ইসলামে কৃষি ও উশর আদায়

লেখক: Shiuly
প্রকাশ: ৫ years ago

Manual6 Ad Code

ইসলামিক ডেস্কঃ

জমিতে উৎপাদিত ফসলে রয়েছে ভূমিহীন ও বঞ্চিত মানুষের অধিকার। জাকাতের মতো ফসলের উশর আদায়কে গুরুত্ব দিলে অর্থনৈতিক বৈষম্য সিংহভাগ কমে যেত। ফসলের জাকাত আদায় করা ফরজ। বিষয়টি পবিত্র কোরআন দ্বারা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত। এ প্রসঙ্গে কোরআনে কারিমে ইরশাদ হচ্ছে, ‘তার ফসল উৎপাদিত হলে তা তোমরা খাও এবং ফসল কাটার দিনই তার হক আদায় করো।’ সুরা আনআম : ১৪১
বর্ণিত আয়াতে ‘ফসল কাটার দিনই তার হক আদায় করার দ্বারা জাকাতকে বোঝানো হয়েছে। আর ফসলের জাকাত হচ্ছে ‘উশর।’ বাংলাদেশের জনগণ কৃষি নির্ভর। দেশে পর্যাপ্ত কৃষি জমি এবং জনশক্তি থাকার পরও বিভিন্ন খাদ্য-পণ্য আমদানি করতে হয়। তাই কৃষিতে বিনিয়োগ ও মনোযোগ বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নয়ন আবশ্যক।

Manual3 Ad Code

কৃষি বিজ্ঞানের উন্নয়নে মুসলিমদের ইতিহাস স্বর্ণোজ্জ্বল। যুগে যুগে মুসলিম খলিফারা দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে কৃষির প্রতি যথেষ্ট মনোযোগী ছিলেন। সাহাবায়ে কেরাম চাষাবাদ করেছেন। মহানবী হজরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কৃষি কাজ করেছেন, কৃষি কাজের প্রশংসা করেছেন। কোরআনে কারিমের অনেক আয়াতে কৃষি প্রসঙ্গে আলোচনা রয়েছে। বলা হয়েছে, ‘তোমরা যে বীজ বপন করো, সে সম্পর্কে ভেবে দেখেছ কি? তোমরা তাকে উৎপন্ন করো না আমি উৎপন্নকারী?’ সুরা ওয়াকিয়া : ৬৩-৬৪

কৃষি কাজের জন্য পানি একটি অপরিহার্য উপাদান। পানি ছাড়া এ জমিনে কোনো কিছু উৎপন্ন করা সম্ভব নয়। এ প্রসঙ্গে ইরশাদ হচ্ছে, ‘তিনিই (আল্লাহ) আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেছেন। অতঃপর আমি এর দ্বারা সব ধরনের উদ্ভিদ উৎপন্ন করেছি। অতঃপর আমি এ থেকে সবুজ ফসল নির্গত করেছি, যা থেকে যুগ্ম বীজ উৎপন্ন করি। খেজুরের কাঁদি থেকে গুচ্ছ বের করি, যা নুয়ে থাকে এবং আঙুরের বাগান, জয়তুন ও আনার পরস্পর সাদৃশ্যযুক্ত এবং সাদৃশ্যবিহীন (উৎপন্ন করি)। বিভিন্ন গাছের ফলের প্রতি লক্ষ্য করো যখন সেগুলো ফলন্ত হয় এবং তার পরিপক্বতার প্রতি লক্ষ্য করো। নিশ্চয়ই এগুলোতে নিদর্শন রয়েছে বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের জন্য।’ সুরা আনআম : ৯৯

Manual2 Ad Code

 

Manual4 Ad Code

কোনো জমি যেন অনাবাদি-পতিত অবস্থায় না থাকে, সে জন্য নবী কারিম (সা.) বলেন, ‘যার কোনো জমি আছে সে যেন তা চাষাবাদ করে। অথবা অন্য ভাইকে দান করে দেয় (তবুও যেন অনাবাদি না থাকে) ।’ সহিহ্ বোখারি : ২৪৯৩

সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেঈনরা কৃষি উন্নয়নে খুব মনোযোগী ছিলেন। ‘হজরত উসমান (রা.) কে একবার জিজ্ঞেস করা হলো, আপনি বৃদ্ধ বয়সে বৃক্ষরোপণ করছেন কেন? তিনি উত্তর দিলেন, সৎকর্মরত অবস্থায় আমার মৃত্যু হওয়া ফাসাদরত অবস্থা থেকে উত্তম।’

একবার সাহাবি হজরত আবু দারদা (রা.) আখরোট গাছ রোপণ করছিলেন। তখন তাকে বলা হলো, আপনি বৃদ্ধ বয়সে এটা কেন লাগাচ্ছেন? অথচ এর ফল পেতে ২০ বছর (অর্থাৎ অনেক) সময় লাগবে। তিনি উত্তর দিলেন, ‘আজর তথা প্রতিদান ছাড়া আমার অন্য কোনো চাহিদা নেই।’ নুজহাতুল আনাম : ১৮৫

Manual4 Ad Code

পরিতাপের বিষয় হলো, নতুন প্রজন্ম কৃষিকে নিম্নমানের পেশা হিসেবে গণ্য করে। যে কর্মের ওপর ভিত্তি করে মানবসভ্যতা টিকে আছে তাকে অবজ্ঞা করে। আরও আক্ষেপের বিষয় হলো, মুসলিম দেশগুলোর ভূমি চাষাবাদের জন্য সবচেয়ে উর্বর হওয়া সত্ত্বেও খাদ্যপণ্য অন্যদের কাছে হাত পাততে হয়।

কৃষি জমির জাকাত আদায়ের গুরুত্ব

ফসলের জাকাতকে ‘উশর’ বলা হয়। ‘উশর’ অর্থ এক দশমাংশ। মুসলমানের মালিকানাধীন ভূমি থেকে উৎপাদিত ফসলের এক দশমাংশ বা দশ ভাগের এক ভাগ অথবা এক দশমাংশের অর্ধেক তথা বিশ ভাগের এক ভাগ জাকাত দেওয়াকে ‘উশর’ বলে। অর্থাৎ মুসলমানের মালিকানাধীন যেসব জমিকে বৃষ্টির পানি এবং নদীর পানি সিক্ত করে কিংবা স্বভাবতই সিক্ত থাকে এমন জমি থেকে উৎপাদিত ফসলের দশ ভাগের এক ভাগ জাকাত দিতে হবে এবং যেসব জমিকে সেচের মাধ্যমে সিক্ত করা হয় এমন জমি উৎপাদিত ফসলের বিশ ভাগের এক ভাগ জাকাত দিতে হবে। অন্যান্য সম্পদের জাকাত আদায়ের ক্ষেত্রে নেসাব পরিমাণ সম্পদ পূর্ণ এক বছর মালিকানাধীন থাকা শর্ত। কিন্তু ‘ফসলের জাকাত আদায়ের ক্ষেত্রে সেই ফসল এক বছর মালিকানাধীন থাকা শর্ত নয়। বরং যখনই ফসল হস্তগত হবে তখনই উশর আদায় করতে হবে। এমনকি বছরে যতবার ফসল উৎপাদন হবে ততবারই ফসলের দশ ভাগের এক ভাগ জাকাত হিসেবে আদায় করতে হবে। ‘উশর’ এর জাকাত সম্পর্কে হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বর্ণিত হাদিসে হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘যে জমিকে বৃষ্টির পানি অথবা নদীর পানি সিক্ত করে অথবা স্বভাবতই সিক্ত হয় তাতে ‘উশর’ অর্থাৎ দশ ভাগের এক ভাগ জাকাত দিতে হবে। আর যে জমিকে সেচের মাধ্যমে সিক্ত করা হয় তাতে ‘অর্ধ উশর’ অর্থাৎ বিশ ভাগের এক ভাগ জাকাত দিতে হবে।’ সহিহ্ বোখারি

ফসলের জাকাত আদায় ফরজ। এ বিষয়টি পবিত্র কোরআন দ্বারা সুস্পষ্ট প্রমাণিত। যে আয়াত লেখার শুরুতে (সুরা আনআম : ১৪১) উল্লেখ করা হয়েছে। আয়াতে ‘ফসল কাটার দিনই তার হক আদায় কর’ দ্বারা জাকাতকে বোঝানো হয়েছে। আর ফসলের জাকাত হচ্ছে ‘উশর।’ তাই আয়াতের মর্মানুযায়ী ‘উশর’ আদায় করা ফরজ। অন্য আয়াতে ইরশাদ হচ্ছে, ‘হে ইমানদাররা! তোমরা যা উপার্জন কর এবং আমি যা ভূমি থেকে তোমাদের জন্য বের করে দেই এর মধ্যে যা উৎকৃষ্ট তা ব্যয় কর।’ সুরা বাকারা : ২৬৭

এ আয়াতে বাধ্যতামূলকভাবে ফসলের জাকাত তথা ‘উশর’ আদায়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ইমাম আবু হানিফা, ইমাম আবু ইউসুফ, ইমাম শায়বানি, ইমাম মালেক, সাঈদ ইবনুল মুসায়্যেব, কাতাদাহ ও দাহহাকসহ বেশির ভাগ মনীষীর মতে, এ আয়াতে আল্লাহর হক বলতে ফসলের জাকাত উশরকে বোঝানো হয়েছে।

উশরের নিসাব কী?

উল্লিখিত হাদিসের ভিত্তিতে ইমাম মালেক, ইমাম শাফেয়ি, ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল, ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদসহ বেশির ভাগ আলেম মত প্রকাশ করেছেন, পাঁচ ওয়াসাকের পরিমাণে কোনো জাকাত হবে না। ‘পাঁচ ওয়াসাক’ বলতে কী পরিমাণ বোঝাবে এ ক্ষেত্রে কিছুটা মতভেদ আছে। ৬০ সা-এ এক ওয়াসাক হয়ে থাকে। মতভেদের কারণ হচ্ছে সা-এর পরিমাণ। এ প্রসঙ্গে বিস্তারিত আলোচনার পর ড. ইউসুফ কারজাভি মত দিয়েছেন, পাঁচ ওয়াসাক সমান ৬৫৩ কিলোগ্রাম অর্থাৎ ১৮ মণের মতো। অর্থাৎ ১৮ মণের বেশি ফসল হলে উশর প্রদান করতে হবে।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual6 Ad Code