মোনাকোয় পুতিনের বান্ধবীর গোপন বিলাসবহুল ফ্ল্যাট

লেখক: Shiuly
প্রকাশ: ৫ years ago

Manual4 Ad Code

বারান্দা থেকে নতুন মালিক মোনাকোর ঝলমলে মেরিনার (সৈকত) দিকে তাকিয়ে সুপার ইয়ট দেখতে পারেন। নিরাপত্তা ব্যবস্থা এতটা মজবুত যে, কোনো পর্যটক বাসিন্দাদের বিরক্ত করতে পারেন না। কমপ্লেক্সের ছাদে ছোট বাগানও রয়েছে। সেখানকার শব্দও শ্রুতিমধুর।

তবে ওই ফ্ল্যাট যিনি কিনেছিলেন, তাঁর পরিচয় জানা ছিল না। কাগজপত্রে ফ্ল্যাট মালিক হিসেবে নাম ছিল একটি অফশোর কোম্পানির। ব্রিটিশ ভার্জিনিয়া দ্বীপপুঞ্জে নিবন্ধিত ওই কোম্পানির নাম ব্রুকভিল ডেভেলপমেন্ট লিমিটেড।

প্যান্ডোরা পেপারসে ওই ফ্ল্যাটমালিকের পরিচয় বেরিয়ে এসেছে। এসব নথি বিশ্লেষণকারী সংবাদমাধ্যমগুলোর একটি গার্ডিয়ান বলছে, ওই ফ্ল্যাটমালিক একজন নারী। ২০০৩ সালে তাঁর বয়স ছিল ২৮ বছর। তাঁর নাম সভেতলানা ক্রিভোনোগিখ। কয়েক বছরের ব্যবধানে ক্রিভোনোগিখ অনেক বেশি সম্পদের মালিক হয়ে ওঠেন।

তাঁর নিজের শহর রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গের একটি অভিজাত এলাকায় ফ্ল্যাট, মস্কোতে বাড়ি ও ইয়ট ছাড়াও অন্যান্য সম্পদের হয়েছিল তাঁর নামে। সভেতলানা ক্রিভোনোগিখের সম্পদের পরিমাণ দাঁড়ায় ১০ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি।

Manual8 Ad Code

তাঁর এই আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়ার রহস্য কী? গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়, গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী ক্রিভোনোগিখের অতীত ছিল খুব সাধারণ। তিনি ঘনবসতিপূর্ণ অ্যাপার্টমেন্টে থাকতেন। তাঁকে পাঁচটা পরিবারের সঙ্গে বাথরুম ও রান্নাঘর ভাগাভাগি করে ব্যবহার করতে হতো।

ক্রিভোনোগিখ বাণিজ্য বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন এবং দোকানে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবেও কাজ করেছেন। তবে নব্বই দশকের পরে এসে তাঁর একজন শুভানুধ্যায়ী জোটে। তিনি আর কেউ নন ভ্লাদিমির পুতিন, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট।

২০২০ সালে রাশিয়ার স্বাধীন অনুসন্ধানী ওয়েবসাইট প্রোইক্ট দাবি করে, পুতিন যখন সেন্ট পিটার্সবার্গের মেয়র ছিলেন তখনই তাঁর সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তোলেন ক্রিভোনোগিখ। তিনি পুতিনের প্রেমিকা ছিলেন বলেও কথিত আছে।

তাদের সম্পর্কের সঠিক প্রকৃতি যা-ই হোক না কেন, তাঁরা কাছাকাছি ছিলেন বলে ধারণা করা হয়। তাঁরা দুজন একসঙ্গে উড়োজাহাজে ভ্রমণ করেছিলেন বলেও অল্প কিছু প্রমাণ মেলে। এরপর পুতিন রাশিয়ার গোয়েন্দা প্রধান, দেশটির প্রধানমন্ত্রী ও ২০০০ সালে দেশটির প্রেসিডেন্ট পদে আসেন। তিন বছর পরে ২০০৩ সালে ক্রিভোনোগিখ একটি সন্তানের জন্ম দেন। তাঁর নাম এলিজাবেথ বা লুইজা। প্রোইক্ট দাবি করে, লুইজার বাবা পুতিন। এ নিয়ে ক্রেমলিন অবশ্য কোনো মন্তব্য করেনি। পুতিন সাধারণত তাঁর ব্যক্তিগত জীবন জনসম্মুখে আনেন না। পুতিন ও তাঁর স্ত্রী লুডমিলার দুই মেয়ে রয়েছে। একজনের নাম মাশা ও আরেকজনের নাম ক্যাটরিনা। লুডমিলার সঙ্গে ২০১৩ সালে পুতিনের বিচ্ছেদ হয়।

Manual8 Ad Code

প্রোইক্ট যখন গোপন খবর ফাঁস করে, তখন লুইজা সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে সক্রিয়ভাবে তাঁর জীবনযাপন তুলে ধরেন। তাঁর ইনস্টাগ্রামে পার্টি, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, প্রভাবশালীদের সঙ্গে যোগাযোগ ও ব্যক্তিগত জেট বিমানে করে ভ্রমণের মতো বিষয়গুলো উঠে আসে। লুইজাকে পুতিনের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে বরাবরই কৌশলে এড়িয়ে যান। গার্ডিয়ানের পক্ষ থেকে এ নিয়ে প্রশ্ন করা হলেও তাঁরা কোনো মন্তব্য করেননি।

ক্রিভোনোগিখের গল্পটি শুধু প্রণয়ের নয়। এর সঙ্গে যুক্ত আছে অর্থের বিষয়টিও। গত দুই দশক ধরে মোনাকোর ওপরে রাশিয়ার প্রভাব বেড়েছে। স্থানীয় আইনজীবী ডমিনিক অ্যানাসটাসিস বলেন, ‘এখানে ধনী ব্যবসায়ী ও রাশিয়ার নাগরিকদের উষ্ণ অভ্যর্থনা দেওয়া হয়। এ ছাড়া কর স্বর্গ হিসেবে এখানে ট্যাক্স নিয়ে মাথা ঘামাতে হয় না। অর্থ কোথা থেকে এল তা নিয়ে কেউ প্রশ্ন করে না। এখানে খতিয়ে দেখার কোনো সংস্কৃতিই নেই। এখানে ট্যাক্সের কোনো ঘোষণা দেওয়া লাগে না।’

Manual8 Ad Code

মোনাকোয় এমন পেশাদার ট্যাক্স ফার্ম রয়েছে, যাদের সঙ্গে বেশ কিছু আইনি প্রতিষ্ঠানের নেটওয়ার্ক রয়েছে যারা বিশ্বজুড়ে গ্রাহক সেবা দেয়। সেখানে বাইরে থেকে সুন্দর একটি ছাদবাগান ছাড়া আর কিছু বোঝার উপায় নেই। এই প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক একজন ব্রিটিশ। তাঁর নাম ইয়ামন ম্যাকগ্রেগর। নথি বলছে, তিনিই ব্রুকভিল ডেভেলপমেন্ট লিমিটেড ও ক্রিভোনোগিখের বিভিআই নামের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত। তিনি কীভাবে অ্যাকাউন্ট্যান্ট হলেন তা জানা যায়নি। তাঁর জীবনীতে বিশেষ কিছু লেখা নেই। বাবা ছিলেন পুলিশ কনস্টেবল। ১৯৫০ সালে জন্ম। লিভারপুরে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। তিনি ট্যাক্স নীতি নিয়ে কাজ করেছেন। ফ্রান্স ও ইতালির ভাষা জানেন।

প্যান্ডোরা পেপারসের নথিতে ম্যাকগ্রেগরের ধনী গ্রাহকদের তথ্য বেরিয়ে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে গেনাডি টিমচেঙ্কোর নামের এক সোভিয়েত আমলার নাম। ফোর্বসের তথ্য অনুযায়ী, টিমচেঙ্কোর রয়েছে দুই হাজার ২০০ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি সম্পদ। গত ২০ বছর ধরে ম্যাকগ্রেগর তাঁর সম্পদ দেখাশোনা করছেন। এর মধ্যে রয়েছে জেট বিমান, ৪০ মিটার বিলাসবহুল ইয়ট, যার নাম টিমচেঙ্কোর স্ত্রী এমএস লেনার নামে।

টিমচেঙ্কো ও পুতিন নব্বইয়ের দশক থেকে বন্ধু। ওই সময় সেন্ট পিটার্সবার্গে তেলের বাণিজ্য করতেন টিমচেঙ্কো। আর উদীয়মান নেতা ছিলেন পুতিন। ১৯৯১ সালে ওই শহরে বিদেশ সম্পর্ক কমিটির প্রধান থাকাকালে পুতিন টিমচেঙ্কোকে তেল রপ্তানির অনুমোদন দেন।

পরে টিমচেঙ্কো গাসভোর নামে সুইজারল্যান্ডভিত্তিক ট্রেডিং হাউস খোলেন, যেটা রাশিয়ার তেল রপ্তানি করত। গানভোর থেকে ঠিক কারা সুবিধাপ্রাপ্ত হয়েছিলেন সে প্রশ্নটি বিতর্কিত।

২০০৭ সালে মস্কোর রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্ট্যানিস্লাভ বেলকভস্কি অভিযোগ করেছিলেন, এসব কোম্পানির কার্যক্রমের একজন সুবিধাভোগী হলেন পুতিন। তিনি আড়ালে এর আরেক মালিক। তবে গানভর অনেক সময় তা অস্বীকার করে। পুতিন বলেন, ‘আমার অংশীদারত্ব ছাড়াই টিমচেঙ্কো বেড়ে উঠেছেন।’ ২০১৪ সালে ওবামা প্রশাসন টিমচেঙ্কোর ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। একই সঙ্গে পুতিনের ঘনিষ্ঠ লোকজনের ওপরই নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ দাবি করে, জ্বালানি খাতে টিমচেঙ্কোর কার্যক্রম সরাসরি পুতিনের সঙ্গে সম্পর্কিত।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual3 Ad Code