ভ্রমণ একটি জ্ঞান-প্রজ্ঞা ও অভিজ্ঞতার উৎস: শাঈখ মুহাম্মাদ উছমান গনী

লেখক:
প্রকাশ: ৭ years ago

Manual4 Ad Code

ডেস্ক রিপোর্ট :: মানবজীবন একটি অনন্ত ভ্রমণের অংশবিশেষ। মানুষ অনন্ত সফরের যাত্রী। এই ভ্রমণের সূচনা হলো আমলে আরওয়াহ বা রুহের জগৎ থেকে। এর দ্বিতীয় ধাপ হলো আলমে দুনিয়া তথা দুনিয়ার জীবন। তৃতীয় সোপান হলো আলমে বারজাখ বা অন্তর্বর্তীকালীন জীবন, যা মৃত্যুর পর থেকে কিয়ামত পর্যন্ত বিস্তৃত। এরপর আখিরাত বা পরকালের অনন্ত জীবন।

Manual6 Ad Code

ভ্রমণের আরবি হলো সফর, ছায়ের, রেহলাত ইত্যাদি। ইসলামের পঞ্চ স্তম্ভের অন্যতম হজ অর্থও ভ্রমণ এবং ওমরাহ অর্থও ভ্রমণ।

ভ্রমণ একটি আনন্দময় ইবাদত এবং জ্ঞান-প্রজ্ঞা ও অভিজ্ঞতার উৎস। সফর বা ভ্রমণের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হলো পূর্ববর্তীদের কীর্তি ও পরিণতি সম্বন্ধে জানা ও শিক্ষা গ্রহণ করা। এ সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তারা কি পৃথিবীতে ভ্রমণ করে না এবং তাদের পূর্ববর্তীদের কী পরিণাম হয়েছিল তা কি দেখে না? যারা মুত্তাকি তাদের জন্য পরলোকই শ্রেয়; তোমরা কি বোঝো না?’ (সুরা-১২ ইউসুফ, আয়াত: ১০৯)।

এরা কি পৃথিবীতে ভ্রমণ করে না? করলে দেখত এদের পূর্ববর্তীদের পরিণাম কী হয়েছিল। পৃথিবীতে তারা ছিল এদের অপেক্ষা শক্তিতে ও কীর্তিতে প্রবলতর। অতঃপর আল্লাহ তাদিগকে শাস্তি দিয়েছিলেন তাদের অপরাধের জন্য এবং আল্লাহর শাস্তি হতে তাদিগকে রক্ষা করার কেউ ছিল না।’ (সুরা-৪০ মুমিন, আয়াত: ২১)। ‘তারা কি পৃথিবীতে ভ্রমণ করে না ও দেখে না তাদের পূর্ববর্তীদের কী পরিণাম হয়েছিল? পৃথিবীতে তারা ছিল এদের অপেক্ষা সংখ্যায় অধিক এবং শক্তিতে ও কীর্তিতে অধিক প্রবল। তারা যা করত তা তাদের কোনো কাজে আসেনি।’ (সুরা-৪০ মুমিন, আয়াত: ৮২)।

ভ্রমণ বা সফরের বিশেষ উদ্দেশ্য হলো আল্লাহ তাআলার সৃষ্টি-রহস্য অবলোকন করে জ্ঞানার্জন করা এবং তাঁর কুদরত ও শক্তির প্রতি অনুগত হওয়া। এ বিষয়ে পবিত্র কোরআনে নির্দেশনা রয়েছে, ‘তারা দেশ ভ্রমণ করে না? তা হলে তারা জ্ঞানবুদ্ধিসম্পন্ন ও শ্রুতিশক্তিসম্পন্ন হতে পারত। বস্তুত চক্ষু তো অন্ধ নয়, বরং অন্ধ হচ্ছে হৃদয়।’ (সুরা-২২ হজ, আয়াত: ৪৬)। বলো, ‘তোমরা পৃথিবীতে পরিভ্রমণ করো এবং অনুধাবন করো, কীভাবে তিনি সৃষ্টির সূচনা করেছেন? অতঃপর আল্লাহ সৃজন করবেন পরবর্তী সৃষ্টি। আল্লাহ তো সর্ব বিষয়ে সর্বশক্তিমান।’ (সুরা-২৯ আনকাবুত, আয়াত: ২০)।

যাতায়াতব্যবস্থা, রাস্তাঘাট, যানবাহন ও পরিবহন আল্লাহর কুদরতেরই অংশ এবং তা-ও ভ্রমণের নিমিত্তে। কোরআনের ভাষায়, ‘তাদের ও যেসব জনপদের প্রতি আমি অনুগ্রহ করেছিলাম, যেগুলোর মধ্যবর্তী স্থানে বহু জনপদ স্থাপন করেছিলাম এবং ওই সব জনপদে ভ্রমণের যথাযথ ব্যবস্থা করেছিলাম এবং তাদিগকে বলেছিলাম, “তোমরা এসব জনপদে নিরাপদে ভ্রমণ করো দিবস ও রজনীতে।”’ (সুরা-৩৪ সাবা, আয়াত: ১৮)।

ইসলামি আইনবিদদের মতে, সব মুসলমানের জন্য আল্লাহর নির্দেশ পালনার্থে সামর্থ্য অনুযায়ী সফর করা ও ভ্রমণ করা কর্তব্য। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমাদের পূর্বে বহু বিধান-ব্যবস্থা গত হয়েছে, সুতরাং তোমরা পৃথিবী ভ্রমণ করো এবং দেখো মিথ্যাশ্রয়ীদের কী পরিণাম!’ (সুরা-৩ আলে ইমরান, আয়াত: ১৩৭)। বলো, ‘তোমরা পৃথিবীতে পরিভ্রমণ করো, অতঃপর দেখো, যারা সত্যকে অস্বীকার করেছে তাদের পরিণাম কী হয়েছিল!’ (সুরা-৬ আনআম, আয়াত: ১১)। ‘সুতরাং পৃথিবীতে পরিভ্রমণ করো এবং দেখো, যারা সত্যকে মিথ্যা বলেছে তাদের পরিণাম কী হয়েছে?” (সুরা-১৬ নাহল, আয়াত: ৩৬)। ‘পৃথিবীতে পরিভ্রমণ করো এবং দেখো, অপরাধীদের পরিণাম কীরূপ হয়েছে।’ (সুরা-২৭ নমল, আয়াত: ৬৯)। ‘এরা কি পৃথিবীতে ভ্রমণ করে না? করলে দেখত এদের পূর্ববর্তীদের কী পরিণাম হয়েছিল। পৃথিবীতে তারা ছিল এদের অপেক্ষা শক্তিতে ও কীর্তিতে প্রবলতর। অতঃপর আল্লাহ তাদের শাস্তি দিয়েছিলেন তাদের অপরাধের জন্য এবং আল্লাহর শাস্তি হতে তাদিগকে রক্ষা করার কেউ ছিল না।’ (সুরা-৪০ মুমিন, আয়াত: ২১)। ‘তোমরা পৃথিবীতে পরিভ্রমণ করো এবং দেখো তোমাদের পূর্ববর্তীদের পরিণাম কী হয়েছে’! তাদের অধিকাংশই ছিল মুশরিক।’ (সুরা-৩০ রুম, আয়াত: ৪২)।

Manual7 Ad Code

শীত, বসন্ত ও গ্রীষ্মকাল ভ্রমণের আদর্শ সময়। কোরআনের বর্ণনায়, ‘কুরাইশদের অনুরাগ, তাদের আসক্তি শীতকালীন ও গ্রীষ্মকালীন ভ্রমণ। সুতরাং তাদের উচিত এই (কাবা) ঘরের প্রভুর ইবাদত করা। যিনি ক্ষুধায় তাদের অন্ন দিয়েছেন; ভয়ে দিয়েছেন নিরাপত্তা।’ (সুরা-১০৬ কুরাইশ, আয়াত: ১০৪)।

Manual4 Ad Code

যেহেতু সফর একটি বিধিবদ্ধ ইবাদত, তাই সফরের রয়েছে বিশেষ কিছু বিধিবিধান। ইসলামি শরিয়তে ফিকহি পরিভাষায় সফর বলা হয়: আপন বাসস্থান থেকে বা কর্মস্থল থেকে আটচল্লিশ মাইল বা সত্তর কিলোমিটার দূরত্বে যাওয়ার উদ্দেশ্যে মহল্লা বা গ্রাম থেকে বের হওয়া। গন্তব্যে পৌঁছার আগ পর্যন্ত সফর অবস্থা বহাল থাকে। সফর বা ভ্রমণকারীকে মুসাফির বলা হয়। গন্তব্য যদি নিজ বাড়ি বা কর্মক্ষেত্র হয়, তবে সেখানে পৌঁছার পর আর মুসাফির থাকবেন না। আর গন্তব্য যদি নিজ বাড়ি বা কর্মক্ষেত্র না হয় এবং সেখানে অন্তত ১৫ দিবস রজনী থাকার নিয়ত বা ইচ্ছা না থাকে, তাহলে সফর অবস্থা বহাল থাকবে।

Manual4 Ad Code

সফরে দোয়া কবুল হয়। সফরকালীন চার রাকাতবিশিষ্ট ফরজ নামাজ কছর, অর্থাৎ দুই রাকাত পড়তে হয় এবং সুন্নত নামাজ নফল পর্যায়ভুক্ত হয়। সফর অবস্থায় প্রয়োজনে ফরজ রোজা পরে রাখা যায়। সফর অবস্থায় ঈদের নামাজ ও জুমার নামাজ এবং কোরবানি ওয়াজিব হয় না। তবে সুযোগ থাকলে আদায় করা উত্তম।

মুফতি মাওলানা শাঈখ মুহাম্মাদ উছমান গনী, বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতির যুগ্ম মহাসচিব ও আহ্ছানিয়া ইনস্টিটিউট অব সুফিজমের সহকারী অধ্যাপক

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual5 Ad Code