যশোরের বৌদ্ধবিহারের গল্প

লেখক: Shiuly
প্রকাশ: ৩ years ago

Manual8 Ad Code

ডেস্ক নিউজ: প্রখ্যাত ঐতিহাসিক সতীশচন্দ্র মিত্র ‘যশোর খুলনার ইতিহাস’ গ্রন্থের প্রথম খণ্ডের ২১২ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছেন, ভরতের দেউলের অর্ধমাইল দক্ষিণে কাশিমপুর গ্রামে ডালিঝাড়া নামে একটি স্থান আছে। ইহা একটি ভগ্নস্তূপ। এখানে ভরত রাজার কোনও কর্মচারীর বাড়ি থাকতে পারে।

প্রত্নতত্ত্ববিদ আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া তাঁর ‘বাঙলাদেশের প্রত্নসম্পদ’ গ্রন্থের ৩৮২ পৃষ্ঠায় ‘গৌরিঘোনা’ নামক স্থানের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন সম্পর্কে বলেছেন, ‘ভরত ভায়না থেকে প্রায় এক কিলোমিটার পশ্চিম-দক্ষিণে গৌরিঘোনা নামক একটি প্রাচীন গ্রাম আছে। এতে অসংখ্য প্রাচীন কীর্তির ধ্বংসাবশেষ এককালে ছিল। বর্তমানে (১৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দ) গ্রামের এখানে-সেখানে প্রাচীন ইট ও মৃৎপাত্রের ভগ্নাংশ ছাড়া আর কিছুই দেখা যায় না। স্থানীয়রা এই স্থানকে ভরত রাজার বাড়ি বলে শনাক্ত করেন।’

যশোরের কেশবপুর উপজেলার গৌরিঘোনা ইউনিয়নের কাশিমপুর গ্রামে ‘ডালিঝাড়া’ ঢিবি অবস্থিত। প্রসিদ্ধ প্রত্নস্থল ভরত ভায়না বৌদ্ধমন্দির থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে এর অবস্থান। চারপাশের ভূমি থেকে ঢিবির পূর্ব অংশ প্রায় ২ দশমিক ৫ মিটার উচুঁ। প্রত্নস্থানটি ইতোমধ্যে ইট লুট, বাড়ি-ঘর নির্মাণ ও চাষাবাদের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঢিবির মধ্যে বিক্ষিপ্ত ইটের টুকরা ও মৃৎপাত্র দৃশ্যমান। জীবনের ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণে বসবাসকারী লোকজন দিনে দিনে প্রত্নস্থলটি কেটে ফেলছে। কিছুটা মাটি অপসারণ করলেই বেরিয়ে আসছে ইটের তৈরি প্রাচীন স্থাপত্যিক অবশেষ। এখানে প্রত্নতাত্ত্বিক খননের পটভূমি এটাই।

Manual5 Ad Code

ডালিঝাড়ায় আবিষ্কৃত পূর্ণাঙ্গ বৌদ্ধবিহার-মন্দির কমপ্লেক্স এখন আলোচনায়। প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতর, খুলনা ও বরিশাল বিভাগীয় অঞ্চল কার্যালয়ের একটি খনন দল এটি আবিষ্কার করেছে। প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব অনুধাবন করে প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের মহাপরিচালকের অনুমতিক্রমে গত ২২ জানুয়ারি প্রত্নস্থানটিতে খনন শুরু করেন তারা।

Manual2 Ad Code

বিহারটির পূর্ব বাহুতে কোনও ভিক্ষুকক্ষ নাই। এখানে দুটি সেলুলার স্থাপনারীতিতে নির্মিত মন্দির রয়েছে। বিহারের স্থাপনাটি আকরের প্রতিসমতা ও গঠন আমলে নিলে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে আরেকটি মন্দিরের অস্তিত্ব ছিল বলে অনুমান করা যায়। তবে স্থানীয় মানুষজন বাড়ি নির্মাণ করে এই মন্দিরটির উপরের কাঠামো সম্পূর্ণ ধ্বংস করে ফেলেছে।

বৌদ্ধবিহারটি আয়তাকার। পূর্ব দিকে ২টি মন্দির, উত্তরবাহুতে ২টি কক্ষ, দক্ষিণ বাহুতে ৯ টি ভিক্ষুকক্ষ, পশ্চিম বাহুতে ৭ টি ভিক্ষুকক্ষ রয়েছে। পশ্চিম বাহুর মাঝখানে একটি বড় কক্ষ। এর পশ্চিমে একটি বৃহদাকার অভিক্ষেপ আছে। পশ্চিম বাহুর মধ্যবর্তী এই অভিক্ষেপ ও বড় কক্ষটিই বিহারের প্রধান প্রবেশপথ ছিল।

Manual6 Ad Code

বৌদ্ধবিহারের পূর্ব দিকে দুটি বৌদ্ধ মন্দির উন্মোচিত হয়েছে। এর মধ্যে উত্তর-পূর্বকোণের মন্দিরটির পরিমাপ হলো উত্তর-দক্ষিণে আনুমানিক ১৯ মিটার ও পূর্ব-পশ্চিমে আনুমানিক ২৪ মিটার। পূর্ব দিকে মাঝ বরাবর (পশ্চিম দিকের বাহুর মধ্যবর্তী প্রবেশপথের ঠিক বিপরীতে) উন্মোচিত বৌদ্ধমন্দিরের পরিমাপ উত্তর-দক্ষিণে আনুমানিক ২১ মিটার ও পূর্ব-পশ্চিমে আনুমানিক ২৪ মিটার। মন্দির সংবলিত ঢিবি চারপাশের ভূমি থেকে প্রায় ২ দশমিক ৫ মিটার উঁচু। উভয় মন্দিরই আবদ্ধ কক্ষের মাঝে নির্মিত। এ ধরনের স্থাপনা রীতি ‘সেলুলার’ স্থাপনা রীতি হিসেবে পরিচিত। এই অঞ্চলের নিকটবর্তী ভরতভয়না, মণিরামপুরের দমদম পীরস্থান ঢিবি ও ঝুড়িঝাড়া ঢিবিতে উন্মোচিত স্থাপত্য কাঠামোতে একই রীতি লক্ষণীয়।

বিহারটি উত্তর-দক্ষিণে ৬০ মিটার ও পূর্ব-পশ্চিমে ৯০ মিটার। বিহারের আঙিনার পরিমাপ ৩৪ দশমিক ৫ মিটার (উত্তর-দক্ষিণে) ও ৪০ দশমিক ৬ মিটার (পূর্ব-পশ্চিম)। বিহারের ভেতরের দিকে এখন অবধি উন্মোচিত দক্ষিণ ও পশ্চিম বাহু সংলগ্ন বারান্দার পরিমাপ উত্তর-দক্ষিণ বরাবর ৪২ মিটার এবং পূর্ব-পশ্চিম বরাবর ৪৪ দশমিক ৬ মিটার। ভেতরের এই বারান্দার প্রস্থ ২ দশমিক ৪০ মিটার থেকে ২ দশমিক ৫৫ মিটার। দক্ষিণ বাহু সংলগ্ন বাইরের বারান্দার প্রস্থ ৪ দশমিক ৫০ মিটার। পশ্চিম দিকের বাইরের ও প্রবেশপথ সংলগ্ন বারান্দা বা পরিসরের প্রস্থ ৪ দশমিক ৭৫ মিটার। এটি গিয়ে দক্ষিণ বাহুর বারান্দার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।

Manual1 Ad Code

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual4 Ad Code