থাইল্যান্ডের ক্রাবি ভ্রমণ গাইড: যাওয়ার উপায় ও আনুষঙ্গিক খরচ

লেখক: Shiuly
প্রকাশ: ২ years ago

Manual5 Ad Code

ডেস্ক রিপোর্ট: দ্বীপদেশের মনমুগ্ধতার নেপথ্যে রয়েছে রোদের আলোয় চিকচিক করা বালি আর আলোক ছটা দেওয়া ঢেউ। সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত বালুকাবেলায় ঝিনুকের আঁকিবুকিগুলো যেন সাবধানে পা ফেলতে বলে সৈকতপ্রেমিককে। এরপরেও উপেক্ষা করা যায় না খালি পায়ে হাঁটা বা সূর্যস্নানের হাতছানি। সমুদ্রের বিশাল বিস্তৃতির উপর দিয়ে লালিমার দিগন্ত রাতের অন্ধকারে মিলিয়ে যাওয়া এক অদ্ভূত শিহরণ জাগিয়ে তোলে।

এই প্রতিটি উপাচারকে সঙ্গে নিয়ে মহাদেশগুলোতে বিচিত্রভাবে সেজে ওঠে সমুদ্রবিলাস। এমনি একটি মহাদেশ এশিয়া, যেটি বিশ্বের সেরা দ্বীপদেশগুলো নিয়ে যুগ যুগ ধরে নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান ধরে রেখেছে। এমনকি দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার জনপ্রিয় কিছু পর্যটন স্থান পরম যত্নে লালন করে চলেছে মনোরম সব সমুদ্র সৈকত। তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ মিলবে থাইল্যান্ডের ক্রাবিতে গেলে। চলুন, অনন্য নান্দনিকতায় ভরপুর ক্রাবি ভ্রমণের আদ্যোপান্ত জেনে নেওয়া যাক।

ক্রাবির ভৌগলিক অবস্থান
দক্ষিণ থাইল্যান্ডের পশ্চিম উপকূলের ক্রাবি প্রদেশের রাজধানীর নাম ক্রাবি। চুনাপাথরের কার্স্ট এবং ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলে অবস্থিত এই শহর থেকে ক্রাবি নদী ফাং নাগা উপসাগরের সঙ্গে মিশেছে। আন্দামান উপকূলের কাছাকাছি এই রিসোর্ট শহরটি ব্যাংকক থেকে ৬৫০ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত।
ক্রাবির নামকরণের ইতিহাস
এই শহরের নাম নিয়ে দুটি গল্প প্রচলিত আছে। প্রথম গল্পটি একটি প্রাচীন তলোয়ার নিয়ে। একবার এই স্থানের অধিবাসীরা এখানকার মাটি থেকে অতিকায় একটি তলোয়ার খুড়ে বের করে। এই তলোয়ারটি পরে প্রদেশের গভর্নরের কাছে পেশ করা হয়। এরপর আরও একটি তলোয়ার মাটি খুড়ে বের করা হয়, তবে এবারেরটা একটু ছোট ছিল। এটিও সেই গভর্নরের কাছে সোপর্দ করা হয়। গভর্নরসহ তখনকার সাধারণ মানুষ এই তলোয়ার দুটিকে বেশ মূল্যবান এবং পবিত্র বলে মনে করতেন। অতঃপর গভর্নরের নির্দেশে তলোয়ার দুটিকে আড়াআড়িভাবে ‘খাও কানাব নাম’ নামে একটি গুহায় স্থাপন করা হয়। এই তলোয়ার দুটির নাম ছিল ক্রাবি। যেটির নামেই পরবর্তীতে এই স্থানের নামকরণ হয়। বর্তমানে পর্যটকরা ক্রাবিতে ঘুরতে যেয়ে একবার হলেও এই তলোয়ার দুটিকে দেখে যান।
দ্বিতীয় গল্পটি লুম্ফি নামের একটি গাছ নিয়ে। চীনা এবং মালয় বণিকরা এটিকে খো-লো-বি কিংবা কা-লু-বি উচ্চারণ করতো। কিন্তু এই দুই শব্দই ছিল ভুল। আর এই ভুল শব্দেই জায়গাটি কয়েক যুগ ধরে পরিচিত থাকে। পরে পাওয়া যায় যে, সেই ভুল শব্দগুলোর সঠিক শব্দ হচ্ছে ক্রাবি। অবশেষে এই নতুন নামেই জায়গাটি ব্যাপকভাবে পরিচিতি লাভ করে।
বাংলাদেশ থেকে থাইল্যান্ডের ক্রাবিতে ভ্রমণের উপায়
থাইল্যান্ডের পর্যটন ভিসা আবেদনের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র
ক্রাবি ভ্রমণের প্রথম শর্ত হলো থাইল্যান্ডের পর্যটন ভিসা নিশ্চিত করা। এই ভিসার আবেদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র হলো-

– বিগত ৬ মাসের মধ্যে তোলা সাদা পটভূমিতে দুটি রঙিন পাসপোর্ট (৩ দশমিক ৫ / ৪ দশমিক ৫ সেন্টিমিটার) আকারের ছবি

– থাইল্যান্ডে পৌঁছার পর থেকে কমপক্ষে ৬ মাস মেয়াদী পাসপোর্ট। ভিসা স্টিকার এবং ইমিগ্রেশন স্ট্যাম্পের জন্য পাসপোর্টে কমপক্ষে ২টি ফাঁকা পৃষ্ঠা থাকতে হবে। পুরনো পাসপোর্ট থাকলে সেগুলোও প্রদর্শন করতে হবে।

– আবেদনকারীর যথাযথভাবে পূরণকৃত এবং সই করা আবেদনপত্র। ভিসার আবেদন ফর্মটি https://thaivisabd.com/NewVisaApplicationForm.pdf- এই লিঙ্কে রয়েছে।

– একটি সক্রিয় ফোন নম্বর

Manual1 Ad Code

– বিগত ৬ মাসের ব্যাংক সলভেন্সি পত্র এবং ব্যাংক স্টেটমেন্ট

Manual3 Ad Code

– তহবিল জনপ্রতি কমপক্ষে ২০ হাজার থাই বাত এবং পরিবার প্রতি ৪০ হাজার বাত অথবা জনপ্রতি ৬০ হাজার টাকা এবং পরিবার প্রতি ১ লাখ ২০ হাজার টাকা (বাংলাদেশের থাই এম্বেসির ওয়েব সাইট https://dhaka.thaiembassy.org/en/ publicservice/tourist-visa-tr অনুসারে)। ব্যাংক স্টেটমেন্ট এবং ব্যাংক সলভেন্সি পত্রের শুধুমাত্র মূল কপি গ্রহণযোগ্য।

– কোম্পানি স্পন্সর করলে কোম্পানির ব্যাংক স্টেটমেন্ট, ব্যাংক সলভেন্সি পত্র, এবং ট্রেড লাইসেন্স|
পেশার প্রমাণ
– চাকরিজীবীর ক্ষেত্রে তার পক্ষ থেকে ভিসার অনুরোধ পত্র এবং তার নিয়োগকর্তার কাছ থেকে সুপারিশ পত্র, আবেদনকারীর বেতন ব্যাংক স্টেটমেন্ট/বেতন স্লিপ/বেতনের সত্যায়নপত্র

– চিকিৎসকদের ক্ষেত্রে বিএমডিসির প্রশংসাপত্র বা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ থেকে চিঠি

– আইনজীবীদের ক্ষেত্রে বার কাউন্সিল সার্টিফিকেট বা আইন সংস্থার চিঠি

– শিক্ষার্থীর জন্য স্কুল/কলেজ/বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একটি সুপারিশপত্র বা স্টুডেন্ট আইডি কার্ড

– ব্যবসায়ীর জন্য ট্রেড লাইসেন্স
পেশার প্রমাণ
– চাকরিজীবীর ক্ষেত্রে তার পক্ষ থেকে ভিসার অনুরোধ পত্র এবং তার নিয়োগকর্তার কাছ থেকে সুপারিশ পত্র, আবেদনকারীর বেতন ব্যাংক স্টেটমেন্ট/বেতন স্লিপ/বেতনের সত্যায়নপত্র

– চিকিৎসকদের ক্ষেত্রে বিএমডিসির প্রশংসাপত্র বা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ থেকে চিঠি

– আইনজীবীদের ক্ষেত্রে বার কাউন্সিল সার্টিফিকেট বা আইন সংস্থার চিঠি

– শিক্ষার্থীর জন্য স্কুল/কলেজ/বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একটি সুপারিশপত্র বা স্টুডেন্ট আইডি কার্ড

– ব্যবসায়ীর জন্য ট্রেড লাইসেন্স
ঢাকা থেকে ক্রাবি যাতায়াত
আগে থেকে আসা-যাওয়ার টিকেট কেটে রাখলে বিমান ভাড়া পড়তে পারে ৪১০ থেকে ৭০৪ মার্কিন ডলার। সর্বনিম্ন খরচে যাতায়াত করলে কলকাতা ও থাইল্যান্ডের ডন মুয়াং হয়ে ট্র্যাঙ বিমান বন্দরে নামতে সময় লাগবে ৩৩ ঘণ্টা ৩৫ মিনিট। বিমান বন্দর থেকে ট্যাক্সিতে চড়ে ট্র্যাঙ বাসস্ট্যান্ডের পথ মাত্র ১০ মিনিটের। সেখান থেকে মিনিভ্যানে করে আড়াই ঘণ্টায় পৌঁছা যাবে ক্রাবি বাসস্ট্যান্ড।
ক্রাবিতে ঘুরতে যাওয়ার সেরা সময়
থাইল্যান্ডের ক্রাবিতে পর্যটনের সেরা মৌসুম হলো নভেম্বর থেকে মার্চের মধ্যে। এই সময়ে গড় তাপমাত্রা থাকে ২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং ঠান্ডা বাতাসে আবহাওয়া বেশ আরামপ্রদ থাকে। অন্যদিকে জুন থেকে অক্টোবর ক্রাবিতে ভারী বৃষ্টিপাত হয়। তাই ঝামেলাহীন ভ্রমণের জন্য এ সময়টা এড়িয়ে যাওয়াই উত্তম।

পর্যটকদের জন্য ক্রাবির সেরা আকর্ষণগুলো
টাইগার টেম্পল
ক্রাবির সবচেয়ে বিখ্যাত এই দর্শনীয় স্থানটির স্থানীয় নাম ওয়াট থাম সিউয়া। পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত এই মন্দিরটি শীর্ষে যাওয়ার জন্য ১ হাজার ২৬০টি সিঁড়ির পথ পেরতে হয়। প্রায় ৩০ থেকে ৪০ মিনিটের এই যাত্রার পর মন্দিরটির সামনে দেখা মিলবে প্রধান আকর্ষণ সোনালি বুদ্ধ মূর্তির। শুধু তাই নয়, পাহাড়ের চূড়া থেকে দেখা যাবে একপাশে ছোট ছোট শহুরে জীবন, আর অন্যপাশে ফেনীল সমুদ্র। মন্দির ছাড়িয়ে ছোট লুপের ট্রেইল অনুসরণ করে গেলে চোখে পড়বে বন উপত্যকা আর বুদ্ধের বেদিতে লুকিয়ে থাকা চুনাপাথরের গুহাগুলো। উপাসনার জন নির্ধারিত এই এলাকাটি ঘুরে বেড়ানোর সময় খেয়াল রাখতে হবে ধর্মীয় ভাব-গাম্ভীর্য যেন অক্ষুন্ন থাকে।

রাইলে
থাইল্যান্ডের ক্রাবি এবং আও নাং শহরের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত ছোট এই উপদ্বীপটির আরেক নাম রাই লেহ। উচু চুনাপাথরের পাহাড় মূল ভূখণ্ডের প্রবেশপথকে বন্ধ করে দিয়েছে। তাই এখানে প্রবেশের একমাত্র উপায় হচ্ছে নৌকা ভ্রমণ।

Manual4 Ad Code

সমগ্র রাইলে চারটি প্রধান এলাকায় বিভক্ত। ফ্রা নাং, পশ্চিম রাইলে, পূর্ব রাইলে এবং টন সাই। পূর্ব দিকের বাংলো এবং রিসোর্ট থেকে শুরু করে পশ্চিম কোণের বিলাসবহুল রিসোর্টগুলো এখানকার পর্যটকদের আকর্ষণ করে। এগুলোর মধ্যে কোনও কোনওটি সাগরের তীর পর্যন্ত বিস্তৃত এবং যেখানে সৈকত ঘেষে রয়েছে শান্ত রেস্তোরাঁ। টন সাই বিশ্ব জোড়া পর্বতারোহীদের প্রিয় গন্তব্য। তবে এটি আধুনিক পূর্ব ও পশ্চিম রাইলের তুলনায় বেশি কাঁচা।
ফি ফি দ্বীপপুঞ্জ
থাইল্যান্ডের এই বৃহৎ দ্বীপরাজ্যের অবস্থান মালাক্কা উপকূলের মধ্যবর্তী স্থানে। সৈকত ও স্বচ্ছ জলরাশি ছাড়াও এর অন্যতম আকর্ষণ হচ্ছে জাতীয় উদ্যান। লিওনার্দো ডি ক্যাপ্রিও অভিনীত সিনেমা দ্য বিচ (২০০০) মুক্তির পর থেকে দ্বীপগুলোতে পর্যটকদের আনাগোণা বেড়ে যায়।

এখানকার অন্যান্য দর্শনীয় স্থানগুলো হচ্ছে- মান্কি বিচ, মায়া বে, মস্কিউটো আইল্যান্ড, কোহ ফি ফি লেহ, ভাইকিং গুহা, এবং লাইম টং বিচ।
ক্রাবি ভ্রমণে থাকা-খাওয়ার উপায়
এখানে রাত্রি যাপনের জন্য হোটেল ভাড়া বাবদ খরচ পড়তে পারে সর্বনিম্ন জনপ্রতি ৫০৮ বাত বা ১ হাজার ৬২৩ টাকা (১ থাই বাত = ৩ দশমিক ১৯ বাংলাদেশি টাকা)। তিন-তারকা হোটেলগুলোর খরচ শুরু হয় প্রতি রাত সর্বনিম্ন ৪ হাজার ১০০ টাকা। দুই-তারকার হোটেলগুলোর ভাড়া প্রতি রাতে ২ হাজার ৪৫৫ টাকা।

ক্রাবিতে খাবারের গড় খরচ সমগ্র দেশের তুলনায় বেশ কম; প্রতিদিন ১৮৮ বাত বা ৬০০ টাকা। রেস্তোরায় স্থানীয় জনপ্রিয় খাবারগুলোর জন্য গড় খরচ হতে পারে প্রায় ১ হাজার ৫২০ টাকা।
ভ্রমণকালীন কিছু প্রয়োজনীয় সতর্কতা
শহুরে এলাকায় অপরাধজনিত নানা দুর্ঘটনার জন্য স্থানীয় প্রশাসনের নাম্বার সংগ্রহে রাখা যেতে পারে। এছাড়া সব সময় ভারী অলঙ্কার পরিধান না করা এবং বেশি পরিমাণে নগদ অর্থ সঙ্গে না রাখাই শ্রেয়। বিভিন্ন স্থানে যাতায়াতের সময় সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি, বিশেষ করে মাতাল চালকদের ক্ষেত্রে। এ জন্য ট্যাক্সি ভাড়া নেওয়ার সময় সাবধানতার সঙ্গে দরদাম করে উঠতে হবে।

ধর্মীয় উপাসনালয়গুলো পরিদর্শনের সময় পোশাক-পরিচ্ছেদ এবং আচার-আচরণে মার্জিত ভাব রাখা বাঞ্ছনীয়।

Manual7 Ad Code

বৃষ্টি বহুল স্থানগুলোতে পোকামাকড় ও সাপের উপদ্রবের ব্যাপারে পূর্বসতর্কতা জরুরি। এ জন্য নিয়মিত আবহাওয়ার ব্যাপারে অবগত থাকার পাশাপাশি স্থানীয়দের সাহায্য নিতে হবে। প্রাথমিক সাবধানতা হিসেবে পোকামাকড় নিরোধক সঙ্গে রাখা যেতে পারে।

পরিশিষ্ট
সৈকতের পাশাপাশি ধর্মীয় স্থাপনাগুলো এক স্বতন্ত্র সংস্কৃতির প্রদেশে পরিণত করেছে থাইল্যান্ডের ক্রাবিকে। মন্দিরগুলোর গাম্ভীর্য এবং স্থানীয়দের বিচিত্র বেশভূষা অন্য সব দীপাঞ্চল থেকে ভিন্ন এক অভিজ্ঞতা দেয়। তাছাড়া দর্শনীয় জায়গাগুলোর অনন্য নামগুলো সরবে ঘোষণা করে থাইল্যান্ডের ইতিহাস-ঐতিহ্যের কথা। এই অনুভূতির সঙ্গে একাত্ম হতে পারলে চিরাচরিত সৈকত দর্শন থেকে ভিন্ন অভিব্যক্তির অবতারণা ঘটাতে পারে ক্রাবি ভ্রমণ। ফলশ্রুতিতে ফিরে আসার সময় আরও একটি দিন কাটানোর সাধ জাগবে এই অনুপম উপকূলে।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual3 Ad Code