চা বিক্রেতা থেকে সফল প্রধান শিক্ষক

লেখক:
প্রকাশ: ৮ years ago

Manual3 Ad Code

ডেস্ক রিপোর্ট :: হরিপুর উপজেলার বহরমপুর চরভিটা গ্রামের এরফান আলী ছিলেন একজন পরাটা ও চা বিক্রেতা।

১৯৯৯ সালে বহরমপুর টি ইসলাম উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাশ ও ২০০১ সালে যাদুরানী মহা বিদ্যালয় থেকে এইচএসসি পাশের পর বহরমপুর ছোট বাজারে চা-পরাটার দোকান দেন এরফান।

ওই বাজারেই তার বাবা নুুরুল ইসলামেরও আছে মুদি দোকান। দুই ভাই, ৬ বোনসহ ১০জন সদস্যের সংসারে বাবাকে সহযোগিতা করতেই লেখাপড়ার পাশাপাশি চা-পরাটা বিক্রি করতেন এরফান। তখন ওই গ্রামে শতভাগ সাক্ষরতাও ছিলনা।

তাই পিছিয়ে পড়া এই এলাকার মানুষের মাঝে শিক্ষা পৌঁছাতে নিজের মনোবল ও প্রচেষ্টায় ২০০১ সালে নিজের ধান ক্ষেতে বাঁশের ঘর তুলে স্থাপন করেন চরভিটা প্রাথমিক বিদ্যালয়। সফল হবেন না নিশ্চিত জেনে সে সময় এলাকার মানুষ তাকে ডাকতেন পাগল এরফান।মানসিক পাগল নয়, শিক্ষার আলো ছড়াতেই পাগলামী-এমন প্রত্যয় নিয়ে বসে নেই এরফান। শুরুতে নানা ঘাত-প্রতিঘাত। এরপরেও পিছনে তাকাননি তিনি।

এলাকার দ্বারে দ্বারে ঘুরে ৪০জন শিক্ষার্থী যোগাড় করে ২০১১ সালে প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগের পাঠদানের অনুমতি পান এরফান আলী। ৫টি শ্রেনিতে শিক্ষার্থীদের ভর্তি নিয়ে রাত-দিন পড়ে থাকতেন বিদ্যালয়ে। ক্লাস পরীক্ষা আর বছরের কিছু গদবাঁধা আয়োজন।

Manual4 Ad Code

প্রধান শিক্ষক এরফান আলী সবার ধারণা পাল্টে দিয়েছেন। সবুজে ঘেরা এক টুকরো জমিতে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন স্কুল, দেয়ালে জলজল করছে বিখ্যাত মানুষদের ছবি আর মনীষীদের নানা উক্তি। আর স্কুলে শিক্ষার্থীদের ধরে রাখতে ও পাঠদানে আনন্দ বাড়িয়ে দেয় নানা ধরনের খেলার উপকরণ।

Manual3 Ad Code

পাশের হার ঈর্ষণীয় সাফল্য হওয়ায় এই অজ পাড়াগাঁয়ের স্কুলটি সরকারিকরণ হয় ২০১৩ সালে, তবে সে ঘোষনাও আসে ২০১৫ সালে। স্কুলে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির হার বৃদ্ধি করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেন প্রধান শিক্ষক এরফান আলী।

শিক্ষার্থীদের পড়াশুনায় মনোযোগী করতে ২০১৪ সালে নিজ খরচে চালু করেন সাপ্তাহে দুইদিন দুপুরে একবেলা খাবার। একদিন ডিম-খিচুরী, অন্যদিন মাছ-ভাত। শুরুতে প্রধান শিক্ষক নিজের ও অভিভাবকদের কাছ থেকে মুষ্টি চাল সংগ্রহ করে মিড ডে মিল চালু করেন।এখন আর মুষ্টি চাল নিতে হয়না। ১শ শতকের এই স্কুলে ৬৬শতকের একটি পুকুর আছে। সেখানে মাছ চাষ আর হাঁস-মুরগী পালন করে বছরে আয় করে ২লাখ টাকার। আর ১০ বিঘা জমি লিজ নিয়ে করেছেন আমের বাগান। সেখান থেকে বছরে আয় হয় ৩লাখ টাকা। সে আয় থেকেই এখন ৩২০জন শিক্ষার্থীদের মিড ডে মিলের খরচ বহন করে বিদ্যালয়টি। আর মিড ডে মিলে বছরে খচর হয় ৬লাখ টাকা। অবশিষ্ট টাকার যোগান দেন বিদ্যালয়ের এই প্রধান শিক্ষক এরফান আলী।

২০১৫ সালে ৫ম শ্রেনির শিক্ষার্থীদের জন্য বিনা খরচে চালু করেন সান্ধ্যকালীন বাড়তি ক্লাস। সৌর বিদ্যুতের আলোতে সন্ধ্যা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত চলে অতিরিক্ত এই ক্লাস। এতে শিক্ষার্থীরা লোখাপড়ায় মনোযোগী হওয়ার পাশাপাশি বাড়তে থাকে পাশের হারও। এতে স্বস্তি নামে এলাকার গরীব অভিভাবকদের মাঝে, তাই খুশি তারাও। বর্তমান বিদ্যালয়ে ৩২০জন শিক্ষার্থীর জন্য আছেন ৪জন শিক্ষক। চাপ বেশি হওয়ায় আরো তিনজন প্যারা শিক্ষকও নিয়েছেন প্রাধান শিক্ষক। এর খরচও বহন করেন এরফান আলী।

এই বিদ্যালয়ের মিড ডে মিলে সফল হওয়ায় ২০১৬ সালের ১৬ আগস্ট প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সমন্বয় সভায় চরভিটা প্রথমিক বিদ্যালয়কে অনুসরণ করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এরপর পরিপত্র জারি করে সারা দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে দেয়।

সেই চা বিক্রেতা এরফান আলী ২০০৮ সালে রাজধানীর একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স শেষ করে এখন ওই বিদ্যালয়ের সফল প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান শিক্ষক।

Manual7 Ad Code

ওই বিদ্যালয়ের ৬ষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী হাসনারা আক্তার ও ৫ম শ্রেণির খাবিরুন আক্তার বলেন, এই বিদ্যালয়টি এই এলাকার সোনার টুকরো। পরিবেশ এতই ভাল যে বাড়িতে লোখাপড়া করতে ইচ্ছা করে না। মনে হয় এখানেই থাকি।

৬ষ্ঠ শ্রেণির আইরিন আক্তার এই বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলেন ৩য় শ্রেণিতে। বাবা রাজ মিস্ত্রী, মা একজন গৃহিনী। লেখাপড়ার খরচ যোগাড় করতে হিমশিম খায় তার পরিবার। কিন্তু এই বিদ্যালয়ে অতিরিক্ত কোন খরচ না থাকায় এবার নতুন করে চালু করা ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছে আইরিন।

৫ম শ্রেণির রিয়াজ জানায়, এখানে পড়াশুনার পাশাপাশি খেলাধুলা, সঙ্গীত ও পুকুরে নৌকা দিয়ে ঘুরানো হয়। বিদ্যালয়ের চারপাশ ফুল ফল আর সবুজ পাতাসহ নানা রঙ্গের পরিবেশ। এতই ভাল লাগে যে সে অনুভূতি বোঝানো যাবেনা।

চরভিটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক-এরফান আলী বলেন, আমি পাগল শিক্ষার। শিক্ষার আলো ছড়াতে এই প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে। শিক্ষার গুনগত মান উন্নয়নে আরো নানা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা অধিদপ্তর ডিডি (নিয়োগ শাখা) একেএম সাফায়েত আলী সম্প্রতি পরিদর্শনে এসে শিক্ষার্থীদের কম্পিউটার ল্যাব উদ্বোধন করেন। এ সময় তিনি বলেন, এই বিদ্যালয়টি পরিচ্ছন্ন। শিক্ষার মান ও পাশের হার সন্তোষ জনক।

Manual3 Ad Code

এছাড়াও অন্যান্য কারিকুলাম এক্টিভিটিস থাকায় শিক্ষায় মনোনিবেশ করতে পারছে ছাত্র-ছাত্রীরা। খুব শিগগিরই এই বিদ্যালয়ে নতুন ভবন দেয়া হবে। অবকাঠামোগত উন্নয়ন হলেই এর মান আরো বেড়ে যাবে বলে জানান তিনি।

দরিদ্র জনপদে শিক্ষার আলোয় আলোকিত করতে এরফান আলীর মতোই অনেক শিক্ষিত যুবক এগিয়ে আসুক এমন প্রত্যাশা সবার।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual7 Ad Code