ইউরোপে পাঠাবে বলে টাকা নিয়ে লাপাত্তা দালাল, ১৬ যুবকের আত্মহত্যার হুমকি

লেখক: Shiuly
প্রকাশ: ৩ years ago

Manual7 Ad Code

নিউজ ডেস্ক: দেশে তেমন কিছু করতে না পারায় পূর্ব ইউরোপের দেশ রোমানিয়া যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এ জন্য শেষ সম্বল বাড়িভিটা বিক্রি ও ধারদেনা করে ৭ লাখ টাকা দেন এক ট্রাভেলস কোম্পানি মালিককে। পরে ভিসা দেখিয়ে ফ্লাইটের দুটি তারিখও দেন ওই ট্রাভেল মালিক। সবশেষ ফ্লাইটের একটি তারিখ দিয়ে নির্ধারিত সময়ের তিন আগে লাপাত্তা হয়ে যান সেই ব্যক্তি।

প্রতারিত যুবক সিলেটের গোলাপগঞ্জের মোল্লারচকের বীর মুক্তিযোদ্ধা মৃত আব্দুল মালিকের ছেলে টিপু সুলতান। একইভাবে প্রতারণার স্বীকার হয়েছেন ওই এলাকার ১৬ জন যুবক। তাঁরা একযোগে ফেসবুক লাইভে এসে আগামী ২৬ নভেম্বর পর্যন্ত আলটিমেটাম দিয়ে আত্মহত্যার হুমকি দিয়েছেন। গত শুক্রবার সন্ধ্যায় উপজেলার আছিরগঞ্জ বাজারে এক প্রতিবাদ সভা করে তাঁরা এমন হুমকি দেন।

Manual2 Ad Code

অভিযুক্ত ট্রাভেলস কোম্পানির মালিক জহির উদ্দিন গোলাপগঞ্জের আছিরগঞ্জ বাজারের আমকোনা গ্রামের মৃত রফিক উদ্দিনের ছেলে। তিনি ওই বাজারের আজিজ ট্রাভেলস নামে একটি প্রতিষ্ঠানের মালিক। জহির উদ্দিন বিভিন্ন দেশে লোক পাঠান। এর আগে তাঁর মাধ্যমে ওই এলাকার বেশ কয়েকজন সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে গেছেন।

এখন ধারদেনার টাকা নিয়ে দুশ্চিন্তা, বাড়িভিটাও নেই টিপু সুলতানের। তিনি বলেন, ‘বাড়িভিটা বেচে ও ধারদেনা করে ৭ লাখ টাকা দেই আজিজ ট্রাভেলসের মালিক জহির উদ্দিনের কাছে। এলাকার হওয়ায় তাকে বিশ্বাস করতে দ্বিধা করিনি। যার কারণে আমি, আমার চাচাতো ভাই আলফাছ উদ্দিন ও ভাতিজা আব্দুল্লাহ আল নাহিদ একসাথে চুক্তিবদ্ধ হয়ে বিভিন্ন ধাপে টাকা দেই। প্রথমে পাসপোর্ট জমা দেওয়ার সময় আমরা তিনজন মিলে দেড় লাখ টাকা দেই। পরে সরাসরি তার হাতে সাড়ে ৩ লাখ টাকা করে তিনজনে ১০ লাখ ৫০ হাজার টাকা দেই। সবশেষ পূবালী ব্যাংকের মাধ্যমে জনপ্রতি ৩ লাখ করে ৯ লাখ টাকা দেই গত জানুয়ারির ২৬ তারিখ।’

Manual7 Ad Code

গত ফেব্রুয়ারির ১২ ও ১৩ তারিখের ফ্লাইট মিস হওয়ার কারণে ২৩ ফেব্রুয়ারি যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে আর কোনো খোঁজখবর নেই জহির উদ্দিনের। প্রতারিত হয়েছেন ১৬ জন যুবক।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জহির উদ্দিন রোমানিয়া ও তিউনিসিয়ায় পাঠাবেন বলে গোলাপগঞ্জের ১৬ জনের কাছ থেকে তাঁদের পাসপোর্ট ও সব মিলিয়ে প্রায় কোটি টাকা হাতিয়ে নেন। পরে টাকা ও পাসপোর্ট নিয়ে লাপাত্তা হয়ে যান।

Manual7 Ad Code

প্রতারিত যুবকেরা হলেন—১০ নং উত্তর বাদেপাশা ইউনিয়নের খাগাইলের আব্দুস সোবহান, আলী হোসেন, আমকোনার সাইদ আহমদ, ফখর মিয়া, আব্দুল ওদুদ, মোল্লারচকের আলফাছ উদ্দিন, টিপু সুলতান, আব্দুল্লাহ আল নাহিদ, বাগলা গ্রামের নাসির উদ্দীন, হীরা মিয়া, তিলপাড়া ইউনিয়নের দেবারাই গ্রামের দুলাল মিয়া, বুধবারী বাজারের চন্দর পুরের আলী, কালপাড়া গ্রামের কামরান হোসেন কবির, আহমদপুরের আলী হোসেনসহ আরও দু’জন।

টাকা চাওয়ায় সম্প্রতি জহিরের চাচা নুর উদ্দিন তাঁদের ও আত্মীয়–স্বজনদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগে মামলা করে হয়রানি করছেন বলেও প্রতিবাদ সভায় অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।

ব্যবসায়ী আব্দুস সালাম ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ছোট ভাই সোবহানকে রোমানিয়া পাঠানোর জন্য জহিরের নুর উদ্দিনের মাধ্যমে তাঁকে ৬ লাখ টাকা দেন। রোমানিয়া যাওয়ার নির্দিষ্ট তারিখও দেন জহির। এখন কিস্তি সামলানোর পাশাপাশি অন্যান্য ঋণও তাঁকে শোধ করতে হচ্ছে।

আরেক ভুক্তভোগী আলী হোসেন বলেন, ‘জহির আমাকে বলে, ৬ লাখ টাকা দিলেই রোমানিয়া পৌঁছিয়ে দিবে। একথা শুনে আমি ব্যাংক থেকে দেড় লাখ টাকা লোন তুলে সব মিলিয়ে ২ লাখ টাকা দেই জহিরকে। সে আমাকে ভিসার কাগজ দেখায় এবং বাকি ৪ লাখ টাকা রেডি রাখার কথা বলে। সে ঢাকা থেকে এলেই সেই ৪ লাখ টাকা দিতে হবে। এর আগেই সে লাপাত্তা। এখন আমাকে প্রতি মাসে ১৫ হাজার টাকা করে কিস্তি দিতে হচ্ছে। আট সদস্যের পরিবার চালাব, নাকি কিস্তি চালাব!’

Manual7 Ad Code

আব্দুস সালামের টাকা লেনদেনের বিষয় অস্বীকার করে নুর উদ্দিন আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘ভাতিজায় দালালি করলেও আমি এসবের সাথে জড়িত না। কোনো কারণ ছাড়াই তারা আমাকে দুই দিন ধরে নিছে। আমার কোনো নিরাপত্তা নাই। যার কারণে কোর্টে মামলা করতে বাধ্য হই। তারাও আমার নামে মামলা করছে। কোর্ট আমাকে কোনো প্রকার লেনদেনের সাথে জড়িত না পেয়ে জামিন দেন।’

জহির উদ্দিনের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে কল করলে প্রথম কেটে দেন। পরে মেসেজে পাঠিয়ে ব্যস্ততার কথা বলেন। ঘটনা তাঁর এলাকার বলে স্বীকার করলেও এসব ব্যাপারে জানেন না বলে দাবি করেন। এ নিয়ে আর কোনো কথা বলতে তিনি রাজি হননি।

এ ঘটনার বিষয়ে গোলাপগঞ্জের বাদেপাশা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জাহিদ হোসাইন বলেন, ‘ঘটনা সত্য। জহিরের পরিবারের সাথে এলাকার, পঞ্চায়েতের মুরব্বিরা বসেও এটার কোনো সমাধান করতে পারেননি। প্রায় কোটি টাকা মেরে জহির এখন দেশের বাইরে। আমরাও সালিসে বসছিলাম এটার সমাধান করার জন্য। কিন্তু জহিরের পরিবারের কেউই আসেনি। যারা প্রতারিত হয়েছে, বর্তমানে তাদের মামলা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে।’

নিরাপত্তা শঙ্কার কথা বলে সাতজনকে আসামি করে গোলাপগঞ্জ থানায় মামলা করেছেন জহির উদ্দিনের চাচা নুর উদ্দিন। আবার ভুক্তভোগীদের মধ্যে উপজেলার জাঙ্গালহাটার পালপাড়া গ্রামের কামরান হোসেন কবির (৩৪) বাদী হয়ে জহির উদ্দিনকে প্রধান আসামি করে পাঁচজনের নামে গোলাপগঞ্জ থানায় মামলা করেন। তবে এলাকার সালিসের পরামর্শে পরে মামলা তুলে নিয়েছেন।

কিন্তু টাকার আদায়ের বিষয়ে কোনো সুরাহা না হওয়ায় উপজেলার বাদেপাশা ইউনিয়নের মোল্লারচক গ্রামের টিপু সুলতান বাদী হয়ে গোলাপগঞ্জ থানায় ছয়জনের নাম উল্লেখ করে মামলা করেছেন। মামলায় একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন গোলাপগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রফিকুল ইসলাম। তিনি জানান, মামলার তদন্ত চলছে। সব ইমিগ্রেশনে খবর দেওয়া হয়েছে। জহিরের ব্যাপারে এখনো পর্যন্ত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual5 Ad Code