

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় দণ্ডিত হাইকোর্টের দেয়া জামিন আগামী রোববার পর্যন্ত স্থগিত করেছেন আপিল বিভাগ। জামিন স্থগিতের আবেদনকারীদের এই সময়ের মধ্যে নিয়মিত লিভ টু আপিল (আপিলের অনুমতি চেয়ে আবেদন) করতে বলা হয়েছে।
জামিন স্থগিত চেয়ে দুদক ও রাষ্ট্রপক্ষের করা আবেদনের প্রেক্ষিতে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের বেঞ্চ এ আদেশ দেন।
অন্য বিচারপতিরা হলেন, বিচারপতি মোহাম্মদ ইমান আলী, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী ও বিচারপতি মির্জা হোসাইন হায়দার। এ আদেশের ফলে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় খালেদা জিয়া আপাতত কারাগার থেকে বের হতে পারছেন না বলে জানিয়েছেন আইনজীবীরা।
এদিকে খালেদা জিয়াকে হাইকোর্টের দেয়া জামিনের ওপর আপিল বিভাগের স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার চেয়ে চেম্বার আদালতে আবেদন করা হলে আপিল বিভাগে শুনানির জন্য রোববার দিন ধার্য করেছেন আদালত।
শুনানিতে উত্তেজিত হয়ে এক আইনজীবী কথা বলায় প্রধান বিচারপতি তাকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘‘আপনি কি কোর্টকে থ্রেট করছেন? বেশি বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে”। শুনানিতে আইনজীবীর বক্তব্য না শোনায় প্রধান বিচারপতির সঙ্গে বাগ্বিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা। একপর্যায়ে আদালত কক্ষ থেকে ‘শেম শেম’ বলে বের হয়ে আসেন বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা। পরে প্রধান বিচারপতির পদত্যাগ দাবি করেন তারা।
এ মামলায় পাঁচ বছরের দণ্ড নিয়ে সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী গত ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে কারাগারে আছেন। সে হিসেবে ৩৪ দিন পর বুধবার খালেদা জিয়ার জামিনের বিষয়টি চূড়ান্ত ফয়সালার জন্য আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে উপস্থাপন হয়।
আদালতে উপস্থিত ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। দুদকের পক্ষে ছিলেন অ্যাডভোকেট খুরশীদ আলম খান। অন্যদিকে খালেদা জিয়ার পক্ষে উপস্থিত ছিলেন অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন, এজে মোহাম্মদ আলী, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন, ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন, ব্যারিস্টার বদরুদ্দোজা বাদল। আদেশের পর খালেদা জিয়ার প্যানেল আইনজীবী অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন বলেছেন, আমরা ব্যথিত দেশের মানুষও ব্যথিত, মর্মাহত।বিচার বিভাগের কাছ থেকে আমরা এটা আশা করি নাই। এ ধরনের লঘু দণ্ডে দেশের সর্বোচ্চ আদালত কখনো ইন্টারফেয়ার করেন নাই।
অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেছেন, আদালত লিভ টু আপিল ফাইল করার নির্দেশ দিয়ে রোববার পর্যন্ত জামিন আদেশ স্থগিত করেছেন। এক আইনজীবীকে সংযত হওয়ার কথা বলেছেন।
তিনি বলেন, আপিল বিভাগ আজ যে আদেশ দিয়েছেন, তা সচরাচর দেয়া হয়ে থাকে। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আইনজীবী খুরশীদ আলম খান বলেছেন, ‘‘খালেদা জিয়ার জামিন আদেশ আগামী রোববার পর্যন্ত স্থগিত করেছেন আপিল বিভাগ। আদালত বলেছেন, রোববারের মধ্যে লিভ টু আপিল ফাইল করতে। এ আদেশের ফলে আমি আনন্দিত”।
এর আগে গত সোমবার বিএনপি চেয়ারপারসনকে চার মাসের অন্তর্বর্তীকালীন জামিন দেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে আগামী চার মাসের মধ্যে মামলার পেপারবুক প্রস্তুত করতে সংশ্লিষ্ট শাখাকে নির্দেশ দেন আদালত। হাইকোর্ট বলেছেন, পেপারবুক প্রস্তুত হয়ে গেলে যে কোনো পক্ষ শুনানির জন্য আপিল উপস্থাপন করতে পারবে। হাইকোর্টে জামিন আদেশের পর অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম ও দুদকের আইনজীবী খুরশীদ আলম বলেছিলেন, তারা জামিন আদেশের বিরুদ্ধে সোমবার চেম্বার আদালতে যাবেন।
এর ধারাবাহিকতায় জামিন স্থগিত চেয়ে মঙ্গলবার সকালে চেম্বার আদালতে আবেদন করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও রাষ্ট্রপক্ষ। ওই দিন শুনানি শেষে চেম্বার বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী কোনো আদেশ না দিয়ে আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে পাঠিয়ে দেন। এর ধারাবাহিকতায় রোববার শুনানির জন্য ওঠে। আপিল বিভাগের বুধবারের কার্যতালিকায় এক এবং দুই নম্বরে আবেদন দুটি শুনানির জন্য ছিল।
সকাল ৯টায় শুনানির শুরুতেই দুদকের আইনজীবী খুরশীদ আলম খান আদালতকে বলেন, হাইকোর্ট ৪টি কারণ দেখিয়ে খালেদা জিয়াকে জামিন দিয়েছেন। আমরা এখনও সে আদেশের সার্টিফায়েড কপি পাইনি। আদেশের কপি পেলে লিভ টু আপিল (আপিলের অনুমতি চেয়ে আবেদন) করব। এ সময় প্রধান বিচারপতি বলেন, সিপি (লিভ টু আপিল) ফাইল করে আসেন। তখন দুদকের আইনজীবী বলেন, সিপি ফাইল করতে রোববার-সোমবার পর্যন্ত আমাদের সময় দেয়া হোক। এ পর্যন্ত জামিন স্থগিত রাখা হোক। এরপর আদালত বলেন, ঠিক আছে সিপি ফাইল করে আসেন রোববারের মধ্যে। এ পর্যন্ত জামিন স্টে (স্থগিত) থাকবে।
এ পর্যায়ে খালেদা জিয়ার অন্যতম আইনজীবী অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন আদালতকে বলেন, আমাদেরকে আগে শুনেন। আমাদের বক্তব্য (আসামিপক্ষের) তো শুনেন নাই। আমাদের না শুনে এভাবে আদেশ দিতে পারেন না। এ সময় প্রধান বিচারপতি বলেন, শুনতে হবে না। রোববার পর্যন্ত তো স্থগিত দিয়েছি। ওই দিন আসেন, তখন শুনব। জয়নুল আবেদীন তখন প্রধান বিচারপতিকে উদ্দেশ করে বলেন, আপনি একতরফাভাবে শুনানি করে আদেশ দিলে, এতে আদালতের প্রতি পাবলিক পারসেপশন খারাপ হবে। জবাবে প্রধান বিচারপতি বলেন, আমরা পাবলিক পারসেপশনের দিকে তাকাই না। কোর্টকে কোর্টের মতো চলতে দিন। এরপর জয়নুল আবেদীন ও এ জে মোহাম্মদ আলী বলেন, না শুনেই তো আদেশ দিলেন। আদালত বলেন, আমরা অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ দিয়েছি। আমাদের শোনার দরকার নেই। জয়নুল আবেদীন বলেন, এই মামলায় চেম্বার আদালত তো স্টে দেয়নি। এই সময়ের মধ্যে আসামিও বের হবে না। তাই স্টের প্রয়োজন নেই। এ জে মোহাম্মদ আলী বলেন, আমরা তো শুনানির সুযোগ পেলাম না। এরপরই আপিল বিভাগের দৈনন্দিন কার্যতালিকা থেকে অন্য মামলার শুনানি শুরু করেন আদালত।
এ সময় খালেদা জিয়ার পক্ষে সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সহসভাপতি গিয়াস উদ্দিন আহমদ দাঁড়িয়ে আদালতকে বলেন, আপনি তো না শুনেই একতরফা আদেশ দিলেন। আমাদের কথা শুনতে হবে। কেন শুনবেন না? তখন প্রধান বিচারপতি বলেন, কার কথা শুনব, কার কথা শুনব না তা কি আপনার কাছে শুনতে হবে? গিয়াস উদ্দিন আবারও একটু উত্তেজিত হয়ে একই কথা বললে প্রধান বিচারপতি বলেন, আপনি কি আদালতকে থ্রেট করছেন? জবাবে গিয়াস উদ্দিন বলেন, শুনে তারপর আদেশ দিতে হবে। তখন প্রধান বিচারপতি বলেন, থ্রেট দেবেন না।
এ সময় অ্যাটর্নি জেনারেলকে উদ্দেশ করে ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, আপনি তো কোর্টকে শেষ করে দিলেন। তখন অ্যাটর্নি কোনো উত্তর না দিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তখন একদল আইনজীবী দালাল দালাল বলে আদালত কক্ষ ত্যাগ করেন।