আজ পহেলা ফেব্রুয়ারিঃ বাঙালির রক্তস্নাত ফাগুন কাল শুরু

লেখক:
প্রকাশ: ৬ years ago

Manual4 Ad Code

সাইমূম ইভানঃ  আজ পহেলা ফেব্রুয়ারি। আবারও ফিরে এলো বাঙালি জাতির জীবনে রক্তস্নাত ফাগুন কাল। ১৯৫২ সালের এ মাসেই রক্তঝরা ভাষা আন্দোলন তীব্রতর রূপ ধারন করেছিল। মাতৃভাষা বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার সংগঠিত দাবি ও আন্দোলনকে বানচাল করার জন্য একুশে ফেব্রুয়ারি প্রথম গুলি চালানো হয়েছিল। তাতে কয়েকটি অমূল্য প্রাণ সালাম, রফিক, জব্বার, বরকত, শফিউর মৃত্যুবরণ করেছিলেন। বাঙালির হৃদয়ে গভীর বেদনায় ঐ দিনটি রক্তের অক্ষরে লেখা হয়ে যায়। ভাষার জন্য শহিদদের আত্মদান আজ পরিণত হয়েছে জাতির জাগরণের প্রতীকে।

Manual7 Ad Code

 

ফেব্রুয়ারি তাই অঙ্গীকারের মাস, প্রত্যয়বদ্ধ হওয়ার মাস। ভাষা আন্দোলনের চেতনাকে সমাজে, রাষ্ট্রে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য শপথ নেয়ার মাস—ফেব্রুয়ারি। আজ ৬৯ বছরেও যা করা যায়নি সেই অফিস-আদালত, শিক্ষাক্ষেত্রে বাংলাকে ছড়িয়ে দেওয়ার অঙ্গীকারের মাস—ফেব্রুয়ারি।

Manual7 Ad Code

 

এই মাসে ভাষাকে নিয়ে নানা আয়োজন শুরু হয়। শুধু ভাষা নয় বরং জাতি হিসেবে আমাদের করণীয় নিয়েও আলোচনা চলে। শিল্প-সাহিত্য-সংগীতসহ শিল্পের প্রতিটি ক্ষেত্রে একুশ নতুন নতুন চিন্তা ভাবনা নিয়ে আসে। একুশে উপলক্ষ্যে বাংলা একাডেমির বইমেলা সারা দেশের সাহিত্যানুরাগী মানুষদের এক করে। তবে এবছর করোনা মহামারির কারণে বইমেলা পিছিয়ে গেছে। মার্চের ১৮ তারিখ থেকে পহেলা বৈশাখ অর্থ্যাৎ ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত চলবে বইমেলা। তবে, বইমেলার প্রেরণা হয়ে থাকবে ভাষা আন্দোলন।

Manual2 Ad Code

 

একুশে ফেব্রুয়ারি বলতে ১৯৫২ সালের কেবল সেই দিনটি নয়। এই আন্দোলন শুরু হয়েছিল সেই ১৯৪৭ সাল থেকে। ১৯৪৭ সালের ১৭ মে হায়দরাবাদে এক উর্দু সম্মেলনে মুসলিম লীগ নেতা চৌধুরী খালিকুজ্জামান ঘোষণা দেন, ‘পাকিস্তানের জাতীয় ভাষা হবে উর্দু’। তার সঙ্গে গলা মেলান আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. জিয়াউদ্দিন। প্রতিবাদে ২৯ জুলাই ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ‘আজাদ’ পত্রিকায় বলেন, বাংলাই হওয়া উচিত পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা, তবে দুটি রাষ্ট্রভাষা করা গেলে উর্দুর কথা বিবেচনা করা যায়।

 

পাকিস্তান গঠনের পরে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন জোরদার হতে থাকে। ঐ বছরের ২৭ নভেম্বর করাচিতে পাকিস্তান শিক্ষা সম্মেলনে পাকিস্তান গণপরিষদের কাছে উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা ও প্রাদেশিক সরকারগুলোর কাজ চালাবার মাধ্যম রূপে মেনে নেওয়ার সুপারিশ করা হয়। সেইসঙ্গে সমগ্র পাকিস্তানে প্রাথমিক শিক্ষায় উর্দুকে এক বছরের জন্য বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাবও করা হয়। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ৬ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন তমদ্দুন মজলিশের সম্পাদক আবুল কাসেম। বক্তৃতা করেন মুনীর চৌধুরী, আব্দুর রহমান, কল্যাণ দাশগুপ্ত, এ কে এম আহসান, এস আহমদ প্রমুখ। রাষ্ট্রভাষা সংক্রান্ত প্রস্তাবগুলো উত্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ইউনিয়নের ভাইস প্রেসিডেন্ট ফরিদ আহমদ।

 

করাচিতে গণপরিষদের অধিবেশন চলছিল। ২৩ ফেব্রুয়ারি বিতর্ক হয় গণপরিষদের কাজের ভাষা রূপে ইংরেজির সঙ্গে উর্দুকে যুক্ত করা নিয়ে। পূর্ব বাংলার কংগ্রেস দলের সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত সংশোধনী প্রস্তাব এনে বলেন, বাংলাকেও যুক্ত করতে হবে। তার সংশোধনী লিয়াকত আলী খান, খাজা নাজিমুদ্দিন ও তমিজুদ্দিন আহমেদের বিরোধিতায় অগ্রাহ্য হয়। ঢাকায় এর ভয়ানক প্রতিক্রিয়া হয়। তৎকালীন সচেতন জনগণ ও ছাত্রদের নেতৃত্বে ১৯৪৮ সালের ২ মার্চ গঠিত হয় সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ। ১১ মার্চ সংগ্রাম পরিষদ সারা পূর্ববঙ্গে ধর্মঘট আহ্বান করে। ১৯ মার্চ কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকায় আসেন। ২১ মার্চ তিনি রেসকোর্স ময়দানে বক্তৃতায় বলেন, ‘আমি স্পষ্টভাবে বলে দিতে চাই, উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা, অন্য কোনো ভাষা নয়।’ ২৩ মার্চ জিন্নাহর বক্তৃতার সমালোচনা করে এ কে ফজলুল হকের বিবৃতি প্রচারিত হয়। ২৪ মার্চ কার্জন হলে জিন্নাহ ভাষা সম্পর্কে তার বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি করলে ‘নো’, নো’ বলে প্রতিবাদ করে ওঠেন অনেকে। দিন দিন তীব্রতর হতে থাকে রাষ্ট্রভাষা বাংলার আন্দোলন।

 

Manual6 Ad Code

ভাষা আন্দোলনের উত্তাল স্মৃতিমাখা এ মাস এলেই বিদ্যুৎ চমকের মতো মনে ভিড় জমায় সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, শফিউর —এসব ভাষা শহিদদের নাম। সাতচল্লিশে দেশভাগের পরেই যখন বাঙালির ভাষার ওপর আঘাত এলো, তখন বুকের রক্ত ঢেলে লেখা হলো এক নতুন ইতিহাস। ভাষা আন্দোলনের সেই লড়াই থেকে সঞ্চিত শক্তিই পরবর্তীকালে যুগিয়েছে গণ-অভ্যুত্থানের প্রেরণা। বাঙালির মহান মুক্তিযুদ্ধে, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে, জাতির স্বকীয়তা, সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে ভাষা আন্দোলন সবসময় আলোকবর্তিকার মত মূর্ত হয়ে ওঠে। এখনো জাতির যে কোনো ক্রান্তিকালে ভাষা আন্দোলন আমাদের প্রেরণা হয়ে দেখা দেয়। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ভাষা আন্দোলন জাতির বীরত্বপূর্ণ ঐতিহ্যের পরিচয় তুলে ধরে। ভাষা আন্দোলন তাই বাঙালির কাছে চির প্রেরণার প্রতীক।

 

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual6 Ad Code