করোনা ঝুঁকির মধ্যেও শ্রম বিক্রি করতে ঘরের বাইরে মানুষ

প্রকাশিত:বুধবার, ০৮ এপ্রি ২০২০ ১০:০৪

করোনা ঝুঁকির মধ্যেও শ্রম বিক্রি করতে ঘরের বাইরে মানুষ

 

আনোয়ার হোসেন আনু,কুয়াকাটা (পটুয়াখালী)
পটুয়াখালীর কুয়াকাটায় লকডাউন ভেঙ্গে শ্রম বিক্রি করছে দরিদ্র শ্রেনীর মানুষ। ক্ষুধা তাদের ঘরের বাইরে নামতে বাধ্য করেছে। নভেল করোনা সংক্রমনের ঝুঁকির কথা জেনেও সামাজিক দূরত্ব ভেঙ্গে বাধ্য হয়ে শ্রম বিক্রি করছে বলে এসব শ্রমিকরা জানান। দিনমজুর এসব মানুষ গুলো করোনার ভয়াবহতার চেয়ে পেটের ক্ষুধাকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। ত্রানের উপর নির্ভরশীলতায় আরো খাদ্য ঝুঁকিতে ফেলতে পারে বলে এসব শ্রমিকরা মনে করেন। সরকারের দেওয়া জরুরী ত্রান সহায়তা জনসংখ্যানুপাতে অপ্রতুল। সমুদ্র উপকুলের তৃনমুল পর্যায়ের মানুষদের জেলা প্রশাসনের দেয়া জরুরী খাদ্য সহায়তা প্রয়োজন মেটাতে সক্ষম নয়। আবার অনেকেই সরকারী খাদ্য সহায়তা পাবার পারও লকডাউন ভেঙ্গে শ্রম বিক্রি করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। উপকুলের মানুষরা করোনা ভাইরাস সংক্রমণকে তেমন একটা পাত্তা দিচ্ছেনা। ঘরের বাইরে গিয়ে দলবদ্ধ ভাবে শ্রম বিক্রি করার কারনে সামাজিক দূরত্ব ভেঙ্গে পরছে। স্থানীয় পর্যায়ে কাচাঁ পাকা রাস্তাঘাট, বেরিবাধঁ সংস্কার সহ সরকারের বিভিন্ন উন্নয়নমুলক কর্মক্রমে জনপ্রতিনিধি ও ঠিকাদাররাও লকডাউন অমান্য করে শ্রমিকদের সম্পৃক্ত করছে। অভিযোগ রয়েছে কুয়াকাটায় উপকুলীয় বেরীবাধঁ উন্নয়ন কাজে চায়না কোম্পানী চায়না শ্রমিকদের পাশাপাশি দেশীয় শ্রমিকদের দিয়ে এখনও কাজ করছে। করোনা ঝুঁকির মধ্যে সকল উন্নয়ন মুলক কর্মযজ্ঞ বন্ধ থাকলেও বন্ধ হয়নি কুয়াকাটায় বেরিবাধঁ উন্নয়ন কাজ। কর্মরত এসব শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সচেতনতায় কোন নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই সেখানে। সকল মানুষ লকডাউনে থাকলেও চায়না কোম্পানী সহ বিভিন্ন পর্যায়ের শ্রমিকরা বাইরে বেরিয়ে দলবদ্ধ ভাবে কাজ করায় সাধারন মানুষের মাঝে আতংক বিরাজ করছে। তবে চায়না প্রকল্পে দায়িত্বেরত কর্মকর্তারা বলছে তাদের কাজ করার অনুমতি রয়েছে।
শ্রম বিক্রি করা এসব মানুষ গুলো ভাত কাপড়,সন্তানদের ভরন পোষণ নিয়ে বেশি চিন্তিত,করোনা ভাইরাস নিয়ে উদাসিনতাই বেশি কাজ করছে। কর্মমুখী এসব মানুষদের ঘরে আটকে রাখতে সরকার খাদ্য সহায়তা দিয়ে আসলেও তা সঠিক ভাবে বন্টণ করা হচ্ছে না বলে শ্রমজীবি মানুষ গুলোর অভিযোগ। খাদ্য সহায়তা বন্টণে ইউপি সদস্য ও কাউন্সিলররা ভোটের হিসাব নিকাশ করে মাথায় রেখে সেভাবেই বন্টন করছে। এতে একই ব্যাক্ত একাধিক বার ত্রান ও খাদ্য সহায়তা পান। আবার কেউ কেউ একেবারেই পাচ্ছে না জনশ্রুতি রয়েছে।
লকডাউন কালীন সময়ে এসব দারিদ্র মানুষকে সরকারের পাশাপাশি স্থানীয় দু’য়েকটি সংগঠন খাদ্য সহায়তা দিয়ে আসলেও পাশে নেই বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থা সহ ক্ষুদ্র ঋন দেওয়া এনজিও গুলো। দরিদ্র শ্রেনীর মানুষকে সহায়তার নামে ঋণের বোঝা চাপিয়ে সুদের ব্যবসা করা এসব সংস্থা গুলো বিপদে তাদেরকে দেখছে না ঋন গ্রহিতারা।
তবে আশার কথা হচ্ছে দিন এনে দিন খাওয়া প্রায় ২০ হাজার মানুষের খাদ্য সহায়তার জন্য দূর্যোগ ও ত্রান মন্ত্রনালয়ে চাহিদা প্রেরন করা হয়েছে। যা বরাদ্দ পেলেই বিতরন করার কথা বলছে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয় সহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা।

সরেজমিনে দেখা গেছে, কুয়াকাটা পৌর এলাকা, বন্দর, গ্রামীন জনপদে চলছে ইমরাত শ্রমিকদের কাজ। শহরে, হাট-বাজারে চাকা ঘুরছে অটো, রিক্সা-ভ্যানের। মাটি কাটা, বালু কাটার কাজও থেমে নেই। চায়ের দোকান গুলোও চলছে গোপনে প্রকাশ্যে। অপ্রতুল খাদ্য সহায়তা বিতরনে দেখা গেছে দরিদ্রদের ভিড়। টিসিবি, ওএমএস, ভিজিডি, ভিজিএফ, ফেয়ার প্রাইস’র চাল বিতরনেও দেখা গেছে গায়ে ঠাসা ঠাসি করে দাড়িয়ে থাকা মানুষের অপেক্ষা। এমনকি অসচেতন মানুষের মত সচেতন মানুষ, রাজনীতীক ও জনপ্রতিনিধিরাও মানছেনা ৩ফুট দূরত্ব রক্ষার নির্দেশনা। এতে ভেঙ্গে পড়েছে সামাজিক দূরত্ব রক্ষার উদ্দোগ।

বুধবার উপজেলার ধূলাসার ইউপি চেয়ারম্যান আ: জলিল মাষ্টার অর্ধশত দিনমজুরদের সমাগম করে তার ব্যক্তিগত পুকুর কাটার কাজ করতে শুরু করে। এতে সামাজিক দূরত্ব রক্ষার নির্দেশনা ভেঙ্গে পড়ায় স্থানীয় বয়স্ক নাগরিক আজাহার খলিফা কাজ বন্ধ করতে নিষেধ করার পরও জনসমাগম চলতে থাকায় ইউএনও কে ফোন করে জানান তিনি। এরপরও চেয়ারম্যান অর্ধশত শ্রমিকদের নিয়ে মাটি কাটার কাজ বন্ধ করেনি। এছাড়া পৌরশহর এলাকা সহ বেশ ক’টি আবাসিক এলাকায় চলছে ইমারত নির্মানের কাজ। অসচেতন বাড়ী ওয়ালা ও ক্ষুধার্ত শ্রমিক কেউ বন্ধ করছেনা কাজ।
কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত লাগোয়া বেরিবাঁধ সংস্কার কাজ করতে দেখা গেছে প্রায় অর্ধশতাধিক শ্রমিকদের। কর্মরত এসব শ্রমিকরা সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী ভেঙ্গে দলবদ্ধ হয়ে কাজ করছে। তারপরও এসব শ্রমিকরা নিজেদের কাজের মধ্যে নিরাপদ মনে করছে। দেশীয় এসব শ্রমিকদের সাথে মিলেমিশে কাজ করছে চায়না শ্রমিকরা।

উপজেলা পরিসংখ্যান অফিস সূত্রে জানা যায়,আড়াই লাখ জনসংখ্যা অধ্যুষিত এ উপজেলায় অন্তত: ৫০ হাজার মানুষ রয়েছে হতদরিদ্র। সামাজিক দূরত্ব রক্ষায় ও চলমান লকডাউনে ঘরে থাকায় কর্ম বিমূখ হয়ে পড়েছে এ বৃহৎ গোষ্ঠীর মানুষ। যাদের অধিকাংশের ঘরেই কোন খাবার নেই। এরমধ্যেও সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচীর আওতায় দেয়া ভিজিডি, ভিজিএফ, টিসিবি, ওএমএস, ফেয়ার প্রাইস চাল বিতরনে অস্বচ্ছতা ও দূর্নীতি পরিস্থিতিকে আরও অবনতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এতে সরকার ঘোষিত সামাজিক দূরত্ব রক্ষা ও ঘরে থাকা হয়ে উঠছেনা নি¤œ আয়ের মানুষের। পেটের ক্ষুধা উপার্জনের জন্য তাদের বের করছে ঘরের বাইরে।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা তপন কুমার ঘোষ বলেন, ’করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলায় দূর্যোগ ও ত্রান মন্ত্রনালয় থেকে নি¤œ আয়ের মাুনষের জন্য ইতোপূর্বে ৪৩ মেট্রিক টন চাল ও নগদ দু’লক্ষ টাকা পাওয়া গেছে। যা দিয়ে দুই হাজার নি¤œ আয়ের পরিবারকে খাদ্য সহায়তা প্রদান করা হয়েছে।’

তপন কুমার ঘোষ আরও বলেন, ’উপজেলার দু’টি পৌরসভা ও ১২টি ইউনিয়নের ১৯০৫২ জন দিন এনে দিন খাওয়া মানুষের তালিকা তৈরী করে উর্ধ্বতনদের কাছে পাঠানো হয়েছে বরাদ্দের জন্য। বুধবার জেলা সদর থেকে ১২টি ইউনিয়নের কর্মবিমূখ হয়ে পড়া মানুষের জন্য ৩৬ মেট্রিক টন চাল ও নগদ ১লক্ষ ৬২ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। যা দিয়ে আরও কিছু পরিবারকে খাদ্য সহায়তা দেয়া যাবে।’

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবু হাসনাত মোহাম্মদ শহিদুল হক বলেন, সামাজিক দূরত্ব রক্ষায় প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের না হওয়ার জন্য আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা করছি। পুলিশ, আনসার ব্যাটালিয়ান, সেনা সদস্যরা এক যোগে কাজ করছে। শহর, বন্দর ও গ্রামের হাট বাজার গুলো বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। জনসমাগম রোধে আমরা কঠোর অবস্থানে রয়েছি। করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকারের নির্দেশনা বাস্তবায়নে আমরা জিরো টলারেন্স নীতির অবস্থান নিয়েছি।

এই সংবাদটি 1,226 বার পড়া হয়েছে

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ