আমদানি নির্ভতায় দেশের বিদ্যুৎ খাতে ঝুঁকি বাড়ছে

লেখক: বাংলানিউজ ইউএস.কম
প্রকাশ: ১১ minutes ago

Manual6 Ad Code

ডেস্ক রিপোর্ট: আমদানিনির্ভরতায় দেশের বিদ্যুৎ খাতে ঝুঁকি বাড়ছে। বর্তমানে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ১৫ ভাগই প্রতিবেশী দেশ ভারতের ওপর নির্ভরশীল। ভারতের ৩টি উৎস থেকে ২ হাজার ৪৮০ মেগাওয়াট নিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহ হচ্ছে। কিন্তু কয়লা সংকটের অজুহাতে ভারতের বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান আদানি পাওয়ার উৎপাদন কমিয়েছে। মূলত ভারতের ঝাড়খণ্ডের গোড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুই ইউনিটের একটি বন্ধ থাকায় বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ কমে গেছে। ফলে পিডিবি প্রতিদিন অন্তত ১৫ কোটি ৫০ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছে। আর এক মাস ধরে সরবরাহ বন্ধ বা কম থাকলে ওই ক্ষতির পরিমাণ ছাড়িয়ে যেতে পারে ৪৫০ কোটি টাকা। আমদানি করা বিদ্যুৎ সরবরাহ ভারত মাঝেমধ্যেই কমিয়ে দিচ্ছে। তাছাড়া নেপালের সঙ্গেও বাংলাদেশের বিদ্যুৎ সরবরাহের চুক্তি রয়েছে। কিন্তু সমপ্রতি নেপালের জলবিদ্যুৎকেন্দ্রে ভয়াবহ ভূমিধসের পর পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে নেপাল থেকে আসা ৪০ মেগাওয়াট সরবরাহ। ফলে দেশের বিদ্যুৎ খাতে নতুন ধাক্কা লেগেছে। বিপাকে পড়েছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। বিদ্যুৎ বিভাগ সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

Manual7 Ad Code

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বাংলাদেশে ভারতের ঝাড়খন্ডের গোড্ডা কেন্দ্র থেকে আদানি পাওয়ার এক হাজার ৪৩৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারে। কিন্তু গত মাসের শেষ দিকে ওই কেন্দ্রটির উৎপাদন কমে যায় এবং এখনো যা অব্যাহত রয়েছে। মূলত কয়লা সঙ্কটের কারণে ভারতের বিদ্যুৎ উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে। ফলে ভেড়ামারা এইচভিডিসি সাবস্টেশন দিয়ে প্রতিদিন ভারত থেকে এক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আসার কথা থাকলেও সামপ্রতিক সময়ে দেখা যাচ্ছে মাঝেমধ্যেই সরবরাহ কমিয়ে ৭০০ থেকে ৭৫০ মেগাওয়াটে নামানো হচ্ছে। যদিও ভারতের ত্রিপুরা থেকে স্বাভাবিক রয়েছে বিদ্যুৎ সরবরাহ।

Manual6 Ad Code

সূত্র জানায়, দেশে সামপ্রতিক সময়ে মোট ১৬ হাজার মেগাওয়াট থেকে ১৬ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। তাতে পিডিবি চলতি বছরের অক্টোবর মাসেও চাহিদামাফিক বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারছে না। ফলে এখনো প্রতিদিনই দিনের কোনো কোনো সময় ২ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং করতে হচ্ছে। তার মধ্যে আদানি বিদ্যুৎ সরবরাহ কমে যাওয়ায় চাহিদা সামাল দিতে অতিরিক্ত তেলচালিত বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে হচ্ছে। অথচ আদানি স্বাভাবিক থাকলে প্রতি ঘণ্টায় অন্তত ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যেত। কয়লাচালিত কেন্দ্র থেকে প্রতি ইউনিট গড়ে ১৩ টাকা করে বিদ্যুৎ পাওয়া গেলেও সাম্প্রতিক সময়ে ফার্নেস অয়েলের দাম বৃদ্ধি পাওয়াতে গড়ে প্রতি ইউনিটের ২৪ টাকা জ্বালানি খরচ হচ্ছে। তার বাইরে আরো এক টাকা ৫০ পয়সা থেকে দুই টাকা পর্যন্ত ক্যাপাসিটি পেমেন্ট ধরলে প্রতি ইউনিটের দাম দাঁড়ায় ২৬ টাকা। তাতে যে বিদ্যুৎ কয়লা থেকে ১৩ টাকায় পাওয়া যেত তা এখন বিদ্যুৎ ফার্নেস অয়েল থেকে ২৬ টাকায় উৎপাদন করা হচ্ছে। অর্থাৎ প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে অতিরিক্ত ১৩ টাকার ক্ষতি হচ্ছে। তাতে পিডিবির প্রতিদিন আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ১৫ কোটি ৫০ লাখ টাকার মতো। আর এক মাস তা অব্যাহত থাকলে ক্ষতির পরিমাণ ৪৫০ কোটি ছাড়িয়ে যাবে।

Manual7 Ad Code

সূত্র আরো জানায়, বাংলাদেশে গত ২৮ আগস্ট রাত ১টায় আদানি থেকে এক হাজার ৮২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। তারপর রাত ২টায় উৎপাদন ২০০ মেগাওয়াট কমিয়ে ৮৮১ মেগাওয়াট করা হয়। তার দুদিন পর গত ৩০ আগস্ট ভোর ৫টায় আদানি পাওয়ার উৎপাদন কমাতে শুরু করে। আর তার এক ঘণ্টা পর আদানি কেন্দ্রটির একটি ইউনিট বন্ধ করে উৎপাদন ৫০৭ মেগাওয়াটে নামিয়ে আনে। এখনো ওই ইউনিটটি চালু করা সম্ভব হয়নি। ফলে এখন পর্যন্ত আদানির উৎপাদন ৫০০ থেকে ৬৫০ মেগাওয়াটের মধ্যে রয়েছে। যদিও বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তিতে আদানির ক্ষেত্রে বলা আছে, কোনো কারণে বাংলাদেশ কেন্দ্রটির ৩৪ ভাগের কম বিদ্যুৎ নিলে পিডিবির জরিমানা (এলডি) দিতে হবে। আর কেন্দ্রটি পিডিবির চাহিদামতো পুরো এক হাজার ৪৩৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করার জন্য প্রস্তুত রাখা হবে। পাওয়ার গ্রিড কোম্পানির ন্যাশনাল লোড ডেসপ্যাচ সেন্টার প্রতি ঘণ্টায় যে পরিমাণ বিদ্যুতের চাহিদা দেবে, ওই পরিমাণ বিদ্যুৎ আদানি পাওয়ার সরবরাহ করবে। তবে প্রতিটি বিদ্যুৎকেন্দ্র সংস্কার, রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বছরে একটি নির্দিষ্ট সময় বন্ধ রাখতে পারবে। কেন্দ্রগুলো সারা বছর যে পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করে তা ধরেই ওই হিসাব করা হয়। এটাকে আউটেজ বলা হয়। কয়লাচালিত কেন্দ্র বছরে ১৫ ভাগ আউটেজ পেয়ে থাকে। কোনো কারণে কেন্দ্রটি বন্ধের সীমা ১৫ ভাগ আউটেজ অতিক্রম করলে তাকে পৃথকভাবে জরিমানা দিতে হয়। তখন কেন্দ্রটিকে যে ক্যাপাসিটি পেমেন্ট দেয়া হয়, তা কেটে নেওয়া হয়। অর্থাৎ আদানি যদি ওই আউটেজ সীমা অতিক্রম করে তাহলে পিডিবি তার ক্যাপাসিটি পেমেন্ট কেটে নিতে পারবে। যা প্রতি ইউনিটে সাড়ে ৪ সেন্টের মতো।

এদিকে তীব্র কয়লা সংকটে চলতি বছর ভারতের দীর্ঘায়িত গ্রীষ্ম এবং এল নিনোর প্রভাবে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ায় ভারতের বাড়তি বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে তাপবিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। গত সেপ্টেম্বর মাসে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বেশি হারে চললেও ভারতের বিদ্যুৎ ঘাটতি ৩ বছরের বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় কয়লা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান কোল ইন্ডিয়া থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করে দেশটির রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ন্যাশনাল থার্মাল পাওয়ার করপোরেশন (এনটিপিসি)। কিন্তু গত এপ্রিলে ১ কোটি ৮০ লাখ মেট্রিক টন কয়লা থেকে কমে বর্তমানে ৫৫ লাখ টনে নেমে এসেছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ার পাশাপাশি কয়লাখনি এলাকায় ভারী বৃষ্টির কারণে স্থানীয় সরবরাহ কমে যাওয়ায় মজুদ বৃদ্ধি করা কঠিন হয়ে পড়েছে। আর ভারতের ওই সংকট এখন বাংলাদেশের ওপরও পড়েছে।

অন্যদিকে বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যুতের মতো পণ্যে পরনির্ভরশীলতার বদলে স্বনির্ভরতা জরুরি। সেক্ষেত্রে দেশের মধ্যে কেন্দ্র থাকলে উদ্যোগী হয়ে সমস্যার সমাধান করা যেতে পারে। কিন্তু অন্য কোনো দেশে কেন্দ্র থাকলে তারা কোনো কারণে বিপাকে পড়লে এদেশকে বিপাকে পড়তে হয়। আদানি বিদ্যুৎ সরবরাহ না করে চুক্তির বরখেলাপ করছে। সরকারের উচিত বিষয়টিকে বিশেষভাবে দেখা।  এ প্রসঙ্গে পিডিবির সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম জানান, আদানি অনেক বারই তাদের দ্বিতীয় ইউনিট উৎপাদনে আসবে বলে জানালেও তা আসেনি। তাই নতুন করে যে তারিখ দিয়েছে তা প্রকাশ করা হচ্ছে না। বাংলাদেশ যদি বিদ্যুৎ নিতে না পারে তাহলে এলডি বা জরিমানার বিধান রয়েছে। বর্তমানে আদানি বিদ্যুৎ সরবরাহ না করায় তেলচালিত কেন্দ্র থেকে ওই বিদ্যুৎ উৎপাদন করে চাহিদা মেটানো হচ্ছে।

Manual7 Ad Code

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual4 Ad Code