জাতীয় জাগরণের মাস : ফেব্রয়ারি - BANGLANEWSUS.COM
  • ১লা জুন, ২০২৩ খ্রিস্টাব্দ

 

জাতীয় জাগরণের মাস : ফেব্রয়ারি

newsup
প্রকাশিত ফেব্রুয়ারি ১১, ২০২৩
জাতীয় জাগরণের মাস : ফেব্রয়ারি

ম আমিনুল হক চুন্নু : বিশ্ব ইতিহাসে বাঙালিই একমাত্র জাতি, যারা বুকের তাজা রক্তের বিনিময়ে ভাষার অধিকার প্রতিষ্টা করেছে। মায়ের ভাষা প্রতিষ্টার জন্য জীবন উৎসর্গের ইতিহাস বিশ্বে নজির বিহীন, যাদের আত্মত্যাগ ও জীবনের বিনিময়ে ১৯৫২ সালের ৮ই ফাল্গুন বা ২১শে ফেব্রæয়ারি প্রতিষ্টিত এই মহান ‘শহীদ দিবস’ ও ’আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ সেই সব সূর্য সন্তান ও ভাষা সৈনিক-সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, শফিউরসহ অসংখ্য শহীদ তাঁদের প্রতি জানাই বিন¤্র শ্রদ্ধা ও সশ্রদ্ধ সালাম। বায়ান্নের ভাষা আন্দোলনই বাঙালির আত্ম পরিচয়ের সন্ধান ও জাতীয় অধিকার প্রতিষ্টার সংগ্রামের সূচনা পর্ব। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতি সত্ত¡ার সে স্ফুরণ ঘটেছিল তাই পরবর্তীতে বাঙালি জাতিরাষ্ট্র বাংলাদেশ প্রতিষ্টার মনস্তাত্তি¡ক প্রেরণা সৃষ্টি করে। এই আন্দোলনের পথ ধরে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর বলিষ্ট নেতৃত্বে ৬ দফা ও ২১ দফার আন্দোলন ৬৯এর গণঅভ্যুত্থান এবং সর্বশেষ সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে বিশ্বের মানচিত্রে বাঙালি জাতির উত্থান ও স্বাধীন, সার্বভৌম বাংলাদেশের জন্ম।

ফেব্রæয়ারি বা ফাল্গুন মাস এলেই প্রকৃতির মোহনীয় রূপ রঙিন হয়ে উঠে বিভিন্ন ফুলের সমারোহে, আমরাও প্রাণ ফিরে পাই। আমরা আমাদের মাতৃভাষাকে রক্ষার জন্য বীর শহীদদের আত্মত্যাগের জন্য হই আপ্লুত ও উজ্জীবিত। পঞ্জিকার পাতায় এক উজ্জ্বল দিন ৮ই ফাল্গুন বা ২১শে ফেব্রয়ারি। একুশ আমাদের অহংকারের দিন, জাতীয় জাগরণের দিন। রক্তের বিনিময়ে, প্রাণের বিনিময়ে বাংলা পায় তার যোগ্য স্বীকৃতি।

ব্রিটিশ শাসিত বাংলায় সাহিত্য ও জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষায় বিস্ময়কর উন্নতি সাধিত হয়েছিল। বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের সময় (১৯০৫-১১) থেকে রাজনীতিতে ইংরেজীর জায়গায় বাংলা ও অন্যান্য ভারতীয় ভাষা ব্যবহৃত হতে থাকে। আর রাজনীতি তখন মিলনায়তন ছেড়ে চলে আসে মাঠে-ময়দানে ও রাস্তায়, তখনই সূচিত হয় জনজাগরণ। রাজনীতিতে ইংরেজী নিয়ে গণজাগরণ সম্ভব হতো না। স্বদেশি আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষার লেখক-পাঠকদের ও জনসাধারণের মধ্যে বাংলা ভাষার ভবিষ্যৎ নিয়ে বিরাট উৎসাহ-উদ্দীপনা ও আশা দেখা দিয়েছিল।
১৮৫৭-র মহাবিদ্রোহের পরে বঙ্কিমচন্দ্র ও রবীন্দ্রনাথের কালেও বাংলা ভাষার লেখক-পাঠকদের মধ্যে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়েছিল। তখন বাংলা ভাষার লেখক-পাঠকদের মনে জাতীয় জীবনে বড় কিছু অর্জনের প্রবল আকাঙ্খা দেখা দিয়েছিল। ব্রিটিশ শাসন বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনে গোটা ভারতে বাংলা ভাষা ছিল অন্যতম প্রধান অবলম্বন। সেটা ছিল রেনেসাঁসেরও কাল।

আমাদের জাতীয় জীবনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মাস রয়েছে। ফাল্গুন বা ফেব্রæয়ারি, মার্চ, আগষ্ট এবং ডিসেম্বর। তেমনিভাবে ৮ই ফাল্গুন বা ফেব্রয়ারি মাস শহীদদের মাস। আন্দোলনের মাস।

১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ দু’ভাগে ভাগ হয়। একটি নাম ভারত অন্যটি পাকিস্তান। পাকিস্তানের আবার দু’টি অংশ একটি পূর্ব পাকিস্তান অন্যটি পশ্চিম পাকিস্তান। দূরত্ব প্রায় ১২০০ মাইল, মাঝখানে ভারতবর্ষ। যদিও লাহোর প্রস্তাবে উল্লেখিত ছিল মুসলিমদের জন্য দু’টি রাষ্ট্র, একটি ‘বঙ্গস্থান’ ও অন্যটি ‘পাকিস্তানি’, কিন্তু মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ‘স্টেটস্’ এর স্থলে ‘স্টেট’ লিখে দিয়ে ইংরেজদের কাছ থেকে ‘এক পাকিস্তান’ এনেছিল। এই যে ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছিল, তা জিন্নাহর জীবিতকালেও ছিল, এরপরেও পাকিস্তানিরা তা ধরে রেখেছিল।

প্রথমেই শুরু হয় আমাদের মায়ের ভাষার উপর সেই ষড়যন্ত্র! পাকিস্তানের প্রতিষ্টাতা ও গভর্ণর জিন্নাহ ১৯৪৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সমাবর্তন অনুষ্টানে ঘোষণা করেন যে, পাকিস্তানের একটিই ভাষা হবে, আর সেটি হবে উর্দূ। একই সালে আবার ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত গণপরিষদে উর্দু ও ইংরেজী ভাষার পাশাপাশি বাংলাকেও পাকিস্তানের ব্যবহারিক ভাষা করার দাবি জানান। কিন্তু পাকিস্তানের প্রধাণমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান তখন বললেন, এটা মুসলিম দেশ তাই উর্দূই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্র ভাষা। নাজিম উদ্দিন ও নূরুল আমিন তাকে সমর্থন করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা তাদের বক্তব্যে তীব্র প্রতিবাদ জানায়। এভাবেই শুরু হয় ষড়যন্ত্র ও পাশাপাশি ছাত্রদের আন্দোলন। পর্যায়ক্রমে তা একসময় বৃহত্তর আন্দোলণে রূপ নেয়। তবে তখনকার ছাত্র রাজনীতি ব্যক্তি স্বার্থের রাজনীতি ছিল না। ছাত্র রাজনীতি মানেই ছিল আদর্শের বড় জায়গা।

এক সময় আসে সেই ফাল্গুন বা ফেব্রæয়ারী মাস, ১৯৫২ সাল। একুশে ফেব্রæয়ারি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক পরিষদের অধিবেশন চলছিল সেই প্রাক্তন পরিষদ ভবনে যা ছিল আজকের জগন্নাথ হলের মিলনায়তন। সেদিন ছাত্ররা মিছিল করে কলাভবন থেকে প্রাদেশিক পরিষদ ভবনের দিকে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নেয়। তখন কলাভবন ছিল বর্তমান ঢাকা মেডিকেল কলেজের পূর্বদিকের বিল্ডিং। সেই ঐতিহাসিক আমতলায় মিটিং শেষে ১০জন করে মিছিল নিয়ে ১৪৪ধারা ভঙ্গের শপথ নেয়া হয়। পরবর্তীতে পুলিশ বাহিনী মিছিলের উপর বিনা উস্কানিতে গুলিবর্ষণ করে। এতে সালাম, রফিক, জব্বার ও বরকত শহীদ হন। ঢাকা মেডিকেল কলেজের উত্তর দিকে সেখানেই শহীদ মিনার স্থাপিত হয়। পরবর্তীতে বহু উত্থান-পতনের মাধ্যমে স্থায়ীভাবে এই শহীদ মিনার স্থাপন করা হয়। আজও এই শহীদ দিবস আমরা পালন করি।

এক সময় পাকিস্তান সরকার আমাদের জাতীয় ভাষা অর্থাৎ মায়ের ভাষাকে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়। পরবর্তীতে দিনটিকে সরকারি ছুটি হিসাবেও ঘোষণা করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রয়াত শিক্ষক, জাতীয় অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম তার ক্যামেরায় ছবি ধারণ করেন। প্রয়াত প্রখ্যাত সাংবাদিক আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী কবিতা লিখেছেন-
‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো একুশে ফেব্রæয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি’।
আলতাফ মাহমুদ সেটিকে সুর দিয়ে গানে পরিণত করেন। এখন আমরা প্রতিটি ৮ই ফাল্গুন বা ২১শে ফেব্রæয়ারিতে এ গান গেয়ে প্রভাতফেরী করে শহীদ মিনারে ফুল দেই। রক্ত দিয়েই আমরা আমাদের মাতৃভাষাকে জাতীয় ভাষায় প্রতিষ্টিত করেছি।

মাতৃভাষা মানুষের জন্মগত অধিকার, মৌলিক অধিকার জন্মের পর মায়ের কোলেই মানুষ মাতৃভাষার সাথে পরিচিত হয়। মাতৃভাষা শেখানোর বিষয়টি পূর্ণতা পেতে থাকে শিক্ষা ও চর্চার মাধ্যমে। শিক্ষা তথা জ্ঞান অর্জন ছাড়া মানুষ যোগ্য হতে পারে না, জাতি এগুতে পারে না। কিন্তু ভাষা ছাড়া কি জ্ঞানার্জন কখনও সম্ভব?

বাঙালী জাতির সত্য ও ন্যায়ের অধিকার প্রতিষ্টার প্রেরণার উৎসই হলো আমাদের মাতৃভাষা আন্দোলন। চার দশক পর্যন্ত শুধু বাংলা ভাষার লোকজনই দিবসটি পালন করত পরে কানাডা প্রবাসী রফিকুল ইসলাম ও আব্দুস সালাম এর যৌথ প্রচেষ্টায় জাতিসংঘের মাধ্যমে ১৯৯৯সালে ইউনেস্কো ২১শে ফেব্রæয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি দেয় এবং ২০০০সাল থেকে বিশ্বের ১৯৩টি রাষ্ট্রে প্রতি বছর ২১শে ফেব্রæয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। তবে অভিবাসী জীবনে আটলান্টিক মহা সাগরের অপর পাড়ে জাতিসংঘের সদর দপ্তরের সামনে ১৯৯৭ সালে ২১শে ফেব্রæয়ারি মুক্তধারার ব্যবস্থাপনায় প্রথম অস্থায়ী শহীদ বেদীতে উদযাপন করা হয়েছিল। গত দশকে বাংলাদেশ সোসাইটি, জালালাবাদ এসোসিয়েশন, এমসি এন্ড গভ: কলেজ এলামনাই এসোসিয়েশন অব উন্ক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলামনাই এসোসিয়েশনের আয়োজনে অস্থায়ী শহীদ মিনার তৈরী করে জাকজমকভাবে পালিত হয়ে আসছে শহীদ দিবস।

নিউইয়র্ক সিটির প্রতিটি বরোতেই অগনিত অস্থায়ী শহীদ মিনার নির্মিত হয় এবং প্রায় চার শতাধিক সামাজিক, রাজনৈতিক, পেশাজীবি সংগঠন মাতৃভাষা দিবসে শ্রদ্ধার্ঘ অর্পন করে।

উল্লেখ্য কয়েক বছর যাবৎ কয়েকটি সংগঠনের উদ্যোগে বঙ্কস ও কুইন্সে প্রভাতফেরি অনুষ্টান শুরু হয় এবং নিউইয়র্ক সিটি কর্তৃক কুইন্স ও বঙ্কসে স্থায়ী শহীদ মিনার নির্মানের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। শীঘ্রই বাস্তবায়ন হবে বলে স্থানীয় কমিউনিটি বোর্ড এর প্রথম ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ এন মজুমদার ও বাংলাদেশ সোসাইটি অব বঙ্কস সভাপতি সামাদ মিয়া (জাকের) ও সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ এমরান আলী জানিয়েছেন। অন্যদিকে প্রায় ৩৪ বছর আগে ১৯৯০ এর একুশে ফেব্রæয়ারি যখন বাংলা পত্রিকা ঠিকানা প্রথম প্রকাশিত হয় নিউইয়র্কে তখন কি কেউ ধারণা করতে পেরেছিল, ঠিকানা কমিউনিটির জন্য এতটা গুরুত্বপূর্ণ, এতটা সহায়ক হয়ে উঠবে? ঠিকানা যেমন সততা ও আন্তরিকতার সঙ্গে কমিউনিটিকে সেবা দিয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে কমিউনিটিও বিশ্বস্থতার সঙ্গে ঠিকানাকে জড়িয়ে রেখেছে এবং সংবাদ পরিবেশনার ক্ষেত্রে ঠিকানা ৩৪বছরের সব সময়েই অগ্রগামী। এই জায়গাটি অন্য আর কোনো সহযোগী পত্রিকার পক্ষেই স্পর্শ করা সম্ভব হয়নি। ঠিকানা আমেরিকায় অদ্বিতীয়। ঠিকানা যার যতটুকু প্রাপ্য তাকে ততটুকু দিতে কার্পণ্য করেনি। প্রবাসে জনপ্রিয় বাংলা সংবাদপত্র ঠিকানার ৩৪তম বছরে পদার্পণ উপলক্ষ্যে সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি ও ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক এম এম শাহীন ও প্রধান সম্পাদক মুহম্মদ ফজলুর রহমানসহ সকল কর্মকর্তাকে অভিনন্দন এবং একুশের চেতনায় আগামী দিন সবার জন্য শুভ হোক। এছাড়া সাপ্তাহিক ঠিকানা’র ৩৪তম প্রতিষ্টা বার্ষিকী ও ৭১তম আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস সফল হউক।

প্রয়াত সৈয়দ শামসুল হক বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভাষাকন্যা উপাধি দিয়েছিলেন। এর একটি কারণও ছিল। বাংলা ভাষাকে আন্তর্জাতিক করণের ব্যাপারে তাঁর একটা বিরাট ভূমিকা আছে। ইউনেস্কোর প্যারিস সম্মেলনে তাঁর উদ্যোগেই একুশে ফেব্রæয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস করা হয়। বাংলাদেশের এত বড় সম্মান প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগেই অর্জিত হয়।

বাংলা ভাষাকে বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় ভাষার মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, কোথাও তার ব্যবহার নেই। বাংলাকে ব্যবহারিক ভাষা করে তুলতে না পারলে এই ভাষা শুধু সাহিত্যের ভাষা হয়ে থাকবে। সাধারণ মানুষের বিভিন্ন কাজকর্মের ভাষা হয়ে উঠতে পারবে না। বাঙালি ডাক্তার বাংলায় ওষুধের প্রেসক্রিপশন এখনও লিখতে পারে না। বাংলায় কোনো বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক চিঠি লেখা যায় না।

বাংলা ভাষা যখন একটি স্বাধীন দেশের রাষ্ট্রভাষা, তখন ইংরেজি, ফারসি ইত্যাদি ভাষার মতো বিজ্ঞানের ও কারিগরি শিক্ষা চর্চার ভাষা করে তুলতে হবে। বাংলায় যাতে বিশ্ববিদ্যালয় স্তরে বিজ্ঞান শিক্ষাদান করা যায় সেজন্য শুধু গবেষণা নয় আন্দোলনও দরকার। পন্ডিতরা অনেক সময় তাঁদের রক্ষণশীলতার জন্য ভাষা সংস্কার করতে পারেন না। যেমন-পন্ডিতরা টেলিফোনের বাংলা করেছিলেন ‘দূরালাপনী’ এবং চিফ সেক্রেটারীকে করেছিলেন ‘মহাকারণিক’, ভ্যানিটি ব্যাগের হিন্দি করা হয়েছিল ‘ফুটানিকা ডিব্বা’। এর একটিও সাধারণ মানুষ গ্রহণ করেনি। তারা টেলিফোন, ভ্যানিটি ব্যাগ ইত্যাদি শব্দকে নিজের ভাষা করে নিয়েছে। গ্রামের মানুষ পর্যন্ত এখন জানে ‘হাইজ্যাক’ শব্দের অর্থ কী ? সবাই এর অর্থ জানে এবং ব্যবহার করে।

বাংলা একাডেমির উদ্দেশ্য শুধু বাংলা ভাষায় বিদেশী গ্রন্থের অনুবাদ করা নয়। তাকে বিদেশী ভাষা থেকে বিজ্ঞান ও কারিগরি চর্চার নতুন নতুন শব্দ আহরণ করতে হবে। বাংলা ভাষাকে বিজ্ঞানের মৌলিক গ্রন্থ রচনার উপযোগি করে তুলতে হবে। এজন্য বাংলাদেশে জিম্বাবুয়ের মতো গণ-আন্দোলন দরকার। জিম্বাবুয়ের রবাট মুগাবের শাসনামলে ইংরেজী ভাষাকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করে সরকারি কাজের সকল স্তরে জিম্বাবুইয়ান ভাষা ব্যবহারে জনগণকে আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছিল। কিন্তু মুগাবে বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষাদানের শব্দ ইংরেজী ভাষা থেকে তাঁর ভাষায় গ্রহণ করেন। দক্ষিণ আফ্রিকায় এখন তাদের কোনো কোনো স্বদেশি ভাষায় বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষা প্রদান করা হয়। কোনো কোনো আফ্রিকান দেশে যা সম্ভব হয়েছে, বাংলাদেশে তা সম্ভব হয়নি। তার কারণ আমাদের রক্ষণশীল আমলাতন্ত্রের মধ্যে ইংরেজী ভাষার প্রতি অতিরিক্ত প্রভুভক্তি।

আজ খুব কষ্ট লাগে, যখন শুনি, অনেকেই বেদনা নিয়ে বলেন, ভাষা আন্দোলনের ৭১বছর অতিকান্ত হলেও বাংলা ভাষার এ বেহাল অবস্থা কেন? পাকিস্তানের পাঞ্জাবি শাসকরা গেল, ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান ঘটল কিন্তু বাংলা ভাষার ওপর থেকে শনির দশা কাটল না। বাংলা ভাষা যেন দু:খিনি ভাষা হয়েই রয়ে গেল। আফসোস নিয়ে বরং বলা যায়, অনাবাসী বাঙালিরা যত ভালোবাসা নিয়ে মাতৃভাষা বাংলাকে বুকের মধ্যে আগলে রাখেন, বাংলাদেশে যারা বসবাস করেন, যারা স্বাধীনতার সর্বাধিক বেনিফিশিয়ারি, তাদের মধ্যে বাংলা ভাষাকে লালন, যত্ম ও প্রতিষ্টার ক্ষেত্রে তত উদাসীনতা লক্ষ্য করা যায় না।

প্রশ্নটা এসেই যায়, কেন এ অবস্থা ? কেন এত কার্পণ্য ? কেন এত অবহেলা ? ব্রিটিশ কলোনির বিরুদ্ধে দীর্ঘ আন্দোলন, সংগ্রাম, জেল-জুলুম খেটে, জীবন দিয়ে স্বাধীন পাকিস্তান হলো। সবাই স্বাভাবিকভাবে ভেবে নিল, ইংরেজ বিদায় হলো, এবার পশ্চিম পাকিস্তানিরা তাদের নিজ নিজ ভাষা ব্যবহার, চর্চা ও লালনের সূযোগ পাবে। পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি জনগোষ্টীও তাদের আত্ম-পরিচয়ের স্বাতন্ত্র্যলাভ করবে। তারা স্বাধীনভাবে বাংলা ভাষাকে ভালোবাসতে, চর্চা ও সর্বস্তরে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্টা করার অবাধ সূযোগ পাবে।

হায় কপাল ! ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্টার পর থেকেই পাকিস্তানি শাসকগোষ্টী বাঙালিদের সঙ্গে প্রতারণা শুরু করে দিল। সাত আট মাস যেতে না যেতেই পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিরা মুসলিম লীগ নেতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর চালাকি এবং শঠতা ধরে ফেললো। ১১ মার্চ তিনি পূর্ব পাকিস্তানে এসে অন্য জাতিগোষ্টীর কোনো ভাষার প্রতি সামান্যতম শ্রদ্ধা না দেখিয়ে সদম্ভে ঘোষণা করেছিলেন, ‘উর্দূই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’। বাঙালি ছাত্র সমাজের সামনে এমন বিবস্ত্র দম্ভোক্তি ছাত্ররা মেনে নেবে কেন ? পাকিস্তানের আন্দোলন শেষ, বাংলা ভাষার দাবিতে ছাত্রদের আন্দোলন শুরু।

বাংলা ভাষার জন্য শহীদ সালাম, বরকত, রফিক, শফিক আত্মদান করেছেন। এখন তাঁদের সেই আত্মত্যাগকে শুধু স্মরণ করা হয়। কিন্তু তাঁরা যে উদ্দেশ্যে আত্মত্যাগ করেছিলেন সেই উদ্দেশ্য পূরণের কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় না। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব জাতিসংঘে বাংলায় ভাষণ দিয়ে নিজের ভাষাকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভের ব্যবস্থা করেছিলেন। তাঁর কন্যা শেখ হাসিনা একুশে ফেব্রæয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা করেছেন। এখন সারা বিশ্বে একুশে যথাযোগ্য মর্যাদায় ফেব্রæয়ারি পালিত হয়। এরই সঙ্গে বাংলাদেশে বাংলা ভাষায় শিক্ষাদান উচ্চতর পর্যন্ত বাধ্যতামূলক করা উচিত। বাংলা ভাষার সংস্কার ও উন্নতির জন্য আরো দরকার পন্ডিতদের সঙ্গে জনপ্রতিনিধিদেরও সংযোগ স্থাপন করা এবং সেখানে বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করা এবং তা হবে বাংলা ভাষায়।

আমাদের সেই ভাষা আন্দোলনই ছিল স্বাধীনতার বীজমন্ত্র। আজ ৮ই ফাল্গুন বা ২১শে ফেব্রæয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে সারা বিশ্বে পালিত হচ্ছে। এটা আমাদের গর্ব। তাই আধুনিক প্রযুক্তির যুগে বাংলা ভাষাকেও আধুনিক প্রযুক্তির ভাষা হতে হবে। নইলে বাংলাদেশ বিশ্বসভ্যতার অগ্রগতির যুগে পিছিয়ে যাবে। ভারত এদিক থেকে এগিয়ে গেছে। বাংলা ভাষাকেও এগুতে হবে। একুশে ফেব্রæয়ারিই পারে বাংলা ভাষাকে এগিয়ে যাওয়ার সেই উদ্দীপনা জাগাতে।

বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক সংকট, দমন-পীড়ন, নিষ্টুরতা, উগ্রতা ও বৈরীতা নিয়ে কথা বলতে হয়। একুশের সাথে ন্যায়, মানবিকতা, অধিকার-ভাবনা ও গণতান্ত্রিক চেতনা যে উচ্চতায় জড়িত ছিল, বর্তমান সময়ে তা লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। ফলে বর্তমান বাস্তবতায় আমাদের একুশের আনুষ্টানিকতা যেমন অর্থবহ হয়ে উঠতে পারছে না । বিষয়টি কি আমাদের জন্য দু:খজনক নয় ?

(লেখক: গবেষক, প্রাবন্ধিক, প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ, নুরজাহান মেমোরিয়াল মহিলা ডিগ্রী কলেজ, সিলেট। পিএইচ ডি ফেলো, নিউইয়র্ক,)।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।