

সম্পাদকীয়:
আমাদের উপমহাদেশে শুধু নয়; দুনিয়াজুড়ে দেশে দেশে ফুটবলের পরিচর্যা ও পৃষ্ঠপোষকতায় ক্লাবগুলোর ভূমিকা
অবিস্মরণীয়। ফুটবলকে জনপ্রিয় করার পেছনে ক্লাবের অবদান সবচেয়ে বেশি। জাতীয় ফুটবলের প্রাণ হলো
ক্লাব ফুটবল। ক্লাব ফুটবল নিয়ে ফুটবলপিপাসুদের আবেগ ও আবেদন মাপার যন্ত্র এখনও আবিষ্কার হয়নি।
মাঠে লড়ছে দুই ক্লাবের ২২ জন ফুটবলশিল্পী। গ্যালারিতে হাজার হাজার দর্শকের গগনবিদারী চিৎকার আর
উত্তেজনা। ক্লাব ফুটবল মানেই রেষারেষি আর ভরপুর প্রতিদ্বন্দ্বিতা। তাই সবাই ক্লাব ফুটবলের সপক্ষে।
বর্তমান ফুটবল প্রজন্মের অনেকেই হয়তো জানে না ১৯৬৭ সালে এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (এএফসি)
আয়োজিত ক্লাব চ্যাম্পিয়নশিপের আগে ঢাকায় আগা খান গোল্ড কাপ ক্লাব ফুটবল টুর্নামেন্ট শুরু হয়েছে
১৯৫৮ সালে। আন্তর্জাতিক এই ক্লাব টুর্নামেন্টের বদৌলতে ঢাকা এক সময় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ফুটবল
নগরী হিসেবে পরিচিত হয়েছিল। এএফসি এই ক্লাব টুর্নামেন্টকে যথাযথভাবে স্বীকৃতি দিতেও দেরি করেনি।
আগা খান গোল্ড কাপ টুর্নামেন্ট ঢাকার ফুটবলের প্রেক্ষাপট পাল্টে দিয়েছে। ঘরোয়া ফুটবলকে সমৃদ্ধ করেছে।
তৎকালীন পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের ফুটবলের মানোন্নয়নে এ টুর্নামেন্ট অর্থবহ ইতিবাচক ভূমিকা পালন
করেছে। গোল্ডকাপ সুযোগ করে দিয়েছে দর্শকদের প্রতিবছর উন্নতমানের ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ফুটবলের
স্বাদ গ্রহণের।
এই টুর্নামেন্টে ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, ভারত, ইরান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, দক্ষিণ কোরিয়া ছাড়াও পূর্ব ও
পশ্চিম পাকিস্তানের ঘরোয়া ফুটবলের সেরা ক্লাবগুলো অংশ নিয়েছে। স্থানীয় ক্লাব হিসেবে ঢাকা মোহামেডান
স্পোর্টিং প্রথম শিরোপা জিতেছে ১৯৫৯ সালে। এর পর ভিক্টোরিয়া স্পোর্টিং ক্লাব জিতেছে ১৯৬২ সালে।
স্বাধীনতার পর এই ক্লাব টুর্নামেন্ট এক পর্যায়ে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন মাঠে নিয়ে এলেও সেটি আর
ধারাবাহিকভাবে আয়োজন করতে পারেনি বিভিন্ন কারণে। হারিয়ে গেছে ঢাকার ফুটবল মাঠ থেকে আন্তর্জাতিক
ক্লাব টুর্নামেন্ট; যে ফুটবল দর্শকদের একটি লম্বা সময় ধরে দিয়েছে অনেক বৈভব।
১৯৮৭ সালের ৮ থেকে ১৬ জুন ঢাকা স্টেডিয়ামে সপ্তম এশিয়ান ক্লাব চ্যাম্পিয়নশিপের চতুর্থ গ্রুপের বাছাই
পর্বের খেলা অনুষ্ঠিত হয় ঢাকা মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের ব্যবস্থাপনায়। উপমহাদেশে ঢাকা মোহামেডান
স্পোর্টিং প্রথম ক্লাব, যারা আন্তর্জাতিক ফুটবল ক্লাব চ্যাম্পিয়নশিপের আয়োজন করে। অংশ নেয়
স্বাগতিক মোহামেডান, ইরাকের আল রশিদ ক্লাব, নেপালের মানাং মারসুরাগদি ক্লাব, ভারতের মোহনবাগান ও
পাকিস্তানের এয়ারফোর্স এসসি। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন ঢাকা মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবকে এই
আন্তর্জাতিক কাপ চ্যাম্পিয়নশিপের দায়িত্ব দিয়েছে। তখন এশিয়ান ফুটবল ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক
ছিলেন পিটার ভেলাপান।
এর পর ঘূর্ণি-দুর্গতদের সাহায্যার্থে আয়োজিত বিটিসি ক্লাব কাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট-৯১ অনুষ্ঠিত হয় ৩১ মে
থেকে ৭ জুন পর্যন্ত ঢাকা স্টেডিয়ামে। এর ব্যবস্থাপনায় ছিল বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন ও মহানগরী ফুটবল
ক্লাব সমিতি। এ ক্লাব ফুটবল টুর্নামেন্টে অংশ নেয় ভারতের কলকাতা থেকে মোহনবাগান, মোহামেডান আর
ইস্টবেঙ্গল ক্লাব। বাংলাদেশ থেকে অংশ নেয় আবাহনী ক্রীড়াচক্র, মোহামেডান স্পোর্টিং ও ব্রাদার্স
ইউনিয়ন। দুই দেশের ঘরোয়া ফুটবলের সেরা ছয় ক্লাবের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত ফুটবল টুর্নামেন্ট দারুণ
উপভোগ্য হয়। হাজার হাজার মানুষ প্রতিদিন খেলা দেখতে গ্যালারিতে উপস্থিত থাকে।
দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলের মানোন্নয়নের কোনো বিকল্প নেই। এ ক্ষেত্রে ক্লাবগুলোর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
কেননা, ক্লাবগুলোই জাতীয় দলের প্রাণ। এরাই খেলোয়াড় জোগান দেয়। প্রতিটি দেশে কয়েক বছর ধরে পেশাদার
ফুটবল চলছে। এই প্রিমিয়ার ফুটবলে স্থানীয়দের পাশাপাশি বিদেশি ভালো খেলোয়াড়ও ক্লাবের হয়ে খেলছেন। এটি
ফুটবলের মানোন্নয়নের ক্ষেত্রে ইতিবাচক দিক।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো থেকে যদি ছয়টি সেরা ক্লাব নিয়ে দুই বছর অন্তর আন্তর্জাতিক ক্লাব
চ্যাম্পিয়নশিপের আয়োজন করা যায়, তাহলে এ অঞ্চলের দেশগুলোর ফুটবল উপকৃত ও লাভবান হবে। অনেক দিন
থেকে সাউথ এশিয়ান ফুটবল ফেডারেশন ক্লাব চ্যাম্পিয়নশিপের কথা ভাবছে। তাদের যে ধরনের চিন্তাভাবনা ও
পরিকল্পনা, এটির বাস্তবায়ন অসম্ভব।
বাংলাদেশে এখন বিলিয়ন ডলার ক্লাবে আটটি শিল্প গ্রুপ আছে। এর মধ্যে বসুন্ধরা গ্রুপ একটি। গ্রুপটি
ক্রীড়াক্ষেত্রে কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিকতার সঙ্গে ফুটবল, ক্রিকেট ছাড়াও বিভিন্ন খেলায় পৃষ্ঠপোষকতা
করছে, যার ধারেকাছে নেই অন্য কোনো গ্রুপ। গ্রুপের ক্লাব বসুন্ধরা কিংসের নীতিমালার অন্যতম ভিত্তি হলো
দেশের ফুটবলের উন্নয়নে অবিচল দায়বদ্ধতা।