মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল: বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে চা শ্রমিকদের সৌরা ভাষা

লেখক: Shiuly
প্রকাশ: ৮ মাস আগে

Manual3 Ad Code

সংগ্রাম দত্ত

বাংলাদেশে বহু ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী আজও তাদের নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য বহন করে চলেছে। কিন্তু সময়ের প্রবল চাপে অনেক ভাষাই ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। সেই বিপন্ন ভাষাগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো সৌরা। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট কর্তৃক চিহ্নিত দেশের ১৪টি বিপন্ন ভাষার মধ্যে সৌরার অবস্থান বিশেষভাবে আলোচ্য। বর্তমানে এই ভাষায় কথা বলে এমন পরিবার সংখ্যা দেশে মাত্র সত্তরটির মতো।

সীমান্তঘেঁষা গ্রামে বসবাস-

Manual6 Ad Code

মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলার রাজঘাট ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী এলাকায় সৌরা সম্প্রদায়ের প্রধান আবাস। ভারতের ত্রিপুরা সীমান্তের খুব কাছে অবস্থিত সৌরা পল্লীতে পরিবার সংখ্যা মাত্র বাইশটি। এর বাইরে দেশের বিভিন্ন চা-বাগান এলাকায় অল্প কিছু পরিবার ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসবাস করছে। তারা মূলত চা শ্রমিক হিসেবে জীবিকা নির্বাহ করেন। অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে উচ্চশিক্ষিত কাউকে পাওয়া যায় না, ফলে ভাষা ও সংস্কৃতির সংরক্ষণে কোনো সচেতন উদ্যোগ গড়ে ওঠেনি।

সৌরা কি?

সৌরা একটি অস্ট্রোএশিয়াটিক ভাষাগোষ্ঠীর অন্তর্গত দক্ষিণ মুন্ডা ভাষা, যা মূলত ভারতের ওড়িশা এবং অন্ধ্র প্রদেশ রাজ্যে সৌরা জনগোষ্ঠীর মানুষজন বলে থাকেন। এটি একটি বিপন্ন ভাষা এবং এতে প্রথাগত সাহিত্যের চেয়ে লোককাহিনী ও ঐতিহ্য বেশি দেখা যায়।

Manual2 Ad Code

সৌরা ভাষার উৎপত্তিস্থল-

সৌরা (Soura) ভাষা ভারতের উড়িষ্যা (বর্তমানে ওড়িশা) রাজ্যের একটি কোকবরক ভাষা গোত্রের ভাষা, যা মূলত এই অঞ্চলের স্থানীয় আদিবাসী জনগোষ্ঠী দ্বারা ব্যবহৃত হয়। ভাষাটি মূলত আদিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রচলিত এবং তাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অংশ।

ভাষা হারানোর মূল কারণ-

একসময় সৌরা সম্প্রদায়ের পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে মাতৃভাষাই ছিল প্রধান যোগাযোগ মাধ্যম। কিন্তু ধীরে ধীরে বাংলা, ওড়িয়া ও সাদরি ভাষার প্রভাব এতটাই বৃদ্ধি পেয়েছে যে সৌরা ভাষার ব্যবহার প্রায় বিলুপ্তির পথে।

স্থানীয় সমাজে সৌরা ভাষাকে অনেক সময় ভুলভাবে আঞ্চলিক বা উড়িয়া ভাষার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা হয়।

সামাজিক মর্যাদার চাপে সৌরাদের বাংলা ভাষায় কথা বলতে হয়।

Manual4 Ad Code

তরুণ প্রজন্ম মাতৃভাষায় কথা বলার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছে না।
ফলে প্রজন্মান্তরে সৌরা ভাষার শব্দভান্ডার ক্রমেই ক্ষয়িষ্ণু হয়ে পড়ছে।

সংস্কৃতির অবক্ষয়-

ভাষার সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে সৌরাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যও। বিয়ে, উৎসব কিংবা সামাজিক অনুষ্ঠানের নানা রীতি-নীতি এখন আর আগের মতো পালিত হয় না। অতীতে প্রচলিত সৌরাদের বিশেষ আচারের নাম, গান বা লোককাহিনি আজকের প্রজন্মের কাছে অচেনা হয়ে উঠছে। ফলে একসময়ের প্রাণবন্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এখন বিলুপ্তির পথে।

লিখিত রূপ থাকলেও নেই প্রয়োগ-

অস্ট্রো-এশিয়াটিক ভাষাগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত সৌরা ভাষার লিখিত রূপ বিদ্যমান। ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশ, উড়িষ্যা, তামিলনাড়ু ও বিহারে এ ভাষার ব্যবহার আছে। এমনকি অন্ধ্রপ্রদেশে সৌরা প্রাথমিক নামে পাঠ্যপুস্তকও চালু রয়েছে। অথচ বাংলাদেশে লিখিত সৌরা ভাষার কোনো চর্চা নেই। এখানকার সৌরারা কেবল মৌখিক ব্যবহারেই সীমাবদ্ধ থেকেছে, যা ভাষাটিকে আরও দ্রুত বিলুপ্তির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

আইনি সুরক্ষা থাকলেও উদ্যোগের অভাব-

বাংলাদেশ সরকার আন্তর্জাতিক শিশু অধিকার সনদে স্বাক্ষর করেছে, যেখানে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিশুরা মাতৃভাষায় শিক্ষা ও সংস্কৃতি চর্চার অধিকার পাবে বলে উল্লেখ রয়েছে। তাছাড়া আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট আইন (২০১০) অনুযায়ী বিপন্ন ভাষাগুলো সংরক্ষণ এবং লিখিত রূপ প্রবর্তনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
তবে বাস্তবতায় অগ্রগতি খুবই সীমিত। এখন পর্যন্ত মাত্র কয়েকটি ভাষায় প্রাথমিক পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন হয়েছে, কিন্তু সৌরা ভাষার জন্য কোনো উদ্যোগ কার্যকর হয়নি। শিক্ষক নিয়োগ, প্রশিক্ষণ বা কারিকুলাম তৈরির প্রক্রিয়াও শুরু হয়নি।

বিলুপ্তির শঙ্কা-

ভাষা গবেষক ও বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী এক প্রজন্মের মধ্যেই বাংলাদেশে সৌরা ভাষা চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ, বর্তমানে খুব অল্প সংখ্যক প্রবীণ মানুষই এ ভাষায় কিছুটা সাবলীলভাবে কথা বলতে পারেন। তরুণ প্রজন্ম মাতৃভাষা শেখার প্রতি অনাগ্রহী হওয়ায় ভাষাটির ভবিষ্যৎ আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

করণীয়-

ভাষাটিকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি।

স্কুল পর্যায়ে মাতৃভাষাভিত্তিক প্রাথমিক শিক্ষা চালু করতে হবে।

সৌরা ভাষার লিখিত রূপের ব্যবহার শুরু করতে হবে।

সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ নিতে হবে।

গবেষণা, শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও কারিকুলাম প্রণয়নে বাজেট বরাদ্দ দিতে হবে।

Manual8 Ad Code

উপসংহার-

সৌরা ভাষা শুধু একটি নৃগোষ্ঠীর যোগাযোগ মাধ্যম নয়, এটি তাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও অস্তিত্বের প্রতীক। ভাষাটির বিলুপ্তি মানে এক অমূল্য ঐতিহ্যের মৃত্যু। আজই যদি কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হয়, তবে অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশের মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাবে সৌরা ভাষা এবং এর সঙ্গে হারিয়ে যাবে এক নৃগোষ্ঠীর শত বছরের পরিচয় ও স্মৃতি।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
  • মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল: বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে চা শ্রমিকদের সৌরা ভাষা
  • Manual1 Ad Code
    Manual8 Ad Code