‘সাহিত্য একাডেমি, নিউইয়র্ক’র জানুয়ারি মাসের সাহিত্য আসর; স্বরচিত পাঠ, আলোচনা, আবৃত্তি, বইয়ের ওপর আলোকপাত

লেখক:
প্রকাশ: ২ years ago

Manual6 Ad Code

বেনজির শিকদার : নিউইয়র্কে জ্যাকসন হাইটসের একটি মিলনায়তনে ২৬ জানুয়ারী শুক্রবার সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত হয়ে গেল ‘সাহিত্য একাডেমি, নিউইয়র্ক’র নিয়মিত অয়োজন মাসিক সাহিত্য আসর। আসরটি পরিচালনায় ছিলেন একাডেমির পরিচালক মোশাররফ হোসেন। এবারের আসরটি সাজানো হয়েছিল— স্বরচিত পাঠ, আলোচনা, আবৃত্তি, বইয়ের ওপর আলোকপাত এবং অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০২৪ -এ প্রকাশিতব্য বইয়ের পরিচিতি নিয়ে।

Manual8 Ad Code

শুরুতেই সাহিত্যের ওপর বিশেষ বক্তব্য রাখেন, লেখক ও প্রাবন্ধিক হাসান ফেরদৌস। তিনি বলেন, লেখকের কাজ রিয়ালকে উদ্ধার করা নয়, লেখকের কাজ হচ্ছে রিয়ালিটিকে নির্মাণ করা, পাঠকের সাথে যোগসূত্র স্থাপনের মধ্যদিয়ে তার মনের ভেতর বিশ্বাসবোধটি জাগিয়ে তোলা।প্রাক রুশ বিপ্লবের বিশ্ববিখ্যাত উপন্যাস ‘আন্না কারেনিনা’র প্রসঙ্গ টেনে বলেন, সব সাহিত্যের লক্ষ্য মূলত একটাই। আমরা যখন এই বইটি পড়ি, প্রথমত— আমাদের চোখের সামনে একটি ভিন্ন, অজানা সভ্যতা উদ্ভাসিত হয়। দ্বিতীয়ত— কতগুলো মানুষকে জানি, যাদের দুঃখবোধ, আনন্দ বেদনা সব আমাদের মতোই। অর্থাৎ মানুষ যেখানেই থাকুক না কেন, তাদের মৌলিক বোধগুলো অভিন্ন। তিনি বলেন, কবিতার প্রধান শর্ত হচ্ছে আড়াল থেকে বলতে হবে। কবিতার বহিরঙ্গ ও অন্তরঙ্গ এই তফাতটা খুব কষ্ট করে জানতে হবে, জানতে হবে শব্দের শক্তি সম্পর্কে। এমনকি শব্দ নিয়ে কসরত করা নয়, সহজিয়া ভাষায় লিখতে হবে। তিনি উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ -এর ‘ড্যাফোডিল’ এবং কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘তালগাছ’ ও ‘বলাকা’ কাব্যের ভেতর সেটি দেখতে পাই বলে উল্লেখ করেন। এসময় তিনি, কবি আলম সিদ্দিকীর ‘নামকাব্য’ ও ‘নজরদারী’ বই দুটো নিয়ে বিশদ কথা বলেন।
প্রবীণ সাংবাদিক সৈয়দ মোহাম্মদ উল্লাহ বলেন, এত এত আলোকিত মানুষের মাঝে এসে, সাহিত্য একাডেমির এই আড্ডায় আমি অত্যন্ত ভালো বোধ করি। ষোড়শ শতাব্দীতে চালু হওয়া ফ্রান্সের লিটারারি স্যালন, যেমনটা কলকাতাতেও ছিল— কফি হাউজের আড্ডা। তাই তো সেই আড্ডা নিয়ে এমন আক্ষেপ, ‘কফি হাউজের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই।’ নিশ্চয়ই সেই আড্ডার মাঝে এমনকিছু ছিল, যা কিনা লিটারারি আড্ডা। তিনি বলেন, আমি মনে করি, সাহিত্য একাডেমির এই আড্ডাটাও ঠিক তেমনি গুরুত্বপূর্ণ।

কবি তমিজ উদ্দিন লোদী বলেন, ধৈর্য অনেক বড়ো বিষয়। যাদের ভেতর এটি থাকে, তারা তাদের অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে সক্ষম হন। একজন লেখকের দেখার চোখ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পাওলো কোয়েল হো তার ‘দ্য এ্যালকেমিস্ট’ বইটি লিখতে গিয়ে দীর্ঘ সময় নিয়েছেন। ভ্রমণের মধ্যদিয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি মেলে দেখেছেন চারপাশ। তিনি উল্লেখ করেন, টি এস এলিয়টের মতো কবিও তার ‘দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড’ রচনার পর সেটি নিয়ে গিয়েছিলেন, কবি এজরা পাউন্ডের কাছে। এজরা পাউন্ড সেটি দেখে কিছু অংশ ফেলে দিতে বলেছিলেন। এলিয়ট তাই করেছিলেন। এই যে শ্রদ্ধাবোধ; একজন লেখকের এটুকু থাকা খুবই জরুরি। কিন্তু আমরা এখন কিছু রচনার পর সেটি নিয়ে আত্মতৃপ্তিতে পৌঁছে যাই। পরিমিতিবোধ কাজ করে না আমাদের। এটি অত্যন্ত আত্মঘাতী। তিনি প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন, আলোচনাকে ইতিবাচক দিক থেকে নিতে পারার সক্ষমতা অর্জনের পাশাপাশি ধৈর্য ধারণের মধ্যদিয়ে আমরা যেন ভবিষ্যৎ-সাহিত্য নির্মাণ করি।
সাপ্তাহিক ঠিকানা’র প্রধান সম্পাদক ফজলুর রহমান বলেন, নতুন অনেককিছুর সংযোজন দেখে আজকের আসরটি আমার খুব ভালো লেগেছে! শুধু লেখার জন্য লেখা হলে তা কখনোই ভালো লেখায় পরিণত হয় না। সিদ্ধান্ত, মনোযোগ ও অধ্যবসায় থাকাটা খুব জরুরি, এমনকি লিখতে গিয়ে সময়ের সীমারেখা টানলেও চলবে না।

Manual6 Ad Code

কবি হোসাইন কবীর বলেন, এবারে দেশ থেকে আসার পর দুটো আসরে উপস্থিত থাকতে পেরেছি। দুটো আসরই আমার কাছে অত্যন্ত সম্মৃদ্ধ মনে হয়েছে। বিশেষ করে বইয়ের আলোচনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি উল্লেখ করেন, আমি যে শহরে থাকি, সেই চিটাগাঙেও এমন আসর হয় না। সাহিত্য একাডেমি যে কাজটি করছে, তা আমাদের জন্য অত্যন্ত ফলপ্রসু। সবশেষে তিনি একটি স্বরচিত কবিতা পাঠ করেন।
সাংবাদিক নিনি ওয়াহেদ বলেন, সাহিত্য একাডেমি বিভিন্ন পরিকল্পনার মধ্যদিয়ে এগোচ্ছে, এই বিষয়টি দেখে আমার খুব ভালো লাগছে। আগামী দিনগুলোতে গল্প, কবিতা, উপন্যাস নিয়ে আলোচনা হবে এটি খুবই প্রয়োজনীয়। প্রত্যাশারাখি এই প্রক্রিয়াটি চলমান থাকবে।
কবি কাজী আতীক বলেন, লেখালেখি কেন্দ্রিক সমালোচনা আমাদের শত্রু নয় বরং বন্ধু। সমালোচনাকে যদি ইতিবাচকভাবে নিতে পারি, তাহলেই আমাদের উৎকর্ষ সাধিত হবে, আরও বেশি পরিশীলিত হবো আমরা। তিনি নিজের লেখা একটি কবিতা পাঠ করেন।

নীরা কাদরী বলেন, নিজের লেখাটি পড়ার জন্য, নিজেকে তুলে ধরার জন্য সাহিত্য একাডেমি বরাবরই একটি অবারিত প্ল্যাটফর্ম। প্রতিনিয়ত চেষ্টা চলছে সাহিত্যের বিষয়গুলো নিয়ে আসরটিকে আরও নতুনভাবে সাজাবার। আশারাখি সামনের দিনগুলোতে আরও অনেক দ্বার উন্মোচন হবে।
এছাড়াও কথা বলেন, অধ্যাপিকা হুসনে আরা বেগম, নূরুল আবেদীন, আবু সাঈদ রতন, এইচ বি রীতা প্রমুখ।
এবারের আসরে বিশেষ সংযোজন ছিল, বই আলোচনা। এতে অংশ নিয়ে লেখক আদনান সৈয়দ— ‘এ্যালবাম থেকে কয়েকজন’ এবং ‘রিডিং ললিতা ইন তেহরান’ বই দুটোর ওপর কথা বলেন। তিনি বলেন, নতুন বছরের প্রথম মাসটি আমার জন্য ভালো ছিল না। এমাসেই হারাতে হলো লেখক মীনাক্ষী দত্তকে। ‘এ্যালবাম থেকে কয়েকজন’ মীনাক্ষী দত্তের একটি স্মৃতিচারণমূলক বই। বইটিকে চারটি ভাগে ভাগ করা যায়।
১. একটি অংশ তার পরিবার নিয়ে।
২. আরেকটি বন্ধুবান্ধব নিয়ে।
৩. অন্যটি বুদ্ধদেব বসু, চামিনি রায় থেকে রবীন্দ্রনাথ সময় পর্যন্ত।
৪. বাকিটুকু তার কলেজ জীবন নিয়ে।
তিনি বলেন, স্বাভাবিকভাবে সব কন্যারাই তাদের পিতাকে ভালোবাসেন। মীনাক্ষী দত্তও এর ব্যতিক্রম নন। বইটিতে তিনি লিখেছেন, ‘ছেলেবেলায় আমার সবচেয়ে প্রিয় দৃশ্য ছিল, টেবিল ল্যাম্পের আলোয় ঝুকে থাকা বাবা বুদ্ধদেব বসুর মুখ! লেখার সময় পায়ের বুড়ো আঙুল দিয়ে বাবা এক অদ্ভুত ধরনের শব্দ করতেন! বাবাকে খালি গায়ে দেখিনি কখনও, দিনেরবেলা কখনও ঘুমাতেও দেখিনি। স্নান সেরে ঢিলে মতো পাজামা পাঞ্জাবি পরতেন, পকেটে থাকতো রুমাল আর পায়ে থাকতো টুকটুকে লাল বিদ্যাসাগরের চটি। বাবা ভালোবাসতেন সুগন্ধ ব্যবহার করতে। যতদূর স্মৃতি যায়, আমি নিজেকে বাবার একনিষ্ঠ পাঠক হিসেবেই দেখতে পাই।’ লেখকের এ বইটি মূলত তার বাবা বুদ্ধদেব বসুর স্মৃতিকে স্মরণ করেই লেখা। ‘রিডিং ললিতা ইন তেহরান’ বইয়ের প্রসঙ্গে বলেন, ললিতা খুব আলোচিত ও সমালোচিত একটি বই। বারো বছরের একটি মেয়ের সাথে মধ্যবয়সী একজন পুরুষের অসম প্রেম, এমন বিষয়গুলো সমাজ কখনোই নিতে পারেনি, সেকারণেই বইটি অধিক সমালোচিত। বইটির লেখক আজার নাফিসি স্কলারশিপ নিয়ে ইরানের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতে যান এবং সেখানে তিনি ‘ললিতা’ বইটি পড়াতে গিয়ে বিপত্তিতে পড়েন। ইরান সরকার বইটি পড়ানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা দেন। শুধু তাই নয়, নানা ঘটনার মধ্যদিয়ে তাকে তার চাকরিটিও হারাতে হয়। তিনি পরবর্তীতে আমেরিকায় চলে আসেন এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগে আটজন স্টুডেন্ট নিয়ে ঘরোয়া বৈঠকে সাহিত্যালোচনা শুরু করেন। এরমধ্যে ‘ললিতা’ বইটিও ছিল। তিনি ভেবেছিলেন, সাহিত্যের কোনো মুখোশ নেই। একে ধর্মদিয়ে আটকানো যায় না। উপন্যাসটি এভাবেই এগিয়েছে।
আসরের একপর্যায়ে লেখক রিমি রুম্মান নিউইয়র্কে বসবাসরত বেশকিছু লেখকের, অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০২৪ সামনে রেখে প্রকাশিতব্য বইয়ের পরিচিতি তুলে ধরেন।

Manual1 Ad Code

এবারের আসরে আবৃত্তি করেন, এম এ সাদেক, পারভীন সুলতানা, মুনমুন সাহা ও তাহরিনা প্রীতি।
স্বরচিত পাঠে অংশগ্রহণ করেন, ড. ধনঞ্জয় সাহা, নানজীব ইমাম চৌধুরী, স্বপন বিশ্বাস, মিনহাজ আহমেদ, তাহমিনা খান, জেবুন্নেছা জোৎস্না, নিবরাজ ইমাম চৌধুরী, ইমাম চৌধুরী, ফারহানা হোসেন, মিশুক সেলিম, মৃদুল আহমেদ, সবিতা দাস, সুলতানা ফেরদৌসী, আকবর হায়দার কিরণ, সুমন শামসুদ্দিন, শিমু আফরোজ, রুপা খানম, রোকেয়া দীপা, সোহানা নাজনীন, ফরিদা ইয়াসমীন, লুৎফা শাহানা, মিয়া আসকির, ফারহা হাসান, এস এম মোজাম্মেল, বেনজির শিকদার প্রমুখ। এছাড়াও আসরে সংগীত পরিবেশন করেন, শিল্পী তাহমিনা শহীদ।
আসরে অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন, লেখক ফেরদৌস সাজেদীন, পীরজাদা, আখতার আহমেদ রাশা, মারিস্টেলা শ্যামলী, দিলরুবা আবেদীন, মনিজা রহমান, এবিএম সালেহ উদ্দিন, উদিতা আজাদ, শহীদ উদ্দিন, রাহাত কাজী শিউলি, নাসির শিকদার, আনিসুল কবির জাসির, শহীদুল ইসলাম, মনিজা রহমান, আকলিমা রানা চৌধুরী, ভায়লা সালিনা, সৈয়দ আহমেদ জুয়েদ, মেহফুজ আহমেদ, লিপি ইয়াসমিন, নেহার সিদ্দিকী, সেলিম আফসারী, মোঃ আমিরুল ইসলাম, ইসরাত বোখারী, মুন্নি, উর্বি সাবিনা প্রমুখ।

Manual4 Ad Code

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual2 Ad Code