্যান্য করপোরেট প্রতিষ্ঠান এই সিএসআরের অধীনে ভালো ভূমিকা রাখতে পারে। যদিও এর অনুশীলন আমাদের সব করপোরেট অফিসে খুব একটা নেই। তার পরও এটি শুরু করলে একটি ভালো কর্ম সংস্কৃতি বা পরিবেশ তৈরি হবে। যেমন—আমাদের দেশের ব্যাংক এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাঁর অধস্তন কর্মকর্তাকে সামান্য ভুলের জন্যও খুব খারাপভাবে গালমন্দ করে থাকেন। যদিও সবাই এমনটা করেন না, কিন্তু অনেকেই করেন। আবার কোনো কর্মকর্তা ছুটি নিতে চাইলে তাঁকে অনেক ক্ষেত্রেই নিরুৎসাহ করা হয়; এমনকি কর্মক্ষেত্রে বয়স্কদের কাজের গতিকে একটু ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখা হয়, আবার মহিলাদের কাজের মানকে অনেক ক্ষেত্রে নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখা হয়। যদিও এই প্রবণতা আগের থেকে অনেক কমে গেছে, তার পরও সব অফিস-আদালতেই যথেষ্ট দৃশ্যমান। এর কোনো কিছুই সিএসআরের নৈতিকতার মধ্যে পড়ে না। আর এ কারণেই দেশের ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য করপোরেট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে তাদের সিএসআরের আওতায় এ বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করে যথেষ্ট ভূমিকা রাখতে পারে।

আমাদের দেশে সুবিধাবঞ্চিত মানুষের সংখ্যাও অনেক এবং তাদের কাজে নিয়োগ দিলে হয়তো তারা অন্য সবার মতো সমানতালে পারফর্ম করতে পারবে না, কিন্তু তার পরও তাদের এই সিএসআরের আওতায় নিয়োগ দিতে হবে। এই উদ্দেশ্যে প্রত্যেক নিয়োগের সময় একটি নির্দিষ্টসংখ্যক পদে এই সুবিধাবঞ্চিতদের নিয়োগ দিলে সিএসআর পালনে ভালো ভূমিকা রাখা হবে। এ রকম আরো কিছু বিষয় আছে যেখানে ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং অন্যান্য করপোরেট ব্যাবসায়িক প্রতিষ্ঠান তাদের সিএসআরের পরিধি বিস্তৃত করে এ ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা কিছুটা হলেও আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে পারে। দেশের করপোরেট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের এই সিএসআর পালনে ভূমিকা রাখতে উৎসাহিত করার জন্য সরকারেরও কিছু উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। যেমন—এই খাতে যে অর্থ ব্যয় করা হয়, তা আমাদের দেশে কোনো প্রকার কর সুবিধা পায় কি না আমার জানা নেই। যদি পায়, তাহলে তো খুবই ভালো। কিন্তু যদি না পায়, তবে সে ক্ষেত্রে ব্যয় করা সম্পূর্ণ অর্থকে করমুক্ত সুবিধা দেওয়া না গেলেও এই অর্থের ওপর একটি নির্দিষ্ট হারে ট্যাক্স ক্রেডিট দেওয়া যেতে পারে। উল্লেখ্য, করমুক্ত সুবিধা এবং কোনো নির্দিষ্ট অর্থের ওপর ট্যাক্স ক্রেডিট এক কথা নয়। এই দুই বিষয়ের পার্থক্য পরিষ্কার করতে গেলে বিস্তারিত আলোচনার প্রয়োজন, যার সুযোগ এখানে নেই। মোটকথা হচ্ছে, বিগত ছয় মাসে আমাদের দেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান তাদের সিএসআর খাতে অর্থ ব্যয় দ্বিগুণ করেছে, এটি একটি ভালো দিক। তাই দেশের ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং অন্যান্য করপোরেট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান যদি অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি তাদের ভূমিকা আরো বিস্তৃত করে, তাহলেই দেশে প্রকৃত সিএসআর বা করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা বাস্তবায়িত হতে পারে।

লেখক : সার্টিফায়েড অ্যান্টি-মানি লন্ডারিং স্পেশালিস্ট ও ব্যাংকার, টরন্টো, কানাডা

এই সংবাদটি 1,226 বার পড়া হয়েছে

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।