অ্যান্টিবায়োটিকের অপমৃত্যু ঠেকাতে হবে

লেখক:
প্রকাশ: ৭ years ago

Manual7 Ad Code
গত ২৫ এপ্রিল সারা দেশে প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি বন্ধ কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন আদালত। স্বাস্থ্যসচিব, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, জনপ্রশাসনসচিবসহ সংশ্লিষ্টদের এ রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে। হাইকোর্ট বলেছেন, প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ওষুধ প্রশাসনের মহাপরিচালক সার্কুলার জারি করবেন। দুই দিনের মধ্যে এ বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য প্রতি জেলার প্রশাসক ও সিভিল সার্জনদের নির্দেশ দেবেন তিনি। এটি নিঃসন্দেহে একটি ভালো উদ্যোগ, তবে তার বাস্তবায়ন কতটুকু হবে তা দেখার বিষয়। কারণ অতীতের ইতিহাস খুব আশাপ্রদ ছিল না। আরেকটি কথা এখানে অব্যক্ত থেকে গেছে। ২০১৫ সালে ইউরোপিয়ান জার্নাল অব সায়েন্টিফিক রিসার্চের এক গবেষণার বরাত দিয়ে বলা হয়েছিল, ওই জরিপে অংশ নেওয়া বাংলাদেশি রোগীদের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ করেছে। তাহলে বাকি ৬৬ শতাংশ মানুষ অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ করেছে চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন মোতাবেক। ৬৬ শতাংশ মানুষের জন্য চিকিৎসকরা যে অ্যান্টিবায়োটিক প্রেসক্রাইব করছেন, তা কি যুক্তিসংগতভাবে করছেন? অসংখ্য চিকিৎসকের অপ্রয়োজনীয় ও অযৌক্তিক অ্যান্টিবায়োটিক প্রদানের কারণে কি অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স সৃষ্টি হচ্ছে না? হচ্ছে এবং খুব ভালোভাবেই হচ্ছে। আমার এই লেখায়ই তার কিছু বর্ণনা আছে। তাই চিকিৎসকের অপ্রয়োজনীয় ও অযৌক্তিক অ্যান্টিবায়োটিক প্রদানের ওপরও জনসাধারণ আদালতের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাশা করে। আমি আশা করি আদালত বিষয়টি নজরে নেবেন।
সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হওয়া এখন শারীরিক বিপর্যয়ের সবচেয়ে বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই সব ধরনের সংক্রামক রোগের বিরুদ্ধে জয়লাভের জন্য আমাদের পরিবেশ সংরক্ষণ করতে হবে এবং শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে হবে। এ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়বে যদি আমরা ব্যায়াম করি, সুষম খাবার খাই, পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানি পান করি, সব সময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকি, পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিই, নিরুপদ্রব ঘুম নিশ্চিত করি, মানসিক চাপ থেকে অবমুক্তি পাই, চিনিসমৃদ্ধ খাবার কম খাই বা বর্জন করি এবং অকার্যকর ভ্যাকসিন ও হাসপাতাল এড়িয়ে চলি। আমরা নিজেরাই নিজেদের কারণে অসংখ্য রোগে ভুগি। আমরা যদি স্বেচ্ছাচারী না হতাম, একটু সচেতন ও সহনশীল হতাম, একটু বিবেকবুদ্ধি প্রয়োগ করতাম, তাহলে আমার মনে হয় আমাদের এত সমস্যা থাকত না। সংক্রামক রোগের উৎপত্তি ও বিস্তারের জন্য ঢাকাসহ দেশের অন্য শহরগুলো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস।
বিশ্বব্যাপী বহু চিকিৎসক অজ্ঞতা, অনভিজ্ঞতা, অনিশ্চয়তা, অবহেলার কারণে রোগ নির্ণয়ে ব্যর্থ হয়ে অযৌক্তিক ও ঢালাওভাবে রোগীকে ওষুধ প্রয়োগ করে থাকেন। তাঁদের এই আচরণের মূল কারণ তিনটি। প্রথমত, রোগী নিজেরাই এ ধরনের চিকিৎসা চায় এবং প্রেসক্রিপশনে বেশি ওষুধের উপস্থিতি তাদের মনস্তাত্ত্বিক আস্থা বাড়ায়। দ্বিতীয়ত, খুব কম চিকিৎসকই পরীক্ষা-নিরীক্ষা বা পর্যবেক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত সময় দেন। সংক্রামক রোগের ক্ষেত্রে দ্রুত আরোগ্য লাভের জন্য তাঁরা একই প্রেসক্রিপশনে একাধিক নামের অ্যান্টিবায়োটিক প্রদান করে থাকেন এই ধারণা নিয়ে যে কোনো না কোনো ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক জীবাণুর বিরুদ্ধে কার্যকর হবেই এবং রোগী দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠবে। এ ধারণা ঠিক নয়।
অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স বৃদ্ধি পাওয়া ও কঠোর নিয়ন্ত্রণের কারণে পরিস্থিতি এমনভাবে পরিবর্তন হয়ে গেছে যে ওষুধ কম্পানিগুলো নতুন নতুন অ্যান্টিবায়োটিক উদ্ভাবনে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। আমরা নতুন ওষুধ চাই, নতুন ওষুধ চাই বলে চিৎকার করছি। কিন্তু নতুন ওষুধ আসছে না। এরই মধ্যে আমরা প্রায় সব অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে রেজিস্ট্যান্ট ব্যাকটেরিয়ার উৎপত্তি লক্ষ করছি। কিন্তু সেই হারে নতুন অ্যান্টিবায়োটিক বাজারে আসছে না। রেজিস্ট্যান্ট সংক্রামক ব্যাধির সংখ্যা আগামী পাঁচ বছরে জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পাবে। আমরা যে একেবারে অ্যান্টিবায়োটিক পাচ্ছি না, তা নয়; কিছু কিছু অ্যান্টিবায়োটিক বাজারে আসছে। কিন্তু সেসব অ্যান্টিবায়োটিক গ্রাম-নেগেটিভ সংক্রামক রোগের ক্ষেত্রে কার্যকর হচ্ছে না।
অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা ও মানুষকে রেজিস্ট্যান্ট জীবাণুর হাত থেকে রক্ষা করার জন্য ও সংরক্ষণের জন্য সচেতনতা সৃষ্টির কোনো বিকল্প নেই। এ প্রসঙ্গে আমি গণসচেতনতার জন্য কিছু পরামর্শ উপস্থাপন করছি। ১. শুধু প্রয়োজনেই অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ করুন। অপ্রয়োজনে অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ করে নিজে ঝুঁকির মধ্যে পড়বেন না এবং অন্যকেও ঝুঁকির মধ্যে ফেলবেন না। ২. সাধারণ সর্দি, কাশি, জ্বর, গলা ব্যথা বা অন্যান্য ভাইরাস সংক্রমণের কারণে সৃষ্ট রোগে অ্যান্টিবায়োটিক পরিহার করুন। মনে রাখবেন ভাইরাসের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবায়োটিক কার্যকর নয়। ৩. ব্যাকটেরিয়ায় আক্রান্ত হলে আপনাকে অবশ্যই অ্যান্টিবায়োটিক নিতে হবে। তবে অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণের আগে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে জেনে নেওয়া দরকার আপনি কোন ব্যাকটেরিয়ায় আক্রান্ত। ৪. অ্যান্টিবায়োটিকের পূর্ণ কোর্স সমাপ্ত করুন। মাঝপথে অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ বন্ধ করবেন না। ৫. সংক্রামক রোগের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ, প্রগতিবাদী ও যুক্তিবাদী চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া আবশ্যক। ৬. অ্যান্টিবায়োটিকের কোনো ডোজ গ্রহণ করতে ভুলে গেলে কী করা উচিত তা ফার্মাসিস্ট বা চিকিৎসকের কাছ থেকে জেনে নিন। ৭. অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণকালে কোর্স পূর্ণ হওয়ার পর অবশিষ্ট ওষুধ পরে গ্রহণ করার জন্য রেখে না দিয়ে ধ্বংস করে ফেলুন। ৮. অন্যের জন্য প্রেসক্রাইব করা অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ করবেন না। তাতে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। ৯. চিকিৎসককে কোনো রোগের জন্য অ্যান্টিবায়োটিক প্রেসক্রাইব করার জন্য চাপ প্রয়োগ করবেন না। ১০. অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণকালে ভয়ংকর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। এ রকম কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করুন। ১১. সংক্রামক রোগের বাহক পরিবেশদূষণ, দূষিত পানি ও অস্বাস্থ্যকর খাবার। পরিবেশ সংরক্ষণ, বিশুদ্ধ পানি ও উন্নত স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব বহুলাংশে কমিয়ে আনে। স্বাস্থ্যসম্মত জীবন যাপন করুন। ১২. আপনার শিশুকে টিকা দেওয়ার ব্যবস্থা করুন। কোনো কোনো টিকা মানুষকে ডিপথেরিয়া ও হুপিং কফের মতো সংক্রামক রোগ থেকে রক্ষা করে। ১৩. আপনি পেনিসিলিনের প্রতি সংবেদনশীল হলে পরীক্ষা না করে পেনিসিলিন গ্রহণ করবেন না। ১৪. শিশুদের কোনোভাবেই অপ্রয়োজনে অ্যান্টিবায়োটিক প্রদান করবেন না। একান্তই দিতে হলে সঠিক মাত্রার অ্যান্টিবায়োটিক প্রদান করুন। ১৫. অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ বা প্রদানের পর রাতারাতি কার্যকারিতা আশা করবেন না। অ্যান্টিবায়োটিক কাজ শুরু করতে সময় নেয় এবং সুফল পেতে কম করে হলেও দুই থেকে তিন দিন সময় লাগতে পারে। ১৬. সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হলে শিশুদের স্কুলে না পাঠিয়ে বিশ্রামে থাকতে দিন। সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত তাদের যথাযথ নজরে রাখুন। ১৭. বিশ্বের খ্যাতনামা ফার্মাসিউটিক্যাল কম্পানিগুলোকে কর রেয়াত বা পেটেন্ট সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে নতুন নতুন কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কারের জন্য উদ্বুদ্ধ ও অনুপ্রেরণা জোগাতে হবে। ১৮. সাধারণত হাসপাতালগুলোতে সংক্রামক রোগের উৎপত্তি ও বিস্তার লাভ ঘটে বেশি। হাসপাতালে সংক্রামক রোগের উৎপত্তি ও বিস্তার রোধ করতে হবে। ১৯. অ্যান্টিবায়োটিকের যুক্তিসংগত ব্যবহার এবং প্রয়োগ সম্পর্কে চিকিৎসক ও ভোক্তাদের সচেতন করে তুলতে হবে। ২০. নকল, ভেজাল ও নিম্নমানের অ্যান্টিবায়োটিক সম্পর্কে সতর্ক থাকুন। নকল, ভেজাল ও নিম্নমানের অ্যান্টিবায়োটিক রোগ সারাতে সক্ষম নয়, বরং এসব ওষুধ অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ২১. অনুন্নত দেশে প্রেসক্রিপশন ওষুধের ওপর নিয়ন্ত্রণ না থাকার কারণে ওষুধের অপব্যবহার ও যুক্তিহীন ব্যবহার অতি বেশি। তাই সরকারকে প্রেসক্রিপশন ওষুধের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ২২. অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার রোধকল্পে চিকিৎসকসমাজ এক গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারেন। রোগীকে প্রকৃত তথ্য প্রদান, সতর্ক করা, প্রেসক্রিপশনে শুধু প্রয়োজনীয় ওষুধটি দিয়ে যৌক্তিক ও বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসা দিতে পারেন শুধু চিকিৎসকরাই। ২৩. ওষুধ খাওয়ার আগে না পরে খাবেন, তা চিকিৎসক বা ফার্মাসিস্টের কাছ থেকে জেনে নিন। ২৪. যেকোনো সংক্রামক রোগ থেকে বেঁচে থাকার ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। কারণ সংক্রামক রোগ বাধালে তা অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে সফলভাবে চিকিৎসা করা যাবে, তার নিশ্চয়তা এখন আর কেউ দিতে পারে না।
লেখক : মুনীরউদ্দিন আহমদ,প্রফেসর, ক্লিনিক্যাল ফার্মেসি ও ফার্মাকোলজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual5 Ad Code