মিথ্যা, বিদ্বেষ ও প্রতারণার ছড়াছড়ি

banglanewsus.com
প্রকাশিত August 3, 2022
মিথ্যা, বিদ্বেষ ও প্রতারণার ছড়াছড়ি

আদালত তদন্ত করে পেলেন যে, চ্যানেল যে সংবাদটি প্রকাশ করেছিল, তার সপক্ষে চ্যানেলের কাছে কোনো প্রমাণ নেই। এ সংবাদে আবেদনকারীর মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয়েছে। সুতরাং আদালত চ্যানেলের বিরুদ্ধে ৩৭,৫০০ পাউন্ড স্টারলিং অর্থদণ্ডাদেশ প্রদান করেন, ভারতীয় রুপিতে যার মূল্যমান প্রায় ৩৬ লাখ।

গোদি (গৃহপালিত) মিডিয়ার কোনো চ্যানেলে মিথ্যা সংবাদ প্রচারণার জন্য মোটা অঙ্কের আর্থিক দণ্ডাদেশ প্রদান এটিই প্রথম। কেননা এখন পর্যন্ত এ ধরনের চ্যানেল নানা ধরনের মিথ্যা প্রচারণার ক্ষেত্রে যেকোনো দণ্ড থেকে রক্ষা পেয়ে যাচ্ছে। এ দণ্ডাদেশ এজন্যই সম্ভব হয়েছে যে, বিচারিক কার্যক্রম বাইরের দেশে পরিচালিত হয়েছে। দেশের ভেতর এ ধরনের অসংখ্য মামলা বিচারাধীন রয়েছে।

সবাই জানেন যে, গোদি মিডিয়া সম্মানী লোকদের অপদস্থ করেছে এবং ভিত্তিহীন সংবাদের মাধ্যমে দেশের দুর্বল শ্রেণীর, বিশেষ করে মুসলমানদের বেঁচে থাকাকে কঠিন করে দিয়েছে। সবচেয়ে বেশি লজ্জাজনক বিষয় হচ্ছে, যখনই ওই সব চ্যানেলের উপস্থাপক বা প্রতিবেদকের বিরুদ্ধে মিথ্যা সংবাদের জন্য মামলা দায়ের হয়, তখনই বিজেপির কর্তৃত্বাধীন রাজ্যগুলোর পুলিশ তাদের রক্ষায় সামনে এসে উপস্থিত হয় এবং তাদের আইনি নিরাপত্তা প্রদান করে। এ ঘটনাগুলো দেখে মনে হয়, মিথ্যার এই ঘৃণ্য কারবার শাসকদলের পৃষ্ঠপোষকতায় ফুলে ফেঁপে উঠছে এবং এই চ্যানেলগুলো প্রশাসনযন্ত্রের আশীর্বাদ পাচ্ছে।

এ কারণেই বিগত দিনে রাহুল গান্ধীর বিরুদ্ধে একটি সম্পূর্ণ মিথ্যা সংবাদ প্রচারের জন্য জি নিউজের উপস্থাপক রোহিত রঞ্জনকে গ্রেফতারের জন্য ছত্তিশগড় পুলিশ ওয়ারেন্ট নিয়ে নয়দা এলাকায় পৌঁছলে উত্তরপ্রদেশ পুলিশ তার সামনে দেওয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। তারা রোহিত রঞ্জনকে ছত্তিশগড় পুলিশের হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেয়।

বিস্ময়কর কথা হচ্ছে, এ মামলায় সব আইনি ধারাকে শিকায় তুলে রাখা হয়েছে। আইনি ধারামতে, যদি কোনো রাজ্য পুলিশ কোনো অপরাধীর অনুসন্ধানে থাকে এবং সেই অপরাধী অন্য কোনো রাজ্যে থাকে, তাহলে ওই রাজ্যের পুলিশের আইনি দায়িত্ব হচ্ছে, তারা ওই অপরাধীর গ্রেফতারিতে সহায়তা করবে। কিন্তু বিষয়টা যেহেতু গোদি মিডিয়ার, এ জন্য নয়দা পুলিশ বেআইনিভাবে অপরাধীকে ছত্তিশগড় পুলিশের হাত থেকে ছিনিয়ে নেয়। ঘটনাটি ছিল, জি নিউজের ওই উপস্থাপক কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীর বিরুদ্ধে এমন এক বিভ্রান্তিকর সংবাদ প্রচার করেছেন, যার দ্বারা তার মানসম্মান ক্ষুণ্ণ হয়।

মূল ঘটনা হচ্ছে, কেরালার বয়নাড় জেলায় রাহুলের নির্বাচনী এলাকায় কিছু উগ্রপন্থী যুবক হামলা করে তার নির্বাচনী কার্যালয়ে ভাঙচুর করে। সাংবাদিকরা যখন রাহুল গান্ধীকে এ ঘটনা সম্পর্কে কিছু বলতে বলেন, তখন তিনি বলেন, ‘তারা আমাদেরই সন্তান। আমরা তাদের বুঝিয়ে সঠিক পথে নিয়ে আসব।’

জিটিভি রাহুল গান্ধীর এই বক্তব্যকে রায়পুরের ঘটনার সাথে জুড়ে দিয়ে প্রচার করে যে, রাহুল গান্ধী কানহাইয়া লালের খুনিদের ব্যাপারে এই সহানুভ‚তিমূলক কথা বলেছেন। এ সংবাদ প্রচার হওয়ার পর কংগ্রেস পার্টি যখন প্রতিবাদ জানাল, তখন চ্যানেল রীতিমতো ক্ষমা প্রার্থনা করল। কিন্তু রোহিত রঞ্জনের বিরুদ্ধে যেহেতু রাজস্থান ও ছত্তিশগড়ে মামলা দায়ের হয়ে গেছিল, তাই তার গ্রেফতারির প্রয়োজন ছিল। তবে উত্তরপ্রদেশের পুলিশ এর পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় এবং অপরাধীকে পালিয়ে যেতে সহায়তা করে।

এর আগে গত এপ্রিলে জিটিভির উপস্থাপক আমান চোপড়া রাজস্থানের আলোয়ার জেলায় এক মন্দির ভাঙা সম্পর্কে মনগড়া কাহিনী প্রচার করেছিলেন। তিনি সেখানে বলেছিলেন, কংগ্রেস প্রশাসন দিল্লির জাহাঙ্গীরপুরী এলাকায় একটি মসজিদের আশপাশে সংঘটিত ধ্বংসযজ্ঞের প্রতিশোধ নেয়ার জন্য মন্দির ভাঙার এই পদক্ষেপ গ্রহণ করে। অথচ বাস্তবতা হলো, মন্দির ভাঙার কাজ জাহাঙ্গীরপুরী ঘটনার আগে হয়েছে। আর এতে বিজেপি শাসিত স্থানীয় মিউনিসিপ্যাল করপোরেশনের হাত ছিল, যারা অবৈধ স্থাপনাগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান চালাচ্ছিল। আমান চোপড়ার এই ডাঁহা মিথ্যার বিরুদ্ধে রাজস্থান পুলিশ মামলা নথিভুক্ত করে এবং তাকে গ্রেফতারের জন্য নয়দা পৌঁছে। কিন্তু নয়দা পুলিশ চোপড়ার গ্রেফতারিতে বাধা সৃষ্টি করে।

বিস্ময়কর কথা হচ্ছে, অপরাধীর বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও আদালতও তাকে গ্রেফতারি থেকে রক্ষা করেন। অথচ আমান চোপড়ার এই ইচ্ছাকৃত চক্রান্তে শান্তি ও নিরাপত্তা এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এগুলো গোদি মিডিয়া প্রচারিত বিদ্বেষ ও মিথ্যার লাভজনক ব্যবসায়ের তরতাজা ঘটনার সামান্য চিত্রমাত্র। কেননা গোদি মিডিয়া আপাদমস্তক পুরোটাই এ ধরনের কর্মকাণ্ডে ব্যস্ত সময় পার করছে যার দ্বারা দেশের শান্তি ও নিরাপত্তা এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কিন্তু আইন যখনই এই কুচক্রীদের বিরুদ্ধে তার নিজের কাজ করে, তখন শাসক দল তাদের রক্ষায় সামনে চলে এসে দাঁড়ায়। এর দ্বারা তো এটিই প্রমাণ হয় যে, গোদি মিডিয়া মিথ্যা, প্রতারণা, ধোঁকাবাজি ও বিদ্বেষের যে কারবার করে যাচ্ছে, তাতে শাসক দলের ‘আশীর্বাদ’ রয়েছে। আর এর সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে, এর দ্বারা শাসক দল তাদের রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডা পূর্ণ করতে সহায়তা লাভ করছে। এ জন্য তারা চায়, মিথ্যা ও বিদ্বেষের এ ঘৃণ্য কারবার এভাবেই ফুলে ফেঁপে উঠুক।

আপনারা এর অপর পিঠে দৃষ্টিপাত করলে, এটি জেনে বিস্মিত হবেন যে, এ আদর্শের বিপরীতে থাকা মিডিয়ায় যারা মিথ্যার এই ঘৃণ্য কারবারের পর্দা উন্মোচন করছেন, সরকারি সংস্থাগুলো তাদের উচিৎ শিক্ষা দিতে ওঁৎ পেতে বসে আছে। এর প্রমাণ হচ্ছে ‘অল্টার নিউজ’-এর সাংবাদিক মুহাম্মদ জুবায়েরের সাথে সরকারি সংস্থার অন্যায় আচরণ। জুবায়ের মূলত তার ওয়েবসাইটে গোদি মিডিয়ায় চলমান মিথ্যা ও মনগড়া সংবাদগুলোর পোস্টমর্টেম করে মানুষকে সত্য সম্পর্কে অবহিত করতেন। সবাই জানেন যে, নূপুর শর্মার ইস্যুটাকেও মুহাম্মদ জুবায়েরই সবার সামনে নিয়ে এসেছিলেন। এ ঘটনার পর সব ফ্যাসিবাদী গোষ্ঠী মুহাম্মদ জুবায়েরের পিছে লাগে। বিস্ময়কর কথা হচ্ছে, নূপুর শর্মার বিরুদ্ধে অসংখ্য মামলা দায়ের হওয়া সত্তে¡ও এখন পর্যন্ত তাকে গ্রেফতার করা হয়নি। বরং তাকে রীতিমতো নিরাপত্তা প্রদান করা হয়েছে। পক্ষান্তরে মুহাম্মদ জুবায়েরকে ২০১৮ সালের একটি টুইটের ভিত্তিতে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়।

এর আগে মুহাম্মদ জুবায়েরের বিরুদ্ধে তার এমন এক টুইটের ভিত্তিতে ইউপিতে মামলা দায়ের করা হয়েছিল, যেখানে তিনি এ সময়ের সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর বদনাম করে ‘বিদ্বেষ বিস্তারকারী’ লিখেছিলেন। তার টুইটের ভিত্তিতে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত বিষয়ক মামলা দায়ের করা হয় এবং তাকে গ্রেফতার করা হয়। অথচ জুবায়ের যাদের ‘বিদ্বেষ বিস্তারকারী’ অভিহিত করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে হরিদ্বার ধর্মসংসদে উত্তেজনাপূর্ণ বিষোদগারের জন্য মামলা চলছে এবং এ মামলায় তাদের গ্রেফতারও করা হয়। সম্প্রতি দিল্লি হাইকোর্ট মুহাম্মদ জুবায়েরকে জামিন দিয়েছেন। বাস্তবতা হলো, জুবায়েরকে মিথ্যা ফাঁস করার শাস্তি পেতে হচ্ছে। পক্ষান্তরে মিথ্যা প্রচারকারীরা সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। বর্তমান প্রশাসনের এটিই সবচেয়ে বড় পরিচিতি।

মুম্বাই থেকে প্রকাশিত দৈনিক মুম্বাই উর্দু নিউজ ১৭ জুলাই,
২০২২ হতে ভাষান্তর
ইমতিয়াজ বিন মাহতাব
ahmadimtiajdr@gmail.com
লেখক : ভারতের প্রখ্যাত সাংবাদিক ও কলামিস্ট

এই সংবাদটি 1,226 বার পড়া হয়েছে

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।