

কানাডা প্রতিনিধি: তার স্টাইলিস্ট হ্যান্ডসাম লুক পছন্দ করেন না এমন হয়তো খুব কম মানুষই আছে! তবে এই সুদর্শন ব্যাক্তির আরেকটি বিশেষ পরিচয় স্কুল শিক্ষকের পেশা ছেড়ে তিনি হয়েছেন কানাডার ২৩তম প্রধানমন্ত্রী। ২০১৫ সালে মাত্র ৪৩ বছর বয়সে কানাডার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন তিনি। কানাডার ইতিহাসে জো ক্লার্কের পর দ্বিতীয় কনিষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো। আর তার ন্যায়পরায়ণতার জন্য তিনি আজ বিশ্বের আলোচিত রাজনীতিবিদদের তালিকায় অন্যতম।
তার জন্ম ১৯৭১ সালের ২৫ ডিসেম্বর কানাডার অটোয়ায়। তার পুরো নাম জাস্টিন পিয়ের জেমস ট্রুডো। বাবা কানাডার সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং আধুনিক কানাডার জনক পিয়েরে এলিয়ট ট্রুডো। মা মার্গারেট ট্রুডো একজন অভিনেত্রী, লেখক এবং সমাজসেবক। তিন ছেলেসন্তানের মধ্যে বড় জাস্টিন ট্রুডো। ট্রুডোর বয়স যখন ৬, তখন তার বাবা-মার বিচ্ছেদ হয়ে যায়।
বাবার আদরেই প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবনে বেড়ে ওঠা ট্রুডোর। রোজ সকালে তিনি স্কুল বাসে করে অটোয়ার পাবলিক এরেমেন্টারি স্কুলে পড়াশোনা করতে যেতেন। দুপুরে লাঞ্চের জন্য আবার স্কুল বাসে করে বাসায় ফেরা। এভাবেই কেটেছে তার শৈশব। স্কুলজীবন শেষে ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র হলেন ম্যাকগিল ইউনিভার্সিটিতে। সেখানে থেকে ব্যাচেলর ডিগ্রি শেষে ব্রিটিশ কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যাচেলর অব এডুকেশন ডিগ্রি অর্জন। শিক্ষকতার দিকে ঝোঁক ছিল হয়তো ট্রুডোর। তাইতো ক্যারিয়ারটাকে এভাবে সাজানো। তারপর স্যার উইনস্টন চার্চিল সেকেন্ডারি স্কুলে গণিতের শিক্ষক হিসেবে কিছুদিন কাজ করেন। কিন্তু পড়াশোনা তখনও থামাননি। মনট্রেল ইউনিভার্সিটি থেকে প্রকৌশল বিষয়ে পড়াশোনা করেন। এরপর ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জিওগ্রাফিতে মাস্টার্স প্রোগ্রামে ভর্তি হন। যদিও কাজের চাপে তা আর শেষ করা হয়নি।
ট্রুডো শুধু শিক্ষকতাই করেননি, একটি মন্ট্রিল রেডিও স্টেশনেও কাজ করেছেন। তারপর লিবারেল পার্টিতে রাজনীতিবিদ হিসেবে আগমন তার। রাজনীতিতে সরাসরি প্রবেশ ঘটে একবিংশ শতাব্দীর শুরুতেই, পার্লামেন্টের সদস্য হন ২০০৮ সালে। প্রথমবার পার্লামেন্ট মেম্বার হয়েই মনোযোগ কাড়েন সবার। সেই সঙ্গে ভূমিকা পালন করেন নাগরিকত্ব, অভিবাসন, শিক্ষানীতির মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোর দক্ষ সমালোচক হিসেবে। জয় পান ২০১১ সালের ফেডারেল নির্বাচনেও, ৩৮.৪১ শতাংশ ভোট পেয়ে, পার্লামেন্টে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার জন্য পান রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ ডায়মন্ড জুবিলি পদক।
রাজনীতিতে ট্রুডোর জনপ্রিয়তা এক ঈর্ষণীয় বিষয়। টানা তৃতীয়বারের মতো কানাডার ক্ষমতায় বসছেন প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো। সবার ভরসার জায়গাটা তৈরি করাটা এতটা সহজ ছিল না। বাবার মৃত্যুর পর রাজনীতিতে তিনি বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠেন।
২০১৫ সালে তার নেতৃত্বে ১৮৪ আসনের মধ্যে ৩৬টিতে জয় পেয়ে কানাডার ইতিহাসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করেছিল লিবারেল পার্টি। সে সময় দেশের ২৩তম প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন ট্রুডো।২০১৫ সালে ক্ষমতা পাওয়ার পর নানামুখী উদ্যোগ নেয়ার ঘোষণা দেন ট্রুডো। মধ্যবিত্তদের জন্য রাজস্বের হার কমানো এবং ধনীদের ক্ষেত্রে কর বাড়ানোর কথা বলেছিলেন তিনি। স্বচ্ছ ও নীতিমান সরকার গঠনের ঘোষণাও দেন এই তরুণ নেতা। প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন সুষ্ঠু নির্বাচন প্রদানে কখনো পিছপা হননি। এমনকি নিজের জনপ্রিয়তা কিছুটা কমে গিয়েছিল যখন, তখনও তা অকপটে স্বীকার করেছেন।
তার মন্ত্রিসভা সাজিয়েছেন নারী-পুরুষের সমতায়। আত্মহত্যার প্রবণতা থেকে দেশকে রক্ষা করতে মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতির জন্য নানা ব্যবস্থা নিয়েছে তার সরকার। এ ছাড়াও আদিবাসীদের জীবনযাত্রার উন্নতিতে তিনি করেছেন আইন প্রণয়ন। ধর্মীয় পোশাক পরি বা প্রতীক ধারণকেও বারবার তুলে ধরেছেন ইতিবাচক হিসেবে। যৌন নিপীড়নবিরোধী ‘মি টু’ আন্দোলন শুরু হলে তিনি সমর্থন প্রকাশ করেছেন আন্দোলনকারীদের প্রতি। তিনি বিরোধিতা করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাতটি দেশের শরণার্থীদের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞার, যার মধ্যে ছ’টিই ছিল মুসলিমপ্রধান। বিরোধিতা করেছেন মধ্যপ্রাচ্যে বিমান হামলার, অস্ত্রচুক্তি বাতিল করেছেন সৌদি আরবের সঙ্গে। আশ্রয় দিয়েছেন ২৫ হাজার সিরিয়ান শরণার্থীকে, সম্প্রসারণ করেছেন নতুন অভিবাসী সংখ্যাও।
ট্রুডো বলেছেন, অন্যদের কথা শোনা গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে যারা ভিন্ন পটভূমির এবং ভিন্ন অভিজ্ঞতার। তিনি এমন একটি নেতৃত্বে বিশ্বাসী যা মানুষকে একত্রিত করে। তার এই ভিন্নধর্মী চিন্তাধারাই মানুষের কাছে তাকে জনপ্রিয় করে তুলেছে। করেছে সফল মানুষ। কানাডার মুক্ত গণতন্ত্রের প্রতীক হয়ে তিনি শাসনকার্য চালিয়ে যাচ্ছেন। শুধু প্রতিশ্রুতি দেননি, প্রতিশ্রুতির ৯২ শতাংশ বাস্তবায়ন করেছেন। সরকার পরিচালনায় মধ্যপন্থা অবলম্বন করেছেন। একজন সত্যিকারের ন্যায়পরায়ণ শাসকের স্থানে তাকে বসানোই যায়। তাইতো তার জনপ্রিয়তা ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বজুড়ে!