কাওয়ালির আদ্যোপান্ত

লেখক: Nopur
প্রকাশ: ২ years ago

Manual5 Ad Code

ডেস্ক রিপোর্ট:

কাওয়ালি হলো প্রাচ্যের সংগীতের একটি প্রাচীন ধারা। দক্ষিণ এশিয়ায় উদ্ভব হওয়া এক প্রকার সুফি ইসলামী আধ্যাত্মিক প্রেম বিষয়ক ভক্তিমূলক গান। ভারত ও পাকিস্তানে ১৩ শতকে কাওয়ালির আবির্ভাব ঘটে। মূলত সুফি-সাধকরা ঈশ্বরের প্রেমে মশগুল হয়ে এই গান করেন।

ইসলামী সুফিবাদের অনুসারীরা পুঁথিগত বিদ্যার উপর নির্ভর না করে গুরুর থেকে শিক্ষা গ্রহণে বিশ্বাসী। সুফি ইসলামী আখ্যানের ওপর ভিত্তি করে রচিত এই গানগুলো শুরুতে পাঞ্জাবের আশপাশের সুফিদের মাজারগুলোতে একটি আধ্যাত্মিক সংগীত হিসেবে পরিবেশন করা হতো। পরে নুসরাত ফতেহ আলী খান এবং সাবরি ব্রাদার্সের মতো বড় নাম কাওয়ালিকে একটি ধর্মনিরপেক্ষ এবং বাণিজ্যিক রূপ দেয়।

কাওয়ালি ফার্সি, উর্দু, হিন্দিসহ আরও নানা স্থানীয় ভাষায় রচিত হতো। বাংলা ভাষায়ও কাওয়ালি গান রচিত হয়েছে। কবি কাজী নজরুল ইসলামের হাত ধরেই বাংলাদেশে বাংলা ভাষায় এই সংগীতের এই ধারাটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

ধারণা করা হয় উর্দু ‘কওল’ থেকে কাওয়ালি শব্দটির উৎপত্তি। কওল-এর আভিধানিক অর্থ হলো বলা। এখানে নবী রাসুল সম্পর্কিত কথা বলাকেই নির্দেশ করা হয়েছে।

কাওয়ালদের উত্থান:

প্রত্যেক কাওয়াল প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ধরে দরগা ও খানকাহের সঙ্গে যুক্ত থাকে, তারা ওরসে যায়, প্রতি মাসে সেখানে পরিবেশনা করতে হয়। সব জনপ্রিয় কাওয়ালদের উত্থান হয়েছে এমন দরগা ও খানকাহ থেকেই।

পাকিস্তানের বিশ্বখ্যাত কাওয়ালি শিল্পী নুসরাত ফতেহ আলী খানের পরিবার গত ৮০০ বছর ধরে বাবা ফরিদ উদ্দিন গঞ্জে শকরের মাজারের সঙ্গে যুক্ত। বলতে গেলে প্রতিটি উদীয়মান কাওয়ালের সংগীত ক্যারিয়ার শুরু করার আগে মাজারে গান করা এক প্রকার বাধ্যতামূলক।

Manual4 Ad Code

এই কাওয়ালি দলের অন্যতম সদস্য আমজাদ ফরিদ সাবরি ছিলেন পাকিস্তানের সবচেয়ে প্রশংসিত তারকা কাওয়ালি সংগীতশিল্পীদের একজন। দুঃখজনকভাবে, তাকে করাচীতে গুলি করে হত্যা করা হয়।

Manual6 Ad Code

নুসরাত ফতেহ আলী খানের উত্তরাধিকার তার ভাগ্নে রাহাত ফতেহ আলী খান বর্তমানে কাওয়ালি সংগীতের অন্যতম বড় নাম। তিনি সাত বছর বয়স থেকে তার চাচার কাছে প্রশিক্ষণ পেয়েছেন এবং তার কর্মজীবনে অনেক বলিউড এবং হলিউড চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক করেছেন। নুরান সিস্টারস (জ্যোতি এবং সুলতানা) এই ঘরানার দুইজন পরিচিত নারী কাওয়ালি তারকা।

বিখ্যাত সুফি গায়ক আমীর খসরুকে এই ধারার সংগীতের প্রবর্তক বলা হয়। তিনি ছিলেন নিজামুদ্দিন আউলিয়ার শিষ্য। কাওয়ালি সংগীত হলো সুফি সাধকদের বাণী। আধ্যাত্মিক গানগুলো অনেকটা ঈশ্বরের সাথে কথোপকথনের মতো হয়। গানের কথাগুলো নানা বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে বাজানো হয়।

কাওয়ালিতে আধুনিকতা:

Manual4 Ad Code

আজ থেকে ৭০০ বছর আগে কাওয়ালিতে হামদ, নাথ, মানকাবাদ এবং গজলও উপস্থাপন করা হতো। তবে এই গান মূলধারায় এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জনপ্রিয়তা অর্জন করে বিংশ শতকে এসে।

আজিজ মিয়া কাওয়াল, নুসরাত ফতেহ আলী খান এবং সাবরি ব্রাদার্সের মতো বিশ্বখ্যাত কাওয়াল শিল্পীরা দরগাহ থেকেই তাদের যাত্রা শুরু করেছিলেন। পরে তারা পাশ্চাত্যে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। এই কাওয়ালদের কারণে কাওয়ালি প্রতিটি মানুষের দ্বারে দ্বারে পৌঁছে যায় এবং বাণিজ্যিক মর্যাদাও পায়।

নুসরাত ফতেহ আলী খান ১৯৮৮ সালে পিটার গ্যাব্রিয়েলের দ্য লাস্ট টেম্পটেশন অফ ক্রাইস্ট সাউন্ডট্র্যাকে কণ্ঠ দেন এবং রিয়েল ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে ছয়টি অ্যালবাম প্রকাশ করেন। তিনি তার কর্মজীবনে আরও শত শত রেকর্ড প্রকাশ করেছেন (যদিও কিছু রেকর্ড বাণিজ্যিকভাবে মুক্তি পায়নি)।

কাওয়ালি কারা শোনেন:

Manual7 Ad Code

বিশ্বখ্যাত কাওয়াল মুন্সী রাজিউদ্দীনের ছেলে ফরিদ আয়াজের মতে, মাহফিল-ই-সামাকে যদি জাগতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, সেখানে শিশু-বৃদ্ধ, নারী-পুরুষ, বুদ্ধিজীবী ও প্রকৌশলী সব শ্রেণি-পেশা-বয়স ও লিঙ্গের মানুষ রয়েছে।

কিন্তু কাওয়ালি শ্রোতার প্রসঙ্গ এলে বলা যেতে পারে, কাওয়ালি শুনতে এবং আবৃত্তি করতে পারেন শুধুমাত্র একজন সুফি। যখন কেউ কাওয়ালি শোনেন, তখন তিনি ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, যুবক, বৃদ্ধ, নারী, পুরুষ কিছুই থাকেন না, তখন তিনি কেবলই একজন সুফি। ফরিদ আয়াজ ও তার ভাই আবু মুহাম্মদ কাওয়ালি আমীর খসরুর ঘরানার কাওয়ালি চর্চা করেন।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual7 Ad Code