দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় আরও পরিকল্পনার প্রয়োজন - BANGLANEWSUS.COM
  • নিউইয়র্ক, রাত ১০:৫৯, ১৭ই মে, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ


 

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় আরও পরিকল্পনার প্রয়োজন

newsup
প্রকাশিত জানুয়ারি ৩০, ২০২৪
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় আরও পরিকল্পনার প্রয়োজন

ফিচার ডেস্ক: জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে যেসব দেশ ঝুঁকিতে আছে, বাংলাদেশ
তার অন্যতম। দেশের লাখ লাখ মানুষ বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, ভূমিকম্প, ভূমিধস,
দাবদাহ, খরা, অগ্নিকাণ্ড এবং শিল্প দুর্ঘটনার মতো বিভিন্ন প্রাকৃতিক ও
মানবসৃষ্ট দুর্যোগের মুখোমুখি হচ্ছে। এসব দুর্যোগ দেশের আর্থসামাজিক
উন্নয়ন এবং মানব নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি, যার
প্রভাব বাংলাদেশে বিদ্যমান। এ শতকের শেষদিকে দেশের গড় তাপমাত্রা ১
ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে ৩.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পাবে বলে আশঙ্কা
করা হচ্ছে, যা মানুষের স্বাস্থ্য এবং জীবনযাপনের ওপর বিরূপ প্রভাব
ফেলবে এবং প্রাকৃতিক সম্পদের ক্ষতিসাধন হবে। যদিও বাংলাদেশ বন্যার
মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় সক্ষম হয়েছে, তারপরও ২০৪০ সাল
নাগাদ দেশের ৬০ লাখ থেকে ১ কোটি ২০ লাখ মানুষ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত
হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এছাড়া ২০৫০ সালের মধ্যে প্রায় ২ কোটি
১০ লাখ মানুষ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, প্রায়
১ কোটি ৩০ লাখ মানুষ অতিরিক্ত তাপমাত্রা অনুভব করবে এবং ১ কোটি
৩৮ লাখ মানুষ ঘূর্ণিঝড়ের কবলে পড়বে বলেও এক সমীক্ষায় উঠে এসেছে।
স্বাধীনতা-পূর্ব ও পরবর্তী সময় অসংখ্য প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট
বিপর্যয়ের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশ। সাম্প্রতিক ইতিহাস থেকে দেখা
যায়, প্রতিবছর বন্যা ও নদীভাঙনের কারণে দেশের প্রায় ১০ লাখ মানুষ
নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। নিয়মিতভাবে তিন থেকে পাঁচ বছরের ব্যবধানে
বন্যায় দেশের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ নিমজ্জিত হচ্ছে, যার দুই-তৃতীয়াংশ
ভূমিকে প্রভাবিত করছে। তবে দেশে ঘূর্ণিঝড়ে মৃতের সংখ্যা অনেক হ্রাস
পেয়েছে।

দুর্যোগ মোকাবিলায় দেশ আজ অনেকাংশে সফল হলেও বজ্রপাত, ভূমিকম্প,
ভূমিধস, দাবদাহ, খরা ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি রয়ে গেছে। এগুলো
মোকাবিলা করার মতো অবকাঠামো ও জনবল থাকলেও তা প্রয়োজনের
তুলনায় অপর্যাপ্ত। সাম্প্রতিক সময়ে বজ্রপাতে গড়ে ২৮৮ থেকে ৩২৫ জন
মারা যাচ্ছে এবং এ মৃতের হার প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। পার্বত্য
চট্টগ্রামের মতো দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত পার্বত্য অঞ্চলগুলো ভূমিধসের
ঝুঁকিতে রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ স্বল্পমাত্রার কিছু
ভূমিকম্পের সম্মুখীন হয়েছে, যা ভবিষ্যতে একটি বড় ভূমিকম্পের আভাস
দিচ্ছে বলে বিশেষজ্ঞরা বলছেন। উপরন্তু, শুষ্ক মৌসুমে দেশের বিভিন্ন
স্থান খরার মধ্য দিয়ে গিয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি
দুর্ঘটনাজনিত বিপর্যয়েরও সম্মুখীন হচ্ছে দেশ। এর উদাহরণ সাভারের
রানা প্লাজা ধস ও সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন জায়গায় অগ্নিকাণ্ড,
রাসায়নিক বিস্ফোরণের ঘটনা।
দুর্যোগের আকস্মিক ঝুঁকি কমাতে এবং সহনশীলতা বাড়ানোর জন্য দুর্যোগ
ব্যবস্থাপনাবিষয়ক কার্যকর নীতি ও অনুশীলন প্রয়োজন। দুর্যোগের এ
পরিবর্তিত প্রকৃতি এবং অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে সরকার তার দুর্যোগ
ব্যবস্থাপনা নীতি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিকশিত করেছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ
প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়; কিন্তু যথাযথ পরিকল্পনার মাধ্যমে তা
মোকাবিলা করা সম্ভব। সরকারের গৃহীত বিভিন্ন পরিকল্পনার কারণে
বর্তমানে বন্যা, নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং
কোভিড-১৯ মহামারি প্রতিরোধে বাংলাদেশ বহির্বিশ্বে রোল মডেল হিসাবে
পরিচিত হয়েছে। সুদূর অতীতে বাংলাদেশে বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ে হাজার হাজার
মানুষ প্রাণ হারিয়েছে এবং সম্পদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। কিন্তু
বর্তমানে এ সংখ্যা অনেক কম এবং ক্ষতির পরিমাণও অনেকাংশে কমিয়ে
আনা হয়েছে। সাম্প্রতিককালে সংঘটিত অনেক সুপার সাইক্লোনের সময় ১৮
থেকে ২৪ লাখ মানুষকে সাইক্লোন শেল্টারে নেওয়া হয়েছে। এসব সাইক্লোন
ও বন্যায় প্রাণহানির সংখ্যা খুব কম। দুর্যোগের আগাম প্রস্তুতি হিসাবে
সরকারের পক্ষ থেকে আধুনিক আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে।
উপকূলীয় এলাকায় রাস্তা ও বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। দুর্যোগ মোকাবিলা

করার জন্য সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে দক্ষ স্বেচ্ছাসেব প্রস্তুত রাখা
হয়েছে। এখন যে কোনো দুর্যোগ মোকাবিলা করতে আবহাওয়া অফিসের
সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আবহাওয়া সংস্থা যেমন, উইন্ডি,
আইএমডি, জিএফএস ইত্যাদি এর আবহাওয়ার পূর্বাভাসও গ্রহণ করা হয়।
ফলে অনেক যাচাই-বাছাই করে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে যথাযথ ব্যবস্থা
গ্রহণ করা সম্ভব হচ্ছে।
সর্বশেষ প্রকাশিত দুর্যোগ ব্যবস্থা পরিকল্পনা (২০২১-২০২৫) অনুযায়ী,
বাংলাদেশ সাত বা এরও অধিক মাত্রার ভূমিকম্প সংঘটিত হওয়ার ঝুঁকিতে
আছে। ধারণা করা হয়, যদি সাত বা এর অধিক মাত্রার ভূমিকম্প সংঘটিত
হয়, তাহলে বিভিন্ন ধরনের ভবন, রাস্তা, গ্যাসফিল্ড, ব্রিজ, রেললাইন
ইত্যাদির ব্যাপক ক্ষতি হবে। একটি সাত মাত্রার ওপরের ভূমিকম্প ঢাকা
শহরের প্রায় ৭২ হাজার ভবনধসের কারণ হবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগ আমাদের দেশের ব্যাপক ক্ষতির কারণ হতে পারে,
তা জানার পরও মোকাবিলা করার মতো ক্ষমতা বিদ্যমান ব্যবস্থায় অনেক
কম। সরকারের পক্ষ থেকে নানা ধরনের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হলেও তা
বাস্তবায়নে প্রয়োজন আরও বেশি উদ্যোগ। প্রয়োজন হলো সঠিক নিয়ম
মেনে ভবন তৈরি করা। আরবান রিজিল্যান্স প্রকল্প অনুসারে, ঢাকা শহরের
প্রায় ৫৭৯টি ভবন ঝুঁকিপূর্ণ, ২২টি ভবন ভেঙে ফেলতে হবে এবং ২২৯টি
ভবনের সংস্কার প্রয়োজন। তবে ৯০ শতাংশ ভবনের সমীক্ষা এখনো বাকি
আছে। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুসারে, রাজউকের
আওতাধীন ৬৬ শতাংশ ভবন বিল্ডিং কোড মেনে তৈরি হয়নি। এছাড়া ড্যাপ-
২০২২ অনুযায়ী, ঢাকা মহানগরী এলাকার ৯০ শতাংশ রাস্তা ২০ ফুটেরও কম
চওড়া; যা ভূমিকম্প বা অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় বড় বাধা
সৃষ্টি করবে।
দেশে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় যথেষ্ট অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু এখনো দুর্যোগ
ব্যবস্থাপনায় অনেক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হচ্ছে। এর মধ্যে কয়েকটি
চ্যালেঞ্জ হলো-পর্যাপ্ত সম্পদ এবং তহবিলের অভাব, আইনের সঠিক
প্রয়োগ না হওয়া, অপর্যাপ্ত তথ্য এবং তথ্যের অব্যবস্থাপনা,

জনসচেতনতার অভাব, জলবায়ু পরিবর্তন ইত্যাদি। এসওডি-২০১৯ ও
এনপিডিএম ২০২১-২০২৫ কার্যকরভাবে এবং দক্ষতার সঙ্গে বাস্তবায়নের
মাধ্যমে বাংলাদেশকে এ চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করতে হবে। জলবায়ু
পরিবর্তনজনিত হুমকির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার জন্য আমাদের অবশ্যই
দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
এসওডির আরও ভালো প্রয়োগ নিশ্চিত করার জন্য ইউনিয়ন দুর্যোগ
ব্যবস্থাপনা সংস্থান কমিটি গঠন করা প্রয়োজন। সরকারকে ইউনিয়ন
পর্যায়ে দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য ইমার্জেন্সি তহবিলের ব্যবস্থা করতে
হবে, যা প্রাথমিক সতর্কতা, অনুসন্ধান, উদ্ধার এবং আশ্রয়
ব্যবস্থাপনার উন্নয়নের জন্য ব্যবহার করা হবে। মন্ত্রণালয় দ্বারা
সমন্বিত একটি কারিগরি দল গঠন করতে হবে। যারা প্রাকৃতিক দুর্যোগ
এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিভিন্ন প্রকাশিত তথ্য বিশ্লেষণ করবে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ নিম্ন-আয়ের পরিবারকে দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
সরকার কাবিখা, টিআরের মতো কার্যক্রম গ্রহণ করেছে এবং এ
কার্যক্রমের আওতায় দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের সক্ষম করে তুলতে
যথাযথ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সরকার। ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলার প্রাকৃতিক
ঢাল হিসাবে পরিচিত উপকূলীয় অঞ্চলের ম্যানগ্রোভ বনের সংরক্ষণ ও
পুনরায় বৃক্ষরোপণ কার্যক্রম
জোরদার করা খুবই জরুরি। বন্যা প্রতিরোধী ভবন নির্মাণ, উপকূলীয়
প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা এবং জলবায়ু-স্মার্ট
পরিবহণ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। এ ছাড়া দুর্যোগের ভয়াবহতা
থেকে রক্ষা পেতে পূর্বপ্রস্তুতি, পরিকল্পনা ও প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা
আরও শক্তিশালী করতে হবে। একই সঙ্গে মানুষকে সচেতনতা বৃদ্ধির
মাধ্যমে দুর্যোগের সময় কাছাকাছি অবস্থিত আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে আগ্রহী
করতে হবে।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।