ট্রাইব্যুনালের পর্যবেক্ষণ নিয়ে নানা প্রশ্ন

প্রকাশিত:রবিবার, ১৪ নভে ২০২১ ১২:১১

ট্রাইব্যুনালের পর্যবেক্ষণ নিয়ে নানা প্রশ্ন

নিউজ ডেস্কঃ আলোচিত রেইনট্রি হোটেলের ধর্ষণ মামলায় খালাস পেয়েছেন অভিযুক্তরা। সেই মামলার রায়ে নানা পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৭ এর বিচারক বেগম মোসাম্মাত্ কামরুন্নাহার। রায়ে বিচারক বলেছেন, ‘৭২ ঘণ্টার পর ভিকটিমের মেডিক্যাল টেস্ট করা হলেই ধর্ষণের আলামত পাওয়া যায় না। ৭২ ঘণ্টার বেশি হলে মামলা না নেয়ার সুপারিশ করছি। কেননা তাতে মামলা প্রমাণ করা দুরূহ হয়ে পড়ে।’

রায়ের এই সুপারিশ নিয়ে নানা সমালোচনা করছেন বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন। তাতে যোগ দিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, নারী অধিকারকর্মীসহ সমাজের বিভিন্ন স্তরের নারী-পুরুষেরা। মন্তব্য করেছেন আইন বিশেষজ্ঞরাও। তারা বলছেন, ধর্ষণের শিকার নারী বা শিশু যদি ৭২ ঘণ্টার মধ্যে থানা বা আদালতে গিয়ে অভিযোগ করার সুযোগ না পান তখন কী হবে? তাহলে ঘটে যাওয়া অপরাধের বিচার চাওয়ার সুযোগ থাকবে কিভাবে?

তবে গতকাল ঢাকার এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন মামলার লিখিত রায় দেখেই তিনি মন্তব্য করবেন।

এদিকে হাইকোর্ট গত বছরের অক্টোবরে দেওয়া এক রায়ে বলেছে, ‘শুধু ভিকটিমের ডাক্তারি পরীক্ষা না হওয়ার অজুহাতে ধর্ষণ মামলা থেকে ধর্ষক খালাস পেতে পারেন না। শুধু ভিকটিমের জবানবন্দি ও অন্যান্য পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য দ্বারা আসামির বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ প্রমাণিত হলে তার ভিত্তিতেই তাকে সাজা প্রদান করা যেতে পারে। ‘ইব্রাহিম গাজী বনাম রাষ্ট্র’ মামলায় এমন পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন বিচারপতি মো. রেজাউল হক ও বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তীর ডিভিশন বেঞ্চ।
রায়ের পর্যবেক্ষণে হাইকোর্ট বলেছেন, ধর্ষণের মত অপরাধের ক্ষেত্রে সাধারণত ভিকটিম বা তার পরিবার থানা বা আদালতে মামলা করবে কি করবে না সেই দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগতে থাকেন। কেননা এর সঙ্গে ভিকটিম ও তার পরিবারের মানসম্মান জড়িত। অনেক চিন্তাভাবনার পরই সাধারণত তারা থানা বা আদালতের দ্বারস্থ হন।

‘ইব্রাহিম গাজী বনাম রাষ্ট্র’ মামলার বিবরণ মতে, ধর্ষণের ঘটনার ৩২ দিন পর ভিকটিমের ডাক্তারি পরীক্ষার জন্য বলা হয়। এ প্রসঙ্গে হাইকোর্ট বলেছে, এতদিন পর ভিকটিমের ডাক্তারি পরীক্ষা করা হলে ধর্ষণের আলামত না পাওয়াটাই স্বাভাবিক ছিল। শুধু ডাক্তারি পরীক্ষা না করানোয় প্রসিকিউশনের (রাষ্ট্রপক্ষ) মামলা অপ্রমাণিত বলে গণ্য হবে না।

‘আব্দুস সোবহান বনাম রাষ্ট্র’ শিরোনামের আরেক মামলায় ঘটনার ২১ দিন পর ডাক্তারি পরীক্ষায় ধর্ষণের আলামত পাওয়া না গেলেও ভিকটিমের সাক্ষ্য বিশ্বাসযোগ্য হওয়ায় আসামিকে দেওয়া সাজা বহাল রাখে হাইকোর্ট।

কাজেই শুধু ডাক্তারি পরীক্ষা না হওয়ায় ধর্ষণ প্রমাণ হয়নি বা অভিযুক্ত ব্যক্তি ধর্ষণ করেনি-এমন অজুহাতে খালাস পেতে পারে না।
প্রসঙ্গত, ২০১৭ সালে বনানীর রেইনট্রি হোটেলে দুই শিক্ষার্থী ধর্ষণের ঘটনায় করা মামলায় গত বৃহস্পতিবার দেওয়া রায়ে আপন জুয়েলার্সের কর্ণধার দিলদার আহমেদের ছেলে সাফাত আহমেদসহ পাঁচ আসামিকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়। রায়ে কেন মামলাটি প্রমাণ করতে রাষ্ট্রপক্ষ ব্যর্থ হয়েছে বলে নানা পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন বিচারক। এসবের মধ্যে রয়েছে ঘটনার দীর্ঘদিন পর (৩৮ দিন) মামলা করা, মেডিকেল রিপোর্ট ও ডিএনএ রিপোর্টে ধর্ষণের আলামত না পাওয়া ও পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য বিশ্বাসযোগ্য না হওয়া ইত্যাদি।

রায়ে রেইনট্রি হোটেল মামলার তদন্ত নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে ট্রাইব্যুনাল। বিচারক বলেছেন, ঘটনার ৩৮ দিন পর মামলা হলো, ৩৯ দিন পর মেডিক্যাল পরীক্ষা করা হলো, চিকিৎসক মেডিক্যাল রিপোর্টে ধর্ষণের আলামত পাননি মর্মে মতামত দিলেন, ভুক্তভোগীদের পরিধেয় কাপড়ে কোনো পুরুষের বীর্য পাওয়া যায়নি এবং আসামি নাঈম আশরাফের সঙ্গে ডিএনএ টেস্ট ম্যাচ করে নাই, তারপরও তদন্ত কর্মকর্তা চার্জশিট দাখিল করে আদালতের পাবলিক টাইম নষ্ট করেছেন। এতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ধর্ষণ মামলার বিচার ব্যাহত হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে আইন বিশেষজ্ঞরা বলেন, তদন্তের দুর্বলতার কারণেই ধর্ষণ মামলা প্রমাণিত হয় না। যখন মেডিক্যাল রিপোর্ট, ডিএনএ-তে কিছু পাওয়া গেল না তাহলে কেন চার্জশিট দেওয়া হলো। আর ওই চার্জশিটের ভিত্তিতে কেন মামলার বিচার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হলো। ট্রাইব্যুনালের উচিত ছিলো মামলাটি পুন:তদন্তের জন্য পাঠানো। তাহলে আদালতের পাবলিক টাইম নষ্ট হতো না।

এ রায়ের বিষয়ে জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের সাবেক রেজিস্ট্রার অবসরপ্রাপ্ত জেলা জজ ইকতেদার আহমেদ বলেন, ধর্ষণ মামলায় মেডিক্যাল রিপোর্টকে অকাট্য প্রমাণ হিসাবে দেখা হয়। কারণ ধর্ষণের ঘটনা ঘটে সঙ্গোপনে। কোন সাক্ষী থাকে না। এ কারণে মেডিক্যাল রিপোর্ট না থাকলে মামলা প্রমাণ অনেক সময় দুরূহ হয়ে পড়ে। সে দৃষ্টিকোণ থেকে হয়তো বিচারক এ ধরনের পর্যবেক্ষণ দিয়ে থাকতে পারেন।

এই রায়ের পর রাজধানীর শাহবাগ থেকে বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে ‘শেকল ভাঙার পদযাত্রা’ কর্মসূচি পালিত হয়। সেখানে অংশ নিয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃ-বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক রেহনুমা আহমেদ বলেন, একবিংশ শতকে এসে একটি স্বাধীন দেশে এ ধরনের রায় হতে পারে না। আদালতের বিচার করার কথা, ক্যারেক্টার সার্টিফিকেট (চারিত্রিক সনদ) দেওয়ার কথা নয়।  বিচারক পুলিশকে বলছেন, ৭২ ঘণ্টার পরে ধর্ষণ মামলা না নিতে। তার মানে, ধর্ষণ করে ৭২ ঘণ্টা নারীকে আটকে রাখলেই পুলিশ আর মামলা নেবে না?

সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনালের পিপি আফরোজা ফারহানা আহমেদ অরেঞ্জ বলেন, ৭২ ঘণ্টা পর মামলা না নেওয়ার বিষয়টি কোন দৃষ্টিকোণ থেকে বিচারক বলেছেন সেটা সকলের জানা দরকার। কারণ আমরা না জেনেই অনেক সময় নানা মন্তব্য করে ফেলি।

‘ইব্রাহিম গাজী বনাম রাষ্ট্র’ মামলার রায়ে হাইকোর্ট আরো বলেছে, সাক্ষীদের সাক্ষ্য পর্যালোচনায় দেখা যায় আসামির পিতা ও চাচারা স্থানীয়ভাবে ক্ষমতাধর। এরা প্রথম থেকেই ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে সচেষ্ট ছিলেন। আসামির পিতা সালিশে বলেন, “এ যুগের ছেলেমেয়েরা এমন করে”; যা অত্যন্ত আপত্তিকর কথা। এতেই বোঝা যায় যে আসামি পক্ষ থানা পুলিশকে প্রভাবিত করে, যার কারণে থানা মামলা গ্রহণ করেনি। রায়ে হাইকোর্ট বলেছে, ভিকটিম শিশু এই মামলার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী। তার সাক্ষ্য প্রদানকালে ধর্ষণের মত লজ্জার কথা নিজমুখে বর্ণনা করেছেন। তার সামনে অনাগত স্বপ্নীল ভবিষ্যৎ  থাকা সত্ত্বেও নিজমুখে আসামির বিরুদ্ধে মিথ্যা সাক্ষ্য দেবার কোন যুক্তিগ্রাহ্য কারণ থাকতে পারে না এবং আমরাও তা খুঁজে পাই না। এই মামলায় ভিকটিমের দেয়া জবানবন্দি সত্য ও বিশ্বাসযোগ্য। এই রকম ধর্ষণের অপরাধের ক্ষেত্রে শুধু ভিকটিমের সাক্ষ্যকে বিশ্বাস করেই আসামিকে সাজা দেওয়া সঠিক ও সমীচীন বলে মনে করে হাইকোর্ট।

এই সংবাদটি 1,226 বার পড়া হয়েছে

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •