নিউজ ডেস্কঃ করোনা মহামারীর সঙ্গে লড়াই করছে গোটা বিশ্ব। এই সংক্রামক ভাইরাসের হাত থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য টিকা এসেছে বাজারে। কিন্তু করোনার মুক্তির জন্য নির্দিষ্ট কোনও ক্যাপসুল বা ট্যাবলেট এতদিন পর্যন্ত ছিল না। এবার হাতে এল করোনার ‘প্রথম ওষুধ’ ‘মলনুপিরাভির’।
এই বড়ি যৌথভাবে তৈরি করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মার্ক অ্যান্ড কো ইনকর্পোরেটেড এবং রিজব্যাক বায়োথ্যারাপিউটিকস সংস্থা। মৃদু এবং মাঝারি উপসর্গ বিশিষ্ট করোনা রোগীদের জন্য এই বড়ি কাজ করে, গবেষণায় উঠে এসেছে এমনই তথ্য। এই বড়িকে ছাড়পত্র দিয়েছে যুক্তরাজ্য। জানা যাচ্ছে, এই ওষুধ করোনা রোগীর হাসপাতালে ভর্তির সম্ভাবনা কমাচ্ছে। শীঘ্রই মার্কিন মুলুকেও এটি ছাড়পত্র পেতে পারে।
করোনার টিকা বাজারে এলেও নিত্যনতুন ভ্যারিয়্যান্টের জেরে সাধারণ মানুষের চিন্তা কাটছে না। ফলে করোনা আক্রান্তদের দ্রুত সুস্থ করার জন্য নির্দিষ্ট ওষুধের প্রয়োজন। ফলে এই ওষুধ করোনা নিয়ন্ত্রণে অনেকটাই কাজ করবে বলে আশাবাদী মার্কিন প্রশাসন।
জানা গিয়েছে, দিনে দুই বার করে এই ওষুধ দেওয়া প্রয়োজন করোনা রোগীদের। জ্বরের চিকিৎসার জন্য এই বড়ির কার্যকারিতা পরীক্ষা শুরু হয়েছিল। যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্য সচিব সাজিদ জাভিদ একটি বিবৃতিতে এই পিলটিকে ‘গেমচেঞ্জার’ বলেছেন। তিনি বলেন, ‘আজ আমাদের দেশের জন্য একটি ঐতিহাসিক দিন। যুক্তরাজ্যেই প্রথম দেশ যা করোনার বিরুদ্ধে ব্যবহার করার জন্য একটি পিলকে অনুমতি দিল।’ ওষুধটি কিনে বাড়ি নিয়ে যাওয়া যাবে। চিকিৎসকের পরামর্শ মতো ব্যবহারও করা যাবে।
এই বড়িটি প্রাথমিকভাবে ৭৭৫ জনের উপর পরীক্ষামূলকভাবে প্রয়োগ করা হয়েছিল। যেখানে দেখা গিয়েছে যারা এই ওষুধটি নিয়েছেন পাঁচদিনের মধ্যে তাদের দেহে করোনার উপসর্গ কমে অর্ধেক হয়েছে এবং হাসপাতাল ও কোভিড মৃত্যু কমেছে। এই ওধুষ প্রস্তুতকারী সংস্থার দাবি, যে কোভিড রোগীরা মলনুপিরাভির নিয়েছিলেন তাদের মধ্যে কারও মৃত্যু হয়নি। এতদিন পর্যন্ত করোনার চিকিৎসায় যে সমস্ত ড্রাগ বাজারে এসেছে তার মধ্যে কোনওটিই বড়ি নয়। রিজব্যাক বায়োথ্যারাপিউটিকস এর সিইও বলেছেন, ‘যেহেতু ভাইরাসটি সংক্রামিত হয়েছে বিপুলভাবে তাই এমন ওষুধের প্রয়োজন যা মানুষ বাড়ি নিয়ে যেতে পারবেন এবং ব্যবহার করতে পারবেন।’ তবে অন্যান্য কোনও দেশ এখনও এই ওষুধকে ছাড় দেয়নি।
ইংল্যান্ডের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের (এনএইচএস) জাতীয় চিকিৎসা পরিচালক প্রফেসর স্টিফেন পোভিস জানালেন, ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের ওষুধটি দেওয়া হবে। হাসপাতালে ভর্তি এবং মৃত্যু কমাতে সক্ষম হলে এই ওষুধ আরও বেশি জনগণকে সুপারিশ করা হবে।’
অ্যান্টিভাইরাল বড়িটি যুক্তরাজ্যে ‘ল্যাগেভরিও’ নামে ব্র্যান্ড করা হবে। এই বড়িটি একটি এনজাইমকে লক্ষ্য করে, যা ভাইরাস পুনরুত্পাদন করতে ব্যবহার করে। এটি জেনেটিক কোডে ত্রুটি সৃষ্টি করে। ফলে ভাইরাস বৃদ্ধি, ছড়িয়ে দেওয়ার এবং দখল করার ক্ষমতাকে ধীর করে দেয়।
এদিকে এই জেনেটিক কার্যকলাপ নিয়েই প্রশ্ন তুলছেন কিছু স্বাধীন বিশেষজ্ঞ। তাদের মতে সমস্ত ঝুঁকির বিষয়ে পরীক্ষা প্রয়োজন। ওষুধটি সম্ভাব্য মিউটেশনের কারণ হতে পারে কিনা তা দেখতে হবে। নয়তো এটি জন্মগত ত্রুটি বা টিউমারের কারণ হতে পারে।
এখনও পর্যন্ত করা ভাইরাল সিকোয়েন্সিং অনুযায়ী মলনুপিরাভির করোনাভাইরাসের সমস্ত ভেরিয়েন্টের বিরুদ্ধে কার্যকর। যার মধ্যে অতি সংক্রামক ডেল্টা ভেরিয়েন্টও রয়েছে, যা সম্প্রতি হাসপাতালে ভর্তি বৃদ্ধি এবং বিশ্বব্যাপী মৃত্যু বৃদ্ধির জন্য দায়ী। প্রস্তুতকারকরা মলনুপিরাভিরের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে বিশদে প্রকাশ করেনি। তবে তারা বলেছে যে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার হার যাঁরা ওষুধ পেয়েছেন এবং যাঁরা ডামি বড়ি পেয়েছেন তাদের মধ্যে একই রকম।
সেপ্টেম্বরে প্রাথমিক ফলাফল ঘোষণা করেছিল প্রস্তুতকারকরা। তাতে বলা হয়, এই ওষুধের ফলে কোভিড-এর প্রাথমিক লক্ষণ থাকা ব্যক্তিদের হাসপাতালে ভর্তি হওয়া এবং মৃত্যুর ঘটনা অর্ধেক হয়েছে। তবে, ফলাফলগুলি এখনও সমকক্ষ পর্যালোচনা(পিয়ার রিভিউ) বা বৈজ্ঞানিক জার্নালে প্রকাশিত হয়নি। মার্কিন উপদেষ্টারা আগামী ৩০ নভেম্বর এই ওষুধের সুরক্ষা এবং কার্যকারিতা ডেটা পর্যালোচনা করবেন। এরপর মলনুপিরাভির অনুমোদিত হওয়া উচিত কিনা তাই নিয়ে ভোট দেবেন তারা।
