আগ্রাসী তৎপরতা বনাম টেকসই কূটনীতি চীন-ভারত

লেখক:
প্রকাশ: ৬ years ago

Manual3 Ad Code
ফরিদুল আলম:
লাদাখের উত্তেজনার মাঝেই গত ৩ জুলাই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সেখানে সফর করেন। এক দিনের ওই সফরে নিজ দেশের সেনাদের উদ্দেশে এক বক্তব্যে মোদি বলেন, ‘বিস্তারবাদের যুগ শেষ, এটি উন্নয়নের যুগ। ইতিহাস সাক্ষী রয়েছে- বিস্তারবাদী শক্তিগুলো হয় হেরে গেছে বা ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছে।’ ভারতীয় সেনাদের ‘বীর ভূমিপুত্র’ হিসেবে বর্ণনা করে মোদি আরও বলেন, ‘দুর্বলরা কখনই শান্তি পেতে পারে না, সাহসীরাই পারে।’ উল্লেখ্য, মোদির এই সফরকে উত্তেজনা উস্কে দেওয়ার পরিবর্তে সেখানে নিয়োজিত ভারতীয় সেনাদের মনোবল চাঙ্গা করার ক্ষেত্রে সহায়ক হিসেবেই দেখা হচ্ছে, যদিও দুই দেশই যুদ্ধের সব রকম প্রস্তুতিতে কোনো রকম ঘাটতি রাখছে না।
গত ১৫ জুন দু’পক্ষের সেনাদের মধ্যে সংঘর্ষ এবং তৎপরবর্তী সময়ে উত্তেজনা নিরসনে দু’পক্ষের সেনা কমান্ডারদের মধ্যে এ পর্যন্ত তিন দফা বৈঠক হলেও এখন পর্যন্ত তারা কোনো ধরনের আপসরফায় পৌঁছাতে সক্ষম হননি। অনুমান করা যাচ্ছে, চীনের তরফ থেকে লাদাখের ঘটনা নিয়ে ভারতের সঙ্গে তিক্ততার বাইরেও সাম্প্রতিক সময়ে হংকংয়ের চলমান বিক্ষোভ প্রশমনে চীনের পার্লামেন্টে যে বিতর্কিত আইন পাস হলো এবং প্রেসিডেন্ট কর্তৃক অনুমোদিত হলো- এটি যেন লাদাখের বাইরেও একটি বিশেষ আন্তর্জাতিক মনোযোগের ইস্যু হিসেবে আবির্ভূত হলো। এ ঘটনার পরপরই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় চীনের আগ্রাসী তৎপরতার নিন্দা জানাচ্ছে ক্রমাগতভাবে।
চীন এবং ভারতের মধ্যে কনভেনশনাল বা প্রথাগত যুদ্ধ হয়েছিল একবারই, আর সেটি ১৯৬২ সালে। এক মাসব্যাপী সেই যুদ্ধে চীনের ৭০০ এবং ভারতের এর প্রায় দ্বিগুণ সেনা নিহত হয়েছিলেন। সর্বশেষ বিস্টেম্ফারণ ঘটে গত ১৫ জুন, প্রথমে দুই দেশের সেনাদের মধ্যে হাতাহাতি, পরে মারামারি এবং উভয় দেশের কয়েকজন সেনার মৃত্যু বর্তমানে পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। অবশ্য ২০১৯ সালে পূর্ব লাদাখে ভারতের সামরিক মহড়া নিয়ে চীনের আপত্তি, ইত্যাদি বিষয়ের ধারাবাহিকতায় এ বছরের মে মাসে পেংগং লেকের পাশে পাথর ছোড়াছুড়ি এবং হাতাহাতিতে জড়ায় দুই দেশ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে একপর্যায়ে মধ্যস্থতার আগ্রহ প্রকাশ করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, যা নাকচ হয়ে যায় চীন-ভারত উভয়ের কাছ থেকেই। তবে এর পরপরই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কর্তৃক ভারতকে জি-৭ এর অন্তর্ভুক্ত করার আগ্রহের পর থেকে চীনের তরফ থেকে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ‘ভারত আগুন নিয়ে খেলছে’ বলে সতর্ক করে দেওয়া হয়, যার পরপরই ঘটে জুনের ঘটনা- যা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে মনে করেন না অনেকেই।
ঘটনা যা-ই ঘটুক না কেন দুই দেশের ভেতরেই কিন্তু এখন একধরনের জাতীয়তাবাদের ঢেউ বইছে, ভারতের দিক থেকে ইতোমধ্যে অর্থনৈতিকভাবে কিছুটা কাবু করে একধরনের বার্তা দিয়ে দেওয়া হয়েছে চীনকে। এখানে বলা সঙ্গত যে, প্রতিবছর ভারতের খুচরা ব্যবসায়ীরা প্রায় সাত হাজার ৪০০ কোটি রুপির চীনা পণ্যের প্রবেশ ঘটে। বর্তমানে স্বতঃস্ম্ফূর্তভাবে ভারতের সাধারণ মানুষ এবং ব্যবসায়ী গোষ্ঠী চীনকে একটি বড় বাজার থেকে বঞ্চিত করতে উঠেপড়ে লেগেছে। পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে চীন প্রায় ৬০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্য রপ্তানি হারাবে ভারতে, অন্যদিকে ভারত চীনে তার ১০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্য রপ্তানির ক্ষতি হয়তো পুষিয়ে নিতে পারবে তার মিত্র যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশগুলোকে সন্তুষ্ট করে। কাজেই আপাতদৃষ্টিতে দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলে নেপাল এবং ভুটানকে হাত করতে পারলেও এ কথা ঐতিহাসিকভাবে সত্য যে, অনেকটাই ভারতবেষ্টিত এবং ভারত নির্ভর এই দুটি দেশের বিশেষ করে নেপাল সরকারের পক্ষে খুব বেশিদিন ভারতের সঙ্গে বৈরি সম্পর্ক চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। এখানে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে যেমনটা মনে হচ্ছে- চীনের বাজারে বাংলাদেশের ৯৭ ভাগ পণ্য শুল্ক্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পেতে যাচ্ছে; এই বিষয়টিতে রয়েছে একধরনের শুভঙ্করের ফাঁকি। এখানে তুলনামূলক প্রতিযোগিতার দিকটি চিন্তা করলে কোনোভাবেই আমাদের পণ্য চীনের বাজারে খুব একটা সুবিধাজনক হবে না। তা ছাড়া চীনের সঙ্গে বিদ্যমান যে বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে, সেখানে খুব একটা হেরফের হওয়ার সুযোগও নেই। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীন থেকে ১৪ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানির বিপরীতে আমাদের রপ্তানির পরিমাণ মাত্র এক বিলিয়ন ডলার।
এখন কথা হচ্ছে চীনের দিক থেকে বর্তমানে যে তৎপরতা লক্ষণীয়, সেখানে কিন্তু যুক্তির চেয়ে শক্তির ওপর তাদের অধিক নির্ভরশীলতা দেখা যাচ্ছে। হঠাৎ করে লাদাখ নিয়ে উত্তেজনা, যদিও এর পেছনে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট রয়েছে, কিন্তু নিছক মামুলি ঘটনাকে কেন্দ্র করে চীনের অনেকটা মারমুখী আচরণের কারণেই কিন্তু ভারতকেও সীমান্তে সর্বাত্মক যুদ্ধপ্রস্তুতি গ্রহণ করতে হচ্ছে। এহেন পরিস্থিতিতে দুই দেশই যদি কূটনৈতিকভাবে কোনো প্রকার সমঝোতায় আসতে না পারে এবং চীন যদি ধরেই নেয় যে, ভৌগোলিক অবস্থা, অস্ত্র এবং সৈন্যের সংখ্যাগত বিবেচনায় তারা ভারতের চেয়ে ঢের ভালো অবস্থায় রয়েছে, যার মধ্য দিয়ে তারা ভারতকে কাবু করতে পারবে, তাহলে এটা একটা বড্ড বড় ধরনের ভুল করতে যাচ্ছে তারা। চীনের বন্ধু বলতে এই মুহূর্তে রয়েছে রাশিয়া (যারা ১৯৬২ সালের যুদ্ধে ভারতকে সমর্থন করেছিল), আর এর বাইরে পাকিস্তান এবং মিয়ানমার। অন্যদিকে ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও গোটা ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া ও ইসরাইলের মতো দেশ রয়েছে। এটা ভাবার অবকাশ নেই যে, সম্ভাব্য যুদ্ধ কেবলমাত্র ভারত এবং চীনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। তা ছাড়া চীনের দিক থেকে ভারতের তুলনামূলক দুর্বল শক্তিকেও অবজ্ঞা করার সুযোগ নেই, কারণ ভারত একটি অন্যতম পারমাণবিক শক্তিধর দেশ। গত পাঁচ বছর ধরে তারা অস্ত্র আমদানিতে পৃথিবীতে শীর্ষে রয়েছে এবং সর্বোপরি তাদের রয়েছে একটি শক্তিশালী জাতীয়তাবাদের ভিত। ভারত এবং চীনের মধ্যে যতগুলো সীমান্ত সমস্যা রয়েছে, এতদিনেও এগুলো নিয়ে কোনোপক্ষ কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে না পারলেও একধরনের ডিফ্যাক্টো অবস্থায় ছিল দুই দেশই। এখানে সমঝোতার মধ্য দিয়ে কোনো সমাধানে আসতে না পারলে শক্তির বিচারে যদি কোনো পক্ষ কিছু অর্জন করতে চায়, তাহলে তা হবে দুই দেশের জন্যই ক্ষতিকর, তবে তুলনামূলক ক্ষতির পাল্লা কিন্তু চীনের দিকেই ভারী থাকবে।
সহযোগী অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual8 Ad Code