

সংগ্রাম দত্ত
মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলায় বহুজাতিক কোম্পানি শেভরন বাংলাদেশ-এর কনডেনসেট পাইপলাইনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় এক পরিবারের দুইজন প্রাণ হারিয়েছেন, আরেকজন আইসিইউতে জীবন-মৃত্যুর লড়াই করছেন। এ ঘটনা শুধুই একটি দুর্ঘটনা নয়—এটি তেল চুরি, অবৈধ ট্যাপিং, নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি এবং কর্পোরেট দায়বদ্ধতার প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে।
শনিবার (২৭ সেপ্টেম্বর) ভোরে স্থানীয় বাসিন্দা অগ্নিদগ্ধ বশির মিয়া (৫০), তাঁর পুত্র রেদোয়ান মিয়া (২০) ঢাকার জাতীয় বার্ন ইউনিট হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। নিহত বশির মিয়ার স্ত্রী ফারজানা আক্তার পারভীন আশঙ্কাজনক অবস্থায় আইসিইউতে চিকিৎসাধীন।
ঘটনাপ্রবাহ-
গত ২৩ সেপ্টেম্বর রাত ৯টার দিকে শ্রীমঙ্গলের ভুনবীর ইউনিয়নের শাসন ইলামপাড়ায় বহুজাতিক কোম্পানি শেভরন বাংলাদেশের পাইপলাইনে দুর্বৃত্তদের করা অবৈধ ছিদ্র দিয়ে কনডেনসেট বের হয়ে ছড়ার পানিতে মিশে যায়। কিছু সময় পর পানির ওপর ভাসমান তেলে আগুন ধরে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে।
এ ঘটনায় গুরুতর অগ্নিদগ্ধ হন স্থানীয় বাসিন্দা বশির মিয়া (৫০), তার স্ত্রী ফারজানা আক্তার পারভীন ও ছেলে রেদোয়ান মিয়া (২০)। অগ্নিদগ্ধ তিনজনকে প্রথমে শ্রীমঙ্গল, মৌলভীবাজার, সিলেট ও পরে ঢাকার জাতীয় বার্ন ইউনিট হাসপাতালে উন্নত চিকিৎসার জন্য প্রেরণ করা হয়। পরে শনিবার (২৭ সেপ্টেম্বর) চিকিৎসাধীন অবস্থায় প্রথমে মারা যান রেদোয়ান, এবং কিছুক্ষণ পর তাঁর পিতা বশির মিয়া। বর্তমানে আইসিইউতে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন ফারজানা।
অবৈধ ট্যাপিংয়ের পুরনো ইতিহাস-
প্রশ্ন হচ্ছে, এই দুর্ঘটনার দায় কার? কে বা কারা এই ট্যাপিং এর সাথে জড়িত? প্রায় দুই দশক আগে সিলেট–আশুগঞ্জ তেল পাইপলাইনের রাজনগর পয়েন্টে একইভাবে পাইপ ছিদ্র করে তেল চুরির ঘটনা ঘটে। সেবার মামলা হলেও কার্যকর প্রতিকার হয়নি। গত ২৩ সেপ্টেম্বরের ঘটনায় স্থানীয়দের প্রশ্ন—এ কি সেই পুরোনো দুঃসাহসী তেলচুরির ধারাবাহিকতা?
নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা-
শেভরনের মতো আন্তর্জাতিক কোম্পানির পাইপলাইনে এভাবে ট্যাপিং হওয়া নিরাপত্তার বড় প্রশ্ন তোলে। পাইপলাইন কিভাবে এত সহজে ছিদ্র করা সম্ভব হলো? কেন আগেভাগে তা শনাক্ত হয়নি? পাইপলাইনের মনিটরিং সিস্টেম কতটা কার্যকর—এসব প্রশ্ন এখন আলোচনায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কনডেনসেট অত্যন্ত দাহ্য পদার্থ। সামান্য ফাঁস হলেই বড় বিপর্যয়ের ঝুঁকি থাকে। তাই উন্নত প্রযুক্তি ও কঠোর নজরদারি ছাড়া পাইপলাইন পরিচালনা বিপজ্জনক।
করপোরেট দায়বদ্ধতা ও মানবিক প্রশ্ন-
শেভরন বাংলাদেশের মিডিয়া ও যোগাযোগ ব্যবস্থাপক শেখ জাহিদুর রহমান গণমাধ্যম কর্মীদের বলেন, “দুর্বৃত্তরা পাইপলাইনের ছিদ্র করে তেল চুরির চেষ্টা চালায়। এতে তেল ছড়িয়ে পড়ে এবং তাতে অগ্নিকাণ্ড ঘটে।” তিনি আরও জানান, শেভরনের পক্ষ থেকে দগ্ধদের সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছিল।
শেভরনের পক্ষ থেকে দগ্ধদের চিকিৎসা সহযোগিতা দেওয়া হলেও এ ধরনের ঘটনায় শুধু চিকিৎসা নয়, দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন অত্যাবশ্যক।
অনেকের জন্য প্রশ্নের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, কোম্পানির কার্যক্রমে বাস্তবিক কোনো সুরক্ষা ব্যবস্থা বা বিকল্প নিরাপত্তা পরিকল্পনা আছে কি না।
স্থানীরা গণমাধ্যম কর্মীদের বলেন, “শেভরনকে শুধু চিকিৎসা নয়, নিহত ও দগ্ধ পরিবারকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। পাশাপাশি দায়ীদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনতে হবে।”
সংবাদপত্র ও স্থানীয় সাংবাদিকদের মন্তব্য-
বিভিন্ন সংবাদপত্রে জানা যায়, দুর্বৃত্তরা ১২ ইঞ্চি পাইপ ছিদ্র করে তেল বের করার চেষ্টা করে। পরে পাইপের সেই ছিদ্র আর বন্ধ হচ্ছিল না। এ লাইনে অনেক চাপ থাকে। পরে ছিদ্রকারীরা সেখান থেকে পালিয়ে যায়।
বাংলা ট্রিবিউন এর স্থানীয় প্রতিনিধি মোঃ সাইফুল ইসলাম এক অনুসন্ধানে লিখেছেন যে, ওই এলাকার একটি চক্র দীর্ঘদিন পাইপলাইন ছিদ্র করে অপরিশোধিত তেল চুরি করে আসছিল। গত মঙ্গলবার পাইপের ছিদ্র থেকে তেল চুরির পর ছিদ্র আর বন্ধ না হওয়ায় তেল বের হয়ে হাওর এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে এবং পরে পানির ওপর ভাসমান তেল থেকে আগুন ধরে।
এদিকে দৈনিক যুগান্তর এর শ্রীমঙ্গল প্রতিনিধি সৈয়দ আবু জাফর সালাউদ্দিন তাঁর ভেরিফাইড ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন যে, “স্থানীয় সাংবাদিক,বালু খেকোর লোকজন,রাজনৈতিক দলের নেতা ও সেভরন কোম্পানির পাহারাদার ম্যানেজ হয়েই ব্রাহ্মনবাড়িয়া জেলার আশুগঞ্জের সেই পুরোনো তেল চুরের সিন্ডিকেট এ কাজ করছিল বলে বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে। সেই তেল আশুগঞ্জে বিক্রি করা হতো। একজন আসামীতো ইতিমধ্যে পলাতক রয়েছে। কিন্তু এ ঘটনায় গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোন তৎপরতা এখনও লক্ষ্য করা যাচ্ছে না? জৈতাছড়ায় ছড়িয়ে পড়া তেলে মাছ মরে ওঠলে কুপি বাতি নিয়ে মাছ ধরতে গেলে প্রবাহিত তেলের আগুনে পিতা ও পুত্র আগুনে দ্বগ্ধ হন। আজ তারা চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা যদি এ ঘটনায় তদন্ত না করে দোষীদের আইনের আওতায় না আনতে পারেন তাহলে এই নিরপরাধ দু’জন ব্যক্তির মৃত্যুর দায় তাদের নিতে হতে পারে। এদিকে নিহত বশির মিয়ার স্ত্রীও আশংকাজনক অবস্থায় রয়েছেন। আশা করি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা দোষীদের ও তাদের নেপথ্যের গড ফাদারদের মুখোশ উন্মোচন করবেন জাতির সামনে।”
দৈনিক দিনকাল এর শ্রীমঙ্গল প্রতিনিধি রুবেল আহমেদ তাঁর ভেরিফাইড ফেসবুক একাউন্টে লিখেছেন যে, “শ্রীমঙ্গলে শেভরনের পাইপলাইনে দুর্বৃত্তদের ছিদ্রে সৃষ্ট অগ্নিকান্ডে পিতা-পুত্রের মৃত্যু..পরিবারের আরো একজন হাসপাতালে আশংকাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন এই মৃত্যুর দায় কার ??
গোপন সূত্রে যানা যায়, একটি তেল চুরির সিন্ডিকেট স্থানীয় সাংবাদিক,বালু খেকো,রাজনৈতিক দলের নেতাদের হাত করে বিগত কয়েক মাস থেকে এই তেল চুরি করে যাচ্ছে। সেই তেল ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার আশুগঞ্জ উপজেলায় বিক্রি করা হয় বলে জানা গেছে। কিন্তু এত বড় একটি ঘটনায় রাস্ট্রীয় আইনশৃঙ্গলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার তেমন কোন তৎপরতা লক্ষ্য করা যায়নি।”
প্রশাসনের ভূমিকা-
শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা গণমাধ্যম কর্মীদের জানিয়েছেন, প্রশাসন পরিবারকে সহযোগিতা করছে। তবে প্রশাসনের ভূমিকা শুধু তাৎক্ষণিক সহায়তায় সীমাবদ্ধ নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ও অবৈধ তেল চুরি রোধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
ভবিষ্যৎ ঝুঁকি ও করণীয়-
এই ঘটনা স্পষ্ট করেছে—বাংলাদেশে জ্বালানি পাইপলাইন এখনো ঝুঁকির মধ্যে। অবৈধ ট্যাপিং রোধে শুধু কোম্পানি নয়, সরকারকেও বাড়তি নজরদারি চালাতে হবে। স্থানীয় জনগণকে সচেতন করা, নিরাপত্তা বাহিনীকে নিয়মিত টহল দেওয়ার পাশাপাশি ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থাও চালু করা দরকার।
তাছাড়া, বহুজাতিক কোম্পানির জন্য কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (CSR) কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়, বাস্তবে প্রয়োগযোগ্য করতে হবে। অন্যথায় একই ধরনের ট্র্যাজেডি আবারও ঘটতে পারে।
শেষ কথা:
শ্রীমঙ্গলের শেভরন পাইপলাইন ট্র্যাজেডি কেবল একটি পরিবারের শোকগাঁথা নয়; এটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, বহুজাতিক কোম্পানির দায়বদ্ধতা এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। এ ঘটনা আমাদের সতর্ক করছে—তেল পাইপলাইন শুধু অর্থনীতির ধমনী নয়, এর নিরাপত্তা ব্যাহত হলে তা মানুষের জীবন কেড়ে নিতে পারে।
যদি এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে এই ট্র্যাজেডি কেবল একটি পরিবারের নয়, বরং পুরো সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য পুনরাবৃত্ত আতঙ্ক হয়ে দাঁড়াবে।