

সম্পাদকীয়:
গত সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর দুই মাসে সারা দেশে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে ৫২২টি। খুন, ধর্ষণ, ডাকাতি, চুরি, দস্যুতাসহ বিভিন্ন অপরাধের ঘটনায় মোট মামলা হয়েছে ২৫ হাজার ৪৫৬টি। তবে দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির যে ব্যাপক অবনতি হয়েছে, তা বোঝার জন্য পরিসংখ্যানের প্রয়োজন হয় না; সাদা চোখেই দেখা যায়। প্রায় প্রতিদিনই রাজধানীর কোথাও না কোথাও হত্যার ঘটনা ঘটছে। বিভিন্ন ইস্যুতে যত্রতত্র রাস্তা অবরোধ করে বিক্ষোভ, ভাঙচুরের ঘটনা ঘটানো হচ্ছে প্রতিনিয়ত। সংঘর্ষ, গণপিটুনি যেন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভাবা যায়, গত তিন মাসে গণপিটুনিতে মৃত্যু হয়েছে অন্তত ৬৮ জনের! এছাড়া রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে দেশীয় অস্ত্র ও লাঠি হাতে হরহামেশাই মহড়া দিতে দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীকে। এসব ঘটনায় স্বভাবতই সাধারণ মানুষ উদ্বিগ্ন। চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে তারা।
এ প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে। ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর তিন মাস পেরিয়ে গেছে। বেশ কিছুদিন নিষ্ক্রিয় থাকার পর পুলিশ আবার সক্রিয় হয়েছে। গ্রেফতার ও বেআইনি সমাবেশ ছত্রভঙ্গ করার মতো সুযোগ দিয়ে সেনাবাহিনীকে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতা দিয়েছে সরকার। তারপরও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কেন স্বাভাবিক হচ্ছে না, তা খতিয়ে দেখা দরকার। অভিযোগ উঠেছে, পুলিশ আইন ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর হচ্ছে না। বিভিন্ন ঘটনায় নগরীতে জনভোগান্তি সৃষ্টি হলেও পুলিশ সেভাবে অ্যাকশনে যাচ্ছে না। প্রশ্ন উঠেছে পুলিশের গোয়েন্দা কার্যক্রম ও আগাম ব্যবস্থা গ্রহণ না করা নিয়েও। ‘ভুল চিকিৎসায়’ রাজধানীর একটি কলেজের একজন শিক্ষার্থীর মৃত্যুর অভিযোগ তুলে বেশকিছু কলেজের শিক্ষার্থীরা একজোট হয়ে পূর্বঘোষণা দিয়ে কয়েকটি কলেজে হামলা ও ভাঙচুর চালায়। এরপর পালটা হামলা চালানো হয় এবং সেটিও পূর্বঘোষণা দিয়ে। অথচ এসব ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রয়োজনীয় পূর্বপ্রস্তুতি লক্ষ করা যায়নি।
প্রায় একই ভূমিকা দেখা গেছে চট্টগ্রামে আইনজীবী হত্যার ঘটনাতেও। ইসকন নেতা চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারীকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ নিয়ে পরিস্থিতি যে উত্তপ্ত হতে পারে, এই সাধারণ বিষয়টি অনুমান করার কথা ছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এবং তাই তাদের প্রস্তুতি নেওয়া উচিত ছিল। তাহলে পরিস্থিতি হয়তো এতদূর গড়াত না। এসব ক্ষেত্রে ব্যর্থতার দায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এড়াতে পারে কি?
বস্তুত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা এবং জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব প্রথমত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের। বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়ে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যে ধরনের ঘটনার সৃষ্টি হচ্ছে, তা নৈরাজ্যের পর্যায়ে পড়ে। এসব ঘটনায় মানুষের ভোগান্তি চরমে উঠছে। অন্তর্বর্তী সরকারকে, বিশেষত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অত্যন্ত দক্ষতা ও বিচক্ষণতার সঙ্গে এসব ঘটনা মোকাবিলা করতে হবে, যাতে জনভোগান্তির কারণ দূর হয়, সেই সঙ্গে পরিস্থিতিরও অবনতি না ঘটে। এক্ষেত্রে প্রয়োজন হলে শক্ত হাতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা দরকার বলে মনে করছেন অনেকে। দেশের প্রধান রপ্তানি খাত পোশাকশিল্পেও অস্থিরতা সৃষ্টি ও সড়ক অবরোধের ঘটনা লক্ষণীয়।